- এই মুহূর্তে দে । শ
- আগস্ট ৭, ২০২৫
কাশ্মীরে ‘দেশবিরোধী চিন্তাধারা’ উসকে দেওয়ার অভিযোগে নিষিদ্ধ ২৫ বই। তালিকায় অরুন্ধতী, নুরানি, অনুরাধা, সুমন্ত্রদের লেখা
ছবি: লেখিকার ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া ।
কাশ্মীর প্রশ্নে ভিন্ন মত আর ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক বহু দিনের। এবার সে বিতর্কে ঘি ঢালল জম্মু-কাশ্মীরের কেন্দ্র চালিত স্বরাষ্ট্র দফতর। ‘মিথ্যা বর্ণনা’ ও ‘সন্ত্রাসবাদকে মহিমান্বিত করার’ অভিযোগে এক ডজনেরও বেশি লেখক ও পণ্ডিতদের লেখা ২৫টি বই নিষিদ্ধ ঘোষণা করল উপত্যকার প্রশাসন। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে ভারতের সংবিধান এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার আওতায়। যা ঘিরে লেখক, প্রকাশক এবং বুদ্ধিজীবী মহলে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
নিষিদ্ধ বইগুলোর তালিকায় রয়েছেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃত লেখক ও গবেষকরা। যারা জম্মু-কাশ্মীরের ইতিহাস ও নাগরিকদের অধিকার, রাষ্ট্রীয় শোষণ ও অত্যাচার, রাজনীতির অলিগলি সহ নানা দিক নিয়ে লাগাতার ‘বিপরীত ধারা’র লেখালিখি করছেন। নিষিদ্ধ তালিকায় তালিকায় রয়েছেন বুকার পুরস্কারজয়ী সাহিত্যিক অরুন্ধতী রায়, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এ.জি. নূরানি, রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুমন্ত্র বোস, ইতিহাসবিদ আয়েশা জালাল, কাশ্মীরি গবেষক হাফসা কাঞ্জওয়াল, ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ভিক্টোরিয়া স্কোফিল্ড সহ লেখক চিন্তকরা। স্বরাষ্ট্র দফতরের দাবি, ‘এই বইগুলো ইতিহাস এবং রাজনীতি চর্চার আড়ালে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করছে এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাসবাদী মনোভাব তৈরি করছে। লেখকরা নিরাপত্তা বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছেন আর সন্ত্রাসবাদকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা করছেন। দেশের অখণ্ডতা বিপন্ন করছেন’। এই নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে ৫ আগস্ট, জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা খারিজ হওয়ার ৬ বছর পূর্তির দিন। কাকতালীয় না রাজনৈতিক বার্তা— জল্পনা চলছে।
নিষিদ্ধ হওয়া বইয়ের মধ্যে রয়েছে বেশকিছু বহুল পঠিত শিরোনাম। যেমন — অরুন্ধতী রায়ের ‘আজাদি’, এ.জি. নূরানির ‘কাশ্মীর বিরোধ: ১৯৪৭ থেকে ২০১২’, সুমন্ত্র বসুর ‘কাশ্মীরের সংকটকাল’, ভিক্টোরিয়া স্কোফিল্ড-এর ‘সংঘাতগ্রস্ত কাশ্মীর’, হাফসা কাঞ্জওয়ালের ‘কাশ্মীরের ঔপনিবেশিককরণ’, অনুরাধা ভাসীনের ‘বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র’, ক্রিস্টোফার স্নেডেনের ‘স্বাধীন কাশ্মীর’, (পিওত্র বালচেরোভিচ ও আগনিয়েসকা কুশেভস্কার ‘কাশ্মীরে মানবতা বিপন্ন’, এসসার বতুলের ‘কুনান পোষপোরাকে মনে পড়ে?’ হেলি ডুশিনস্কির ‘হানাদারদের বিরুদ্ধে কাশ্মীরিদের প্রতিরোধ’-এর মতো বই। বইগুলির মধ্যে রয়েছে ইতিহাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, নিপীড়নের অভিজ্ঞতাভিত্তিক বর্ণনা এবং নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে লেখা গবেষণাগ্রন্থও। পেঙ্গুইন, হার্পার কলিন্স, ব্লুমসবেরি, তুলিকা, জুবান, ম্যাকমিলান, রাউটলেজ এবং ভার্সোসহ বিশ্বখ্যাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বইগুলি প্রকাশিত হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার খবর পেয়ে লেখক, গবেষক এবং নাগরিক সমাজের একাংশ কঠোর প্রতিবাদ জানিয়েছে। অনুরাধা ভাসিন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমাদের গবেষণার ফলাফল বহুল আলোচিত। আমাদের লেখা কোনোভাবেই সন্ত্রাসবাদের প্রশস্তি করে না। বই নিষিদ্ধ করলেই সত্যকে ধামাচাপা দেওয়া যায় না।” কাশ্মীরের শীর্ষ ধর্মীয় নেতা মীরওয়াইজ উমর ফারুক বলেছেন, ‘এভাবে ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। পণ্ডিত গবেষকদের লেখা নিষিদ্ধ করলেই বাস্তবতা বদলানো সম্ভব নয়। কাশ্মীরবাসীর অভিজ্ঞতা ও বেদনা তাঁদের মনে অম্লান থেকে যাবে।” তিনি আরও যোগ করেছেন, ‘এই নিষেধাজ্ঞা শুধু প্রশাসনের ভীত ও অজ্ঞতার প্রকাশ, অথচ একই সময়ে শ্রীনগরে বইমেলা আয়োজন করে তারা সাহিত্যচর্চার ছদ্মবেশ ধারণ করছে।’ রাষ্ট্রীয় জনতা দলের সাংসদ মনোজ কুমার ঝা বলেছেন, ‘বই নিষিদ্ধ করা গণতন্ত্রের পরাজয় এবং ভিন্নমত নিষিদ্ধ করার কালো অধ্যায়ের সূচনা।’
প্রবল সমালোচনার মুখেও প্রশাসন সিদ্ধান্তে অনড়। জম্মু ও কাশ্মীর স্বরাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে , ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (২০২৩) এবং ভারতীয় দণ্ডবিধির (নতুন ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, ২০২৩’) সংশ্লিষ্ট ধারার আওতায় এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। নিষিদ্ধ বইগুলোর বিক্রয়, বিতরণ, প্রকাশ কিংবা প্রচার বন্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বইগুলি বাজেয়াপ্ত করা হবে। ‘নাগরিক সুরক্ষা’ এবং ‘রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা রক্ষার’ জন্য পদক্ষেপ অপরিহার্য।
জম্মু ও কাশ্মীর প্রশাসনের এ নিষেধাজ্ঞা জাতীয় নিরাপত্তা ও অখণ্ডতার স্বার্থে নেওয়া না কি গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করবার চেষ্টা, তা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা চলছে। নিষিদ্ধ হওয়া বইগুলির বেশ কয়েকটি মূলত কাশ্মীরি জনগণের মৌখিক ইতিহাস, নারী নির্যাতনের দলিল এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ‘বিবরণ’। সাহিত্যিক ও অ্যাকাডেমিক মহলের একাংশের মতে, প্রশাসনের এ পদক্ষেপ বাক্ স্বাধীনতার উপর ‘সেন্সরশিপ’-এর দিকে ইঙ্গিত করছে। একজন প্রকাশক মন্তব্য করেছেন, ‘একটা গণতান্ত্রিক দেশে ইতিহাস ও সমকালের ব্যাখ্যা, মতভেদ ও সমালোচনার জায়গা থাকা উচিত। যে বইগুলো নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেগুলির অনেকগুলোই আন্তর্জাতিক গবেষণামহলে প্রশংসিত।’ নিষেধাজ্ঞার পর, কাশ্মীরের ইতিহাস, সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ঘিরে সঠিক তথ্য, মুক্ত গবেষণা এবং মুক্ত মতপ্রকাশের সুযোগ কতটুকু থাকবে, গভীর সে প্রশ্ন ক্রমাগত পাক খাচ্ছে।
❤ Support Us







