Advertisement
  • খাস-কলম
  • জুলাই ২৮, ২০২৩

বার্বির কাল-যাত্রা

বার্বির ইতিহাস ক্রমান্বয়িক অস্থিরতার কথা বলে। বিতর্ককে সঙ্গে নিয়ে গত সাড়ে  ছয় দশক ধরে তার অন্তহীন যাত্রা

সাগ্নিক দাস
বার্বির কাল-যাত্রা

আকর্ষণীয় পুতুল হিসাবে জনপ্রিয়তা তো ছিলই, এবার পরিচালক গ্রেটা গারউইগের হাত ধরে ছবির দুনিয়াতেও পা রেখেছে ‘বার্বি’। আর শুরুতেই তার নজরকাড়া সাফল্য । মুক্তির মাত্র কয়েকদিনেই ১৫৫ কোটি মার্কিন ডলারের ব্যবসা করে নিয়েছে সে। সবাই বেশ উচ্ছ্বসিত ছবি নিয়ে। নেট দুনিয়াতেও রীতিমতো তোলপাড় চলছে বার্বিকে নিয়ে। কেউ বলছেন অবিশ্বাস্য ! আবার কেউ বলছেন পোষাক ও প্রোডাকশন ডিজাইন এত নিঁখুত কাজ করেছে যা দর্শকদের এই অনুভূতি দিয়েছে যে, এরা সত্যিকারের বার্বি।

বার্বিল্যাণ্ডে সবটাই পিকচার পারফেক্ট। এক অদ্ভুত কল্পরাজ্য। যেখানে মেয়েরাই তাঁদের মতো করে চলার পথ বেছে নেন, নিজের ইচ্ছায় ও শর্তে বাঁচেন। এহেন বার্বিকে নিয়ে অনুরাগীদের আগ্রহ ছিল বরাবরই তুঙ্গে। পঞ্চাশের দশকে প্রস্তুতকারী সংস্থা ম্যাটেল যখন তাঁদের নতুন পুতুল বাজারে নিয়ে আসে সে সময় থেকে বিতর্ক ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। তখন বাজারে যেসমস্ত পুতুল ছিল তার থেকে বার্বি পোষাক ও সজ্জায় ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। আর এই স্বাতন্ত্র্যকে বরাবর বজায় রাখতে গিয়ে একাধিকবার সমস্যায় পড়তে হয়েছে ম্যাটেলের কর্মকর্তাদের। যেমন- সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময় তাঁরা নিয়ে আসেন বার্বিরই ছোট্ট বোন ‘স্কিপার’-কে। যে বাম হাত কে ঘড়ির বাঁ দিকে ঘোরালে ছোট্ট শিশু থেকে কিশোরীতে পরিণত হয়। এ নিয়ে সে সময় প্রবল আলোড়ন তৈরি হয়। সংবাদপত্র থেকে বিভিন্ন সাময়িকীতে বিস্তর সমালোচনার পর শেষ পর্যন্ত দু বছরের মধ্যেই বাজার থেকে বিদায় নেয় অভিনব পুতুলটি।

পরবর্তীকালে উদারীকরণ ও এক মেরুকৃত বিশ্বে বার্বি ধরা দিতে লাগল নতুন নতুন রূপে। ১৯৯২ সালেই বাজারে এল ‘টিন টক বার্বি’। যে তাঁর যান্ত্রিক কণ্ঠস্বরের সাহায্যে কেবলমাত্র চারটি বাক্য বলতে পারে, যার মধ্যে যে দুটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি হইচই হয়েছিল তা হল, লেটস প্ল্যান আওয়ার ড্রিম ওয়েডিং ও ম্যাথ ক্লাস ইজ টাফ। নারীবাদী শিক্ষাবিদরা এ নিয়ে প্রবল আপত্তি জানিয়েছিলেন, যে পুতুলটি বাচ্চাদের কাছে এত গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে তার মাধ্যমে ভুল বার্তা পাঠানো হচ্ছে বলে দাবি করেন তাঁরা। কতগুলো চিরাচরিত ধারণা, যেমন মেয়েদের কেবলমাত্র বিয়ে বা তার জন্য দোকান বাজার করা অথবা গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষা তাদের জন্য নয় ইত্যাদি ভাবনাকে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে এমন পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। যাই হোক, কয়েকমাস পর তার সংশোধিত রূপ বাজারে এনে বিতর্কিত বাক্যগুলোকে বাতিল করে দেয় ম্যাটেল। যদিও তাতে বিতর্ক পিছু ছাড়ল না। পরের বছরই ইয়াররিং ম্যাজিক কেন নামে বার্বির বয়ফ্রেন্ডকে সামনে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু নারী-পুরুষের প্রচলিত রূপের ধ্যান ধারণার বিরোধী বলে এটি কদিন পর বিদায় নেয়।

নতুন শতাব্দীতে আবার নতুন চমক নিয়ে হাজির হয় ম্যাটেল পরিবার। ২০০২ সালে বার্বি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যুক্ত হয় আরো একজন। সে হল পুতুলটির পুরনো এক বন্ধু মিজ্‌। দেখানো হয় যে এটি গর্ভবতী। কিন্তু একজন কিশোরী কী করে এত অল্প বয়সে মা হতে পারে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে। কেউ কেউ বলতে শুরু করেন অল্প বয়সে মাতৃত্বলাভকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে নতুন সংস্করণটির মধ্যে দিয়ে। বিষয়টি নিয়ে তখন চারদিকে এত হইচই শুরু হওয়ায় ওয়ালমার্ট তাঁদের শো রুমের তাক থেকে মিজ-কে বিদায় জানায়। ম্যাটেল-ও এই নতুন সংস্করণের উৎপাদন বন্ধ করে। পরে ২০০৭ ও ২০০৯ সালেও পুতুলটির নতুন ধাঁচে আনা হলেও তা সে ভাবে জনপ্রিয়তা পায়নি। ২০১০ সালে বার্বির নতুন রূপে ফিরে আসে। যেখানে দেখা যায়,’ভিডিও বার্বি’-কে। কিন্তু শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কয়েক বছরের মধ্যেই তা বিদায় নেয়।

খেলার পুতুল আজ পর্দায় স্থান পেয়েছে। জনপ্রিয়তাও পাচ্ছে। কিন্তু বার্বির ইতিহাস ক্রমান্বয়িক  অস্থিরতার কথা বলে।  বিতর্ককে সঙ্গে নিয়ে গত সাড়ে  ছয় দশক ধরে টিঁকে আছে সে। তারপরেও অক্ষুণ্ণ রয়েছে ছোটোদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা।  অনেকেই আজও জানেন না বার্বির আসল বয়স কত। তা নিয়ে  কৌতূহলীদের মধ্যে প্রশ্ন তো আছেই। ম্যাটেলও তা বজায় রাখতে চায়। তাই আজও এর উত্তর কখনো প্রকাশ্যে দেয়নি।  তাই অপার রহস্য ও বিস্ময়কে সঙ্গে নিয়ে  বার্বি কালের সীমানা অতিক্রম করে  কালজয়ী হয়ে উঠেছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!