Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • অক্টোবর ১১, ২০২৫

সন্ত্রাসের আগুনে জ্বলছে পাকিস্তান ! পুলিশ প্রশিক্ষণকেন্দ্রে ঘাতক হামলা, টিএলপির ছায়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা !

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
সন্ত্রাসের আগুনে জ্বলছে পাকিস্তান ! পুলিশ প্রশিক্ষণকেন্দ্রে ঘাতক হামলা, টিএলপির ছায়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা !

আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের রাজধানী পেশোয়ারের কাছেই শনিবার ভোরে এক ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) নামের বিদ্রোহী গোষ্ঠী। পাকিস্তান পুলিশের একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে হঠাৎ করে হামলা চালায় তারা। পাক গোয়েন্দা বলছেন, হামলা ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত ও ঘাতক, যার ফলে প্রাথমিকভাবে কমপক্ষে ৭জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। পরে লড়াইয়ে ৬ জন সশস্ত্র বিদ্রোহীও প্রাণ হারিয়েছেন । পুলিশ এবং নিরাপত্তা বাহিনী প্রায় ৫ ঘণ্টা ধরে লড়াই চালিয়ে অবশেষে রাত্তা কুলাচি এলাকায় অবস্থিত প্রশিক্ষণকেন্দ্রকে পুরোপুরি ‘জঙ্গিমুক্ত’ ঘোষণা করে।

মাত্র একদিন আগে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল এবং সীমান্তবর্তী পকতিকা প্রদেশে পাকিস্তানি বায়ুসেনার বিমান হামলায় টিটিপির শীর্ষস্থানীয় দুই কমান্ডার নিহত হয়েছেন বলে খবর ছড়িয়েছে। আফগান তালিবান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে ইসলামাবাদকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী হামলার ঘটনা ‘নজিরবিহীন হিংসা ও প্ররোচনামূলক’। এ ধরনের কর্মকাণ্ড ‘ভাল পরিণতি ডেকে আনবে না’ বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের বিমান হামলা এবং তার পরের টিটিপির পাল্টা হামলা একে অপরের পরিপূরক বা প্রতিশোধের জবাব হিসেবেই ধরা হচ্ছে। গভীর রাতে হামলাকারীরা গোপনে পুলিশের প্রশিক্ষণকেন্দ্রে প্রবেশ করায় সেখানে বিশাল রণক্ষেত্র তৈরি হয়। দীর্ঘক্ষণ চলে গুলির লড়াই, যেখানে দুই পক্ষই বিপুল সংখ্যক ক্ষয়ক্ষতি সম্মুখীন হয়। পাকিস্তানি নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর অভিযোগ, টিটিপি বিদ্রোহীরা আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ ছড়াচ্ছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী এক সাংবাদিক বৈঠকে স্বীকার করেন, আফগান মাটি ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের ঘাঁটি’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পাকিস্তান তা বরদাস্ত করবে না। তিনি বলেছেন, দেশের নাগরিকদের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আফগানিস্তানে পাকিস্তানের এই বিমান হামলা এবং পরে টিটিপির পাল্টা হামলার ঘটনাগুলো রাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, আফগান তালিবান সরকারের বিদেশমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির এই মুহূর্তে ৬ দিনের ভারত সফরে রয়েছেন। সফরের প্রথম দিন তিনি যখন দিল্লিতে উপস্থিত, তখনই কাবুলে পাকিস্তানের বিমান হামলা ঘটে। সময়ের সামঞ্জস্য পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। ভারত-আফগান- পাকিস্তান ত্রিপাক্ষিক সম্পর্কের জটিলতা এশিয়ায় নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে মত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের। আফগান তালিবান সরকার পাকিস্তানকে কঠোর ভাষায় সতর্কও করে বলেছে, তাদের মাটিকে সন্ত্রাসবাদের জন্য ব্যবহার হতে দেওয়া হবে না।

তবে শুধু পেশোয়ার কিংবা কাবুল নয়, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। পাকিস্তানের বালোচিস্তান প্রদেশে বালোচ বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে টিটিপির সম্পর্ক এবং তাদের কৌশলগত জোট ইসলামাবাদের জন্য নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই আইএস-খোরাসান (আইএসকে) ও লশকর-এ-তৈয়বার মতো জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যেও সমঝোতা গড়ে তুলছে বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে খবর পাওয়া গেছে। এমন পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদের ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা’ নীতি অনুযায়ী তারা নিজেদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের মোকাবিলায় নতুন দিক থেকে চাপ প্রয়োগ করছে। আফগান তালিবান সরকার এবং বিশেষত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোল্লা মহম্মদ ইয়াকুব তালিবানের কাছ থেকে পাকিস্তান ঘনিষ্ঠ হিসেবেও পরিচিত হলেও, তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একাধিকবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলা ও ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পরবর্তী সময়ে। আফগান তালিবান বাহিনী ধারাবাহিকভাবে আইএসকে ও অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে, যা ইসলামাবাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে কঠিন করে তুলেছে। এছাড়াও আফগানিস্তানে তালিবান সরকারের ভেতরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও ভিন্নমত যেমন ইসলামাবাদের পক্ষে সমস্যা তৈরি করছে, তেমনি দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে সন্ত্রাসবাদের নতুন দিক থেকে ছড়িয়ে পড়ার অবকাশও বাড়িয়েছে। টিটিপি দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় অঞ্চলগুলোতে সক্রিয়। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে শান্তি আলোচনার ব্যর্থতার পর থেকে খাইবার পাখতুনখোয়ায় বিশেষত টিটিপির হামলা বেড়েছে। এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী আফগান সীমান্তবর্তী এলাকায় আশ্রয় নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে, যা দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। সম্প্রতি কুররম জেলায় টিটিপির হামলায় এক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এবং মেজরসহ বহু সেনা নিহত হওয়া এ অশান্তিরই ইঙ্গিত।

অন্যদিকে, পাকিস্তানের রাজনৈতিক মঞ্চে তেহরীক-ই-লাব্বাইক পাকিস্তান (টিএলপি) অদৃশ্য ছায়ার মতো ঘোরাফেরা করছে। একদিকে সামরিক শাসনের সহায়ক, অন্যদিকে দেশের জন্য একটি বড়ো রাজনৈতিক ধাঁধা, এই ধন্দেয় জেরবার পাকিস্তান। সামরিক বাহিনী প্রয়োজনে এই চরমপন্থী ইসলামি দলটিকে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় করে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করে আসছে বলে অভিযোগ উঠছে। এক কথায়, টিএলপি পাকিস্তানের রাজনীতিকে বারবার বন্দি করে রেখেছে। গত সপ্তাহে লাহোরের বিক্ষোভে ২ জনের প্রাণহানি এবং ইসলামাবাদে হাজার হাজার টিএলপি সমর্থকের মার্কিন দূতাবাসের সামনে মিছিল, দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনাকে ফের তীব্র করে তুলেছে। যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ইন্টারনেট বন্ধ থাকা সত্ত্বেও বিক্ষোভে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়া পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের গভীরতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে উত্তরোত্তর। বিশ্লেষকরা মনে করেন, টিএলপির উত্থান ও সক্রিয়তা মূলত পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ‘ছায়া যুদ্ধের’ অংশ। দীর্ঘদিন ধরে এই সামরিক-ধর্মীয় জোট দেশকে রাজনৈতিক অস্থিরতায় ঠেলে দিয়েছে। ২০১৭ সালে ইসলামাবাদে দীর্ঘ ২১ দিনের অবরোধ আন্দোলনের মাধ্যমে টিএলপির শক্তি দেশের রাজনৈতিক ক্যানভাসে দৃশ্যমান হয়। শপথবাক্যের ‘নবুয়াতের চূড়ান্ততা’ নিয়ে পার্লামেন্টে আনা সামান্য সংশোধনী নিয়ে জোরালো প্রতিবাদ করে তারা সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগে সক্ষম হয়।

উল্লেখ্য, ২০২০ সালে ফ্রান্সে নবী মুহম্মদ (সঃ)-কে ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন প্রদর্শনের প্রতিবাদে বিশাল বিক্ষোভে মুখরিত হয় পাকিস্তান। টিএলপির সক্রিয় ভূমিকা তাতে ছিল বলে আন্তর্জাতিক সংস্থা সূত্রে খবর। ২০২১ সালে সংগঠনটির উপর পাক সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও সেনাবাহিনীর মধ্যস্থতায় তা দ্রুত প্রত্যাহার করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞার প্রত্যাহারের পেছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং সেনা-টিএলপির গোপন চুক্তি রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। ২০২১ সালের বিক্ষোভ চলাকালীন সেনা সদস্য নিহত হলেও টিএলপির নেতা সাদ রিজভিকে মুক্তি দেওয়ার ঘটনায় এই ধারণাকে শক্তিশালী করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী টিএলপির মতো উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বল করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে টিএলপির সক্রিয়তা পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল করে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফকে ক্ষমতায় আনতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেনাবাহিনী ও টিএলপির মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। বিশেষ করে সেনাপ্রধান জেনারেল কামর জাভেদ বাজওয়া ও আইএসআই প্রধান নিয়োগ নিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এবং সেনা নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব টিএলপির বিক্ষোভকে তীব্র করে তোলে। টিএলপি যদিও নিজেদের সশস্ত্র সংগঠন নয় বলেই দাবি করে, তবু তাদের প্রভাব দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বারবার বিঘ্নিত করছে। এ ধারা এখনো বর্তমান। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, সামরিক শাসন ও ধর্মীয় উগ্রপন্থার এই অদ্ভুত জোট পাকিস্তানকে ক্রমশ মৌলবাদী রাষ্ট্রের পথে ঠেলে দিচ্ছে। ধর্মকে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা সে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে ।সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় টিএলপি এমন একটি রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা, আইনশৃঙ্খলা এবং সামরিক আধিপত্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে চলেছে। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ধর্মীয় সহনশীলতার ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!