Advertisement
  • গ | ল্প
  • এপ্রিল ১৫, ২০২৩

বেউমীদ

বনানী দাস
বেউমীদ

অলঙ্করণ: দেব সরকার

সে রাতে হর্ষদকে নিয়ে চলে যায় ওরা কিছু কথা জিজ্ঞাসা করার জন্য, বলে যায় পরদিন সকালেই ঘরে চলে আসবে সে।সেদিন শেষ রাতে তুমুল বৃষ্টি! ঘর বলতে তো সালমাদের কাঠের তক্তার দেওয়ালের ছোট ছোট দুটো খুপরি । একটা জ্বালানি কাঠকুটো,রান্নার জিনিস আর বিছানাপত্রে ঠাসা।তার এক পাশে কোনমতে থাকেন বড়িআম্মা, সালমার শাশুড়ি ! দু পাতা হাদিস মুখস্ত করে নিজেকে খুব জ্ঞানী জেনানা ভাবেন তিনি। সালমা তার স্কুলপাশ সার্টিফিকেট নিয়েও তাঁর নিথর চোখের কোণের ফিকফিক হাসিকে ভয় পায়।আল্লা জানে কী ভাবেন , কী বিড়বিড় করেন বড়িআম্মা !

এপাশের বড় ঘরটাতে তো এক ছেলে, দুই মেয়ে, সাদী না হওয়া ননদ সাগেরাকে নিয়ে সালমাবিবি মোটা বিছানা পেতে মাটিতেই ঘুমোয়, শুধু এককোণে রাখা চৌকিটাতে সারাদিন কাজের শেষে ঘুমোয় হর্ষদ, এ সংসারের রোজগেরে বড়ো ছেলে।আগে আব্বাসাহিব বেঁচে থাকতে ওই চৌকি ছিল তাঁর।
সেখানে নিয়ম করে জল,খাবার, তামাক পৌঁছে যেত।পুরাতন কাশ্মীরি কার্পেটশিল্পী আব্বাসাহিব বাইরের মুলুকজুড়ে খুব সম্মানের ব্যক্তি ছিলেন, ঘরেও।বড়িআম্মা তাঁর দেখভালের তিলমাত্র ত্রুটি হতে দিলে তো !

হঠাৎ সিঙ্গল-স্ট্রোকে আব্বাসাহিব আল্লার প্রিয় হয়ে শুয়ে গেলেন কবরে।সংসারে তখন থেকেই হাল ধরল হর্ষদ।হর্ষদ আলি শেখ। ছোটবেলায় খুব হাসিখুশি সদা প্রফুল্ল বড়ো ছেলেকে দেখে এই হর্ষদ শব্দটাই নাকি আব্বাসাহিবের মগজে ঘুরত ফিরত।জান- পয়চান লোগ বলত,
— হর্ষদ ! এ তো আরবি, ফার্সি শব্দ নয় ভাইয়া !
ভাই ভাতিজাদের এই কথা শুনে আব্বাসাহিব নাকি বলতেন,
— হোক বা নাহোক, এই শব্দ আমার কলজেতে খুশবু ছড়াচ্ছে। হর্ষদ একটা হিন্দি শব্দ যার মানে যে খুশী করে ও খুশী হয় ! আমার বেটার নাম ওই রাখব !
অন্য দুই ভাই অনেক আগেই নিজের নিজের পরিবার নিয়ে আলাদা হয়ে গেলেও হর্ষদ কিন্তু সত্যিই হাসমুখ এক কার্পেটশিল্পীর কাজ যত্নে
শিখেছে আব্বাসাহিবের কাছে। তাই এ সংসার ডুবে যায়নি, তবে ওই মহাজনি দাপট যেমন আব্বাসাহিবের আমলেও গরিবীর খোসার বাইরে বেরোতে দেয়নি এই কাশ্মীরী পরিবারকে, এখনও তাই।তাই অজগরের মতো এক শ্রমের পেষণ তো সারাদিনই ঘিরে রেখেছে স্বামীকে, সালমা তা বেশ বোঝে।কিইবা বয়স হর্ষদের !
বছর সাতাশ ! আর সালমার চব্বিশ!সকালে কোন কোনদিন কাহওয়া বা শের চায়ে চুমুক দিতে দিতে যখন আড়চোখে সালমার দিকে নজর দেয়, সারাদিনের হাজার কাজের মাঝেও এই নজরতীর বিঁধে থাকে সালমাকে।রাত গভীর হলে পাশের কুঠুরিতে বড়িআম্মা আর মেঝেতে সাগেরার নাকডাকা শুরু হলেই সে অবিকল বরফরাজ্যের এক পেঙ্গুইনের মতো টলতে টলতে উঠে পড়ে হর্ষদের চৌকিতে।সকালের ছুঁড়ে দেওয়া তীরের বিষক্ষয় না হওয়া পর্যন্ত তারা থামেনা।হর্ষদ তার খুবই রূপবান, দিলদরাজ, আল্লাকে লাখ লাখ ধন্যবাদ দিয়েও সালমা শেষ করতে পারে না।

তার দিল নিংড়ে বলা এইসব কথা শুধু শোনে ডলি।ডলি রহমান ।তার একমাত্র সহেলি , দেওয়ালের কাঠের ফাঁক দিয়ে পাশের কুঠুরিতে
বাস করা ডলির সাথে কত্ত কথা থাকে। এ গুলাবীবস্তিতে এরকমই গায়ে গায়ে থাকার রেওয়াজ। তা সারাদিনই ঘুরে ফিরে ডলির সঙ্গে দেখা হয় তার।বাইরে সাফসাফাই, ঘোড়াকে দানা দেওয়া, বর্তন ধোওয়া, ছোটমোটো কেনাকাটা সবকাজেই দুজনে শলাপরামর্শ করে তারা।আবার কাজের শেষে ছেলে মেয়েদের ছেঁড়া জামাকাপড় নিয়ে সিলাতে ঘরে বসলেও কাঠের তক্তার ফাঁক দিয়ে একে অন্যকে দেখা হয়,কথা হয়।কত মুলুকের গল্প জানে ডলিবিবি, এ বস্তিতে সেই একমাত্র ‘গেরাজুয়েট’ বলে তার কথাবার্তাও কিছু আজীব লাগে সালমার।কিন্তু ফেলতে পারে না। যেমন ডলি গুনগুন করে বলে,
— এ জমানা মর্দোকি! তারা বুঝি সবসময় সেবা নেবে! সেবা দেবেনা কাউকে!
এরকম উৎপটাং কথা শুনে সত্যি রাগ হয় সালমার! আরে জমানা কি কারো হয় ! সে তো সবার! মর্দ,অওরৎ সবার।যার যেমন কাজ,তার
সেটাই! কেন কেন করে শুধু এই গেরাজুয়েট লেরকা লেড়কি গুলো উচ্ছন্নে গেল !

•২•

তা সেদিন বেদম বৃষ্টির রাতে দরজায় আওয়াজ শুনে কম্বল থেকে বেরিয়ে চাপকান গায়ে জড়িয়ে একবার তাকাল সে অবশ পড়ে থাকা সালমার দিকে। তার রাজকুমার হর্ষদ আলি ! তারপর চলে গেল দরজা খুলতে। রাতবিরেতে জেনানা কেন খুলবে দরজা। কথাও সেই বলল।কৌতূহল ও জিজ্ঞাসা নিয়ে পাঁচ খানা প্রাণী ঘরে স্থির, ফটো থেকে বাবাসাহিবও।
কি যেন কথা হল সব সেনাদের সঙ্গে খুব ভদ্র সভ্য স্বরে।হর্ষদ ঘরে ফিরে এল, সালমাকে একটু চোখ নাচিয়ে গেল পাশে মায়ের ঘরে। নীচু হয়ে পায়ের ধুলো নেয়।মায়ের উৎকন্ঠায় শুধু একটাই কথা বলে সে,
— এ তল্লাটের হালহকিকত জানতে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে একদুঘন্টার জন্য। বাড়ি পৌঁছে দেবে কালই। এসে সকালে নাস্তা করব।
ছোট মেয়েটার মাথায় ছোঁওয়া দিয়ে গাড়ির হর্ণের মধ্যে গিয়ে বসে হর্ষদ।ততক্ষণে দোপাট্টা দিয়ে সারা শরীর ঢেকে সালমাও দরজার আড়াল থেকে প্রাণপণ হাত নেড়ে দেয়।শরীরের ওমে তখনও সে পেঙ্গুইন হয়ে আছে।

•৩•

হর্ষদের প্রিয় নাস্তা বাকরখানিই বানায় পরদিন তার আদরের সালমাবিবি। সে ছেলে, মেয়ে, ননদ সবাইকে খাইয়ে ঘোড়াদুটোকে চানা দেয়।শাশুড়ি কেমন থম ধরে আছেন কালরাত থেকে। বহু পিড়াপিড়ি তে এককাপ মাত্র কাহওয়া চা পান করেছেন। মুখ তুলছেন না।এই তো জ্বালা! ওঁকে বোঝে কারও সাধ্য নেই।মাঝে ডলি একবার সকাল সাড়ে আটটায় জিজ্ঞেস করেছে রঙ্গময় চোখে,
— তিনি কোথায় !
কোন উত্তর না দিয়ে আরোশ পারোশ কাজে মন দেয় সালমা।নাস্তা ঢাকা রেখে। হর্ষদ ফিরলে এক সাথে খাবে।
হঠাৎ ঘড়িতে চোখ পড়ে, বারটা ! এখনো তো ফিরল না সে ! তিনঘণ্টা হয়ে গেল ! বড়ো ছেলেটা একটু আগেই কার্পেটের কারখানাঘরে গিয়ে বলে এসেছে, আজ আব্বুর দেরী হবে !
কিন্তু কোথায় কি ! তিন ঘন্টার পর শাশুড়ির থম ভাব সালমার ওপর বর্তায়।তার পর যখন তিন দিনের মধ্যে হর্ষদের ছায়া এ বাড়ির দরজা দ্যাখে না,আত্মীয় বাড়ি, বন্ধুর বাড়ি সব খোঁজ নেওয়া শেষ তখন সালমা বড়িআম্মার তক্তার নীচে কেঁদে পড়ে।তাঁর কথাতেই চলে থানায়। সঙ্গে ডলি আর পাশের বাড়ির রফিক আজাদ।হর্ষদের ফুফাতো ভাই।
কারা হর্ষদকে নিয়ে গেছে সেটা বোঝাতেই ঘাম ছুটে গেল ডলি, সালমার।যেহেতু বর্ষার কালো রাতে কাউকেই দেখেনি তারা।তবে সেনারা নিয়ে গেছে এই বার্তা তারা দিতেই পারল।বলতেই বিপত্তি, এভাবে আন্দাজে এফআইআর নেবেই না থানা।বহু কাকুতি মিনতি করেও কিছু লাভ হলো না।শুধু ডলির খুব বিনীত প্রার্থনায় দুটি সম্ভাবনা জেনে ফিরল ওরা, এক. হয়ত কোন থানায় আটক রাখা আছে হর্ষদকে তদন্তের প্রয়োজনে দুই. ওকে কেউ ধরে নি, নিজেই শত্রুদেশে পাড়ি দিয়েছে ট্রেনিং নিয়ে উগ্রবাদী হতে।
এত আজব ও আশ্চর্য কথা শুনে নির্বাক হয়ে যায় সালমা।এ বাড়ির পাঁচটি মানুষের জন্য দিনরাত খাটতে হয় যাকে সে কিনা…! ডলি আর রফিক তাকে ধরে নিয়ে আসে বাড়িতে।সেখানে তখন অধীরা বড়িআম্মা!তাঁকে বলার মতো কিছু নেই। এই দুর্দিনে তিনিই ভারী কোমর নিয়ে বাড়ির রান্না ও নাতি নাতনি ও ঘোড়াদের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।ডলির মুখে খানিক শুনে তিনি শুধু বললেন, উমীদ রাখ্খো!
খুলে বসলেন তাঁর হাদিস !

মাসখানেক পরে রিয়াজকে নিয়ে এল রফিক, মানে রিয়াজুদ্দিন।এইসব বিষয়ে নাকি তার বিস্তর জানাশোনা ! নামটা শুনেই সালমার মনে পড়ে গেল পুরনো কথা।
একটা পরিপক্ব চাউনি নিয়ে আজকের এই বছর আঠাশের কাশ্মীরী তরুণ এককালে হর্ষদকে হিংসা করত লেখাপড়ায় ভালো ছিল বলে। পরে সংসারের চাপে হর্ষদকে পড়ালিখা ছাড়তে বাধ্য হলে সে বিলক্ষণ খুশি হয়। তবু ডাকাডাকি করতে হোল সেই রিয়াজকে কারণ সে নাকি এইরকম কেসের ঘাঁতঘোত জানে।রিয়াজ এসে এই বেহাল,বেকাবু সংসারে ফিসফিস করে হুঙ্কার দিল,
— কি চান আপনারা বড়িআম্মা জিন্দা হর্ষদভাইয়া নাকি রুপিয়া।
কথা শুনে এ বাড়ির কারও বাক্য সরেনা,ডলি ফিসফিস করেই বলল, এফআইআরও তো করা গেল না ভাইয়া।
— হবেনা।এমনিতে হবেনা এফআইআর,পয়সা লাগবে।
সত্যি পয়সা যা ছিল ঝেড়েঝুড়ে দিয়ে হলো এফআইআর। লিখিত ভাবে সত্যি সেই মানুষটা নেই জানাতে সালমার বুক ফেটে যাচ্ছিল।রিয়াজ বলল আরও কিছু টাকা দিলে মামলাও করা যেত সেনাদের বিরুদ্ধে।
ডলি মুখ শক্ত করে বলল,আইন আছে নানারঙা সেনাদের বাঁচাতে। আমরা কোন ছার! মামলা করে হবে কি ! তাছাড়া মামলা টানবে কে !
সালমা শুধু চাইছিল রিয়াজুদ্দিনের ধূর্ত চোখদুটো সরে যাক এ বাড়ির থেকে। তবে তার একটা কথা মনে ধরল সালমার,
— ভাবিজি আমাকে যাই ভাবুন, একবার থানা আর সেনাছাউনিতে খোঁজ নিন।ওখানে তো ক্যাম্প করে অনেককে আটকে রাখা হয় !

ডলিকে সেই কথা বলতেই বিড়বিড় করে বলতে লাগলো, ওসব আবার কেমন ক্যাম্প ! আমরা তো ডিটেনশন ক্যাম্প জানি। সেই কি এই !
রফিকের বয়স কম,মনটাও বড় নরম। চোখ বড় করে বলল,ডলি ভাবী, নিজের সহেলিকে ভীত করবেন না।
ডলি হেসে বলল,না রে সালমা, তুই ঘাবড়াস না !
সালমা দাঁত চেপে বলল,
— আমি তো হিটলারের ক্যাম্পে আছি রে সহেলি।
দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার। কোথায় গেল ঘরের লোকটা ! কেন নিয়ে গেল, কিচ্ছু বুঝতে পারছি না ! তার উপর আজ তিন দিন হলো হর্ষদের দিল্লিওয়ালি চাচি কুলসুম এসেছে। সে বলেছে,অওরতের তকদিরেই লেখা থাকে আদমির দুঃখ সুখ ! আমার কপালদোষেই হয়েছে সব কিছু !
— তুই একটু বেশিই রিঅ্যাক্ট করছিস সালমা…
এইসব বাজে কথা বাদ দে তো !
বেশী বাড়িয়ে ভাবার জন্য একপ্রস্ত সালমাকে বকাঝকা করে ডলি!সালমা সকাল থেকে কাজ সেড়ে ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠিয়ে ডলি আর রিয়াজুদ্দিনের সাথে থানায় যায়। কিন্তু কোন লাভ হয় না।থানা সোজাসুজি বলে দেয়,
— এখানে যদি আপনাদের লোক থাকেও তার খোঁজ দেওয়া যাবে না।জানানোও সম্ভব নয় সে এখানে আছে কি না।
— কিন্তু কেন ! ওর অপরাধ কি!
না এই কথাটুকু ছাড়া আর কিছু বলতে পারে না দুই সহেলি। চিন্তা বা উৎকন্ঠার শক্তিও ক্রমে হারিয়ে ফেলছে সালমা।

বিরস মুখে এর দুদিন বাদে দূর শহরের প্রান্তে সেনাছাউনিতে যায় তারা।সেখানে ঢুকতেও যেন পা সরছিল না সালমার।বার বার আশাহত হওয়া যে কি পাথর হয়ে বুকে চেপে বসে তা কাউকে কি বোঝানো যাবে ! সেনাছাউনির বাইরে বটগাছের বাঁধানো ছায়ায় বসে পড়ে সে হেলান দিয়ে। ডলিকে বলে,
— একবার গিয়ে দ্যাখ্ ! আমি আর পারছি না !
ডলি রিয়াজুদ্দিনকে নিয়ে ভেতরে গেলে সালমা অনেকক্ষণ অবশের মতো বসে থাকে।একটা শীতল প্রতীক্ষা তার মনকে স্থবির করে, চোখ বুজে আসে।
হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়।সালমা বিব্রতভাবে চোখটা খুলে দেখে একজন তরুণ জওয়ান সরু চোখে দেখছে তাকে।মুখে মৃদু হাসি।তাড়াতাড়ি মাথার হিজাব ঠিক করে সালমা।তারপর খুব কোমল স্বরে বলে,
— আমার একটা কথা রাখবেন ভাই! আমার স্বামী এখানে আছে কি না জেনে দেবেন একটু !
ছেলেটি বেশ একটু আগ্রহ নিয়েই জিজ্ঞেস করে সবকিছু।এত সরল ও স্নেহশীল দেখতে তাকে যে একই বয়সী হলেও বেশ একটা ভাই ভাই ভাব দেখতে পায় সালমা ! রিফু ( জওয়ানের নাম) বলে এই বিশাল সেনাছাউনির পিছনের ক্যাম্পে আটকে রাখা মানুষদের লিস্ট শুধু দু একজনই জানে।যদি সালমা সত্যি জানতে চায় তবে তাকে বেহাগবস্তীর পাশে আলাউলের চা নাস্তার দোকানে কাল একটু আসতে হবে সকাল আটটায়।কথাটা একটু গোপন রাখতে হবে যদিও। সালমা একটু ভয় পেলেও রাজি হয়।আলাউলের দোকানের পাশে তো হরবখত যায় সে।কখনো সিমাই কিনতে,কখনো রেশমি সুতো বা কুরুশ-কাঁটা কিনতে।তাছাড়া চারদিকে তো ভরাট বাজার। কি আর করবে ওখানে !
ডলি আর রিয়াজুদ্দিন বেরিয়ে এসে জানায়,
— এরা কিচ্ছু জানেনা।হর্ষদের নামও শোনেনি বলল !
রিয়াজুদ্দিন এর মাঝে বলে, এ জমানায় সবই
পয়সায় চলে। যদি সে ব্যবস্থা করা যায়…
সালমা শুধু মাথা নেড়ে নিজের দুর্ভাগ্যকে ধিক্কার দেয়।এবার তার সত্যি পয়সা নেই।ঘরের মানুষগুলোর পেট ভরাতে সব শেষ।তিনজনে চলে আসে। পিছন ফিরে একবার শুধু রিফু ভাইয়ার দিকে কাতর দৃষ্টি দিয়ে সালমা ঘরে ফেরে।

•৪•

প্রায় তিন মাস হতে চলল।সালমা একটা, শাল কারখানাতে কাজ নিয়েছে। ছেলে মেয়ে দুটোকে স্কুল ছাড়িয়ে হর্ষদের মালিকের কার্পেট কারখানায় দিতে বলেছিল চাচি কুলসুম। সালমা কোন উত্তর না দিয়ে ওদের নিয়ে কাছের সরকারি মক্তবে দিয়ে দিয়েছে। জান থাকতে পড়ালিখা বন্ধ নয়!
বড়িআম্মা আজকাল সালমা কাজে যাবার পর অনেকটা সামাল দেন,তার পর স্নান টান করে দুপুর পর্যন্ত চলে তার হাদিস কোরান পাঠ।কুলসুম একটা কুটোও ভাঙেনা শুধু চেঁচামেচি করে একটা ঝাঁটা হাতে বাড়ির এদিক ওদিক ঝাঁট দিয়ে বেড়ায় আর সবাইকে জানান দেয় সে অসময়ে এসে এদের খুব সুরাহা করছে, ওদিকে তার নিজের দিল্লির সংসার ভেসে যায়।
তাকে ভয় করে ভালোমানুষ রফিকও।শুধু ডলি সময় বুঝে তাকে বেদম জব্দ করে কড়া কথায় !

আধবেলা কারখানায় ছুটি নিয়ে আল্লার নাম নিয়ে সালমা আজ বাজারের মধ্যে আলাউলের দোকানটা চিনতে পারে। বেশ ভীড় দোকানে,আর
সেসব কাটিয়ে নীচু গলায় লম্বা দাড়িঅলা আলাউল চাচাকে রিফুর কথা বলে সালমা।
— রিফু ভাইয়া আপনার কাছে পাঠালো চাচা !
মশলার থুথু একটা তামার ডিব্বায় ফেলে আলাউল বলে,
— ও তুমিই সেই আধা-বেওয়া!আচ্ছা দাঁড়াও…
বুকের মধ্যে ধরাস করে ওঠে। সে তবে বেওয়া!
অর্ধেক বিধবা !এই তার নাম ! তবে কি হর্ষদ আর
কোন দিন ফিরবে না !
— নাও।এই নম্বরটাতে অবসর মতো ফোন কোর !

বাজার থেকে বেরোতে মশলাগলিতে ডলি নামে পাশে সাইকেল নিয়ে। সহেলিকে না বলে তো এ তল্লাটে আসেনি সালমা।দূর দিয়ে তাকে অনুসরণ করে চলে এসেছে ডলি।সালমার ব্যথার্ত চোখ মুখ দেখে তুলে নেয় সাইকেলের পিছনে। নিঃশব্দে সাইকেল চালাতে চালাতে বোঝে সালমা কাঁদছে অঝোরে। তার অশ্রুতে ভিজে উঠছে ডলির বোরখার পিঠ।

বাড়ির ঝক্কি সামলিয়ে, ছেলে, মেয়ে,সাগেরাকে শুইয়ে দিয়ে পাশের কামড়ায় বড়ি আম্মাকে বলে সালমা ডলির ঘরে যায়। পিছন থেকে কুলসুম বদবদ করতে থাকে, ঘরের অওরত ঘরেই শোভা পায়।এত রাতে আবার সহেলি কি!
ফোনটা ডলিই করে। ওর স্বামী বরকত ও ছেলে পাশের ঘরটায় ঘুমিয়ে কাদা !
বেশ ক’বারের চেষ্টায় ফোন লাগে। ঘুম বা নেশার মধ্য থেকে পুরুষকন্ঠ সাড়া দেয়।স্পিকার চালিয়ে সালমাকে ফোন দেয় ডলি।সালমা যতটা
সম্ভব তার সংসারের হাল বর্ণনা করে যদি তার স্বামীর খোঁজ কিছু দিতে পারেন অন্য পাশের কন্ঠ, সে কথাই বলে।
গলা খাকারি দিয়ে পুরুষকন্ঠ বলে,
— তোমার দুরাবস্থার কথা জেনে সত্যি খুব খারাপ লাগলো বহেন ! তোমার স্বামীকে খুঁজে দেওয়ার জন্য এই ভাই খুব চেষ্টা করবে।তবে এখন সংসার বাঁচানো, ছেলেমেয়ে বাঁচানোর একটা উপায় আছে, আমার হাতে ভালো পার্টি আছে, সপ্তাহে একদিন করে গেলেই মোটা টাকা বাঁধা।
দেব নম্বর পার্টির !
কথার আকস্মিকতায় দুজনেই কি করবে বুঝতে পারে না।ডলি চটপট স্পিকার অফ করে, তখনো সেই কন্ঠটি ভারী স্নেহশীল ভাবে বুঝিয়ে যাচ্ছে এটা এখন কোন ব্যাপার নয়,কেউ জানতেও পারবে না,লেখাপড়া,চিকিৎসা,খাওয়া দাওয়া… ইত্যাদি ইত্যাদি ডলি অফ করে দেয় ফোনটা।সালমার খুব গলা শুকিয়ে যায়। ডলি জল খাওয়ায় ওকে।মাথায় হাত বুলিয়ে ঘরে ছেড়ে আসে, বলে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়তে।

•৫•

সেদিন সন্ধ্যার আঁধারে শাল কারখানা থেকে কাজ সেরে ফিরতে ফিরতে সালমা তাদের ঘরের দাওয়ায় খুব হাসি হুল্লোড় শুনতে পায়।কাছে এলে দেখে কুলসুম চাচী মোটা শরীরটা নিয়ে বসে বসে পান খাচ্ছে আর রিয়াজুদ্দিন খুব চকচকে একটা কামিজ পরে এসে তার সঙ্গে নানান রঙ্গ রসিকতায় ব্যস্ত।সালমা আসতেই রিয়াজ কাছে এসে বলে,
— সবসময় এমন মুখ গোমড়া কেন ভাবি !
সালমা মুখ বাড়িয়ে দেখল বড়িআম্মার চিহ্ন নেই, একটু পরেই অবশ্য খোঁড়াতে খোঁড়াতে তিনি ফিরে এলেন।মুখে খুবই ধোঁয়াশা। এত কস্ট হয় এখন বড়িআম্মাকে দেখলে আগেকার মতো আর রাগ হয় না সালমার তাঁর হাদিস খুলে শান্ত ভাবে বসা দেখলে।মনে হয় তার যদি এমন একটু কোন আশ্রয় থাকত !
রিয়াজুদ্দিন বেসুরো আবহাওয়া দেখে ভেগে গেল। ছেলেরা,ননদ ঘুমোলে বড়িআম্মা সালমাকে ডেকে নিলেন। বললেন,
— আজ ছ’মাস হয়ে গেল বহু।আমার বেটা নিপাত্তা।তুমি তো সাধ্যমতো কাজ করছ।কিন্তু আমাকে তো শেষ সোনার কঙ্গনটাও বাঁধা দিতে হলো।তার মধ্যে ঘরে অবিবাহিতা মেয়ে।মেহমান কুলসুম! যদি তোমার আব্বুর কাছে ক’দিন থেকে আস…
সালমার জিভ যেন ভিতর দিকে টেনে ধরে। আব্বু এখন একদম অথর্ব। কোন কাজ করতে পারেনা।তিন দাদার সংসারে আব্বু, আম্মি কোনমতে থাকে। এর মাঝে ছেলেমেয়ে নিয়ে সে!বড়িআম্মার পায়ের কাছে বসে পায়ে হাত বুলিয়ে বলে,
— কোথায় যাব আম্মা ! জায়গা থাকলে তো!রিয়াজুদ্দিন বলছিল গরমিন্ট থেকে সাহায্য দেয় আমাদের মতো অওরতকে!
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বড়িআম্মা বহুর মাথায় আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে বলেন,
— দ্যাখো কি হয়!

ডলি রিয়াজুদ্দিনের সাথে সালমার যাওয়া একেবারে পছন্দ করে না।তার মনে হয় রিয়াজ অনেক কিছু জেনেই তাকে বিপদে ফেলে। যেদিন আলাউলের দোকানে যায় সালমা সেদিনও নাকি রিয়াজ সাইকেল নিয়ে ফলো করেছে। এদের দূর্দশায় সে উৎফুল্ল। সালমার এত কথা বিশ্বাস হয় না।নিজের ঘরে সুন্দরী বহু আছে রিয়াজের, কেন সে খামোখা তার মতো দুই বাচ্চার মায়ের পিছু নেবে !
সরকারি দপ্তরেও ডলি সঙ্গে যায়।সেখানে বড় লাইনের শেষে ডলি সালমার কাগজপত্র দেখায়।
পাশ থেকে রিয়াজুদ্দিন বলে,
— এর স্বামী তো নিরুদ্দেশ। থানায় এফআইআর করা আছে ! বছর খানেক তো হবেই।
সরকারি অফিসার ঠান্ডা গলায় বলেন,
— উনি পুরা বিধবা হলে আমাদের মাসিক সাহায্য দেবার বিধি আছে। কিন্তু আধা-বেওয়া! না না সেটা আইনের আওতায় পড়ে না।
ফিরে আসার সময় ডলি খামোখা ঝগড়া করে রিয়াজুদ্দিনের সাথে।
— তোর আগ বাড়িয়ে নিরুদ্দেশ বলার কি ছিল !
রিয়াজ বোঝাতে চায় ওরা জানতই।সালমা কান্না মাখা গলায় ডলিকে বলে,
— তা নাহলে তুই তো তোর হর্ষদ ভাইয়াকে মেরেই ফেলতিস,তাই না রে ডলি ! আমি পুরা বেওয়া হলে তো চুকেই যেত !
ডলি খুব কষ্ট পায় সহেলির নিষ্ঠুর কথায়। ফিরে আসার পর বড়িআম্মাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। চুপ আর শান্ত মানুষটিকে এসব বলা যায়!
কুলসুমকে কে এতসব রিপোর্ট করে জানা নেই। হয়ত রিয়াজই।সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফিরে সালমা শোনে কুলসুম বড়িআম্মার পাশে বসে জ্ঞানীর মতো বলছে,
— ওসব সাহায্য পেয়েই কি বহুরাণির দিন ফিরবে দিদি, মুসলিম আইন অনুযায়ী বেওয়ারিশ লোকের জন্য যে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায় তার আধা-বেওয়া পাবে তার আট ভাগের একভাগ। বাকি সব পাবে তুমি তোমার অন্য ছেলেরা !
বড়িআম্মা চাপা স্বরে ধমকান,চুপ যা,চুপ যা কুলসুম ! এত কথা বলিস !

•৬•

ডলির রাগ বেড়েই চলে। রিয়াজুদ্দিন অনেক বড়ো ক্ষতি করবে তা নিশ্চিত সে।এখন সালমা বোঝে বুদ্ধিমতী শিক্ষিত ডলি ঠিকই বলে অনেকটা। কিন্তু কিইবা করা যাবে।এ বাড়িতে হর্ষদ অদৃশ্য হয়ে যাবার পর তার যাওয়া আসা বেড়ে গেছে।
দেড় বছর কেটে যায়। মাথাটা আর কোন রকম চিন্তা করতে ভুলে গেছে সালমার।শুধু শালের কাজ করতে যাবার পথে সেনা ছাউনির পাতাঝরা পথটা দেখে তার মন হু হু করে, মনে হয় ওখানেই একটা ঘরে হর্ষদ হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে। বা হয়ত কঠিন কোন কাজ করে না খেতে পেয়ে হাঁপাচ্ছে। কেউ নেই তাকে একটু জলও দেবার। কিন্তু একটা লোক খেটেখুটে ঘর সংসার পালছে,তাকে এরকম ধরে রেখে কি লাভ দেশের মাথাদের! সালমা ভেবেই পায় না।আর রিফুর মুখটা মনে করে বমি পায়।মাঝে মাঝে মনে হয় হর্ষদ ফিরে এসে তো ছেলে মেয়ে বোন কাউকে চিনতে পারবে না। আর তার বিবিকে !

ক্রমেই সংসারটা না চলার মতো অবস্থায় চলে যায়। ঘোড়া দুটোকে বেচতে হয়।দূরে কার্পেটের বোঝাা নিয়ে যাবার কাজ তো আর নেই ! শেষক্ষণে ঘোড়িটার চোখে ঘন অশ্রু দেখেও সালমা বিদায় করে তাকে।সেদিন ছেলে মেয়ে দুটোকে একটু ঘন সুরুয়া বানিয়ে দেয়। নিজে মুখে তুলতে পারেনা,হর্ষদের কত প্রিয় !
ছেলেটা আট বছরের হলো, হর্ষদই নাম দিয়েছিল হরিৎ আলি।এখনই কতো লম্বা। সালমা হরিৎকে ডাল লেকের ধারে চায়ের দোকানে কাজে লাগায়।সকালে মক্তব থেকে এলেই হরিৎকে সে নিয়ে যায় কাজে । কোন উপায় থাকলে কি আর ছেলেটাকে রাত পর্যন্ত ‘চায়ে কি দুকান’এ যত আজে বাজে লোকের সঙ্গে রাখতে চাইত ! তবে সালমা ভেবে দেখেছে, হরিৎএর রোজগার ওর মায়ের কাছাকাছিই হয়ে গেছে। হয়ত ছেলেটার আর লেখাপড়া হবে না। এখনো তো ওর আব্বু ফিরতে পারত !
ঈদের দুদিন আগে কুলসুম আর ওর বেটি ফতেমা ভেঙে পড়া চেহারার সালমাকে আড়ালে ডাকল,
— শোন তুমি জান তো স্বামী নিরুদ্দেশ হলে বিয়ে করতে পার তুমি আবার !
— আমি কি জানতে চেয়েছি ?
— কেন চাও না! এ বাড়ির বড়ভাই আর ফিরবে না,তোমাকেও এ বাড়ি ছাড়তে হবে!
— চাচি আমি শাদী করব না! তুমি কি আমাকে জোর করে বিয়ে দেবে?
কুলসুম হেসে বলে, তোর মতো আধা বেওয়ার জন্য ধর্মের নিয়ম কি জানিস?
সালমা নির্বোধের মতো চেয়ে থাকে। চাচি বলে, হানাফি মতে স্বামী অদৃশ্য হবার নব্বই বছর পরে একজন মহিলা শাদী করতে পারে। অবশ্য মালিকি ধারণায় সাতবছরই যথেষ্ট।
— তোমাকে অত জ্ঞান দিতে হবে না চাচি, আমি বিয়ের পথে নেই! তাছাড়া সাত বছর তো অনেক বাকি !
— সাতবছর যবে হবে হবে, তার আগেই একজনের কাছে রাণী হয়ে থাক না কেন !
— কি বলছ চাচি! তোমার কি মাথা খারাপ!
— আরে কি উমর আছে তোর!তিশ সালও হয়নি, রিয়াজুদ্দিন তো কতদিন থেকে তোর জন্য হা পিত্যেশ করে…
— তোমার মুখে পোকা পড়ুক চাচি,জ্বলে জ্বলে মর তুমি !
— এঃ অভিশাপ দিচ্ছে ! বদ অওরত ! রিয়াজকে জিইয়ে রেখে…….. সাধ্বী স্ত্রী বনছে !
— তোমাকে ঘুষ দিয়ে রেখেছে তাই না ওই হায়নাটা !
কান্না নয় দু কান দিয়ে গরম হাওয়া বেরোতে থাকে সালমার।কেন যে এই মহিলাটা গত দুবছর ধরে মাঝে মাঝেই এসে রক্তাক্ত করে দেয় তাকে!

 

•৭•

এইসব শুনে ডলি এত রাগ করে তার ইয়ত্তা নেই, হর্ষদ চলে যাবার পর সে সালমাকে গোপনে ভোজালি রাখতে বলেছিল মনে করায়। সালমা ডলিকে থামিয়ে রাখে,হরিৎটা দুটো পয়সা কামাবার আগে এ সংসার তো সহেলিই চালাতো।আর বরকত ভাই সত্যি বড় দিলের লোক!
ঈদের দিন সন্ধ্যায় বড়িআম্মা বাতি জ্বালান না।
ইতিমধ্যে গুলাববস্তির দক্ষিণ দিকের আরও একটা ছেলেকে নিয়ে গেছে সেনারা।সে অদৃশ্য হওয়ার পর তার বহুর অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। তার শাশুড়ী তাকে উদয়াস্ত গঞ্জনা দিয়ে আবার বিয়ে দিয়ে বিদায় করেছে। সেখানেও চরম নিগৃহীত ও অন্তঃসত্ত্বা মেয়েটি না পারছে পুরনো শ্বশুর বাড়ি ফিরতে, না পারছে সেখানে থাকতে। ডলি তো বলে স্টেশন, বাজার, স্কুল, কলেজ সব জায়গায় সেনারা শিকারীর মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে কখন কাকে তুলবে তার ঠিক নেই।
এই কাশ্মীরে নাকি লাখো সেনা মজুত আছে।
কেন ! কাদের দমন করতে তা ভেবে অবাক হয় সালমা !
ছেলে মেয়ে দুটো কে নিয়ে কুলসুম চাচি, সাগেরা ঈদের জুলুস দেখতে গেলে শাশুড়ী বৌয়ে চুপ করে বসেছিল বাইরে। হঠাৎ অন্ধকারে গলা খাঁকারি শুনে সালমা দেখে দুজন লোক। আলো দিলে চেনা যায় দাড়িঅলা আলাউল আর রিয়াজুদ্দিন। সালমা এগিয়ে গেলে আলাউল বলে,
— একটা খবর পাওয়া গেছে বহিনজি !
— কি খবর !
— হর্ষদ এতদিন এই সেনাছাউনিতে ক্যাম্পেই ছিল…
— তাহলে এখন?
— জানিনা তার সঙ্গে ওদের তুমুল ঝগড়া হয়।তার জেরে ওরা..
— ওরা! ওরা কী করেছে ! সালমা ঈদের চাঁদের দিকে চেয়ে তীক্ষ্ণ চিৎকার করে
— ওকে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে।
— আল্লা !! বড়িআম্মা শুনে ফেলেছেন পাশ থেকে। সালমা ছুটে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরে। তিনি অজ্ঞান হয়ে গেছেন।সালমা তাঁর মুখে জল ছিটে দিয়ে জাপটে ঘরে নিয়ে যায়।চিৎকার শুনে ডলি বেরিয়ে আসে। দু’হাতে মা ও বেটিকে আঁকড়ে ধরে। সালমা এক ঝটকায় ডলিকে সরিয়ে বাইরে যায়, আলাউল ও রিয়াজুদ্দিনের সামনে সোজা দাঁড়িয়ে বলে,
— বডি কোথায় !
— ঝিলের জলে ভাসিয়ে দিয়েছে শুনলাম !
— আমার ওর বডি চাই! আমি দাফন দেব !
— কি করে বডি পাবে বলো।গোটা শহর উৎসবে মেতে আছে, এর মাঝে কোথায় কোন্ জলে ফেলে দিয়েছে…
— চুপ ! তুই একটাও কথা বলবি না!এই প্রথম সালমা চিল চিৎকারে রিয়াজুদ্দিনকে ধমকায় !
রিয়াজুদ্দিন বেশি কথা বাড়ায় না।ডলি আর সালমার চোখ তখন ঈদের চাঁদের নিচে অঙ্গারের মতো ধক ধক করে জ্বলছে ! আলাউল আর রিয়াজুদ্দিন অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।

বেশ কিছুক্ষণ পরে সালমা ডলিকে বলে,
— তোর চাচাতো ভাই মুনিরের একটা শিকারা আছে না !
— আছে। কিন্তু ওদের কথায় বিশ্বাস কি সালমা !
— ওরা শয়তানের চর।খারাপ খবর ঠিকই আনে ডলি!তুই মুনিরকে ফোন লাগা !
বড়িআম্মাকে ডলির জিম্মায় রেখে সালমা মুনিরের সাথে বেড়িয়ে যায়। দূরে তখন ঈদের জুলুসের একটানা আওয়াজ।
জ্যোৎস্নায় চকচক করছে পাতাঝরা পথটা, যেটা সেনাছাউনির দিকে। নির্জন পথটা ধরে ওরা সবচেয়ে ছাউনি লাগোয়া ঝিলটাতে শিকারা ভাসায়।একটা বড় টর্চ নিয়ে জলে আলো ফেলে ফেলে চারদিকে খোঁজে সালমা।তার শুধু মনে হয় জলের অনেক গভীরে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে তার প্রিয় শরীর, প্রিয় হর্ষদের শরীর,তার ঘন চুল,ভ্রু,সোনালী দাড়ি অল্প অল্প, ঠোঁটে চাপা হাসি আর মজাক।সারাটা রাত বার বার পাক খেয়েও মেলে না হর্ষদ ! ভোর ভোর ফিরতে ফিরতে সালমা দেখে হরিৎ নিষ্পলক চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাড়ে। মার হাত জড়িয়ে ঘরে ফেরে সে।
বাড়িতে ঢুকতেই তেমন শব্দ নেই। ডলি বেরিয়ে এসে বলে, বড়িআম্মাকে ডাক্তার ডেকে ওষুধ দিতে হয়েছে।
সালমা শুকনো গলায় বলে, হু !
সকালে উঠে বাইরে ঘোড়াগুলোর খাবার পাত্রগুলোকে দেখে খুব কান্না পেল ওর !
একটু বেলায় কুলসুম উঠে যায়।প্রাতঃকৃত্য সেরে সে বেরিয়ে আসতেই সালমা তার সামনে এসে দাঁড়ায়।কুলসুম থতমত খেয়ে যায়, সালমা
বলে,
— নমস্তে চাচিজান।আমি এখন পুরো বিধবা।আমার স্বামীর দেহ এখনো পাইনি।খুঁজতে হবে।বড়িআম্মা অসুস্থ। আপনি এখন মেয়েকে নিয়ে এ বাড়ি থেকে চলে যান।দয়া করে যান।হাতজোড় করছি…
কুলসুম ভিতরের ঘরে গিয়ে কাপড় নিতে থাকে ব্যাগে।
বড়িআম্মার সার আছে কিনা বোঝা যায় না। সালমা তাঁর পায়ের কাছে কুন্ডলী পাকিয়ে শোয়! ।হঠাৎ দেখে রিয়াজুদ্দিন চকচকে পাঞ্জাবি পরে জানলার বাইরে থেকে হাসছে। সালমা চিৎকার করে ওঠে,
— ডলি! ডলি !
ডলি ছুটে এলে বলে, তোর ভোজালিটা দেতো !
জানলায় তাকিয়ে দেখে কেউ নেই। হা হা করছে শূন্য সকালবেলা!ডলি ছুটে এসে ধরে সহেলিকে।
— সালমা ! বহু ! বড়িআম্মা নড়ে উঠেছেন।
সালমা উঠে কাছে যায়।
— কেমন আছেন আম্মা!
— গীধরসে মত ডরো।ইঁদুরকে ভয় করো না ! আর উমীদ রাখ্খো !
— কিসকী উপর !
— আপনে আপ পর।আর দিন বদলাবে, এই বিশওয়াসে উমীদ রাখ্খো বেটি !
সালমা বড়িআম্মাকে দুইহাতে জড়িয়ে ধরে, তাঁর বুকে মাথা রাখে !

♦  ♦♦  ♦♠♦  ♦♦  ♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!