- দে । শ
- এপ্রিল ১২, ২০২৪
লোক গানেও ভোটের ছায়া, বোলান গাজনে মেতেছে বাংলার ৩ জেলা
ভোটপাখিরা উড়ছে দ্যাখো ভোট এসেছে / ব্যাটা ভোটের মাঠে ভোজের লোভে নাচতে এসেছে। চৈত্র শেষের বোলান গানে লোকসভা ভোটের ছায়া। গানের কলিতে স্তুতি, কটাক্ষ আর ঠেসের ছড়াছড়ি। রাজ্য বাজেটে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রসঙ্গ টেনে তৃণমূল ঘেঁষা বোলানের দলের গান, দু’গুণ হল টাকা মমতার লক্ষ্মীর ভাণ্ডার / দ্বিগুণ ভোটে জিতবেন শর্মিলা সরকার / মনের রোগ সারান তিনি বড় ডাক্তার / বর্ধমান পূর্বে ঘাসফুল ফুটবে বারংবার। পাল্টাও আছে। পদ্মগন্ধী বোলানের সুরে ফুটছে, চাকরি নেই স্বাস্থ্য নেই এ যে নেই রানির দেশ / ফুটবে পদ্ম পড়ছে ধরা সেই সুবাসের রেশ।
বাংলার সনাতন লোকসংস্কৃতি বোলান গানের পালায় ধরা পড়ল এমনই সব কলি। একেবারে সাম্প্রতিক ঘটনাকে তুলে ধরে বোলান গান গাওয়ার চল হয়েছে কয়েকবছর ধরে। পুরাণের ঘটনাবলিও রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বিষয়কে উপজীব্য করে ‘দাঁড়া বোলান’ আর পাঁচালি গানের আসর চোখে পড়ে বেশি। গরম পড়লেও বোলানের আসরগুলো ছিল একেবারে ভিড়ে ঠাসা। করোনা কেড়েছিল মাঝের ২ বছর। তারপর থেকে আবার স্বমহিমায় বোলান। বোলান-গাজনে সবথেকে বেশি মাতামাতি দেখা যায় ৩ জেলা, পূর্ব বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ ও বীরভূমের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলি। লোকসংস্কৃতি গবেষক রণদেব মুখার্জির মতে, ‘বুলা বা বলা শব্দ থেকে বোলান কথাটি এসেছে। মূলত দেবতার আবাহনেই বোলান গাওয়া হয়। তবে বোলান গানের আরাধ্য দেবতা মূলত শিব।’ বোলান মূলত ৪ ধরনের। দাঁড়া বোলান, সখি বোলান, পালা বোলান ও পোড়ো বা শ্মশান বোলান। তবে শ্মশান বা পোড়ো বোলান খুবই ভয়াবহ। সেটাই দেখা যায় কেতুগ্রামের উদ্ধারণপুর, মাসুন্দি, মৌগ্রাম, কাটোয়ার সুদপুর, মুর্শিদাবাদের এড়েরা-সহ বিভিন্ন এলাকায়।

এই বোলানের বৈশিষ্ট্য হল, বোলান গাওয়ার আসরটিকে শ্মশানের আকার দেওয়া। মৃত মানুষের খুলিকে মাঝে রেখে শ্মশান-দৃশ্য রচনা করা হয়। শিব, কালি, শকুনি, কুকুর, ডাকিনী, যোগিনীর ভয়ঙ্কর সাজে সেজে নানারকম অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বোলানের দল শিবের বন্দনা গান করেন, ‘নমো নমো নীলকন্ঠ, নমো শিব-শঙ্কর / নমো হর গৌরীনাথ, নমো ডম্বরুধর। / সৃষ্টির আদি তুমি, তুমি অনাদি দেব / ধ্বংসের অন্ত তুমি / তুমিই মহাদেব— কেউ শিঙা ফোঁকেন। কেউ ধুনুচিতে ধুনো ছিটিয়ে আগুন জ্বালান। সেইসঙ্গে ঢাক-কাঁসির বোলে নিঝুম রাত আতঙ্কে দোলে। গাইতে বেরনোর আগে স্থানীয় মৃৎশিল্পীদের কাছে শ্মশানের স্বাভাবিক চরিত্রগুলির মতো মুখে রং করানো হয়। পোড়ো বোলানের শিল্পী সামাই দাস, নির্মল রাজোয়াররা বলছিলেন, ‘পোড়ো বোলান খুবই প্রাচীন প্রথা। এখন কাটোয়া, কেতুগ্রাম বা মুর্শিদাবাদের দু’চারটে গ্রাম ছাড়া আর তেমন কোথাও দেখা যায় না। এই গান খুবই শ্রমসাধ্য।’ এই গানের রীতি টিকিয়ে রাখা আরও দুষ্কর এজন্য যে, গানের প্রধান অনুষঙ্গ মড়ার খুলি পাওয়া খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এ ব্যাপারে পুলিশ-প্রশাসন সাঙ্ঘাতিক কঠোর। নামমাত্র খরচে গাইয়েদের মুখ রাঙানোর কাজ করা মৃৎশিল্পী ধুলো পাল বলছিলেন, ‘তিন পুরুষ ধরে এই কাজ করছি। মুখে রং চড়ানোর পর ওরা সত্যিসত্যিই শেয়াল, শিব, নন্দী, ভৃঙ্গী, ডাকিনী, যোগিনী হয়ে ওঠে।’

বোলান গানের পালাকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ইদানীং পুরাণ আশ্রিত বিষয় নিয়ে পালার থেকে বর্তমান বিষয়ের উপর পালা লেখার বরাত বেশি মিলছে।’ তার নমুনা মিলল কাটোয়ার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে লেখা গানের কলিতে কেন্দ্রীয় সংস্থা এনটিপিসির কাটোয়ার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি বিশ বাঁও জলে। সেই ঘটনারও ছবি বোলানের কলিতে, ‘এনটিপিসি হার মেনেছে পাততাড়ি গোটায় / কাটোয়ার তাপবিদ্যুৎ মাঝদরিয়ায় / শিল্প হোক ওই জমিতে চাইছে মনপ্রাণ / মাথায় আছেন মমতাদিদি, মুশকিল আসান/ ওরে ভাই মুশকিল আসান। ‘মুশকিল আসানে’র কারিগর নরেন্দ্র মোদির বন্দনাও ধরা পড়ছে বোলান গানে, ‘দেশের সেরা দশের সেরা বিরাট বুকের ছাতি / নরেন্দ্র ভাই মোদি নিয়ে তাই জগৎ মাতামাতি / রে ভাই জগৎ
❤ Support Us





