Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক
  • নভেম্বর ১১, ২০২১

ধা|রা|বা|হি|ক: কয়েকটি প্রেমের গল্প |পর্ব ৩০|

দেবপ্রিয় চক্রবর্তী
ধা|রা|বা|হি|ক: কয়েকটি প্রেমের গল্প |পর্ব ৩০|

অলঙ্করণ: দেব সরকার

জীবনের রোজনামচায় আকস্মিক তার আগমন। স্থায়িত্বে কোথাও সে পূর্ণাঙ্গ, আবার কোথাও অসম্পূর্ণ। রূপক এ নয়, নানান জীবনচর্যায়, সেই পূর্ণ অপূর্ণের রূপ নিয়ে দেবপ্রিয় চক্রবর্তীর ধারাবাহিক কথামালা…

 

সিধু

ফুল বাগানে মোষ ও  ডায়ালগবাজি

এয়ারপোর্টে পার্কিংয়ে অভির গাড়িতে উঠে সিধু প্রশ্ন করল –‘লীনার সঙ্গে কবে দেখা করাবি?’
–‘কিছু বলতে পারছি না। সব কেমন গোলমাল হয়ে গেছে। সকালে গুড মর্নিং জানিয়ে মেসেজ করেছিলাম। এক ঘণ্টা পর উত্তর এসেছে। শুধু গুড মর্নিং। সুরটা কেটে গেছে মনে হচ্ছে।’ বিমর্ষ জবাব অভির।
–‘হবেই। সরলরেখার সম্পর্কটা হঠাৎ ট্রায়াঙ্গল হয়ে গেছে তো।’ ফোন বের করে নিশাকে পৌঁছনর মেসেজ করতে করতে মন্তব্য করল সিধু।
অভি চুপ করে রইল। ফোনটা ড্যাশ বোর্ডে রেখে সিধু প্রশ্ন করল –‘রিয়ার সঙ্গে দেখা করবি?’
–‘করতে চাই না। কিন্তু দেখা হবেই।’
–‘হ্যাঁ সেটা হয়তো ভবিতব্য। ভালো নাটকে পড়েছিস। তোর নিজের কি ইচ্ছে?’
–‘রিয়া আমার একটা সুখ এবং দুঃখের স্মৃতি। কিন্তু লীনা আমার একটা খুব সুন্দর বর্তমান। হয়ত ভবিষ্যৎ ও। তোর কি মনে হয় আমার কাছে কোনটা বেশি জরুরি?’ ট্রাফিক লাইটে ব্রেক কষে সিধুর দিকে ফিরে বলল অভি।
–‘হুম্‌। বুঝলাম। তোর লীনাকে সেটা বলা উচিত।’ জানালা নামিয়ে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকা ভিখিরিকে দশ টাকার একটা নোট দিতে দিতে মতামত জানাল সিধু।
– ‘বলব কিন্তু তার আগে আমি একটা বিষয়ে নিশ্চিত হতে চাই।’ ট্রাফিক আলো সবুজ হতে গাড়ির গিয়ার বদলে রওয়ানা হয়ে বলল অভি।
–‘কি?’ অভির দিকে ফিরে তাকিয়ে প্রশ্ন করল সিধু।
– ‘লীনার কাছেও কি আমি অতটাই জরুরী? নইলে বন্ধুত্বটাও হারিয়ে ফেলতে পারি।’
–‘তোদের পেহলা আপ -এর চক্করে ট্রেন না ছুটে যায়।’
– ‘তোর কি মনে হয়?’
– ‘দুজনের সঙ্গে তোর বোঝাপড়া করে নেওয়া উচিত। নইলে তোর নিজের জীবনটা ঘেঁটে যাবে।’ জানালা দিয়ে বাইরে দেখতে দেখতে বলল সিধু।
–‘রিয়ার সঙ্গে আবার কিসের বোঝাপড়া?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল অভি।
–‘ওটার ক্লোজার না হলে পিছুটান থেকে যাবে তোর। কিন্তু এটা আমার মতামত। এখনই কিছু বলতে পারছি না। লীনার সঙ্গে একবার দেখা করাতে পারবি তো?’
–‘ সে তো করাবই। কবে সেটা জানিনা। কতদিন আছিস?’
–‘যতদিন না তোর ভাঙ্গা হৃদয়টা জোড়া লাগছে কিংবা আবার ভেঙেচুড়ে বরবাদ হচ্ছে।’ অন্যমনস্ক স্বরে বলল সিধু।
–‘আমার লাইফটা নিয়ে ইয়ার্কি মারছিস?’
–‘ না সত্যিটাই বললাম।’
– ‘ভয় দেখাস না।’
–‘সেটার জন্য আমার দরকার নেই। লীনাকে হারানোর ভয়ে সিঁটিয়ে আছিস সে তো বোঝাই যাচ্ছে।’
–‘গুরুদেবের অন্তর্দৃষ্টি কিছু কমেনি দেখছি।’
–‘সেজন্যই তো আসা। তোর হয়ে একটা ঘটকালি আমি ফেল করেছি। এবার এটা দেখি কি হয়।’
–‘থ্যাঙ্ক ইউ সিধু। এসেছিস বলে।’ কৃতজ্ঞতা জানাল অভি।
–‘মোস্ট ওয়েলকাম ব্রো। তবে এর অর্ধেকটা তোর বোনেরও প্রাপ্য। ওই ঠেলল আমাকে এখানে আসার জন্য। তোর নাকি আমাকে দরকার এখন।’ হেসে বলল সিধু।
–‘একদম ঠিক বলেছে। নিশা একটা সুইটহার্ট।’ সিধুর সঙ্গে দেখা হবার পর প্রথমবার খুশি মুখে বলল অভি।
-‘হ্যাঁ আশা করা যাক, সব ঠিক হয়ে যাবে।’

•♦••♦••♦•

সিধুকে ফ্ল্যাটে নামিয়ে অফিসের জন্য বেরিয়ে গেল অভি। অরুণকে নিয়ে ওর মা-বাবা পাটনা চলে গেছেন। সকালেই জয়িতা এয়ারপোর্টে হুইলচেয়ারে বসা অরুণকে সি -অফ করতে গিয়েছিল। তারপর অভিকে ফোন করেছিল। অভি অফিসে দেরিতে আসবে জানিয়ে দিয়েছে।
অমিতাভদাকে সকালে ব্রেকফাস্ট তৈরী করে দিয়ে সিধুকে এয়ারপোর্ট থেকে পিক আপ করতে এসেছিল অভি। না এলেও চলত। কিন্তু ওর ইচ্ছে করছিল অনেক দিন পর সিধুর সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলতে। ভালই করেছিল। সিধু আসায় কথা বলার একজনকে পেয়ে চিন্তার এলোমেলো ভাবটা একটু কমেছে।
অভির ফ্ল্যাটে ঢুকে জামা কাপড় ছেড়ে গিজারটা অন করে চানে ঢুকতে যাবে সিধু, এমন সময় নিশার ফোন এলো, –‘বাড়ি পৌঁছেছ?’ স্ত্রীর প্রশ্নের উত্তরে বলল সিধু, -‘হ্যাঁ অভি চলে গেছে অফিস। চানে ঢুকছি।’
–‘তারপর প্ল্যান কি?’
–‘ভাবছি বেরোব। পারলে রিয়ার অফিসে যাবো।’

Image removed.

–‘দেখো সাবধান। ফুল বাগানে মোষের মত ঢুকো না ব্যাপারটায়। তোমার তো আবার যা মুখে আসে বলে ফেলার অভ্যাস আছে। ব্যাপারটা ডেলিকেট। একটু সামলে চলবে।’
–‘এটাতো ফুল বাগান নয়। রুক্ষ মাটি। দরকার হলে মোষের মতোই চাষ করে ফসল তুলতে হবে। তবে ভেবো না রিয়াকেও আঘাত দেবার কোনো ইচ্ছে নেই আমার।’
-‘ইচ্ছে করে তো খারাপ করবে না তুমি। একটু সাবধানে হ্যান্ডেল করো সেটাই বলছি।’
নিশার ভয়টা অমূলক নয় জানে সিধু। অদ্ভুত এই পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে জানেনা সে। তবে চেষ্টা তো করতেই হবে আর সেটা সাবধানেই করতে হবে যতদূর সম্ভব। নিশাকে সেটাই বলে চান করে রিয়ার অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল সিধু। ঠিকানা আগেই অভির কাছ থেকে নিয়ে নিয়েছিল।

•♦••♦••♦••♦•

রিয়া মিটিং-এ আছে শুনে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর যখন ভেতরে ডাক এলো তখন রিসেপসনিস্টের ব্যবহারের পরিবর্তনটা দেখে সিধু বুঝল তার আসাটা রিয়ার কাছে অবাঞ্ছনীয় হয়নি। অনুমানটা যে সত্যি সেটা রিয়ার কেবিনের দরজা খুলে ঢুকেই বুঝতে পারলো সে। রিয়ার মুখে অনাবিল হাসি।
–‘হোয়াট এ প্লেজান্ট সারপ্রাইজ সিধুদা। এতদিন পর মনে পড়ল আমাকে?’
–‘কি করা বল? জীবন কি আপাধাপি মে কব ওয়াক্ত মিলা কহি পর বেঠ কভি ইয়ে সোচ সকুঁ যো কিয়া কহা সুনা উষ্মে ক্যায়া বুরা ভলা… আমাদের জীবনে সব কিছুই আছে নেই কেবল সময়।’
-‘বদলাওনি একদম সিধুদা। সেই ডায়লগবাজি চালু আছে। শুধু আগে সেলিম জাভেদ কোট করতে, এখন প্রমোশন হয়েছে, হরিবংশ কোট করছো। সেই সঙ্গে একটু ফিলসফিকাল হয়েছ মনে হচ্ছে।’ হেসে বলল রিয়া।
হাসল সিধুও।
–‘নিশা বলে আমি নাকি আর বড় হইনি, ছোটবেলায়ই আটকে থেকে গেলাম।’
হাসিটা মিলিয়ে গেল রিয়ার।
–‘সে ক্ষেত্রে তুমি লাকি। আমাদের সেই সুযোগটা জীবন দেয়নি। কত ভাল ছিল ছোটবেলাটা – সহজ সরল নিশ্চিন্ত। কি ভাল হত বড় না হলে।’
– ‘তারার প্রোমোটা মনে আছে তোর? সেই ডায়লগটা – জিন্দেগী জিনা উতনা মুশকিল তো নেহি জিতনা লোগ উসে বনা দেতে হ্যায়।’
–‘মুশকিল কি কেউ ইচ্ছে করে বানায় জীবনকে সিধুদা? জটিলতা তো এসেই পড়ে। তারপর সেই জট ছাড়ানোর চেষ্টাই তো জীবনের সংজ্ঞা বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে।’
–‘ফিলোসফিক্যাল তো তুইও কম হোসনি মনে হচ্ছে।’
–‘তোমার ওটা শখের দার্শনিকতা। আমার কাছে ওটা বাস্তবের সঙ্গে লড়বার একটা অস্ত্র। কষ্টের হাত থেকে অনুভূতিগুলোকে বাঁচাবার একটা বর্মও বলতে পার।’ স্থির স্বরে বলল রিয়া।
পরিবেশটা ভারী হয়ে যাচ্ছিল। আলোচনাটা অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য বলল, – ‘আর হঠাৎ কলকাতায় কি মনে করে। তুমি তো দিল্লিতে ছিলে।’
–‘সে তো আগে। এখন মুম্বাইতে থাকি।’ চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল সিধু।
–‘নিশা কেমন আছে? আঙ্কেল আন্টি?’
কিছুক্ষণ খবরা খবর আদান প্রদানে দুজনের মধ্যে পরিবেশটা সহজ হয়ে আসছিল। কিন্তু রিয়ার একটা প্রশ্নে সেটাও বাধা পেল –‘কলকাতায় কোথায় উঠেছ?’
–‘অভির ওখানে।’ সিধুর উত্তরে মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল রিয়ার। ভুরু কুঁচকে গেছে তার।
–‘মানে তোমার এখানে আসাটা একেবারে কোইন্সিডেন্স নয় বলো?’
–‘রিয়া, প্রায় এক যুগ আগে আমরা যে গোলকধাঁধায় পড়েছিলাম সেটা আবার হাজির হল কিনা ভেবে চলে এলাম।’
–‘সেই টিনেজার পাত্র-পাত্রীরা কি আর এখন আছে সিধুদা? অভি প্রফেশনালি আমাদের এখানে কাজ করবে। সেই ছোটবেলার ইতিহাস টানার না সময় আছে না পরিস্থিতি। তুমি শুধু শুধু ভয় পাচ্ছো। না আমি সেই রিয়া না অভি সেই অভি। আমরা প্রাপ্তবয়স্ক প্রফেশনাল এর মত এটা হ্যান্ডেল করে নেব।’
–‘সেটা কি সহজ হবে?’
–‘সহজ কঠিন জানি না সিধুদা যেটা ঠিক সেটা আমি করব অভিও করবে আশা করি।
–‘তোর মতে কোনটা ঠিক?’
–‘দেখ সিধুদা অভি যদি নিজের জীবনটাকে অন্য কারো সঙ্গে জড়িয়ে খুশি হয়। তবে আমার যে অপরাধবোধটা আছে, এই সম্পর্কটা ভেঙে দেবার, সেটা কাটবে। বিশ্বাস করো, আমি চাই অভি সুখী হোক। আর মনে হয় সেই সুখের অবলম্বন খুঁজে পেয়ে গেছে। তুমি সেটা আমার থেকে বেটার জানো নিশ্চয়ই।’
সিধু সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলল –‘অভির সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে পারবি?’
–‘না পারার কি আছে? কাজের মধ্যে ব্যক্তিগত সমস্যা টেনে আনার মত আনপ্রফেশনাল বলে আমাকে মনে হয় কি তোমার?’
–‘এত বড় বিজনেসটা ভেতরের যথেষ্ট শক্তি না হলে চালাতে পারতিস না তাতে সন্দেহ নেই। তবু সবারই তো কোন না কোন জায়গায় দুর্বলতা থাকে।’ বলল সিধু।
–‘থাকে। কিন্তু আমার সেই দুর্বলতা শিলং ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেছনে ফেলে এসেছি। ভুলো না সম্পর্কটা শেষ করার সিদ্ধান্তটা আমার ছিল।’
–‘আমি কিছুই ভুলিনি রে। না অভির দুঃখ তোর লড়াই। সেসব আমার চেয়ে কাছ থেকে কে দেখেছে?’
–‘সেই লড়াইটা না জিতলে আমি কি বিনোদকে বিয়ে করতে রাজি হতাম?’
সিধু বুঝতে পারছিল, নিজের অতীতকে আড়াল করে যে দেয়ালটা তৈরি করেছে রিয়া, সেটা যথেষ্ট শক্ত। নিজের কাজটা সহজ হয়ে যাবে জেনে যতটা খুশি হবার কথা ছিল তার – সেটা হতে পারছিল না। কোথাও না কোথাও রিয়ার জন্য একটা দুঃখ সেটাকে ম্লান করে দিচ্ছে।
রিয়া বললো –‘কিন্তু অভি এখানে কাজ করবে কিনা, সেটা আর আমার একার সিদ্ধান্ত নয়। তার জন্য আমার এক নতুন বন্ধুর মতামতটাও জরুরি।’
রিয়ার মুখে একটা দুর্বোধ্য মুচকি হাসি। ঠিক বুঝতে না পেরে সিধু বললো, – ‘সেটা আবার কে?’
–‘দাঁড়াও। পরিচয় করাই।’ বলে ইনটারকমে ডায়াল করলো রিয়া। ও দিক থেকে নারী কন্ঠের উত্তর স্পিকারএ শোনা গেলে রিয়া অনুরোধ করল, -‘একটু আসতে পারবে আমার ঘরে প্লীজ?’ উত্তরে ‘আসছি’ বলে ফোনটা কেটে দিল ওদিকের মহিলা।
মজা পাওয়ার হাসি ঠোঁটে নিয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকা রিয়াকে দেখতে দেখতে ব্যাপারটা কি হতে চলেছে আন্দাজ করতে চেষ্টা করছিল সিধু।

♦-♦♦-♦♦-♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!