Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • মার্চ ২৫, ২০২৬

সমুদ্রতলে ‘অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্র’ গড়ে তুলছে বেইজিং ! প্রশান্ত-ভারত জুড়ে চিনের নজরদারি ঘিরে উদ্বেগ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
সমুদ্রতলে ‘অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্র’ গড়ে তুলছে বেইজিং ! প্রশান্ত-ভারত জুড়ে চিনের নজরদারি ঘিরে উদ্বেগ

উপরে শান্ত নীল জলরাশিআর তার বহু নীচে নিঃশব্দে তৈরি হচ্ছে ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্র! গোটা বিশ্ব যখন হরমুজ প্রণালীর উত্তেজনায় ব্যস্ততখন নীরবে ভারতের কাছাকাছি জলসীমায় তাদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে ড্রাগনেরা। সমুদ্রতলের মানচিত্র আঁকতে একের পর এক গবেষণা জাহাজ নামিয়েপ্রশান্তভারত মহাসাগর জুড়ে বিস্তৃত নজরদারির জাল বিছিয়ে দিচ্ছে চিন। নৌ-বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবিএই বিপুল তথ্যভান্ডারই একদিন সাবমেরিন যুদ্ধের মোক্ষম অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে, বিশেষত আমেরিকা ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে।

রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই বিস্তৃত কার্যক্রমের ছবি।  বছরের বেশি সময় ধরে অন্তত ৪২টি চিনা গবেষণা জাহাজের গতিবিধি খতিয়ে দেখে দেখা গিয়েছেসমুদ্রতলের খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহে ব্যস্ত বেইজিং। কখনো সোজা লাইনে এদিক-ওদিক যাতায়াত করে গ্রিড’ প্যাটার্নে ম্যাপিংকখনো বা সমুদ্রতলে বসানো হচ্ছে সেন্সরযা জলতলের অদৃশ্য গতিবিধিও ধরতে সক্ষম। এই অভিযানের অন্যতম মুখ ডং ফাং হং ৩। ওশান ইউনিভার্সিটি অব চায়নার অধীনস্ত এই গবেষণা জাহাজ ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তাইওয়ানের আশপাশগুয়াম (যেখানে আমেরিকার শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি রয়েছে) এবং ভারত মহাসাগরের কৌশলগত জলসীমায় বারবার চক্কর কেটেছে। জাপানের উপকূলে বসানো চিনা সেন্সর ব্যবস্থার কার্যকারিতাও পরীক্ষা করেছে তারা। আবার শ্রীলঙ্কা থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত মালাক্কা প্রণালীর প্রবেশপথেও দেখা গিয়েছে তাদের নিবিড় উপস্থিতি।

কাগজে-কলমে এসব অভিযানের লক্ষ্য জলবায়ু গবেষণা’ বা কাদা সমীক্ষা। অথচ একই সঙ্গে গভীর সমুদ্রের বিশদ মানচিত্র তৈরির প্রমাণ মিলেছে বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রেই। নৌ-বিশেষজ্ঞদের মতেসমুদ্রতলের ঢালগিরিখাতস্রোতলবণাক্ততা— এসব তথ্য সাবমেরিন পরিচালনার ক্ষেত্রে অমূল্য। কোথায় লুকোনো যাবেকোথায় শত্রুপক্ষকে ধরা সহজসবটাই নির্ভর করে এই অদৃশ্য ভূগোলের উপর। অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন সাবমেরিন প্রধান পিটার স্কট জানিয়েছেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুতির জন্য এসব তথ্য কার্যত সোনার খনি।’ মার্কিন নৌ গোয়েন্দা দপ্তরেরও আশঙ্কা, এই অমূল্য তথ্য চিনের সাবমেরিনকে আরও নিখুঁত ভাবে চালনা ও গোপন থাকতে সাহায্য করবে।

তবে শুধু একটি জাহাজ নয়পুরো নৌবহর কাজ করছে এই লক্ষ্যে। অন্তত ডজনখানেক জাহাজ সরাসরি সমুদ্রতল ম্যাপিংয়ে যুক্তআরও বহু জাহাজে রয়েছে সেই উপযোগী যন্ত্রপাতি। পাশাপাশি শত শত সেন্সর বসানো হয়েছে সমুদ্রের তলদেশেযা তাপমাত্রাস্রোতএমনকি সাবমেরিনের গতিবিধিও পর্যবেক্ষণ করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিনের সিভিল-মিলিটারি ফিউশন’ নীতির ফলেই এই মেলবন্ধন। বেসামরিক গবেষণার আড়ালে সামরিক প্রস্তুতিএই দ্বৈত ব্যবহারই এখন বেজিংয়ের কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু। নজরদারি সবচেয়ে বেশি ঘনীভূত হয়েছে ফিলিপিন্সের পূর্বেযা তথাকথিত ফার্স্ট আইল্যান্ড চেন’-এর অংশ। জাপান থেকে তাইওয়ানসেখান থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াএই দ্বীপশ্রেণি কার্যত চিনের উপকূলকে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। এর এই বেষ্টনী ভাঙতেই মরিয়া বেইজিং। গুয়ামহাওয়াইএমনকি পাপুয়া নিউগিনি ও অস্ট্রেলিয়ার সংলগ্ন জলসীমায় দেখা গিয়েছে ড্রাগন জাহাজের উপস্থিতি। অন্যদিকে ভারত মহাসাগরেশ্রীলঙ্কা থেকে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল— বিশেষত মালাক্কা প্রণালীর প্রবেশপথ রয়েছে চিনের নজরে। কারণএই পথ দিয়েই তারা অধিকাংশ তেল আমদানি করে থাকে। 

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের কাছাকাছি জলসীমায় চিনা গবেষণা জাহাজের বাড়তি আনাগোনা নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সম্প্রতি শি ইয়ান ৬’ নামে আরও একটি জাহাজ সুন্দা প্রণালী পেরিয়ে মালদ্বীপের রাজধানী মালে-র দিকে রওনা দিয়েছে। ইতিমধ্যেই দা ইয়াং হাও’ ও দা ইয়াং ই হাও’ এই অঞ্চলে সক্রিয়। ভারতীয় নিরাপত্তা মহলের একাংশের মতে কর্মযজ্ঞ সরাসরি সাবমেরিন যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত। কোথায় গোপন থাকা যাবেকোথায় নজরদারি দুর্বলএসব সূক্ষ্ম তথ্যই ধাপে ধাপে সংগ্রহ করছে চিন। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটায় ইউয়ান ওয়াং ৫’-এর নোঙর ফেলার ঘটনা ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিলতার রেশ এখনো কাটেনি।

বর্তমানে ভারতীয় নৌবাহিনী এই কার্যক্রমের উপর কড়া নজর রাখছে। তবে তুলনায় চিনা গবেষণা জাহাজের সংখ্যা অনেক বেশিপ্রায় ৫০টি। ভারতের হাতে রয়েছে মাত্র ১০-১২টি। এ ব্যবধান কমাতে উদ্যোগী হয়েছে নয়াদিল্লি। মাতস্য ৬০০০’ নামে একটি গভীর সমুদ্রযান তৈরির কাজ চলছেযা ৬,০০০ মিটার গভীরে নামতে পারবে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতেসমুদ্রের তলদেশে এহেন নীরব প্রতিযোগিতাই আগামী দিনের সামরিক শক্তির মাপকাঠি নির্ধারণ করবে। কারণযুদ্ধক্ষেত্র এখন শুধু আকাশ বা স্থলে নয়সমুদ্রের গভীর অন্ধকারেও।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!