Advertisement
  • খাস-কলম প্রচ্ছদ রচনা
  • আগস্ট ৩, ২০২২

আইন ভেঙে গোপনে জাওয়াহিরিকে হত্যা। সন্ত্রাসের অপচ্ছায়ারা খুশিতে নাচছে, সমর্থনের ভিত্ বাড়বে।

ন্যায়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হত্যার দম্ভিত ঝোঁক বাড়ছে, তাতে কয়েক মিনিট দূরে যে খুনি, যে-নরঘাতক হাসি বন্টনে ব্যস্ত, তারা, আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখছে

বাহার উদ্দিন
আইন ভেঙে গোপনে জাওয়াহিরিকে হত্যা। সন্ত্রাসের অপচ্ছায়ারা খুশিতে নাচছে, সমর্থনের ভিত্ বাড়বে।

আলকায়দার সাংগঠনিক প্রধান আর তাত্ত্বিক নেতা আয়মান আল জাওয়াহিরিকে, কীভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা টের পাননি, তাঁর কাবুলের বাসস্থানের প্রতিবেশীরা । গোটা ঘটনায় তাঁরা বিস্মিত । শোনা যাচ্ছে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর নেতৃত্বে তাঁকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালায়। তখন কি জাওয়াহারি একা ছিলেন, সঙ্গে ছিলেন না পরিবারের সদস্যরা ? এবিষয়ে কিছুই পরিস্কার নয় । তালেবান সরকার কি বিষয়টা জানত না? না জেনেও মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছিল? আলজাওয়াহিরির মৃত্যু সংবাদ ঘোষণার পর হাসির উচ্ছ্বাস দেখা গেছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মুখে । তিনি বলেছেন, ৯/১১-য় যাঁরা মারা গিয়েছিলেন, তাঁদের পরিবারবর্গ সুবিচার পেলেন । তালেবান সরকারের মুখপাত্র মুখ বাঁচাতে বলেছেন, জাওয়াহিরির হত্যায় আমেরিকা আইন লঙ্ঘন করেছে । ভারত নীরব । দিল্লি এখনও কোনও মন্তব্য করেনি । পাকিস্তানের শাহবাজ সরকারের মুখে কুলুপ । শাহবাজ মার্কিনপন্থী । তাঁর সরকারের নীরবতাই প্রত্যাশিত । সৌদি আরব ছাড়া, গোটা আরব দুনিয়াও চুপ । আইওসি এতটাই মেরুদন্ডহীন যে, তাঁদের মতামতকে কেউ গুরুত্ব দেয় না । না হলে, সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে তাঁদের নৃশংস নৈঃশব্দ বিশ্বকে দেখতে হত না । সৌদি আরব আলকায়দার অবস্থানের ঘোর বিরোধী । যুবরাজ সলমানের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ওয়াহিবিদের অস্তিত্ব সঙ্কটে । জাওয়াহিরির হত্যাকান্ডে সৌদিআরব স্বাভাবিক ভাবেই খুশি ।

জাওয়াহিরি কেবল ব্যক্তি বিশেষ নন, একটি প্রতিষ্ঠান, একটি জবরদস্ত আত্মঘাতী সংগঠনের নেতা । তাঁকে হত্যা করে সন্ত্রাসবাদকে নির্মূল করতে চাইল আমেরিকা । কিন্তু সামরিক হস্তক্ষেপ করে উগ্রতার অন্ধ উপাসকদের উচ্ছেদ কি সম্ভব । কয়েক বছর আগে, অমর্ত্য সেনের নেতৃত্বে, কমনওয়েলথ আয়োজিত একটি সম্মেলনের বিবৃতিতে, বহু নোবেলজয়ী, সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিক বলেছিলেন, সামরিক হস্তক্ষেপ ঘটিয়ে সন্ত্রাসবাদকে উচ্ছেদ করা সম্ভব নয় । বিপরীত পরিস্থিতি তৈরি হয় । সন্ত্রাসবাদীরা সমাজিক সমর্থনের ভিত্ পেয়ে যায় । কার্যত এটাই ঘটেছে । ওসামা বিন লাদেনের লাশ সুমদ্রে ভাসিয়ে দেওয়ার পর আলকায়দা নানা রূপান্তরের ভেতর দিয়েই তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে । তার জঙ্গি সহযোগি আবু বক্কর আল বাগদাদির ছত্রছায়ায় সংগঠিত হতে থাকে । আমরা, গত কয়েক বছর জুড়ে বারবার বলেছি, বাগদাদি আইএস-যোগ দিচ্ছে । আলাদা অস্তিত্ব বজায় রেখেও তারা লড়ছে। লাদেনকে, আলজাওয়াহিরিকে বন্দি না করে, যেভাবে হত্যা করা হয়, একইভাবে আল বাগদাদিকেও আন্তর্জাতিক বিধি লঙ্ঘন করে খতম করেছিল মার্কিন বাহিনী । হত্যাকান্ডের দৃশ্য টিভির সমানে বসে বাইডেনের মতোই দেখেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প । তাঁর অট্টহাসি, তাঁর বিদ্রুপের কী সেই ছবি । তিন স্বীকৃত, বিশ্বনিন্দিত খলনায়ককে হত্যা করার পরেও কেন সন্ত্রাস সদর্পে জেগে রইল? কেন মুছে দেওয়া গেল না আইএস কিংবা আলকায়দার যৌথ শক্তিকে?

পাকিস্তান লাদেনকে প্রশ্রয় দিয়েছিল । বলতে গেলে, লুকিয়ে রেখেছিল পাহাড়ি এলাকায় তাঁর বসবাসকে । কাবুল থেকে পাক সীমান্তে, সীমান্তের ভেতরে, তাঁর ছোটাছুটি পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দাদের অজানা ছিল না । আবার তাঁদের জ্ঞাতসারেই মার্কিণ ড্রোন খতম করে দেয় দ্য মোস্ট ওয়ান্টেড খুনিকে।

আল জাওয়াহিরিকেও নিঃশব্দে পুষে রেখেছিল তালেবান । প্রমাণ নেই, আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস এই যে, আলকায়দা, আইএস আর তালেবানরা যৌথভাবে ক্ষমতাচ্যুত শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে । সঙ্গে পাকিস্তানেরও মদত ছিল । তাই এতদ্রুত, এত অনায়াসে গোটা আফগান ভূখণ্ড তালেবানদের কবলে চলে এল । মোল্লা ওমর-শাসিত আফগানিস্তান লাদেনের সহায়তায়, পাক গোয়েন্দাদের সক্রিয় প্রশ্রয়ে টিকে থাকবে ভেবেছিল । পারে নি । বিশ্ব জনমত তাঁদের পাশে ছিল না । তালেবানি শাসকরাও আলজাওয়াহিরিকে একই নজরে দেখছে ।

জাওয়াহারির মৃত্যুর পরেও তারা এ মেজাজ টিঁকিয়ে রাখবে । কারণ, তাঁদের কিংবা আলকায়দার কিংবা আইএসএর লক্ষ্য অভিন্ন । খেলাফতের প্রত্যাবর্তন চায় তারা । ওই ধরণের শাসন ব্যবস্থা কেবল সুন্নি আফগানিস্তান আর শিয়াশাসিত ইরানে বহাল । আর কোথাও নেই । কোনও মুসলিম দেশে ।

সময় বদলেছে, ইতিহাসের অভিমুখ বদলাচ্ছে । কয়েকশ বছর ধরে মুসলিম দুনিয়া রাজনৈতিক সঙ্কটে । সংশয়ে আক্রান্ত । গণতন্ত্র না রাজতন্ত্র, না মাঝামাঝি এমন কোনও অবস্থান জরুরি, যা জনগণের মৌলিক স্বাধীনতাকে ম্লান করবে না । এবিষয়ে সংশয় এতটা প্রকট যে শাণিত বুদ্ধির, প্রখর বিবেকের প্রতিনিধিরা মুখ খোলার সাহস পান না । কেউ কেউ সরব হওয়ার চেষ্টা করলেই মাথার ওপরের ঝুলন্ত খড়্গ চুপ করিয়ে দেয় । রাষ্ট্র আর অনুশাসন তেরো শতক থেকেই এমন একটি আঁতাত, এমন একটি ব্যবস্থা চাপিয়ে রেখেছে, যার শেষ কোথায়, দুঃসাহসী বিকল্প কী, তা আন্দাজের বাইরে । গামাল আব্দুল নাসিরের মিশর, কামাল আতাতুর্কের তুরস্ক আর বঙ্গবন্ধুর বা শেখ হাসিনার বাংলাদেশে সূর্যোদয়ের স্বপ্ন দেখছে । কিন্তু এসব দেশকে বারবার থেমে যেতে হচ্ছে । রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়নই এই মুহূর্তে তাঁদের প্রধান অবলম্বন । পন্ডিত জওহরলাল নেহরু ভেবেছিলেন, কলকারখানা যত বাড়বে, প্রযুক্তির যত বিস্তার ঘটবে, ততই সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ কোণঠাসা হবে । আশির দশক পর্যন্ত অপশক্তি ভারতে মাথা তুলতে পারেনি । কিন্তু পরের কয়েকদশকে কী ঘটল? আঁতাতের রাজনীতি এসে কংগ্রেসের মতো গণ সংগঠনকে মাথা নোয়াতে বাধ্য করল । আর এখন গণতন্ত্রের নামে আধিপত্যবাদ কংগ্রেসকে বিধানসভা কিংবা সংসদে অস্তিত্বহীন করে তুলছে । যান্ত্রিক সভ্যতার বিকাশের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ভারতে সফল হয়নি । সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ কিংবা সন্ত্রাসবাদের বিকল্প হতে পারেনি অজস্র কলকারখানার প্রতিষ্ঠা ।

এসব প্রবণতাকে রুখতে সামরিক হস্তক্ষেপও পুরোপুরি ব্যর্থ । লাদেন, আল বাগদাদি, কিংবা আলজাওয়াহিরির হত্যাকান্ডও সন্ত্রাসবাদকে রুখতে পারবে না । বরং এদের সমর্থনের ভিত বাড়বে । যারা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের আমলদার, তারা যখন বেসরকারি সংগঠিত সন্ত্রাসবাদকে খতম করতে অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন সহানুভূতির ছায়া আর হাওয়ার ত্রাস সামাজিক খতরনাকদের পাশে দাঁড়িয়ে পড়ে । সমাজতত্ত্বের আধুনিক বিশ্লেষণ রাষ্ট্রকে এব্যাপারে বারবার সতর্ক করেছে । দ্বিতীয়ত সন্ত্রাসের নেতা আর হোতাদের যেভাবে, সব ন্যায়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে হত্যার দম্ভিত ঝোঁক বাড়ছে, তাতে রাষ্ট্রের ক্ষমতামত্ততার দর্প তৃপ্ত হতে পারে, রাষ্ট্রনায়করা আপাতত অট্টহাসি ছাড়াতে পারেন, কিন্তু অট্টহাসির কিংবা উল্লাস থেকে কয়েক মিনিট দূরে যে খুনি, যে-নরঘাতক হাসি বন্টনে ব্যস্ত, তারা, হ্যাঁ তারাই আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখছে । নির্মম বাস্তব মেনে নেওয়া জরুরি । তা হচ্ছে এই যে, রাষ্ট্রীয় খুনি আর বেসরকারি সংগঠিত খুনিদের ঘোষিত লড়াইয়ে দুনিয়া আরও বেশি রক্তাক্ত হয়ে উঠবে । সংকট এখানেই বড়ো বেশি চাওড়া। উদ্বেগও এখানে । মানুষ কম্পমান, আতঙ্কগ্রস্ত । এসব কারণেই, বিচার ছাড়া জাওয়াহারির হত্যাকান্ডে আমরা ক্ষুব্ধ । আমাদের আর মুখ বাঁচাতে মরিয়া তালেবানের ক্ষোভের সাদৃশ্য নেই । ওরা গণঅসন্তোষের ছায়া দেখছে । আর আমরা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিভৎস, কদর্য, সর্বাত্মক অপচ্ছায়ার ক্রম বিস্তার দেখে ভয় পাচ্ছি । এই ভয়কে কেন্দ্র করে একধরণের ক্ষোভ আর সন্ত্রাসের নির্বোধ নৃত্যের দৃষ্টিপাত লক্ষ্য করছি ।


❤ Support Us
Advertisement
Advertisement
শিবভোলার দেশ শিবখোলা স | ফ | র | না | মা

শিবভোলার দেশ শিবখোলা

শিবখোলা পৌঁছলে শিলিগুড়ির অত কাছের কোন জায়গা বলে মনে হয় না।যেন অন্তবিহীন দূরত্ব পেরিয়ে একান্ত রেহাই পাবার পরিসর মিলে গেছে।

সৌরেনি আর তার সৌন্দর্যের সই টিংলিং চূড়া স | ফ | র | না | মা

সৌরেনি আর তার সৌন্দর্যের সই টিংলিং চূড়া

সৌরেনির উঁচু শিখর থেকে এক দিকে কার্শিয়াং আর উত্তরবঙ্গের সমতল দেখা যায়। অন্য প্রান্তে মাথা তুলে থাকে নেপালের শৈলমালা, বিশেষ করে অন্তুদারার পরিচিত চূড়া দেখা যায়।

মিরিক,পাইনের লিরিকাল সুমেন্দু সফরনামা
error: Content is protected !!