Advertisement
  • গ | ল্প
  • জানুয়ারি ৯, ২০২১

মঞ্জুর লাল-নীল সংসার

মঞ্জুর লাল-নীল সংসার

চিত্র: প্রকাশ কর্মকার

এই দিদি আজ আমাদের লুচি হবে?
হ্যাঁ।
জানিস, আমার লুচি খেতে খুব ভালো লাগে।
তোর ভালো লাগে না?
না।
কেন?
জানিনা।
মা কখন লুচি ভাজবে রে?
বলতে পারব না।
চল, আমরা এবার উঠি। সকাল হয়েছে।
ঐ দ্যাখ, টালির ফাঁক থেকে আলো দেখা যাচ্ছে।
তুই ওঠ, আমার ভালো লাগছে না।
বলেই পাশ ফিরল মুনিয়া।
ছোট একটা চৌকিতে তাপ্পি দেওয়া মশারির ভেতরে পাশাপাশি শুয়ে  আছে দুই বালিকা। ফুটফুটে প্রাণবন্ত । পূর্ব কলকাতার বাইপাসের সীমান্তবর্তী ঘিঞ্জি এলাকায় লিজের একটা ১০/৮ ফুটের ঘরে ওদের বাস।
কীরে তোদের এখনও ঘুম ভাঙেনি? এক্ষুণি ওঠ, বলেই জোরে ডাকতে শুরু করে দিল ওদের মা মঞ্জু।
বছর পঁচিশের শ্যামবর্ণা মঞ্জু  শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে দ্রুত গতিতে ঘরে ঢুকেই মশারিটা খুলতে শুরু করে দিল। কাকভোরে উঠে পুকুর পাড়ে ছুটে গিয়েছিল সে। এই পাড়ায় মাত্র দিন কয়েক হয়েছে তারা এসেছে। শেখরের রোজগার যৎসামান্য। বড়ো ঘর, ভালো এলাকা কোনও কিছুই সম্ভব নয়। অনেক খোঁজা খুঁজির পর প্রান্তিক এ এলাকার বেশ কিছু পরিবার নিয়ে গড়ে ওঠা পাড়াটায় ঘরের সন্ধান দিয়েছিল শেখরের এক বন্ধু। মঞ্জুর একটাই দাবি ছিল, চারাপাশটা একটু পরিষ্কার যেন হয়। গরিবের মেয়ে হলেও মঞ্জুর ছেলেবেলা কেটেছে বড় বাড়িতে। মা বিধবা হওয়ার সুবাদে মামা বাড়িতেই মাথা গোজার একটি ঘর তাদের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল। যদিও এর বিনিময়ে মঞ্জুর মা ও মঞ্জুকে মামার সংসারের যাবতীয় কাজকর্ম করতে হত। তাই ছোট থেকেই মঞ্জু ঘরকন্যা, রান্নাবান্নায় একেবারে সিদ্ধহস্ত।

ভালোই কাটছিল দিনগুলো। হঠাৎ সুতো ছিঁড়ল— ঘুমের ঘোরেও  তীব্র যন্ত্রণায় মঞ্জু আঁতকে উঠল। মা বলে চিৎকার করে উঠতেই কে যেন দৌঁড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মামি এমনিতেই মঞ্জুকে দেখতে পারে না। সারাদিন কোন না কোনও বাহানায় তাচ্ছিল্য পাশাপাশি চুল টেনে নাড়িয়ে দেওয়াটা কোনও নতুন ঘটনা নয়। ভয়ে কোন কথাই বলতে পারল না মঞ্জু। শুধু রাতে বিছানায় মাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, মা তুমি আমায় ছেড়ে কোথাও যাবে না তো। মা বলেছিল, আমার তো বয়েস হয়েছে, আজকাল শরীরটাও তেমন ঠিক যাচ্ছে না। সারাজীবন তো কেউ বাঁচে না রে মা। মঞ্জু মায়ের বুকের ভেতর মুখটা গুঁজে দিয়ে বলল, না তোমায় আমি কোথাও যেতে দেব না।
মঞ্জু বড়ো হচ্ছে।  মলিন জামার ওপর থেকে নরম মাংসল আভা উঁচু হয়ে উঠেছে। আজকাল প্রায়ই মামির ভাই এ বাড়িতে এলে জল খাবার বাহানায় রান্নাঘরে ঢুকেই মঞ্জুর হাতটা চেপে ধরে। মঞ্জু  লোকটাকে একদোম পছন্দ করে না। সুযোগ পেলেই ওকে চেপে ধরে। বুকের ওপর হাত দিয়ে আঁকিবুকি কাটে। মঞ্জু দৌঁড়ে পালাতে চায়। কিন্তু শক্ত হাতে চেপে ধরে ওর কোমল হাত। ধমক দেয়, শাসায়।

মঞ্জুর মায়ের কাশিটা বেড়ে যাচ্ছে। ও বুঝতে পারে না, কী করবে। মামাকে কতবার বলেছে ডাক্তার ডাকার কথা। মামির ভয়ে মামাও সে কথা কানে তোলে না। সেদিন সকাল থেকে আকাশের মুখ ভার। মা বিছানায়। এককোনে বসে পরম স্নেহে মায়ের কাপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে তার আদরের মেয়েটা। জানলার পর্দাটা হাওয়ায় উড়ছে। ঘরে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। বহুদূরে গাছের ডালে নাম না জানা কোনও পাখি অনবরত ডেকে যাচ্ছে। বেলা বাড়ছে, বাইরে মামির হাকডাক। কিন্তু মঞ্জু মাকে ছেড়ে যাবে না, কিছুতেই না।
বাধ্য হয়ে মামিই ঘরে ঢুকে বলল, বলি কী হয়েছে ? নবাবের মেয়ে কাজকর্ম সব পড়ে আছে, মায়ের কোলে বসে থাকলে হবে।
চল, চল বলছি।
মঞ্জুর হাত ধরে টানতেই মামি আঁতকে উঠল।
চিৎকার করে বলল, ওরে আমার কী সর্বনাশ হল!
দিদি গো তুমি আমাদের ছেড়ে চলে গেলে। বলেই চিলচিৎকার জুড়ে পাড়া-প্রতিবেশিদের জড়ো করল।
মঞ্জু পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে রইল। মায়ের কাজ-কর্ম মিটে গেল। কিন্তু ও এবার কী করবে, কোথায় যাবে, মামি নিজের সংসারে থাকেত দেবে না বলেই দিয়েছে।
ও একেবারে একা। ঠিক এই সময় দেবদূতের মতো একটা ছেলের কথা ওর মনে পড়ল।
শেখর, বাজারে বেশ কয়েকবার দেখেছিল ছেলেটাকে।
মা বেঁচে থাকাকালীন, মামি মাঝে মাঝে জিনিসপত্র কিনতে পাঠালে ছেলেটার সঙ্গে দূষ্টি বিনিময় হয়েছিল মঞ্জুর। এমনকী একদিন মাসকাবারির পসরা বয়ে আনতেও ওকে হেল্প করেচিল ছেলেটা। তখনই দুজন দুজনের নাম, পরিচয় জানল। শেখরের বাবা নেই, মা ও ভাইদের সঙ্গে থাকে। মা পড়াতে চাইলেও ওর পড়তে ভালো লাগে না। তাই বাজারের এই ‘তারা  ভান্ডার’ দোকানটাতে ও কাজ করে। এখান থেকে যে কয়েক পয়সা পায় তা দিয়ে ওর হাতখরচ চলে যায়। মঞ্জু মুগ্ধ হয়ে দেখেছিল ছেলেটার পুরুষালি চেহারা।
মঞ্জু মনস্থির করে নিল আজ বিকেলেই ও শেখরের সঙ্গে কথা বলবে। মামির ভাইয়ের লালসার ভরা চোখ দুটো মনে পড়তেই ও আরও দূঢ় হল।

সময়মতো বাজারে গিয়ে শেখরকে চোখের ইশারায় বাইরে ডেকে আনল। তারপর বলল, মামি আর মামা বাড়িতে থাকেত দিতে চায় না। তুমি কি আমার থাকার ব্যবস্থা করতে পার। শেখর পুরোপুরি সম্মত ছিল না। কিন্তু মঞ্জুর মুখের দিকে তাকিয়ে না বলতে পারল না।


মামির ভাই এ বাড়িতে কোন না কোনও বাহানায় রান্নাঘরে ঢুকেই ওর  হাতটা চেপে ধরে। মঞ্জু  লোকটাকে একদোম পছন্দ করে না। সুযোগ পেলেই ওকে চেপে ধরে। বুকের ওপর হাত দিয়ে আঁকিবুকি কাটে।


সেইদিনই কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে এক মন্দিরে গিয়ে দুজনে বিয়েটা সেরে ফেলল। বিয়ে সেরে মামা-মামির কাছেই এসেছিল ওরা । মামি দূরে দাঁড়িয়ে বলল, পাপ বিদেয় হয়েছে, বাঁচলাম। দুজন দ্রুত সেখান থেকে চলে যায়।
দিন দুই বন্ধুর বাড়ি কাটানোর পর কঠোর যুদ্ধে নেমে পড়ে স্বামী-স্ত্রী। তিলে তিলে গড়ে তোলে তাদের লাল-নীল স্বপ্নের সংসার। কঠোর পরিশ্রম করে কারখানায় লোহা পেটায় শেখর। আর মঞ্জু ঘরে সারাদিন হাত মোজার মেশিনের খটাখট শব্দের মাঝে নিজের হাতের চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ মিশিয়ে বুনে চলে একের পর এক মোজা। তার মাঝেই দুই মেয়ের দেখাশোনা, রান্না সবই করত। আর যখন সন্ধ্যে নামে, তখন এই ভাড়া ঘরের দেওয়াল গুলোও মেতে ওঠে । ওরা জানে একটু বাদেই মঞ্জু ওর দুই মেয়ে আনন্দে মেতে উঠবে। কারণ শেখর ফিরলেই হৈ হৈ করে উঠবে ওরা।
মা কখন লুচি ভাজবে?
এই তো সোনা
দিদি আর তুমি স্নান করে নাও, তারপর।
মঞ্জু ছটপট বিছানাটা ছেড়ে দুই মেয়েকে স্নান করাতে নিয়ে যায়।
এখানে এসে প্রথম দিনই মঞ্জুর খুব ভালো লেগে। পাড়াটার  মাঝামাঝি বড় একটা পুকুর। চারপাশ ঘিরে ছড়িয়ে রয়েছে সারি সারি ঘরবাড়ি। চারপাশ সান বাঁধানো। গৃহস্থলীর কাজকর্মের পাশাপাশি পুকুরের পাক তুলে তার সঙ্গে কয়লার গুড়ো মিশিয়ে গুল দেয় মঞ্জু। আসলে মঞ্জুর রেশন কার্ড নেই, ওর দুই মেয়েরও কার্ড বানাতে পারেনি। শেখরের একটা কার্ড দিয়ে যেটুকু কেরোসিন পায়, ওদের হ্যারিকেন জ্বালাতেই খরচ হয়ে যায়। বাজার থেকে কেরোসিন কিনতে গেলে অনেক খরচ পড়ে। তাই গুল দিয়ে রান্না করলে খরচ কমে। উনুনে রান্না করলে বাড়ির মালিক কিছু বলে না। ঘরটা আগের তুলনায় ছোট হলেও এসব সুবিধার কথা ভেবেই মঞ্জু এ বাসা তার পছন্দ বলে শেখরকে জানিয়ে দেয়।

আজ ওদের ছোট মেয়ে গুড়িয়ার জন্মদিন। মুনিয়া আর গুড়িয়া পিঠোপিঠি দুই বোন। মঞ্জু চেয়েছিল পরপর দুটো বাচ্চা। কারণ মিলিমিশে ওরা একসঙ্গে বড়ো হয়ে যাবে। তাছাড়া, দুই বোন হওয়ায়, একজনের জামা আরেকজন পরে। মঞ্জু কখনই ভোলে না, অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে ওর স্বপ্নের সংসার এগোচ্ছে। শেখর চেয়েছিল একটা ছেলে। কিন্তু কখনোও মন খারাপ করেনি। দুই মেয়েকেই বাবা খুব ভালোবাসে।
ছোট মেয়ের জন্মদিনে মেয়ের পছন্দ মতো খাবার, রান্না হবে। গত রাতে শেখর আর মঞ্জু ঠিক করে নিয়েছিল, লুচি, বেগুন ভাজা, আলুর দম আর চাটনি সহযোগে দুই মেয়ের ওরা খাওয়া-দাওয়া সারবে।
সেইমতো শেখর সকাল সকাল বাজারে চলে যায়।
ঘর আলো করে বড়ো হচ্ছে মেয়েরা।  বাবা- মা রান্নার আয়োজনে ব্যস্ত থাকায় দুই বোন খেলতে শুরু করে।
খুব ছোট ঘরটা। রান্নার জন্য আলাদা কোনও ব্যবস্থা নেই।
ওদের ছোট তক্তাপোষ, আলনা আর টুকিটাকি  জিনিসপত্র রাখার শেল্ফটা ছেড়ে সরু এক ফালি গলির মতো জায়াগাটায় মঞ্জু রান্না করার জন্য বেছে নিয়েছে।  উনুনের আগুন গনগনে সূর্যের মতো লাল টকটকে হয়ে জ্বলছে। গুড়িয়া আবার জিজ্ঞাসা করল—
মা কখন লুচি ভাজবে?
শেখর উত্তর দেয়, একটু দাঁড়া মা, এক্ষুণি ভাজা হবে।
মঞ্জু বলল, এত তাড়া কীসের সময় দাও, হলেই খেতে দেব।
দুইবোন বিছানায় খেলা করছিল। মুনিয়া কিছুতেই ওর সাধের পুতুলটা গুড়িয়াকে দেবে না, গুড়িয়াও ছাড়বে না। ব্যস মুনিয়া দিল বোনকে চিমটি কেটে।
গুড়িয়া হাফুস নয়নে কান্না জুড়ে দিল।
মঞ্জু রান্না ফেলে উঠে গিয়ে দুই মেয়েকে ধমক লাগাল।
শেখর বলল, আরে ছেড়ে দাও, ওদের বকাবকি করো না।
মঞ্জু এসে আবার রান্নায় মন দিল। শেখর লুচি ভাজছে, আর মঞ্জু বেলে বেলে দিচ্ছে।
আগুনটা বেশি হওয়ায় খুব তাড়াতাড়ি কড়াইয়ে ধোঁওয়া উঠে যাচ্ছে।
ওরা নামিয়ে নামিয়ে দু-চারটে করে ভাজছে।
এমন সময় গুড়িয়া বলে উঠল, মা টয়লেটে যাব!
মঞ্জু বলল, সাবধানে যেও।
আসছে খেয়াল কর।
বলতে বলতে এক ছুটে গুড়িয়া বাইরে বেরুতে গিয়ে ওর পা টা গরম তেলের কড়াইয়ে ঢুকে গেল।
চোখের সামনে দেখতে দেখতে লুচির মতো ফুলে উঠল কচি পা।
গুড়িয়া আর্তনাদ করে চিৎকার দিয়ে উঠল। মঞ্জু কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না।
শেখর তাড়াতাড়ি মেয়ের পা টা টেনে কড়াই থেকে বের করল। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে ছুটল ডাক্তারখানায়। মঞ্জু তাড়াতাড়ি উনুনটা বাইরে বের করে তাতে জল ঢালতে ঢালতে ডুকরে উঠল। বিছানায় একা মুনিয়া, কিছু বুঝে উঠতে না পেরে ও কাঁদতে শুরু করল।  মুহূর্তেই আট/দশের ঘরটাকে গিলে নেয় মা-মেয়ের আর্তনাদ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!