- খাস-কলম পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- এপ্রিল ৩০, ২০২৩
লাদেনের চেয়েও খতরনাক জঙ্গি, স্যাঞ্চেজ ওরফে কার্লোসের বৃত্তান্ত
মিউনিখ অলিম্পিকে ইসরাইলি খেলোয়াড়দের ওপর হামলা, ওপেক সম্মেলন থেকে ২ মন্ত্রীসহ ৬০ সদস্যকে অপহরণ— এরকম বহু, রোমহর্ষক ঘটনার মাষ্টার মাইণ্ড কেন ফিলিস্তিনিদের হয়ে লড়াই করত, যৌবনে কী কারণে ভেনিজুয়েলা ছেড়ে ঠিকানাহীন জঙ্গি হয়ে উঠল, কীভাবে লণ্ডনে ব্যর্থ হয়েছিল তার প্রথম ‘মিশন’, কী কারণে বিয়ে করেছিল এক জর্ডন সুন্দরীকে— এসব কাহিনির পর কাহিনি এবং তার সর্বশেষ পরিণতি ফ্রান্সে যাবজ্জীবন পেশ করা হল এই বিশেষ প্রতিবেদনে
ইল্চ রামিরেজ স্যাঞ্চেজ। বয়স, ৭৪। আদিবাড়ি ভেনিজুয়েলায়। জন্ম ১৯৪৯ সালে। শৈশব কেটেছে সুখে। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। সুপুরুষ, শক্তপোক্ত দেহ-গঠন। খতরনাক সন্ত্রাসবাদী। বহু ফরাসি আর ইহুদি হত্যার নায়ক। যাবজ্জীবন দণ্ডে দণ্ডিত। ফ্রান্সের জেলে বন্দী। ছাড়া পাবে বলে মনে হয় না। একাধিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত। সব অভিযোগ প্রমাণিত। জেরায়, সন্ত্রাস হামলা আর খুন-খারাবির কাহিনি স্বীকার করেছে নিজেই। সম্ভবত জেলেই তার মৃত্যু হবে। একটি শাস্তির মেয়াদ শেষ হলে, আরেকটি এসে তার ঘাড়ে পড়বে।
তার পরিকল্পিত জঘন্যতম হামলা, মিউনিখ অলিম্পিকে। ১৯৭৫ সালের ২১ ডিসেম্বর। খেলার মাঠে সেদিন বর্ণময় অনুষ্ঠান চলছে। নানা দেশের ক্রীড়াবিদ,দর্শক আর খেলোয়াড়দের ইভেণ্ট। আচমকা স্টেডিয়ামে সদলে প্রবেশ করল স্যাঞ্চেজ। সবার ব্যাগে বোমা, গ্রেনেড আর মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র। মুখে মুখোশ। কণ্ঠে হুমকি। দর্শক থেকে খেলোয়াড়, ক্রীড়া সংগঠকরা হতচকিত। মুহুর্তে ইহুদি খেলোয়াড়দের ওপর হামলা চালিয়ে, কয়েকজনকে পণবন্দী করে দলের লোকদের নিয়ে পালিয়ে গেল সে। অলিম্পিক গেমে হামলার ঘটনা এই প্রথম। দুনিয়া আলোড়িত। সন্ত্রস্ত। গোয়েন্দা-পুলিশ ছুটল পার্শ্ববর্তী বহু দেশে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেল, হামলার মূল চক্রী র্যামিরেজ স্যাঞ্চেজ। সশস্ত্র ফিলিস্তিনিদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।ইহুদি আর তাদের মদতপুষ্টদের শায়েস্তা করতে জঙ্গিগোষ্ঠী গড়ে তুলেছে। ঘুরে বেড়ায় এক দেশ থেকে আরেক দেশে। বড়ো বড়ো গোয়েন্দা সংস্থা তাকে খুঁজছে। কখন কোথায় থাকে, হদিশ মেলে না।
১৯৭৫ সালের আরেকটি ঘটনা। ওপেক সম্মেলনে হাজির হয়েছেন সৌদি আরবের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী আর ইরানের সন্ত্রাস মন্ত্রী। স্যাঞ্চেজ তার অনুগামীদের নির্দেশ দেয়, সম্মেলন স্থলেই খুন করতে হবে দুজনকে। যথারীতি প্লট তৈরি। বৈঠকে আলোচনায় ব্যস্ত তেলসমৃদ্ধ দুদেশের মন্ত্রী। তখনই স্যাঞ্জেজসহ জঙ্গিরা প্রবেশ করে। অস্ত্র দেখিয়ে দুজনকে তুলে নিয়ে যায়। অপহরণের দায় নিয়ে বিবৃতি জাহির করে। প্রমাদ গুণল দুই দেশ। ভাবল, দুজনের মৃত্যু অবধারিত। ফিলিস্তিন সূত্রে স্যাঞ্চেজের সঙ্গে আলোচনা শুরু হল। গোপন আস্তানা থেকে ঘোষণা করল সে, দুজনকে মুক্তি দিতে সে রাজি। কিন্তু দুই সরকারকে কথা দিতে হবে, ফিলিস্তিনিদের হয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে লড়তে হবে। দ্বিতীয়ত, দুই মন্ত্রীর মুক্তির আগে স্যাঞ্চেজের ডেরায় ৫ কোটি মার্কিন ডলার পৌঁছে দিতে হবে। আব্দার মেনে নেয় দুদেশের সরকার। মুক্তি পেলেন দুই মন্ত্রী আর বিভিন্ন দেশের ৬০ নাগরিক। সেবার হামলাকারীদের সঙ্গে ছিল ৬ সদস্য। নেতা স্বয়ং স্যাঞ্চেজ। দিবালোকে, হাতব্যাগে গ্রেনেড আর পিস্তল নিয়ে তারা ঢুকে পড়ে বৈঠক কক্ষে। অতর্কিত হামলা চালিয়ে আরব-অনারব দেশগুলোর ৬৩ জনকে নিয়ে গা ঢাকা দেয়। টাকার দরকার ছিল জঙ্গিদের। অস্ত্র কিনতে হয়। গোপন বসবাসের খরচ ব্যাপক। সন্ত্রাসী অভিযান চালাতে হলেও অর্থের দরকার। তাই ৫ কোটি টাকার বিনিময়ে মুক্তি দেয় বন্দীদের।
পরে, অভাবনীয় ঘটনা সংঘটিত করে অষ্ট্রেলিয়ায়। হামলা চালিয়ে ওদেশের কয়েকজন নাগরিককে আটক করে ঘোষণা করল, বন্দীদের খুন করবে না। ছেড়ে দেবে একটি শর্তে। কী এই শর্ত ? প্রতি দু ঘণ্টা অন্তর জাতীয় সংবাদ মাধ্যমে (টেলিভিশন) ফিলিস্তিনি আন্দোলনের খবর প্রচার করতে হবে। আর জঙ্গিদের জন্য বুলেটপ্রুফ বাস আর উন্নতমানের বিমান বরাদ্দ করতে হবে। সে বিমানেই তারা পালিয়ে যাবে অজানা গন্তব্যে। সরকার মেনে নেয় স্যাঞ্চেজের দাবি। নিরাপদে সহযোগী জঙ্গিদের নিয়ে পালিয়ে যায় সে। অনুমান, আলজেরিয়ায়। ইতিমধ্যে বিশ্ব জেনে গেছে তার নাম, ছদ্মনাম এবং ফিলিস্তিনি জঙ্গি যোগ। তার মূল নিশানা, পশ্চিমি দেশগুলোর বিভিন্ন ভিআইপি আর ইসরাইলের নাগরিকরা। বহু দেশ তার খোঁজে গোয়েন্দা নিয়োগ করল। অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে উঠল সি আই এ, মাসাদ , ইন্টারপোল। অবশেষে সন্ধান মিলল, সুদানের খার্তুমে সে বসবাস করছে। বিবাহিত। বিয়ে করেছে জর্ডন সুন্দরী লালা আবদুস সালেমকে। ১৯৯৩ সালে, জর্ডনি গোয়েন্দারাই এ খবর দেয় সিআইএ কে। দ্রুত সিয়ার এজেণ্ট উড়ে যায় খার্টুমে।
খার্টুম বিমান বন্দর থেকে সে ফোন করে খার্টুমের গোয়েন্দা সংস্থাকে। সি.আই.এ-র এজেন্ট আরব বংশোদ্ভূত। আরবি জানে। ইংরাজি জানে। আগেই জর্ডনি গোয়েন্দারা লানার ছবি দিয়ে রেখেছিল সিয়ার আরব এজেন্টকে। সে ছবির সূত্র ধরে স্যাঞ্চেজ দম্পতির বাসস্থান খুঁজে বের করে। সুদান স্যাঞ্চেজের পরিচয় জানত না। দুনিয়ার এক ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসবাদী স্যাঞ্চেজ ওরফে কার্লোস যে খার্টুমের উপকণ্ঠে সস্ত্রীক বাস করছে, এ তথ্য জানা ছিল না তাদের। এবার সক্রিয় হয়ে উঠল সুদানি গোয়েন্দারা। তল্লাশি অভিযানে নামল মূলত ফ্রান্স আর আমেরিকার চাপে। স্যাঞ্চেজ জানতে পারেনি বহু দেশীয় গোয়েন্দারা তার সন্ধান পেয়ে গেছে।
একদিন সহজ ফাঁদে পা দিল সে। ধরা পড়ে গেল। সুযোগ পেলেই পালিয়ে যাবে, এ আশঙ্কায় তার দেহে ইঞ্জেকশন ঢুকিয়ে, অজ্ঞান অবস্থায় খার্টুম বিমান বন্দরে ফ্রান্সের হাতে তুলে দেয় সুদানের গোয়েন্দা পুলিশ। ফ্রান্সে শুরু হয় তার বিচার। আদালতে দাঁড়িয়ে সে স্বীকার করে, ফিলিস্তিনিদের স্বার্থে সে সন্ত্রাসবাদে দীক্ষা নেয়। উদ্দেশ্য নয়, সুলভ আত্মপ্রচার। সরাসরি সন্ত্রাসবাদে তার হাতেখড়ি হয় লণ্ডনে, ১৯৭০ সালের ৩০ ডিসেম্বর। ইহুদি পোশাক ব্যবসায়ী জোসেফ এডোয়ার্ডকে হত্যা করার বরাত পেয়ে হাজির হয় লণ্ডনের অভিজাত এলাকায়। জোসেফ এখন বাড়িতে। নিরস্ত্র ব্যবসায়ী ঘটনাচক্রে বেঁচে গেলেন। গুলি তাঁর গায়ে লাগল না। স্যাঞ্চেজের প্রথম মিশন ব্যর্থ হল বটে, কিন্তু বিশ্ব জেনে গেল ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসবাদের কবল থেকে ইসরাইলি ব্যবসায়ী আর তাঁদের মদতদাতাদের রেহাই নেই। হত্যাকাণ্ডের ছকে জড়িয়ে পড়েছে ভেনিজুয়েলার অচেনা এক যুবক। কালক্রমে, স্যাঞ্চেজ এতটাই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল যে, তার নাম, ছদ্মনাম খুঁজে বের করতে পুলিশ মরিয়া হয়ে ছুটতে থাকল দেশে দেশে।
স্যাঞ্চেজ এখনও হয়তো অধরা হয়ে থাকত। ধরা পড়ল, দুটো ভুলের জন্য। সুদানকে নিরাপদ ভেবে প্রায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াত। একবার স্থানীয় এক বাসিন্দার সঙ্গে বিবাদে সে জড়িয়ে পড়লে পুলিশ তার গতিবিধির ওপর নজরদারি শুরু করে দেয়। দ্বিতীয় ভুল, সুন্দরী লানার সঙ্গে বিবাহ। পুলিশের সন্দেহ হয় লানা ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু নয় তো ! জর্ডন সুন্দরীই কি বিয়ে করে আশ্রয় দিয়েছে ফিলিস্তিনিদের সমর্থক ভেনিজুয়েলার জঙ্গিকে।
♦—♦
❤ Support Us








