- গ | ল্প
- জুলাই ১০, ২০২১
একটি বিলের আত্মকথা
চিত্র: তপন মিত্র ।
এক
লোকদুটো গতকালও এসেছিল। গতকাল ভাড়ুলগাছটার আড়ালে দাঁড়িয়ে ভুঁড়িমোটা লোকটি ফিসফিস করে বলছিল, ‘দরকার হলে রেট কিছুটা কমিয়ে দেব। কাস্টোমারে লাইন লেগে যাবে।’ পাতলা হিলহিলে লোকটি ফুট কেটে বলল, ‘এখন শহরের ভেতরে ফাঁকা জায়গা বলতে গেলে এই জায়গাটাই। না হলে দূরে পঞ্চায়েত এলাকায় চলে যেতে হবে।’
ভুঁড়িমোটা লোকটি সিগারেটটায় একবার সুখটান দিয়ে ডান হাত প্রসারিত করে উত্তর দিকের কিছু একটা দেখাল। তারপর বলল, ‘শ-খানেক ট্রলি মনে হয় লাগবে ? ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওতেই ঢিবি হয়ে যাবে।’ বলল পাতলা লোকটি। তারপর ফিসফিস করল, ‘তুমি কিন্তু ওপর মহলটা হাত করে রেখো।’
‘ও নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। শুধু সদানন্দ ডাক্তার একটু ফুটুক ফুটুক করছেন।’
‘একটা ট্যাবলেট দিয়ে দেব নাকি?’
“না না, এক্ষণই ওসব করার দরকার নেই। গতকাল একটা ওষুধ অলরেডি দেওয়া হয়েছে। গাল্লুকে বলে দিয়েছি।’
‘আর কাদির খাঁ?’
‘ও ব্যাটাই তো গণ্ডগোলটা বেশি পাকাচ্ছে। ডিএলআরও’র কাছে দু-বার কমপ্লেন করেছে। এসপি’র কাছেও নাকি একবার গিয়েছিল।’ ধিকধিক করে জ্বলতে থাকা সিগারেটটায় জোর টান দিল ভুঁড়িমোটা লোকটি। দুজনে আরও কিছুক্ষণ ফিসিরফিসির করার পর গাড়িতে উঠে গেল। ভুঁড়ি মোটা লোকটি শ্যামল চৌধুরি। শহরের বড়দা। আর পাতলা লোকটি তার সাগরেদ শম্ভু ভট্ট। বড়দার সাঙ্গেত।
এবার মনে হয় আমার গলা অবধি বুঁজে যাবে। প্রথম যখন নিমগাছটার গোঁড়ায় বাঁশের খুঁটি পড়েছিল তখন আন্দাজই করতে পারিনি, আসল মতলবটা ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির মতো হবে, প্রথমে খুঁটি পোঁতা, তারপরে ত্রিপল টাঙানো, তারপরে কয়েকটা চেয়ার রেখে আবঠি মারা। আর এই আবঠির তলে তলে যে অন্য ফন্দিফেউর ছিল তাই বা কে জানে। সবাই বলে, আমি হলেম শহরের ফুসফুস। শহরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সতেজ অক্সিজেন জোগাই।পরিবেশবীদরা বলেন, আমি মরলেই শহরটার মৃত্যুদণ্ড হয়ে যাবে। ধোপা রথীন লোকটাও তাই, বেস তো কাপড় কাচা-ধোয়া করছিলি তা আবার খুঁচ পোঁতার কী দরকার ছিল বাপু? খেলি তো গুঁতো? এবার না ভিটে ছাড়তে হয়। দাদাদের সাথে পাঞ্জা! দিয়েছে তো মাথা ফাটিয়ে? আরে, বাবা, চুটকে পুটকে গরিব মানুষের অত লাফাং ঝাপাং করতে নেই। ব্যাটা বিলুও বাঁশ খেয়েছে। বেশ তো পাকুড়তলাটায় সাইকেল ভ্যান স্ট্যান্ড দিয়ে ঘুগনি বেচছিলি, তা আবার লুকিয়ে ভ্যানে করে মাটি ফেলার কী দরকার ছিল? লে, চোখের জল আর পাছার কাপড় সম্বল করে এখন বাঁচ।দুই
‘অবৈধ ভাবে বিল ভরাট করা চলবে না………। বিল ভরাটের চক্রান্ত বন্ধ হোক…। ‘ ছলবল করে উঠলাম। জল-পানিতে ডুবে থাকা মাথাটা ভুশ করে তুলে চোখ ফেড়ে তাকালাম। আহা! প্রাণে দুদন্ড শান্তি এল। আজ দেখছি মিছিলের বহর অনেকটাই বেড়েছে। অথচ প্রথম প্রথম যখন প্রতিবাদটা শুরু করেছিল কাদির খাঁ, তখন মুষ্টিমেয় কয়েকজন লোক। পরে তো শ্যামল চৌধুরির হুমকির জেরে সে সংখ্যাটা কমে গোটা দশকে ঠেকেছিল। তবুও কাদির খাঁর গলা থামাতে পারেনি। অবশ্য সদানন্দ ডাক্তার প্রথম থেকেই সঙ্গে ছিলেন। পরিবেশপ্রেমি নিউরো সার্জেন সদানন্দ বরাবর প্রকৃতির ওপর মানুষের আঘাত নেমে এলে সোচ্চার হয়ে এসেছেন। সারাদিন হাজার কাজের ব্যস্ততার মাঝেও কিছুটা সময় বের করে প্রত্যেক সন্ধ্যেয় বিলের ধারের বেঞ্চে এসে স্থির হয়ে বসেন। আর রিফ্রেশ হয়ে অতিরিক্ত অক্সিজেন নিয়ে আবারও রাতের অপারেশন থিয়েটারে ঢোকেন। কাটাছেঁড়া করেন মেন্টালি পাগল মানুষের মগজ। নার্ভ। এত মগজ কাটাছেঁড়া করলেও সদানন্দ ডাক্তারের মন বড়ো নরম।
মাইকের তেজ আর কথার ঝাঁঝ শুনে আজ অনেকদিন পর বুক ডুবিয়ে শ্বাস নিলাম। নিলু হালদারকে দেখলাম ধনুকের মতো বেঁকে ওঠা নারকেল গাছটার আড়ালে ভবেশ মাঝির সাথে ফুসুরফুসুর করছে। নিলু বলছে, ‘কাদির খাঁ আর সদানন্দ ডাক্তার যেভাবে উঠেপড়ে লেগেছে এবার কিছু একটা হবেই।’ ভবেশ বলে, ‘হলেই বাঁচি রে। বিলটা আছে বলেই পেটটা চলে।’ নিলু বলল, ‘বিলটা বুজিয়ে দিলে কত মানুষের পেট মারা যাবে বল তো? আমাদের গোটা জেলেপাড়াটাই না খেয়ে মারা পড়বে।“ ভবেশ বলল, “শুধু কি তোদের জেলেপাড়া? আমাদের মাঝিপাড়াতেও দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। আমরা মরলে মারা পড়বে শহরের মেছোপট্টি।’
আর তার ফলে শহরের ভেতো বাঙালির পাতে টান পড়বে চালতিয়া বিলের সুস্বাদু মাছের।’ বলল নিলু। তারপর চোখ ঘুলিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘এবার আমাদেরও প্রতিবাদ সভায় যোগ দেওয়া উচিৎ। আর কতদিন চুপ মেরে থাকব? এবার যে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেল?’ ভবেশ চোখ পাকাল ‘তোর কি লাশ হওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে? বেশি তিড়িং বিড়িং করলে এই বিলের পাড়েই গদ্দন কাটা হয়ে পড়ে থাকবি। জানিস নে, শ্যামল চৌধুরির ঠাপ? দেখলি নে, তুষারের কী দশা করল, তিন থান করে বিলে ভাসিয়ে দিল!’ শুকনো ঢোক গিলল নিলু। যেন নিজের বলা কথাকে নিজেই গিলে খেলো। সে জানে মাঝিপাড়ার তুষার ছিল প্রতিবাদী ছেলে। বিল বে-দখল হয়ে যাচ্ছে দেখে সে মানবাধিকার কমিশনে নালিশ ঠুকেছিল শ্যামল চৌধুরির নামে। ব্যস, আর যায় কোথায়, চলে গেল মায়ের ভোগে। হাত চুলকানির মতো করে নিলু ফ্যাসফ্যাস করে বলল, ‘এমনি এমনি বললাম। শ্যামল চৌধুরি কী চিজ সে কি আর জানি ন্যা? বাপেরও বাপ।’
হাজার কাজের ব্যস্ততার মাঝেও কিছুটা সময় বের করে প্রত্যেক সন্ধ্যেয় বিলের ধারের বেঞ্চে এসে স্থির হয়ে বসেন।
‘দরকার হলে রিক্সা টোটো চালিয়ে খাব। তবু ওই বিপ্লবী ক্ষুদিরাম হতে যাব না।“ বলল ভবেশ। তার চোখ চিকচিক করছে। নিলু সেটা লক্ষ্য করল। খেয়ালি হয়ে বলল, ‘কত বছরের পুরোনো বিল। বংশ বংশ পরম্পরা ধরে মাছ ধরে আসছি। ঠাকুরদা বলতেন, এই বিলই আমাদের মা রে। আমাদের অন্নপূর্ণা। গর্ভদাত্রী মায়ের মতো সেবাযত্ন করবি, দেখবি মুখে অন্ন ঠিকই তুলে দেবে।’
‘আমার ঠাকুরমাকে দেখতাম প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলা নিয়ম করে বিলের ধারে এসে প্রণাম করতে। জিজ্ঞেস করলে বলতেন, এটাই তো আমাদের আসল ঠাকুর রে। ‘ ফ্যাচ করে নাক টেনে বলল ভবেশ। তারপর লুকিয়ে চোখ মুছল।
নিলু আর ভবেশের চোখের জল দেখে আমার চোখ ছলছল করছে। আর কত কাঁদব? এত কাঁদি তবু ক-জন আর শুনতে পায়? ওই সদানন্দ ডাক্তার আর কাদির খাঁ ছাড়া? কান কি ভগবান শুধু ওদেরই দিয়েছে? শহরের এত্ত ঘিঞ্জি লোক, সব্বাই কি ঠসা-বহরা না আনাকানি? অথচ এ শহরে নেতাদের ডাকে ভিড় উপচে পড়ে! রাস্তাঘাট স্তব্ধ হয়ে যায়। আমার জন্যে এতটুকু চোখের জল ফেলার লোক নেই! অথচ এরা কবে বুঝবে, আমার মরণে ওদের মরণ? কানাঘুষো শুনলাম, শ্যামল চৌধুরি হুমকি দিয়েছেন, আজ কাদির খাঁ বেশি গলা চড়ালে ওর গলার আওয়াজকে চিরতরে বন্ধ করে দেবেন! সে হুমকির খবর নাকি, কাদির খাঁর বাড়িতেও পৌঁছে গেছে! সে জন্যেই কি শাড়ির আঁচলা গুটিয়ে কাদির খাঁর বৌ বিলে এল!তিন
মুক্ত ভর্তি নৌবহর ঢাকা যাবে। সঙ্গে জগত বিখ্যাত বাংলার রেশম। জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জের বালুচরি শাড়ি। নবাব আলিবর্দি খাঁ নিজেই তদারকি করছেন। ভান্ডারদহ বিলে মুক্তোর চাষ শুরু করেছেন নবাব আলিবর্দি। গৌড়ের অধিপতি আলাউদ্দিন হুসেন শাহর গড়ে তোলা হোসেনপুর বন্দর এখান থেকে মাইল বিশেক। কিছু বাণিজ্য তরী ভান্ডারদহ বিল হয়ে আমার বুকের ওপর দিয়ে ভাগীরথী হয়ে পদ্মায় যাবে আর কিছু হোসেনপুর বন্দর হয়ে ভৈরবের ওপর দিয়ে পদ্মা হয়ে ঢাকায় যাবে। স্বয়ং বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব আমার বুকের ওপর দিয়ে যাতায়াত করেন।
ব্রিটিশরা বহরমপুর ব্যারাক আর ক্যান্টনমেন্ট পত্তনের সময় খনন করলেন লালদীঘি। ইট তৈরির কিছু মাটি আমার গতর খুঁড়েও গেছিল। সে মাটি টাপা দিয়ে গরু-মোষের গাড়িতে গড়গড় করে সার বেঁধে গিয়েছিল। ডাচ সাহেব মাঝেমধ্যেই ছিপ হাতে আমার বুকে মাছ ধরতে চলে আসতেন। আমার মান ও গৌরব কোন অংশে কম নয়? তবে আমার একটা লজ্জাও বহুত দিন ধরে ক্ষত হয়ে আছে, পলাশীর যুদ্ধে জয়ী হয়ে ব্রিটিশ সেনারা আমার পাড় দিয়েই বিজয় উল্লাস করতে করতে হেঁটে গিয়েছিল কাশিমবাজারের দিকে। দেখেছিলাম লর্ড ক্লাইভের বিদ্রপ মাখা হাসি। খি খি করে হাসছিলেন মীর জাফর। আমি কিছুই করতে পারিনি। আমি তো আর কালাপানির সমুদ্র নই? আমি হলেম নদীর ছাট পড়া বিল।
মুক্তোর থালার মতো চাঁদ ভাসছে পুব আকাশে। রুপোলি জ্যোৎস্না ছুপছুপ করে ঝরে পড়ছে চরাচরে। হেমন্তের শিশির ভেজা ধানের পাতাগুলো মুক্তোর মতো চিকচিক করে হাসছে। ধান গাছে কেবলই শিষ এসেছে। শিষের খিলখিলে হাসি দেখে আমারও হাসতে ইচ্ছে করছে। কতদিন হাসিনি । একটা উফল মাছ এমন করে উছাল মারল, আমার ঘোর ভেঙে গেল। সেদিন সদানন্দ ডাক্তারই আমার অতীত গৌরব বলতে গিয়ে এসব নবাব-ইংরেজদের কথা মন্থন করছিলেন।
চার
লাশটা পশ্চিম দিকের জমাটি কচুরিপানার ভেতরে ঢোকানো ছিল। কানপট্টি ঘেঁষে একটামাত্র গুলির দাগ। রক্ত দলা হয়ে গোটা মুখ পাকিয়ে বুকে নেমে গেছে। খবরটা দ্রুত ভাইরাল
হয়ে গেছে। ওদিকে আবার বিল ভরাটের বিরুদ্ধে করা কেসটা আজ কোর্টে উঠবে। রায় ঘোষণারও সম্ভাবনা আছে। সদানন্দ ডাক্তার আর কাদির খাঁ দুজনে মিলেই মামলা ঠুকেছিল। বিল ভরাটের বিরুদ্ধে মামলা। তার আগেই এই খুন। শহর একেবারে বাকরুদ্ধ। খবরটা চাউর হওয়ার পর থেকেই সব দোকানপাটও বন্ধ হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ আগেই পুলিশ এসেছে। লাশ পোস্টমর্টেমএর জন্যে নিয়ে গেছে।
লাশকাটা ঘর থেকে মৃতদেহ ফিরল পড়ন্ত বিকেলে। চালতিয়া বিলের নাটাতলায় কাদির খাঁর বাড়িতে তখন ভিড় ঠেললে ঠেলা যাচ্ছে না। নানান কিসিমের লোক এসেছেন। সিঁড়ি ঘরের আড়ালে দাঁড়িয়ে নিলু ফিসফিস করে বলল, ‘এবার কী হবে? কোর্টে কেস লড়বে কে?’ ভবেশ বলল, ‘কেন, সদানন্দ ডাক্তার?’
‘এরপরেও কি উনি সামনে এগোবেন?’ খটকা প্রকাশ করল নিলু। ভিড়ের ভেতর থেকেও কানাঘুষো শোনা গেল, “সদানন্দ ডাক্তার তো একবারও এলেন না!’
ভয়ে নিশ্চয় ঘরের ভেতরে ঘাপটি মেরে গেছেন। এখন একজনই ক্ষুদিরাম, কাদির খাঁ। মনে মনে বিড়বিড় করল নিলু। হঠাৎ কোলাহলের ভেতর থেকে কে একজন বলে উঠলে, ‘ডাক্তারবাবু তো কোর্টে গেছেন।’ সদানন্দ ডাক্তার কোর্টে! চোখ বড় করে নিলু ভবেশের দিকে তাকাল! ভবেশ কিছু না বুঝেই নিলুর দিকে হাঁ করে তাকাল।
❤ Support Us








