- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- আগস্ট ১৯, ২০২৫
বিপুল চিনা বিনিয়োগে ‘তিস্তা মহাপ্রকল্প’ বাস্তবায়নের পথে বাংলাদেশ! নয়াদিল্লির কপালে চিন্তার ভাঁজ
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ একটি নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প, কিন্তু এখন তা পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক জল্পনার কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে, বিনিয়োগ ক্ষেত্রে ভারত-চিন টানাপোড়েন, অন্যদিকে ঢাকার কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ। আর ঠিক সেই সময়েই জল্পনা শেষ করে চিনা ঋণেই ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের পথে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ‘প্রথম আলো’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিনের কাছে ৬৭০০ কোটি টাকার ঋণ চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে ঢাকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্পের কাজ শুরু হবেই বলে আগাম পূর্বাভাস। আর পরশি দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার আর্থিক পরিমাণ এবং ভৌগোলিক অবস্থান এতটাই স্পর্শকাতর যে, তার আঁচ লেগেছে নয়াদিল্লির গায়েও।
তিস্তা নদীর জলবণ্টন নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ বিবাদ দীর্ঘদিনের। ২০১১ সালে জলবণ্টন চুক্তির কথা উঠেছিল, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের আপত্তিতে থেমে যায় আলোচনা। এরই মাঝে ভারত শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার সব জল আটকে রাখছে আর বর্ষায় আচমকা সব কপাট খুলে দিয়ে সে দেশের ৫ টি জেলাকে প্রবল বন্যার মুখে ফেলে দেয় বলে অভিযোগ বাংলাদেশের। চলতি বছর মার্চে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বেইজিং সফরের পর প্রকল্পটি ঘিরে নতুন করে গতি এসেছে। পুরো প্রকল্পে খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। ‘তিস্তা যেন উত্তরাঞ্চলের মানুষের অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে’ —বলছেন তিস্তা বাঁচাও আন্দোলনের নেতা নজরুল ইসলাম হক্কানি। তিনি আরও বলেন, ‘হাসিনা সরকার শুধু আশ্বাস দিয়েছিল, বাস্তবায়ন করেনি। এখন অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের দাবি শুনেছে, তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিয়েছে, এ উদ্যোগ জনগণের জয়।’ যদিও, আওয়ামী লীগের দাবি, তিস্তা নদীর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালেই।
বিবিসি সূত্রে জানা যাচ্ছে, চিনা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ‘পাওয়ার চায়না’ ইতিমধ্যে বাংলাদেশের আওয়াভুক্ত তিস্তার উপর সমীক্ষা শেষ করেছে। নদী খনন, তীর সংরক্ষণ, সেচব্যবস্থা, রাস্তাঘাট, পর্যটন শহর, নিরাপত্তা অবকাঠামো, সব কিছুই থাকবে এই প্রকল্পের আওতায়। প্রায় ১০ বছর মেয়াদি এ মেগা প্রকল্পে নদীর গভীরতা বাড়ানো হবে ১০ মিটার পর্যন্ত। উদ্ধার করা হবে দেড় শত বর্গকিলোমিটার জমি। তৈরি হবে ২০৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ, নির্মিত হবে স্যাটেলাইট শহর, রাস্তাঘাট, হোটেল-মোটেল, কৃষিজমি, এমনকি থাকবে কোস্ট গার্ড ও সেনা ক্যাম্পও। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সে দেশের অন্তর্বর্তী সরকার দৃশ্যত তিস্তা প্রকল্পে চিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার পথেই এগোচ্ছে। চিনা প্রতিনিধিদল ইতিমধ্যেই তিস্তাপাড়ের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছে, মতবিনিময় করেছে নদীপাড়ের মানুষ, রাজনৈতিক দল, এমনকি বিভিন্ন আন্দোলনকারীদের সঙ্গেও। একের পর এক চিঠি চালাচালি চলছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, জলসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং চিনা দূতাবাসের মধ্যে। অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ জানিয়েছেন, দু-পক্ষই একমত, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিক খরচ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চিনও আগ্রহী, কাজ শুরু হওয়া এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।
তবে তিস্তা এখন আর শুধু বাংলাদেশ-ভারত-চিনের ইস্যু নয়। বরং এ নদী হয়ে উঠেছ গভীর ভূরাজনৈতিকতার প্রতীক। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং ১২টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত ইন্দো-প্যাসিফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক-এ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে যখন তৎপরতা চলছে, তখন চিন চায় বাংলাদেশকে তার প্রস্তাবিত ফোরামে নিতে, যেখানে রয়েছে পাকিস্তানও। আর এমন সময়েই চিন বাংলাদেশে বিনিয়োগের হাত আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। তিস্তা প্রকল্পের বাইরে বাংলাদেশে ব্যাপক বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বেইজিং। মোংলা বন্দরের আধুনিকীকরণে ৪০০ মিলিয়ন ডলার, চিনা শিল্প অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার, কারিগরি সহায়তায় আরও ১৫০ মিলিয়ন ডলার, টেক্সটাইল, ওষুধ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ, সব মিলিয়ে বাংলাদেশে চিনের প্রতিশ্রুত বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। চিন উৎসাহ দিচ্ছে, উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলিকে বাংলাদেশে স্থানান্তরের জন্য, যাতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার এক উদীয়মান শিল্প কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এই আর্থিক মধুচন্দ্রিমা আরো গভীর হয়েছে জলবিদ্যুৎ নিয়ে চুক্তির মাধ্যমে। বেইজিং ও ঢাকা সম্প্রতি একটি চুক্তিতে সই করেছে, যেখানে দুই দেশ যমুনা বা ইয়ারলুং জাংবো নদীর উপর তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে বন্যা ব্যবস্থাপনা উন্নত করবে। চিনের এ উদ্যোগই সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে ভারতকে। কারণ চিন একদিকে যেমন ব্রহ্মপুত্রে বিশাল বাঁধ নির্মাণ করছে, সেখানে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রকল্পে সহায়তা করছে। ‘জলযুদ্ধ’-এর বিশাল আয়োজনের আশঙ্কা করছেন কূটনীতিকরা।
বাংলাদেশের ক্ষমতার পটপরিবর্তনের আগে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিনের আগ্রহ সত্ত্বেও স্পষ্ট বলেছিলেন, ‘আমি চাই ভারত প্রকল্পটি করুক।’ ভারত করলে দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও মিলবে, এমনটাই ছিল তাঁর যুক্তি। কিন্তু আওয়ামী লীগের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার আর সেই সংবেদনশীল ভারসাম্য রাখছে না। এখন দৃশ্যত চিনের প্রতিই বেশি ঝুঁকছে ঢাকা। ভারতের জন্য এ এক চরম কূটনৈতিক ধাক্কা। সিলিগুড়ি করিডরের ঠিক নিচে, যেখানে ভারতের নিরাপত্তা ক্ষেত্রের সবচেয়ে স্পর্শকাতর এলাকা, সে এলাকাতেই চিনা অর্থায়নে বিশাল মেগা প্রকল্প দিল্লির ঘুম কাড়ছে। ভারতের অবস্থান পরিষ্কার, তারা চায় না, তিস্তার মতো স্পর্শকাতর নদীঘেঁষা এলাকায় চিনের সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকুক।
❤ Support Us








