Advertisement
  • গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
  • মে ২৪, ২০২৬

একটি গল্প আগামী সকালের

বিমল গঙ্গোপাধ্যায়
একটি গল্প আগামী সকালের

চিত্রকর্ম : সতীশ গুজরাল

পল্লব মাঠের ধারে সুভাষ উদ্যানের গা ঘেঁসে পায়চারি করছে। সময় সদ্যোত্তীর্ণ সকাল। চারপাশ ঝলমল করছে নবীন সূর্যের আলোয়। পথ-চলতি মানুষজন, চায়ের দোকানের খরিদ্দার, স্কুল কলেজের ছেলেমেয়ে, সব মিলিয়ে জায়গাটা সরব। পল্লবের পরনে ছাই রংঙের ফুলপ্যান্ট। গায়ে হালকা নীল জামা। পায়ে চটি। পল্লবের বয়স সাতাশ আটাশ বা তার দু-এক বছর এদিক ওদিক।

পল্লবের বাঁ হাতের কব্জিতে বাঁধা একটি ঘড়ি। ঘনঘন সিগারেটে টান দেওয়া বা বারে বারে ঘড়ির দিকে চাওয়া, এসব থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, পল্লবের ভেতরে একটা অস্থিরতা কাজ করছে। পায়চারি করতে করতে একসময় পল্লব চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে পড়ল এবং খুব ক্লান্ত গলায় বলল, একটা লিকার চা দাও তো, অমর। চায়ের গ্লাস হাতে রাস্তার দিকে চেয়ে বসে রইল পল্লব। এই সময় একজন ভিখারি মিনমিনে গলায় তার থেকে ভিক্ষা চাইল। পল্লব কোনো সাড়াশব্দ দিল না। তাকে অনমনস্কের মতো দেখতে লাগছে। আসলে তখন তার চোখের সামনের রাস্তা মাঠ লোকজন সব ঝাপসা হয়ে গিয়ে, ত্রিলোক ভার্মার দাড়ি গোঁফহীন বিশাল মুখখানা, বনবনে দুটো চোখ, উত্তেজনায় স্ফীত নাক, এইসব নিয়ে, অস্থির রেখাচিত্রের মতো ওপর নিচ, এপাশ ওপাশ, কখনো বা কৌণিক অবস্থানে এবং সেসব অস্থির ছন্নছড়া শব্দগুলো, গোঙানির মতো দুর্বোধ্য দুঃসহ, জাগতিক দৃশ্যাবলী শব্দজালকে আড়াল করে দিয়েছে।

ইউ পল্লব?

 পল্লব মাথা তুলে তাকাতেই গর্জে উঠেছিল ভার্মা, জি.এম. ডিজায়ার্স টু ডিসমিস ইউ।

 আমাকে ?

 বিস্ময়ে পল্লবের দুচোখ ঠেলে বেরিয়ে এসেছিল, কিন্তু কেন ? আমি তো আমার ডিউটি সম্পর্কে যথেষ্ট অ্যালার্ট।

 সো হোয়াট ? তুমি অফিসের মধ্যে গন্ডগোল ক্রিয়েট করছ।

 আমি ?

 ইয়েস। তুমি অফিসে পলিটিক্স করছ।

 আপনি আমায় মিথ্যে দোষারোপ করছেন।

 নো। নেভার। জানবে ম্যানেজমেন্ট সব ওয়াচ করে।

 তখন সারা অফিস ঘর জুড়ে নীরেট নিস্তব্ধতা। মনোযোগী ছাত্রের মতো টেবিলের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে কাজ করছে সবাই।   পল্লবের অসহায় দু-চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছিল একটি প্রতিবাদী মুখ। উৎকর্ণ দুটি কান প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের অপেক্ষায়।

  তখনই সে শুনতে পেয়েছিল ভার্মার শ্লেষাত্মক গলা, ইউ আর ইন নিড অফ এ গুড লেশন।

 হেসে ফেলেছিল পল্লব। তীব্র ঘৃণার হাসি। পেনটাকে বন্ধ করে টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে এবং ব্যাগটাকে কাঁধে তুলে নিতে যেটুকু সময় লাগে তার ভগ্নাংশেরও কম সময় লেগেছিল স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছতে। সে স্পষ্ট উচ্চারণে, আই কিক ইওর জব। বলে অফিস ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিল।

 এসব গতকাল বিকালের ঘটনা। অফিস থেকে বেরিয়ে সে আর কোথাও যায়নি। বাড়ি ফিরে এসেছিল। বাড়ির লোক তার ভেতরের তোলপাড় আঁচ করতে পারেনি। এমনই স্বচ্ছন্দ ছিল তার আচার আচরণ। কথাবার্তা। এমনকি হাসিও।

 রাতে কুহুকে ফোন করেছিল, কাল সকালে মাঠের ধারে এসো একবার। কুহু অবাক হয়ে গেছিল! সাতসকালে মাঠের ধারে! তুমি অফিস যাবে না?

 অফিস। বলে একটু থমকে গেছিল পল্লব। তারপর ধীর গলায় বলেছিল, জরুরী কথা আছে।

 কুহু কী ভেবেছিল কে জানে। অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল, যদি যেতে না পারি? মানে ধরো…!

 স্টপ। ধমকে উঠেছিল পল্লব, যদি না আসো, ধরে নেব তুমি অ্যাভয়েড করতে চাইছ।

 আর এটুকু বলেই ফোনের সুইচ অফ করে দিয়েছিল। হাতঘড়িতে আবার একবার সময় দেখল পল্লব। ল্যাম্পপোস্টের ছায়া বাড়তে বাড়তে রাস্তা টপকে গেছে। কোর্টের বারান্দায় ভিড় বাড়ছে। জেরক্স সেন্টারের সামনে লাইন বাড়ছে। বক্সিং গ্রাউন্ডের কোণায় ভনভনে মাছির মতো জুয়াড়িরা সংখ্যায় বাড়ছে। কোনো মানুষেরই সব ইচ্ছা সব ধারণা প্রতিদিন একশভাগ মিলে যেতে পারে না। একসময় পল্লবের মনে হল, আজ সব কিছু তার ইচ্ছেমতো হবে না। রাগ দুঃখ বা অভিমান থেকে এক ধরণের আত্মগরিমা জন্ম নেয়। আর তা কোন একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাত্রা পেতে চায়।

চাকরি ছেড়ে দেওয়ার জন্য পল্লবের নিজেকে খুব গর্বিত আর সুখি মনে হতে লাগল। তার ভেতরের অস্থিরতা স্তিমিত হয়ে গেল। তখন সে মনে মনে নিজেকে শুনিয়ে একবার দুবার বেশ কয়েকবার বলল, মজা করার জন্য তোমাকে আসতে বলেছিলাম কুহু। বলেছিলাম জরুরী কথা আছে। আসলে ব্যাপারটা তেমন কিছুই নয়। মাত্র গতকাল বিকালে আমি হারবার্টসনস্ ব্রাদার্সের চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি। চেষ্টা করলে হয়ত চাকরিটা রাখা যেত। বাট মাই মাইন্ড ডিড নট রেসপন্ড।

 তখন কুহুর দু চোখে ছায়া নেমে আসবে। টুকরো চুল উড়ে এসে পড়বে দু ভ্রূর মাঝে। অভ্যস্ত হাতে কুহু তা সরাতে ভুলে যাবে। পল্লব তখন কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলবে, হোয়াট মেকস ইউ আপসেট? লুক অ্যাট মি।

 কুহু তার মা-কে বলে রেখেছিল, খুব ভোরে না হলেও, অন্যদিনের চেয়ে সকাল করে যেন তাকে ডেকে দেওয়া হয়। মেয়ের প্রতি স্নেহজনিত দুর্বলতার জন্যই, কুহুর মা মেয়ের অনেক কথার কারণ জানতে চান না। আবার কুহুর মা কুহুর কাছে তখন দুর্বোধ্য নন বলেই, কুহু কোনো কিছুই গোপন করে না তার মায়ের কাছে। মা মেয়ের সম্পর্কটা তাই সমবয়সীর সখ্যতায় দানা বেঁধেছে।


বাইরে একটা পাখি ডাকছে কুব কুব করে । জানলা দিয়ে রোদ্দুর বিছানা ছাড়িয়ে ঘরের মেঝের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে । কুহুদের পাশের বাড়ির ছাদে একটি কিশোর
লাটাই হাতে সূতো ছেড়ে যাচ্ছে । তার পাশে দাঁড়িয়ে সমবয়সী তিনজন উর্দ্ধাকাশের
দিকে চেয়ে রয়েছে


 যেমন কুহু সকালে ঘুম থেকে উঠে হতভম্বের মতো চারপাশে চেয়ে বলল, ইস! কত বেলা হয়ে গেছে। পল্লব হয়ত কখন থেকে এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

 কোথাও যাবি নাকি ? কুহুর মা বললেন, কাল রাতে কিছু বলিস নি তো !

 কুহু বিছানার চাদর ঠিক করতে করতে বলল, কোত্থাও যাব না। জরুরী কথা বলবে। কী কথা জিজ্ঞেস করতে রাগ হয়ে গেল।

 কার ?

 পল্লবের। ফোনটা কেটে দিল।

 পল্লব অফিস যাবে না?

 আমি কী করে বলি বলো তো! বেলায় যাবে, নাকি আদৌ যাবেই না।

 ওদের তো ছুটিছাটার ব্যাপারে খুব কড়াকড়ি আছে। তাই না?

 শুনেছি তো তাই। বলে কুহু আর দাঁড়াল না। দ্রুত বাথরুমে ঢুকে গেল।

কুহুদের বাড়ির কাজের মেয়েটি, রমা, বাড়ির মধ্যেকার যে কোন অবস্থান থেকে বাড়ির বাইরেটা নিখুঁত দেখতে পায়। গলিতে কে ঢুকল, কে গলি ছেড়ে বেরল, বাড়ির মধ্যে থেকে সে সব দেখতে পায়। আজও রমা-ই প্রথম দেখতে পেল লোকটাকে। রোগা লম্বা চেহারা। সামনের দিকে ঝুঁকে হাঁটছে। পরনের পোশাক মলিন এবং ছিন্ন। সারা শরীর জুড়ে অভাব আর ক্লান্তির ছাপ। লোকটা ঘাড় ফিরিয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। স্বাভাবিক বিচারে যা সন্দেহজনক।

 কুহু বাথরুম থেকে বেরিয়ে ঘরে ঢোকা মাত্রই রমা বলল, দিদি একবার জানলার কাছে এসো।

 কেন ? কুহুর গলায় বিরক্তি। রমা ততক্ষণে গ্রীল ঘেরা বারান্দায় চলে গেছে।

 লোকটা কে বলো তো?

 কোন লোকটা ? ঘরের মধ্যে থেকেই জানতে চাইল কুহু। এসো না একবার।

 লোকটা রমার গলার আওয়াজ শুনে মাথা তুলে বারান্দার দিকে চাইল। অস্ফুট গলায় কী যেন বলল। আর তারপরেই ইটপাতা গলির রাস্তার ওপর বসে পড়ল। লোকটা কি হাঁফাচ্ছে। চামড়া ভেদ করে তার বুকের ওঠানামা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হাতের চেটোয় ভর দিয়ে লোকটা বসে থাকার চেষ্টা করছে। তার খড়িওঠা পায়ের পাতায় ঘাম ঝরে পড়ছে।

 লোকটা বোধহয় অসুস্থ। কুহু নিচু গলায় বলল রমাকে।

 মরেটরে যাবে না তো?

 কী আজেবাজে কথা বলিস! কুহু ধমকে উঠল, জিজ্ঞেস কর না, কী হয়েছে।

 রমা ডাকল, এই যে শুনছ? কী হয়েছে তোমার ? রমার ডাকে লোকটা মাথা তুলে তাকাল। তার চোখভর্তি জল। ঠোঁট দুটো কাঁপছে।

কী হয়েছে তোমার ? রমা আবার জিজ্ঞেস করল। লোকটা রমার প্রশ্নের কোনো জবাব দিতে পারল না। আভাসে ইঙ্গিতেও কিছু জানাতে পারল না। তার আগেই ঝুপ করে পড়ে গেল রাস্তার ওপর।

এমন দৃশ্য বুহু কোনদিন দেখেনি। কথা নেই, বার্তা নেই, একটা মানুষ তার চোখে সামনে পড়ে গেল। হয়ত মরেও গেল। আর এটা ভাবতে গিয়েই ভয়ে কুহু শিউরে উঠল। তার হাত পা শিথিল হয়ে গেল। চারপাশের সব ঝাপসা দেখতে লাগল। রমা তখন চিৎকার শুরু করে দিয়েছে। তা শুনে আশপাশের বাড়ি থেকে লোকজন বেরিয়ে এসেছে। কে যেন বলল, এক বালতি জল নিয়ে এসো তো রমা। ধরাধরি করে লোকটাকে কুহুদের গ্যারেজ ঘরে এনে শুইয়ে দেওয়া হলো।

লোকটা মরেনি। জলের ঝাপটা দিতেই তার চোখের পাতা, ঠোঁট কেঁপে উঠল তিরতির করে। সামান্যক্ষণ পরে সে তার শীর্ণ হাত দুটোকে বুকের কাছে জড়ো করে আনল। নিজে নিজেই।

কুহুর বাবা বাজার গেছিলেন। বাজার থেকে ঘেমেনেয়ে ফিরে, তাঁর বাড়িতে এত মানুষের উপস্থিতি মেনে নিতে পারলেন না কিছুতেই। চিৎকার করে উঠলেন, সামনে এত বড়ো মাঠ থাকতে, আমার বাড়িতে কেন? হোয়াই?

এ থেকে একটা গন্ডগোল বেঁধে যেতে পারত। হৈ হট্টগোল থেমে গিয়ে জায়গাটা নিথর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মুখ চাওয়াচাওয়ি শুরু করে দিয়েছে উপস্থিত কিছু মানুষ। শিরায় টান ধরেছে কয়েকজনের।

তখনই কুহু এসে হাজির হলো সেখানে। ক্লান্ত গলায় বলল, তুমি ভেতরে যাও বাবা। কুহুকে খুব দুর্বল দেখাচ্ছিল। ঘটনার আকস্মিকতায় সে বিহ্বল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তাকে ঘিরে মানুষের জটলা তৈরী হয়নি। উচ্চস্বরে কেঁদেও ওঠেনি কেউ। সে নিজেই নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়েছে ।

উপস্থিত লোকজনের মধ্যে কয়েকজন কথা বলতে শুরু করল।

এইভাবে কতজনকে সাহায্য করা যায়! মোস্ট অফ দিজ কেসেস-আর-ফলস।

তাতাইয়ের বাবা, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক, নিবারণবাবু বললেন, এই সোসিও স্ট্রাকচারের লিমিটেশনগুলো ওভারকাম করতে না পারলে, মানে একটা কমপ্লিট রেভেলিউশন না হলে…!

ভোটের সময় এদেরই কত কদর দেখতেন ! সরকারি অফিসের বড়বাবু দেবু ব্যানার্জী বললেন থেমে থেমে।

এই জাতীয় আলোচনা যতই সারগর্ভ হোক না কেন, বেশীক্ষণ স্থায়ী হয় না। একসময়ে যে যার মতো চলে গেল। জায়গাটা ফাঁকা হয়ে যাওয়ার পর, লোকটা টেনে হিঁচড়ে নিজেকে বার করে নিয়ে এল কুহুদের গ্যারেজ ঘর থেকে। তারপর সে তার নিজেরই ছায়া, যা তার শরীরের তুলনায় আকারে বেশ বড়ো, সেটা মাড়িয়ে মাড়িয়ে গলিটুকু পার হয়ে গেল।

পরদিন সকালে তখন সবেমাত্র ঘুম ভেঙ্গেছে কুহুর। তার চোখমুখে ক্লান্তির ছাপ। বিছানায় শুয়ে শুয়েই সে রমাকে ডাকতে যাচ্ছিল, জানলার পর্দাটা সরিয়ে দেওয়ার জন্য। রোদ এসে পড়বে বিছানায়। রোদের উত্তাপে নিজেকে একটু সতেজ করবে বলে।

আচমকা কলিং বেল বেজে উঠল। টুং-টাং শব্দে।

রমা ঘরে এসে বলল, দিদি ওঠো। পল্লবদা এসেছে।

কুহু খুব অবাক হয়ে গেল। পল্লব সচরাচর তাদের বাড়ি আসে না। তাও আবার এমন অসময়ে! বিছানায় উঠে বসল কুহু। পরণের শাড়ি, মাথার চুল গুছিয়ে নিল দ্রুত। পল্লবের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। মায়ের সঙ্গে কথা বলছে। ডাইনিং কিম্বা রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে। এখনই হয়ত এসে দাঁড়াবে কুহুর ঘরের দরজা জুড়ে। স্থির গলায় ভেঙ্গে ভেঙ্গে বলবে, কাল সকালে গেলে না কেন? সত্যি আমাকে অ্যাভয়েড করতে চাইছ?  কী বলবে তখন কুহু। ইশারায় কাছে ডেকে পাশে বসিয়ে বলবে, প্লিজ শোন, আমি তোমাকে একটিও বাজে কথা মানে মিথ্যে কথা বলছি না। গতকাল…!

ততক্ষণে ঘরে ঢুকে পড়েছে পল্লব।

কুহুকে বিস্মিত করে দিয়ে হেসে বলল, আই নিড নো এক্সপ্লানেশন ফর ইওর অ্যাবসেন্স। বরং এমন অসময়ে এসে অপরিচিতের রূপে দেখলাম তোমায়।

পল্লবের দু-চোখে ও কিসের ঘোর ! ও কি চোখ কানের মাথা খেয়েছে। চারপাশ বিস্মৃত হয়ে কুহুর ভ্রূর ওপর থেকে খয়েরি টিপটা তুলে নিয়ে, কুহুর নাকের ওপর সেটা আলতো করে বসিয়ে দিল। তারপর শরীর দুলিয়ে হেসে বলল, আয়নায় একবার দেখ, ভুল সাজলেও কি দারুণ দেখায় তোমায়।

কী করছ ? কুহু বলল, তুমি কি পাগল হয়ে গেছ ?

পল্লব বলল, তোমার জন্য কী না হওয়া যায়।

কুহু বিরক্ত হল, আঃ। চুপ করো তো। তোমাকে এসব মানায় না।

পল্লব অবাক বিস্ময়ে কুহুর মুখের দিকে চেয়ে রইল অল্পক্ষণ। তারপর নিঃশব্দে কুহুর পাশ থেকে উঠে গিয়ে সোফায় বসল।

একসময় কুহুর খুব মায়া হল পল্লবের জন্য। সে নরম গলায় পল্লবকে ডাকল, তুমি রাগ করলে? পল্লব এ কথার কোন জবাব দিল না।

কুহুর মনে হল, এই অপ্রীতিকর অবস্থাটার জন্য সে-ই দায়ী। সে তাই অবস্থাটাকে সামাল দিতে চেষ্টা করল এইভাবে –

কাল সকালে আমি কেন যেতে পারিনি জানো ? তুমি রাগ করেছ, আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু বিশ্বাস কর, কাল সকালে ঠিক এই সময়ে একটা লোক…। পল্লব আমি কোনোদিন এমন দৃশ্য দেখিনি যেখানে…! ভাবতেই পারি খন একটা লোক সাহায্যের আশায়…। এইভাবে ঘুরতে ঘুরতে ঘুরতে লোকটা হয়ত …। লোকটা নিশ্চয়ই ফ্যামিলি ম্যান। ওর বউ ছেলেমেয়ে …। পল্লব আমি কাল সারাদিন ব্যাপারটা নিয়ে ভেবেছি। লোকটা তো একটা পরিস্থিতি, একটা অবস্থার শিকার। আর ওই লোকটার ওপর ভরসা করে যারা রয়েছে…!


বাইরে একটা পাখি ডাকছে কুব কুব করে। জানলা দিয়ে রোদ্দুর বিছানা ছাড়িয়ে ঘরের মেঝের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। কুহুদের পাশের বাড়ির ছাদে একটি কিশোর লাটাই হাতে সূতো ছেড়ে যাচ্ছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে সমবয়সী তিনজন উর্দ্ধাকাশের দিকে চেয়ে রয়েছে


ওঃ। কি মিসারেবল। আনফরচুনেট। কুহুর ঘোরলাগা চোখমুখের দিকে চেয়ে, পল্লব হাতের ইশারায় তাকে থামতে বলল। কুহু উত্তেজিত হয়ে পড়েছে এটা বুঝতে পেরে হেসে বলল, এবার তুমি একটু চুপ করো। নাউ ইট ইজ মাই টার্ন।

কুহু লজ্জা পেল। বাধ্য মেয়ের মতো খাটের কোণায় গিয়ে বসল। পা ঝুলিয়ে।

নাও, কী বলবে, বলো।

পল্লব তার বক্তব্যটুকু আগেভাগেই তৈরী করে রেখেছিল। সে, ‘পলিটিক্স’, ‘ম্যানেজমেন্ট’, ‘নিড এ গুড লেশন’, এসবও যেমন বলল, সাথে সাথে খুব নিস্পৃহভাবে বলল, চাকরিটা আমি ছেড়ে দিয়েছি কুহু। হয়ত একটু সয়ে যেতে পারলে, দু-তিনজনকে টপকে এ বছরে একটা প্রমোশনও পেয়ে যেতে পারতাম। তখন কোম্পানী আমাকে দু-কামরার ফ্ল্যাট দিত। এদিক সেদিক ট্যুরে পাঠাতো। তা থেকে টি.এ. বাবদ আমার অতিরিক্ত কিছু রোজগার হতো। একটু থামল পল্লব, তুমি বলো কুহু, আমার ডিশিসনটা …!

অ্যাবসলুটলি রং। কুহু প্রায় চিৎকার করে উঠল।

কিন্তু কেন ?

কেন ? ভ্রূ কুঁচকে বলল কুহু, তুমি নিজে বুঝতে পারছ না ? তোমাকে যখন অপমান করা হচ্ছে, তোমার একজন কলিগও তার প্রতিবাদ করছে না কেন ? ওরা হয়ত ভয় পেয়েছে। হারাবার ভয়। তাই অন্যায় বুঝেও প্রতিবাদ করার মতো সাহস দেখাতে পারেনি। নো। নো। অস্থিরভাবে মাথা ঝাঁকাল কুহু, ওরা বুঝেছে, তুমি যেটা করেছ, সেটা স্রেফ হঠকারিতা। তা না হলে নিজেকে ডিগনিফায়েড করার একটা অপচেষ্টা।

তখন বাইরে একটা পাখি ডাকছে কুব কুব করে। জানলা দিয়ে রোদ্দুর বিছানা ছাড়িয়ে ঘরের মেঝের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। কুহুদের পাশের বাড়ির ছাদে একটি কিশোর লাটাই হাতে সূতো ছেড়ে যাচ্ছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে সমবয়সী তিনজন উর্দ্ধাকাশের দিকে চেয়ে রয়েছে।

পল্লব সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল বাইরে যাবে বলে।

ঠিক তখনই রমা ঘরে ঢুকল হাঁফাতে হাঁফাতে, দিদি, দেখ, আজ আবার একটা লোক বাড়ির সামনে ঘুরছে।

কুহু অনিচ্ছুকের গলায় বলল, আমি কী করব তার?

পল্লব হঠাৎই খুব উৎসাহিত বোধ করল, চলো তো দেখি। সে রমার সঙ্গে বারান্দায় এল। হাত নেড়ে ডাকতেই শীর্ণ চেহারার একটা লোক বারান্দার সামনে এগিয়ে এল। লোকটার পরণে আধময়লা লুঙ্গি। বিড়ি দেশলাই, খৈনির কৌটো বা ঐ জাতীয় কিছু কোমরে গোঁজা। আর তাই তলপেটের কাছটা উঁচু হয়ে উঠেছে। লুঙ্গির আড়ালে ছোটখাটো টিউমার বলে মনে হচ্ছে। লোকটার মাথাভর্তি ঝাঁকরা চুল। আর তা মেঘলা আকাশের মতো কালচে। ধুলো ময়লার আস্তরণে। হাত এবং পায়ের নখ বড় বড়। ময়লাভর্তি।


কোনো মানুষেরই সব ইচ্ছা সব ধারণা একশভাগ মিলে যেতে পারে না । রাগ দুঃখ বা অভিমান থেকে এক ধরণের আত্মগরিমা জন্ম নেয়। আর তা কোন একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাত্রা পেতে চায়


পথেঘাটে এ জাতীয় মানুষ হামেশাই দেখা যায়। পল্লবের মনে হল, অপরের অনুগ্রহই এদের রোজগারের পথ। একমাত্র মূলধন।

পল্লব ধমকের সুরে পলল, কী নাম তোমার? কোথায় থাক?

আজ্ঞে মাতন সাঁপুই। রেল বিরিজের নিচুতে থাকি।

এখানে ঘোরাফেরা করছ কেন?

মাতন এদিক ওদিক তাকাল। যেন কোন পরিচিত প্রিয়জনের মুখ খুঁজছে। ভাবখানা এইরকম।

শুনতে পাচ্ছ না? পল্লব গলা চড়িয়ে বলল, এখানে কী দরকার?

ওই লোকটার খোঁজ করছিলাম বাবু।

কোন লোকটা? কার কথা বলছ?

কাল যারে নিয়ে এখানে বেপয্যয় ঘটে গেল। একটু চুপ করে থেকে বলল, মানে কোথায় গেল লোকটা, কী বেত্তান্ত, এইসব আর কী!

তোমার মতলবখানা খুলে বলো তো। পল্লবের গলায় সন্দেহ ফুটে উঠল।

মতলব ! মাতনের গলা কেঁপে উঠল যেন, কী যে বলেন বাবু। আমি তো শুধু ওই লোকটার পাত্তা করছিলাম।

কেন? লোকটা তোমার আত্মীয় ?

না বাবু।

তাহলে কিসের খোঁজ ?

পল্লবের প্রশ্নে মাতন ঘাবড়াল না। বরং সে যেন তার প্রয়োজনীয় কথাগুলি বলার জন্য, ‘কিন্তু কেন’ বা ‘তাহলে কিসের’, এ জাতীয় প্রশ্নের অপেক্ষাতেই ছিল। আর তাই খুব সহজ গলায় বলল, একটু বসি।

পল্লবের ‘হ্যাঁ’, ‘না’ কিছু বলার আগেই মাতন বারান্দার সিঁড়িতে বসে পড়ল ঝপ করে। হাঁটুর ওপর থুতনি রেখে চোখ বুজে বসে রইল অল্পক্ষণ। তাকে অন্যমনস্কের মতো দেখতে লাগছিল। হয়ত এই অবসরে সে তার কথাগুলিকে সাজিয়ে নিল।

মাতনের কথা শুনতে শুনতে কোথাও এতটুকু হোঁচট খেল না পল্লব। একটি কথাও অবিশ্বাস্য মনে হল না।

গতকাল রাতে মোড়ের মাথার চায়ের দোকানে বসে মাতন, হতভাগ্য লোকটার গল্প শুনেছে। কিন্তু দোকানে উপস্থিত কেউ তাকে লোকটার ঠাঁই ঠিকানা জানাতে পারেনি। মাতন আবু বেন আদম নয়। আর্থ সামাজিক অসামঞ্জস্যের কারণ বা তার প্রতিকারের প্রকৃত উপায় সম্পর্কেও সে কিছু বোঝে না। তবু রাতে বিছানায় শুয়ে অনেক্ষণ লোকটার কথা, তার পরিবারের কথা ভেবেছে। আর সেই ইস্তক তার বুকের মধ্যে খচখচ করছে।

তুমি নিজে কী করো? পল্লব জানতে চাইল।

জনমজুরের কাজ করি। ভাবছিলাম ওই লোকটাকে যদি কোন পাতলা কাজে লাগিয়ে দিতে পারতাম।

আর যদি না পারো? পল্লব বলল।

পল্লবের প্রশ্নে থমকে গেল মাতন। চুপ করে রইল কয়েক মুহূর্ত। তারপর দু-হাতের চেটো ঘষরাতে ঘষরাতে বলল, টেরাই করে দেখতাম বাবু।

তুমি ওই মাঠে গিয়ে বসো। পল্লব ঘাড় ফিরিয়ে দেখল কখন যেন কুহুর মা এসে দাঁড়িয়েছে তার পিছনে। কুহুকেও দেখতে পেল তার মায়ের গা গেঁসে দাঁড়িয়ে। পল্লব তার চারপাশের সব কিছু চিনতে পারছিল। আবার পারছিলও না। হয়ত সে কারণেই একটু দ্বিধা। খানিক বিহ্বলতা। মাত্র কয়েক মুহূর্তেই সে এই অবস্থাটাকে টপকে যেতে পারল।

মাতনের দিকে চেয়ে বলল, মাঠে নয়। তুমি এই সিঁড়িতেই বসো।

পল্লব তার ডান হাতটিকে মাতনের দিকে বাড়িয়ে ধরল। হতচকিত মাতন পল্লবের এমন আচরণের অর্থ ধরতে না পেরে ভয় পেল। সিঁড়ি ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

পল্লব ধীর পায়ে ঘরের মধ্যে এল।

কুহু বসেছিল বিছানার ওপর। অস্ফুট গলায় বলল, লোকটা কি তোমায় কিছু বলছিল? তুমি হঠাৎ করে নিজের হাতটা …!

পল্লব ঘাড় নেড়ে বলল, না। কিছুই বলেনি। আমিই এইভাবে। বলে সে তার ডানহাতের করতলটি কুহুর সামনে মেলে ধরল, আমি ওই লোকটার হাতের উষ্ণ ছোঁয়া পাওয়ার জন্যই নিজের হাতটা বাড়িয়েছিলাম।

পল্লবের প্রসারিত হাতের দিকে চেয়ে কুহুর শরীরের মধ্যে অদ্ভুত শিহরণ হল। পল্লবের করতল জুড়ে অসংখ্য রেখা। রেখাগুলি মিলেমিশে একটি মানচিত্রের মতো দেখাচ্ছে। নিখুঁত একটি মানচিত্র। কুহু পষ্ট দেখল, পল্লবের করতল জুড়ে ভারতবর্ষ । স্থির চোখে সেদিকে চেয়ে থেকে কুহুর ঠোঁট কাঁপতে লাগল। গলা বুজে এল কান্নায়।

ধরা গলায় কোন রকমে সে শুধু এইটুকুই বলতে পারল, পল্লব, প্লীজ, তুমি তোমার হাতের স্পর্শটুকু… !

♦—♦•♦—♦♦—♦•♦—♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!