- ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
- জুলাই ১৯, ২০২১
বিধ্বস্ত প্রকৃতির প্রতিশোধ
ইতিহাসে আমরা প্লেগ বা স্পানিশ ফ্লুর ধ্বংসকান্ড পড়েছি। বড়ো বড়ো দুর্ভিক্ষের মর্মান্তিক পরিণতির গল্প শুনেছি। কিন্তু বিশ্বজুড়ে এরকম আতঙ্ক, এরকম সংক্রমণ, মৃত্যুর এরকম মিছিল কখনও দেখা যায়নি। প্লেগ বা স্প্যানিশ ফ্লু কয়েকটি দেশে সীমাব্দ্ধ ছিল। সারা বিশ্বে একই সঙ্গে থাবা বসাতে পারেনি। তখন আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এত সহজ ছিল না। খবর ছড়াত দেরিতে। আজ কোথাও কোনও অঘটন ঘটলেই সারা বিশ্বে খবর ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ ভয় কাটাতে, আত্মরক্ষার্থে সতর্ক হয়ে ওঠে। করোনায় আক্রান্ত পৃথিবীর তিনটি স্পষ্ট চেহারাও আমরা দেখতে পাচ্ছি। মানুষ এক সঙ্গে লড়ছে, একসঙ্গে লকডাউন মেনে নিয়ে প্রবল সতর্কতা অবলম্বন করছে। দ্বিতীয়ত, দুর্যোগে দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর প্রবণতা বাড়ছে। তৃতীয়ত, নানা স্তরের বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকেরা সংক্রামক অতিমারির হামলা রুখতে ঐক্যবদ্ধ। বিশ্বজুড়ে প্রতিষেধক (ভ্যাকসিন) আবিষ্কারের গবেষণা চলছে। খোঁজ চলছে মারাত্মক রোগটির উৎস কী?
বিজ্ঞানসম্মত প্রতিষেধক ব্যবস্থা আর প্রাকৃতিক ভারসাম্য, মানব দেহরক্ষার দুই প্রধান অবলম্বন। প্রকৃতিও তার সুস্বাস্থ্য চায়। তার গায়ে হাত পড়লে সে ক্ষেপে ওঠে। নানাভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে থাকে।
গোটা জীবজগতকে, বিশেষ করে মানুষকে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে বাঁচতে হয়। এটাও তাঁর বেঁচে থাকার অন্যতম ধর্ম। লড়তে লড়তে জীব দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, তার প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে ওঠে। আমি বিজ্ঞানের ছাত্র নই। সাধারণ জ্ঞান ছুঁয়েই বুঝতে পারি, প্রতিরোধের শক্তি অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। বিজ্ঞানসম্মত প্রতিষেধক ব্যবস্থা আর প্রাকৃতিক ভারসাম্য, দেহরক্ষার দুই প্রধান অবলম্বন। প্রকৃতিও তার সুস্বাস্থ্য চায়। তার গায়ে হাত পড়লে সে ক্ষেপে ওঠে। নানাভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে থাকে।
আমরা ছোটবেলা যে প্রকৃতিকে দেখেছি, আমাদের চারপাশে, আমাদের মতোই সেও তার ‘নেচার’ বদলে ফেলেছে। সে কখনও নিঃশব্দে, কখনও তীব্র আঘাত কষে তার প্রতিরোধ প্রদর্শন করছে। আমি হলফ করে বলতে পারি, ক্ষুদ্ধ প্রকৃতি সরাসরি মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। আঘাতের বিরুদ্ধে আঘাত হেনে ধ্বংস থেকে, বিনাশ থেকে রেহাই দাবি করছে।
লকডাউন পর্বে বাড়িতে বন্দি। ছাদে যাই। সকালে-বিকেলে। কখনও রাতে। দেখতে পাই, পরিষ্কার আকাশ। পাখিরা অবাধে উড়ছে। সন্ধ্যায়, ভোরে স্বাভাবিক কোলাহল বাড়ছে। প্রায়ই অনুভব করছি, মুক্ত উৎপাতহীন আবহে প্রকৃতি, প্রকৃতির লালিত পশুপাখি শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে। কারণ দূষণ কমছে। পারিপার্শ্বিকে কমছে ম্যানমেড অশান্তির প্রকোপ। এরকম মুহূর্তে যে কোনও স্পর্শকাতর মানুষের মতো আমিও প্রকৃতির ফিসফাস শুনতে পাচ্ছি। সে মানুষকে সরাসরি বলছে, তোমাদের বাড়াবাড়ি অসহ্য। আমার ওপর অনেক অত্যাচার করেছ। ভারসাম্য নষ্ট করে দিচ্ছ। এবার আমার প্রতিশোধের পালা শুরু। আমিও ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠছি। ছাড়ব না। মার খেলে আমিও মারব।
প্রকৃতি কি কথা বলে? বলে না। নিঃশব্দে ব্যক্ত করে তার প্রতিক্রিয়া। আমরা তার নৈঃশব্দে ভাষা খুঁজি। তাকে অনুভব করি অন্তরে ও বাইরে। আমি ব্যক্তিগত অনুভুতি ছুঁয়েই বুঝতে পারি, প্রকৃতি বারবার, বহুবার আমাদের সতর্ক করেছে। আমরা সাড়া দিইনি। সে ফিসফিস করে বলেছে, তোমাদের উন্নয়ন দরকার। করছো, করো। কিন্তু আমার ভারসাম্য নষ্ট করোনা। প্রকৃতি যখন বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় চিৎকার জুড়ে নড়ে উঠল, তখনও আমরা তার আর্তনাদে কান দিই নি। বরং সমগ্র বিশ্বজুড়ে নিও ক্যাপিটেলিজমের আগ্রাসী মনোভাবের সোহাগী হয়ে তার ব্যবসা, তার ‘খাহেস’ বাড়িয়ে তুলেছি। নব্য পুঁজিবাদ দেখেছে, অল্প অর্থব্যয়, সস্তা মজুরি দিয়ে আয় বৃদ্ধি সম্ভব। এটাই তার বিশ্বায়নের, তার বাজার অর্থনীতির প্রধান লক্ষ্য। আনএনডিং প্রফিট (অন্তহীন মুনাফা) দিয়ে সে তার বৃদ্ধি চাপিয়ে দিচ্ছে।
আগে বিভিন্ন সংস্থার স্ট্যার্ন্ডাড ছিল ১৫ থেকে ২০ শতাংশ মুনাফা। এখন তাদের দাবি, কম খরচে ২০০ থেকে ৩০০ ভাগ আমাদের পেতেই হবে। মুনাফার নেশায় ওরা পাগল হয়ে উঠছে। ওদের সংহত উন্মাদনায় প্রকৃতি আক্রান্ত। বিধ্বস্ত। উন্নয়নের নামে মুনাফা, মুনাফার নামে উন্নয়ন বাজার অর্থনীতির সুপরিকল্পিত অঙ্ক। জল ও জঙ্গলকে অবাধে ব্যবহার করো। নিজের শক্তি বাড়াও। অরণ্য আর চাই না। কেটে সাফ করে দাও। রুদ্ধ করো জলের স্বাভাবিক গতিকে, আমাদের ক্ষমতামত্ততার দাসত্ব জঙ্গলকে, জলকে মানতে হবে। হিমালয় থেকে কন্যাকুমারি, আফ্রিকা থাকে আমাজন সর্বত্র এই ভয়ঙ্কর লীলা চলছে। কেন না কর্পোরেটের আরও বেশি উৎপাদন চাই। খনিজ চাই। চাই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎ এখন আর নিছক পরিষেবা নয়, পণ্য। শেয়ার মার্কেট বিক্রি হয়। মুনাফা জোগায়। নদীকে রুদ্ধ করে বিদ্যুতের উৎপাদন, জঙ্গল কেটেকুটে তার নির্জনতার উচ্ছেদ প্রকৃতি আর কতদিন সহ্য করবে? করছে না। রুখে দাঁড়াচ্ছে। প্রতিশোধ নিতে চাইছে।
আমরা ছোট বেলায় উত্তরবঙ্গের দুর্বার, নির্মল তিস্তাকে দেখেছি। কী তার বিস্তার? কী তার গর্জন? কয়েকমাস আগে গিয়ে দেখলাম, তিস্তা শুকনো। নালার মতো স্রোত বইছে। গায়ে তার অকাল বার্ধক্যের চিহ্ন। তিস্তার জল নিয়ে কূটনৈতিক লড়াই চলছে। প্রতিবেশী দাবি তুলছে, জলের ভাগ দাও।
জল কোত্থেকে দেওয়া হবে? তিস্তা জলহীন, স্রোতহীন ব্রাত্য নদীর মতো ধুঁকছে। শুধু কি তিস্তা? বিশ্বে অসংখ্য নদ-নদী মানুষের হস্তক্ষেপে, মানুষের লোভের শিকার হয়ে মৃত্যুর দিকে হাঁটছে। জঙ্গলের পর জঙ্গল সাফ। আরোপিত ধ্বংসকান্ডে, দূষণে বিপর্যস্ত রাশি রাশি জল। জলস্থলে ভারসাম্য বিনষ্ট। প্রকৃতি রুষ্ট। ক্ষুদ্ধ। এসব কথা বলবার খানিকটা অধিকার আমার আছে। তা প্রসঙ্গত একটু বলা দরকার।
ইতালির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে আমি তিনভাষায় ( হিন্দি, ইংরেজি, ও ইতালিয়ান) যে চলচ্চিত্র তৈরি করছি তার বিষয়, প্রকৃতির ওপর মানুষের অত্যাচার। মূল কাহিনি একজন ইতালিয়ান তরুণ লেখকের। বিদেশি কাহিনীটির ভিত্তিতে তথ্য ও তত্ত্ব সাজিয়ে চিত্রনাট্য তৈরি হয়েছে।
মানুষ কীভাবে আমাদের চারপাশের ভারসাম্য নষ্ট করছে, কীভাবে জঙ্গলে কোপ বসিয়ে, নদীর পর নদীকে রুদ্ধ করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ভিটেচ্যুত, ভূমিহারা মাতৃহারা করে দিচ্ছে —নিঃশব্দ প্রকৃতিও কীভাবে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে—এরকম বহু প্রসঙ্গকে ঘিরে গড়ে উঠেছে মূল কাহিনি ও তার ত্রিভাষিক চিত্রনাট্য। প্রধান চরিত্র একজন ইতালিয়ান লেখক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা। ইকোলজি নিয়ে ছবি বানাতে ভারতে এসেছেন। নানা প্রান্তে ঘুরছেন। স্ত্রী অকাল প্রয়াত। একটি ছেলে আছে। বয়স ১২। ছেলেটিকে রেখে এসেছেন। সে বাড়িতে নিঃসঙ্গ। বিষন্ন। বই আর সোশ্যাল মিডিয়া তাঁর সঙ্গী।
মুম্বাইয়ের জুহুবিচে তথ্যচিত্র নির্মাতা ইতালিয়ান লেখকের সঙ্গে, তাঁরই ছেলের একটি বালকের দেখা হয়। তার আদি বাড়ি মধ্যপ্রদেশ। সে এখন ভিটেহীন।উদ্বাস্তু। বাড়িঘর প্রকৃতির প্রতিশোধে ভেসে গেছে। ওই তথ্যচিত্র নির্মাতা এই ঘটনার বর্ণনা শুনতে শুনতে একটা মিল খুঁজে পান নিজের ছেলের সঙ্গে। তাঁর ছেলে মাতৃহীন আর এই ভিটেচ্যুত ছেলেটি মাতৃভূমিহীন।দুজনেই অসহায়। নিঃসঙ্গ। আমার নির্মীয়মাণ এই ছবির হিন্দি টাইটেল পরিক্ৰমা । ইংরেজি ও ইতালিয়ান টাইটেল ভেবে রেখেছি। অন্যান্য কাজ চলছে।ছবিটির শ্যুটিং করতে ডিসেম্বরের শেষে আমাকে ইতালি যেতে হয়।সঙ্গে আমার স্ত্রী নীলাঞ্জনা। সব প্রস্তুতি নিয়েই আমরা ১০ জানুয়ারি থেকে দক্ষিণ ইতালির নেপলস আর প্রসিদা আইল্যান্ডে শ্যুটিং শুরু করি। টিমের প্রায় সব সদস্য ইতালিয়ান। সহ প্রযোজকও ইতালির। চিনে তখন করোনা সংক্রমণের প্রকোপ বাড়ছে। ভয় ছড়াচ্ছে ইতালিতেও। তখন আমার ইতালিয়ান বন্ধু, প্ররিক্রমার সহ পযোজক আড্ডায় একাধিকবার বলেছে, এটা এমন কিছু নয়। কমন ফ্লু। প্রতিবছর সংক্রমক জ্বরে বয়স্ক লোক আক্রান্ত হন।কেউ কেউ মারা যান। দক্ষিণ ইতালি থেকে এরপরই আমি আর নীলাঞ্জনা কলকাতায় ফিরে আসি। চলে আসার আগে আমার কখনও মনে হয়নি, ইতালিয়ান বন্ধুরাও ভাবেনি, কমন ফ্লু এক ভয়ঙ্কর মহামারির চেহারা নিয়ে গোটা বিশ্বকে বিপর্যস্ত করে দেবে।
শ্যুটিং এর ইতালিয় পর্ব শেষ, ভারতে শ্যুট বাকি। ইতালিয়ান অভিনেতা মার্ক লিওনার্দি ও অন্যান্য কলাকুশলিকে নিয়ে আসতে হবে। পরের শ্যুটিং কবে শুরু করতে পারব জানি না। যেমন সারা বিশ্ব জানে না, কখন, কী ভাবে অতিমারি করোনার হাত থেকে আমরা রেহাই পাব। দুনিয়া লড়ছে।আশা করি, প্রতিষেধক খুঁজে বের করবে, এবং আর্থসমাজিক অবস্থা নিয়েও ব্যাপক ভাবনাচিন্তা শুরু হবে।প্রকৃতিও ভাবসাম্য রক্ষায় আরও বেশি সজাগ হয়ে উঠবে। বলবে, উন্নয়ন হোক কিন্তু ধ্বংস নয়। নয় জলজঙ্গলে মানুষের অপকান্ডের বিস্তার।
বাড়িতে আটক। চারপাশে নিয়মের অবরোধ। এ এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। দমবন্ধ অবস্থা, মেনে নিতে হচ্ছে। বহু ধ্যান ধারণা বদলে যাচ্ছে। বাড়ি বসে স্ক্রিপ্ট রিভাইজ করছি। করতে করতে অবাক লাগছে, প্রকৃতির ভারসাম্যহীনতা নিয়ে আমার ছবিটির সঙ্গে এই সময় আর দৃষ্টান্তহীন সঙ্কটের মিল কী অদ্ভূত। সময়কে নিঃসময় করে তেলার তাগিদ অনুভব করছি।করোনাজাত সংক্রমণ, সঙ্কট ও মৃত্যু প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে গল্পের আদলে।আদলের বিস্তৃতিতে।
❤ Support Us








