- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- এপ্রিল ২৮, ২০২৩
রাজ্যের শীর্ষস্তরের আধিকারিক নিয়োগে বাংলা ভাষার পরীক্ষা বাধ্যতামূলক । কেন্দ্রীয় চাকরির যোগ্যতা নির্ণয়েও গুরুত্ব পাচ্ছে আঞ্চলিক ভাষা
স্থানীয় দাবিদাওয়া পূরণ না নিজেদের দলীয় এজেণ্ডার বাস্তবায়নের আভাস ? প্রশ্নাতীত নয় কেন্দ্রের পদক্ষেপ
কোনো নির্দিষ্ট ভাষা মানুষের সাফল্যের জন্য একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক বহুদিনের । ঔপনিবেশক অতীতের ভার বহন করা ভারতও তার বাইরে নয়। মেকলীয় ইনফিল্ট্রেশন তত্ত্ব বা চুঁইয়ে পড়া নীতির পরিণামে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার যে বৈষম্যের ভিত রচিত হয়েছিল, ব্রিটিশ উত্তর ভারতেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ইংরাজি ভাষায় দক্ষতা না থাকার জন্য সরকারি হোক বা বেসরকারি চাকরি সবক্ষেত্রেই বঞ্চিত হয়েছে অনেক সম্ভাবনা। ইংরাজি ও হিন্দিতে প্রশ্ন থাকার কারণে অহিন্দি ও ইংরাজি কম জানা পরীক্ষার্থী পরীক্ষার প্রশ্ন বুঝতে অসুবিধায় পড়েন। তাই এক অসম প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থেকে শুরু করেন আঞ্চলিক ভাষার পরীক্ষার্থীরা। শুধু চাকরি ক্ষেত্রে নয়, একই দশা দেখা দিয়েছে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে। পড়াশোনায় মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও নিজের পছন্দের কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়ে ইংরাজিতে সড়গড় না হওয়ার কারণে সেমিষ্টারের মাঝপথে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন এমন পড়ুয়ার সংখ্যা নেহাত কম নয়। যাদবপুর-প্রেসিডেন্সির ঘটনা তার সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত।
চাকরিপ্রার্থী থেকে পড়ুয়াদের এ সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে কেন্দ্র ও রাজ্যের সরকার। একই সঙ্গে এব্যাপারে সমান আগ্রহী বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসি। সম্প্রতি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ঘোষণা করেছে, ইংরেজি, হিন্দির পাশাপাশি ১৩ টি আঞ্চলিক ভাষায় হবে সেন্ট্রাল প্যারামিলিটারি ফোর্সের কনস্টেবল (জেনারেল ডিউটি) নিয়োগের পরীক্ষা গ্রহণ করা হবে। বিজ্ঞপ্তি জারি করে বলা হয়েছে, বাংলা, অসমিয়া, গুজরাটি, মারাঠি, মালায়ালম, কন্নড়, তামিল, তেলুগু, ওড়িয়া, উর্দু, পঞ্জাবি, মণিপুরি এবং কোঙ্কনি ভাষায় প্রশ্নপত্র তৈরি করা হবে। যাতে লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী উপকৃত হবেন।কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে। আগামী বছরের ১ জানুয়ারি নতুন নিয়মে পরীক্ষা নেওয়া হবে। একই ব্যবস্থা করা হয়েছে কেন্দ্রীয় স্টাফ সিলেকশন কমিশন কমিশনের মাল্টি টাস্কিং নন টেকনিক্যালএবং কম্বাইণ্ড হায়ার সেকেণ্ডারি লেভেল এক্সামিনেশনের ক্ষেত্রে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংহ টুইট করে বিষয়টি জানিয়েছেন।
পিছিয়ে নেই রাজ্যও। গত বছরই কলেজ সার্ভিস কমিশনের অধ্যাপক নিয়োগের পরীক্ষা সেট- এ বাংলায় প্রশ্ন করা হয়েছিল। সরকারের নতুন নির্দেশ, ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষায় বাংলা ভাষায় ৩০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা থাকবে। যা দিতে বাধ্য থাকবেন সব পরীক্ষার্থীই। এখানে বলা প্রয়োজন, দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করা হচ্ছিল বাংলা না জানা সত্ত্বেও অনেকে পরীক্ষায় বসেছিলেন উত্তীর্ণ হচ্ছিলেন ও রাজ্যের বিভিন্ন প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে দায়িত্বভার সামলাছিলেন। তাতে সরকারি পরিষেবা পেতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সে সব মাথায় রেখেই নতুন সিদ্ধান্ত নিল নবান্ন ।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও কেন্দ্রের পক্ষ থেকে মাতৃভাষায় পঠন -পাঠনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ইউজিসির প্রধান এম জগদেশ কুমার সম্প্রতি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে পাঠানো এক চিঠিতে বলেছেন, পঠনপাঠনের ভাষা ইংরেজি হলেও সমস্ত আঞ্চলিক ভাষায় শিক্ষার্থীরা যাতে পরীক্ষা দিতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। জোর দিতে হবে ভালো অনুবাদ কর্মের ওপর। গত বছর ডিসেম্বরে দেশের সমস্ত কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ে আঞ্চলিক ভাষায় পঠন-পাঠন চালু করার কথা বলেছিল ইউজিসি। শিক্ষাবিদদের অনেকেই মনে করছেন, এটিই তার প্রথম ধাপ। বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় পঠন -পাঠন নিয়ে কেন্দ্রীয় সংস্থা তাঁদের উদ্যোগ জারি রেখেছে। খুব তাড়াতাড়ি হয়তো কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আঞ্চলিক ভাষায় পঠন-পাঠনের সুযোগ মিলবে।
স্বাধীনতার লড়াই চলাকালীনিই গান্ধী-নেহেরু সহ একাধিক জাতীয় নেতারা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প ধারার শিক্ষা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। শিক্ষার জাতীয়করণের উদ্দেশ্যে দেশীয় ভাষায় লেখাপড়ার ওপর জোর দিয়েছিলেন কংগ্রেস নেতৃত্ব। কিন্তু তাঁদের ভাষা নীতিতে সর্বগ্রে স্বান পেল হিন্দি ভাষা। যা ব্রিটিশ পরবর্তী ভারতে অহিন্দি জাতিগুলোর সঙ্গে সংঘাতের বীজ বপন করল। পরবর্তীকালে শ্রীমতি গান্ধির সময়কালে ত্রিভাষা সূত্র অনুসরণ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়য়। সংঘ পরিবার দীর্ঘদিন ধরে হিন্দিকে জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে । তাঁদের একীকরনের অন্যতম অঙ্গ হল তাঁদের ভাষা নীতি। বাজপেয়ী জমানা বা নরেন্দ্র মোদির প্রথম পর্বের শাসনকালে কেন্দ্রে বিষয়টি অত চর্চিত না হলেও ২০২০ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর পদক্ষেপ হিন্দি-অহিন্দি বিবাদকে আবার বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। কিছুটা পিছু হটে ইংরাজি, হিন্দির পাশাপাশি সংবিধান স্বীকৃত সমস্ত আঞ্চলিক ভাষাতে পড়াশোনা ও দাপ্তরিক কাজকর্ম চালানোর কথা বলে কেন্দ্রীয় সরকার। নয়া নির্দেশিকা যদি ভালো করে খুঁটিয়ে দেখা হয়, তাহলে সংঘ পরিবারের রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণের উদ্দেশ্য স্পষ্ট তই সামনে আসে। মনে রাখা দরকার এখনও বহু রাজ্যে বিজেপি সরকারের ভিত্ শক্ত নয়। নিজেদের দলীয় নীতিকে সরকারি ঘোষণার মুখোশে উপস্থাপনের এ কোনো নতুন ফাঁদ কিনা তা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। জনবাদী রাজনীতিতে জনমুখী দাবি পূরণের প্রবণতা সাধারনত দেশ ও রাজ্যের দুই সরকারের থাকে। সে দিল্লি হোক বা নবান্ন- ছবিটা একই।সাম্প্রতিক সরকারি সিদ্ধান্ত সেই রাজনৈতিক দর্শনের বাস্তবায়নকে প্রকট করে তুলেছে।
❤ Support Us







