Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • মার্চ ২৫, ২০২৬

ট্রান্সজেন্ডার সংশোধনী বিল’ ঘিরে সরগরম সংসদ, দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক। বিল প্রত্যাহারের আহ্বান শীর্ষ আদালতের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ট্রান্সজেন্ডার সংশোধনী বিল’ ঘিরে সরগরম সংসদ, দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক। বিল প্রত্যাহারের আহ্বান শীর্ষ আদালতের

সংসদের বাজেট অধিবেশনের শেষ পর্বে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের মধ্যেই হঠাৎ করেই কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ট্রান্সজেন্ডার অধিকার। বুধবার রাজ্যসভায় আলোচনার জন্য তোলা হয় ট্রান্সজেন্ডার পার্সনস (অধিকার সুরক্ষা) সংশোধনী বিল২০২৬। তার ঠিক একদিন আগেমঙ্গলবারলোকসভায় বিরোধীদের ওয়াকআউটের আবহে ধ্বনিভোটে পাস হয়ে গিয়েছে বিলটি। আর সে সূত্রেই সংসদের ভিতরে-বাইরে তীব্র বিতর্কের ঝড় বইছে।

বুধবার রাজ্যসভায় শুরু হয় ট্রান্সজেন্ডার সংশোধনী বিল নিয়ে আলোচনা। শুরু থেকেই বিরোধী শিবিরের তোপের মুখে পড়ে কেন্দ্র সরকার। বিরোধী সাংসদদের অভিযোগএই বিল রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের লড়াইয়ে অর্জিত অধিকার খর্ব করছে, সংবিধান স্বীকৃত স্ব-পরিচয়ের অধিকারকে নস্যাৎ করছে। এনসিপি (এসপি)-র সাংসদ ফৌজিয়া খান বলেন, ‘বিকশিত ভারতের কথা বলা হচ্ছেকিন্তু তা যেন বাছাই করা ভারতের রূপ না নেয়।’ তাঁর ইঙ্গিতসমাজের একাংশকে বাদ দিয়ে উন্নয়নের ধারণা অসম্পূর্ণ।

সমাজবাদী পার্টির সাংসদ জয়া বচ্চন এ প্রসঙ্গে আরও তীব্র ভাষায় সরকারের সমালোচনা করেন। তাঁর মতেযাদের নিয়ে আইনতাঁদেরই সংসদে যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নেইএটা গণতন্ত্রের পক্ষে উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, ‘মন উল্লেখযোগ্য একটি আইন আনার আগে ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের কণ্ঠস্বর শোনা উচিত ছিল।’ পাশাপাশি তাঁর অভিযোগবাজেট অধিবেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা সমস্যার পরিবর্তে এমন একটি সংবেদনহীন’ বিল আনা হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। আরজেডি সাংসদ মনোজ কুমার ঝা সরাসরি প্রশ্ন তোলেন সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে। তাঁর প্রশ্ন, ‘অধিকারভিত্তিক পদ্ধতির বিরুদ্ধে কেন যাচ্ছে সরকার?’ তিনি আরও বলেনবিশ্ব যখন যুদ্ধ পরিস্থিতির মুখোমুখি, আঁচ লাগছে দেশে, তখন এমন একটি সংবেদনশীল আইন আনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তাঁর মতেএই বিল সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।

বিরোধী শিবিরের প্রায় সকল সাংসদ একসুরে দাবি তুলেছেনবিলটি সরাসরি পাস না করে সিলেক্ট কমিটি বা স্থায়ী কমিটির কাছে পাঠানো হোকযাতে আরও বিস্তৃত আলোচনার মাধ্যমে সংশোধন আনা সম্ভব হয়। অন্যদিকে, কেন্দ্র সরকার বলছে, এই বিল সমাজকল্যাণমূলক পদক্ষেপ। সামাজিক ন্যায় ও অধিকারিতা মন্ত্রী ড. বিরেন্দ্র কুমার বলেছে, ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সবার সাথে, বার বিকাশ, সবার বিশ্বাসবার প্রয়াস’-এর নীতিতেই সরকার কাজ করছে।’ তাঁর দাবিএই সংশোধনী আইনের লক্ষ্য, এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারবেন। মন্ত্রী জানানসাত বছর আগে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সুরক্ষা ও কল্যাণের জন্য একটি আইন আনা হয়েছিলবর্তমান সংশোধনের উদ্দেশ্য সে আইনকে আরও কার্যকর করা। তাঁর দাবি, এই বিল মূলত তাঁদের জন্যযারা জৈবিক বা সামাজিক কারণে গভীর বঞ্চনার শিকার।

তবে বিরোধীরা এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয়। কংগ্রেসের এস. জোথিমণি অভিযোগ করেন, রূপান্তরকামী ব্যক্তিদের সঙ্গে কোনো রকম পরামর্শ না করেই এই বিল আনা হয়েছেযা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থী। তিনি একে পশ্চাদমুখী’ পদক্ষেপ বলে আখ্যা দেন। সমাজবাদী পার্টির আনন্দ ভদৌরিয়াডিএমকের ড. টি সুমাথিতৃণমূলের জুন মালিয়া এবং এনসিপি (এসপি)-র সুপ্রিয়া সুলে সকলেই বিলটির বিরোধিতা করে সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর দাবি জানান। অন্যদিকে শাসক শিবিরের সাংসদদের একাংশ এই বিলকে ঐতিহাসিক’ বলে দাবি করেছেন। টিডিপির ড. বাইরেড্ডি শবরির মতেএ আইন ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়কে পরিচয় ও ন্যায়বিচার দেবে। বিজেপির প্রতাপচন্দ্র সারঙ্গি বলেনবিলের লক্ষ্য ট্রান্সজেন্ডারদের জন্য সুরক্ষা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করাএবং আইন লঙ্ঘনকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থাও এতে রয়েছে।  

তবে, বিলটির মূল বিষয়বস্তু ঘিরেই সবচেয়ে বেশি বিতর্ক। ২০১৯ সালের আইনে যেখানে ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তির সংজ্ঞা ছিল বিস্তৃত এবং স্ব-পরিচয়ের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিলসেখানে নতুন সংশোধনীতে সেই সংজ্ঞা বদলে দেওয়া হয়েছে। কিছু শ্রেণি— যেমন ট্রান্স-ম্যানট্রান্স-উইমেন এবং জেন্ডারকুইয়ার সংজ্ঞা থেকে বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিবর্তে কিছু নির্দিষ্ট সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং জৈবিক বৈচিত্র্যের ভিত্তিতে নতুন শ্রেণিবিন্যাস আনা হয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে স্ব-পরিচয়ের অধিকার কার্যত বাতিল হওয়াকে। নতুন ব্যবস্থায় একজন ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিকে পরিচয়পত্র পেতে হলে জেলা শাসকের কাছে আবেদন করতে হবেএবং সে আবেদন বিবেচনা করা হবে নির্দিষ্ট মেডিক্যাল বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে। ওই বোর্ডের নেতৃত্বে থাকবেন প্রধান চিকিৎসা আধিকারিক বা উপ-প্রধান চিকিৎসা আধিকারিক। প্রয়োজনে অন্যান্য চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতামতও নেওয়া যেতে পারে। এর পাশাপাশিলিঙ্গ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংশোধিত পরিচয়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানকে সেই তথ্য জেলা প্রশাসনের কাছে জানাতে হবে। সমালোচকদের মতেমন বিধান ব্যক্তিগত গোপনীয়তার পরিপন্থী ও রাষ্ট্রের অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপের পথ খুলে দিতে পারে।

বিলটিতে অপরাধ ও শাস্তির ক্ষেত্রেও নতুন কিছু সংযোজন করা হয়েছে। বিশেষ করেকাউকে জোর করে ট্রান্সজেন্ডার পরিচয় গ্রহণে বাধ্য করাঅপহরণগুরুতর আঘাত করা বা ভিক্ষাবৃত্তি ও দাসত্বে ঠেলে দেওয়ার মতো অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছেযার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ও মোটা অঙ্কের জরিমানার কথা বলা হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতেএই নতুন অপরাধ সংজ্ঞাগুলি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছেযা ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়কেই অপরাধমূলক দৃষ্টিতে দেখার প্রবণতা তৈরি করতে পারে।

প্রবল বিতর্কের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্তপ্রাক্তন দিল্লি হাই কোর্টের বিচারপতি আশা মেননের নেতৃত্বে উপদেষ্টা কমিটিকেন্দ্রকে এই বিল প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের বক্তব্যএই সংশোধনী ২০১৪ সালের ঐতিহাসিক নালসা রায়ের মূল চেতনার বিরোধী। সে রায়ে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে বলেছিললিঙ্গ পরিচয় একটি ব্যক্তিগত ও স্বনির্ধারিত বিষয়এবং তা নির্ধারণে কোনো চিকিৎসা পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। কমিটির মতেনতুন বিল সেই স্ব-পরিচয়ের অধিকারকে সরিয়ে দিয়ে একটি মেডিক্যালাইজড’ প্রক্রিয়া চাপিয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশিচিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘন করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

দেশজুড়ে বিল ঘিরে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। দিল্লিতে মহিলা প্রেসক্লাবে জরুরি বৈঠক থেকে শুরু করে  কলকাতাবেঙ্গালুরুভুবনেশ্বরহায়দ্রাবাদবিভিন্ন শহরে ট্রান্সজেন্ডার সংগঠনঅধিকারকর্মীআইনজীবী ও ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণে প্রতিবাদ সভা হয়েছে। তাদের অভিযোগযে আইন সুরক্ষার কথা বলেসেটাই বাস্তবে নিয়ন্ত্রণ আরোপের হাতিয়ার হয়ে উঠছে। তাঁদের আশঙ্কা, সংশোধিত আইন কার্যকর হলে দেশের হাজার হাজার তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের পরিচয়পত্রঅধিকারচিকিৎসা পরিষেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। সংসদে বিতর্ক যতই বাড়ুকরাজনৈতিক ও সামাজিক মহলের একাংশের মতেএ লড়াই এখানেই শেষ নয়। প্রয়োজনে নয়া আইন আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে পারে। কারণপ্রশ্নটি শুধু একটি আইনের নয়প্রশ্ন নাগরিকের পরিচয়মর্যাদা এর সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের।


  • Tags:
❤ Support Us
Advertisement
error: Content is protected !!