Advertisement
  • গ | ল্প
  • এপ্রিল ১৫, ২০২১

পয়লা বৈশাখের গল্প

পিঙ্কি ঘোষ
পয়লা বৈশাখের গল্প

চিত্র: রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়

গিজগিজ করছে মানুষ। তিল ধরার জায়গা নেই। ছেলে, মেয়ে, বাচ্চা, বুড়ো যুবক-যুবতী দাঁড়িয়ে আছে অধির আগ্রহে। ভিড়ের ঠেলায় বন্ধ যানচলাচল। জমায়েত বাড়তে বাড়তে ক্রমশ রোডের ওপর উঠে এসেছে। এ ছবি নতুন নয়। তবুও মাঝেমাঝে দুএকটা অচেনা গাড়ি এসে পড়লে, ভিড়ের ঠেলায় আর এগোতে পারে না। চালককে পিছনে ব্যাক করে আবার ফিরে যেতে হয়।  অন্য রাস্তায়। অনেক সময় এ ও দেখা গেছে,  ড্রাইভার কিংবা যাত্রীরাও দূরে কোথাও গাড়ি পার্কিং-এর ব্যবস্থা করে ফিরে এসেছেন চৈত্রের শেষে সন্ন্যাসী ঝাঁপ দেখতে। উপস্থিত জনগণের সঙ্গে তাঁরাও ভিড়ে মিশে গিয়ে প্রায় কুড়ি ফুট লম্বা বাঁশের ওপর কে বা কারা দাঁড়িয়ে আছেন তা চাক্ষুষ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
বিট্টু বলল,  মা, কত লম্বা, ২০ ফুট? মিন্টুদের দোতলা বাড়ির মতো উঁচু?
ওর মা জয়া বললেন, তা হবে বৈকি।
ওমা, তারপর, তারপর বলো। কী হল বলো? কাল তুমি আমায় প্রমিস করেছ, তোমার ছেলেবেলায় পয়লা বৈশাখের গল্প শোনাবে। চোখ বুজিয়ে ছেলের পাশে শুয়ে আছে মা। সারাদিন বাবুদের বাড়ির হেসেল সামলোনা, ঘর গোছানো, বাসন মাজা, জামাকাপড় কাচা। কত ঝক্কি। তারপর বাড়ি ফিরে ছেলের আবদার মেটানো।
জয়া ভাবছে,  রাত পোহালেই নব বর্ষের নতুন সূর্য উঠবে। কাল কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার সময় ছেলের জন্য একটা গেঞ্জি আর প্যান্ট কিনে এনেছিলো। রায় গিন্নির মনটা খুব ভালো। তিনি জয়াকে ১০০ টাকার নোট দিয়ে বলেছিলো, পয়লা বৈশাখে তোর ছেলেকে কিছু কিনে দিস। নতুন গেঞ্জি-প্যান্ট পেয়ে বিট্টু খুশিতে নেচে উঠেছিল। তারপর জানতে চেযেছিল, পয়লা বৈশাখ কী মা? পাঁচ বছরের বিট্টুকে বাংলা বছরের নতুন দিনের কথা বলতে গিয়েই  চড়কমেলা, গাজন সন্ন্যাসীদের কথা বলেছিল জয়া। আর তখনই বিট্টু মাকে চেপে ধরেছিল। আচ্ছা কাল রাতে শোয়ার সময় শোনাব, এখন মেলায় কাজ পরে আছে।

আজ  তাই বিট্টু ওকে  ঘুমোতে দিচ্ছে না। ছেলেকে আনন্দ দিতে জয়া মাঝে মধ্যেই নিজের ছেলেবেলার গল্প শোনায়।
কী গো মা, অত উঁচু বাঁশের ওপর কারা উঠেছিল?
দেওয়ালে ঝোলানো ইংরেজি ক্যলেন্ডারের দিকে তাকিয়ে জয়া বলল বাংলায়ও বারো মাস বছর। প্রথম মাস বৈশাখ। বৈশাখের প্রথম দিনটাই আমরা নববর্ষ হিসেবে পালন করি। আমরা ছেলেবেলায় প্রায় সপ্তাহ খানেক ধরে আনন্দে মেতে উঠতাম। আমাদের পাড়ায় চড়ক মেলা বসত।
মা, চড়ক মেলা আমি তো দেখিনি কোনওদিন।
এখন তেমন চোখে পড়েনা। তবে গ্রামে গেলে দেখতে পাবি।
তোমরা মেলায় কী করতে? তুমি তো বলছিলে পয়লা বৈশাখের কথা, এখন বলছো চড়ক, এটা কেমন হল।
আরে শোন না মন দিয়ে। ভগবান শিবকে সন্তুষ্ট করতে পাড়ার কিছু ছেলে চৈত্র মাসের শেষের দিকে সন্ন্যাসী হওয়ার রীতি মানত।ওরা সপ্তাহ খানেক মাটিতে শুত, ফলমূল খেত, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, ভগবানের আরোধনা করে দিন কাটাত। ছেলেদের সন্ন্যাস নেওয়ার দিন থেকে পয়লা বৈশাখের দিন পর্যন্ত পাড়ায় চলত উৎসব। ঢাক বাজত, দুধ পুকুর সাজানো হত, মাথায় করে ঘট নিয়ে পুকুর থেকে চড়ক কাঠ তোলা, ও সে কী আনন্দ। আমরা পাড়ার পুচকেরা পেছন পেছন যেতাম। সন্ন্যাসীরা নতুন ধুতি,  গলায় নতুন গামছা, উত্তরীয় পরে হাতে মাটির পাত্র নিয়ে বাড়ি বাড়ি মাগন তুলতে আসত। দিন শেষে যেটুকু আলু, মুলো কলা পেত তাই ফুটিয়ে খেত। দিনের শেষে সূর্য ডোবার পর একবারই খেতে পারে  তাঁরা।
তাহলে খুব কষ্ট হত বল, সন্ন্যাসী কাকুদের ।
হ্যাঁ বাবা,  তা তো হত। আমাদের সবাইকেই কষ্ট করতে হয়। জানিস তো,  চড়ক মেলায় সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বটি ঝাপের দিন। খোলা বটিতে অনেক উঁচু থেকে ঝাপ দেয় সন্ন্যাসীরা।
তাই !
সরু সরু অনেক উঁচু বাঁশের ওপর দাঁড়িয়ে প্রথমে ফল ঝাপ হয়। এক একজন সন্ন্যাসী নিজের সাধ্য মত ফল কিনে উঁচুতে উঠে ভক্তদের দিকে ছুড়ে দেয় সেই ফল। মঙ্গলসূচক সে ফল যে লুফে নিতে পারবে, তাঁরই ভালো হবে। আমি আর আমার বন্ধুরা ফল পাওয়ার জন্য কত ধাক্কাধাক্কি করতাম। আসলে কী বলত, ছেলেবেলায় পড়ে গেলেও তেমন ব্যাথা লাগে না। গল্প করতে করতে জয়া পৌঁছে গেছে দুদশক আগে। মধ্য কলাকাতার চড়ক মেলায়। এক শিব মন্দিররে গা ঘেঁষে বিশাল বড়ো মাঠ জুড়ে মেলা বসেছে। সারি সারি  দোকান, চুড়ি, পুতুল, খেলনার।কী বিশাল আয়োজন। গরম আঁচের ওপর পাঁপড়, জিলিবি ভাজা হচ্ছে, ফুচকাওয়ালা,  বাঁশিওয়ালা হাকছে। জয়া যেন হাওয়ায় উড়ছে। মায়ের দেওয়া নতুন ফ্রকটা পরে। নাগর দোলায় একবার ওপরে, একবার নীচে। ওর বন্ধুরা ওকে ডাকছে, জয়া, এই দ্যাখ এই দ্যাখ আমরা এখানে। হাত বাড়িয়ে বন্ধুকে ধরতে গেল জয়া। ব্যাস অমনি গেল পড়ে। অ্যাঁ । বলে চিৎকার করে  ছেলের গায়ে হাত দিয়ে দেখল,  শরীরটা এলিয়ে দিয়েছে বিট্টু। ঘুমে কাদা হয়ে গেছে।
টালির ঘরের ফাঁক দিয়ে আলো ঝিলিক মারছে। না এখুনি উঠে পড়তে হবে। আজ যে পয়লা বৈশাখ। কাজের বাড়ি থেকে ছুটি দিয়েছে। একটু ভালো-মন্দ রান্না করে ছেলের মুখে দিতে হবে।তারপর বিকেলে বিট্টুকে নিয়ে হালখাতা সারতে যেতে হবে। ধড়ফড় করে উঠে পড়ল জয়া। আস্তে করে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে দেখলো, পাশের বাড়ির রেডিওয়ে বাজছে, এসো হে বৈশাখ এসো হে…


❤ Support Us
error: Content is protected !!