Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক
  • এপ্রিল ১০, ২০২২

লঙ্কাগড়ের লঙ্কাকাণ্ড

পর্ব ২৪

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী
লঙ্কাগড়ের লঙ্কাকাণ্ড

চিত্র: দেব সরকার

   ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল বাংলার নাড়াজোল রাজবংশ । সেই রাজবাড়ির পরিখায় তরবারি হাতে পাহাড়া দিতেন স্বয়ং দেবী জয়দুর্গা । জনশ্রুতি তাঁর অসির জ্যোতিতে অত্যাচারি ইংরেজরা চোখ ঢাকত। বর্গীরাও এই জনপদের ধারেকাছে ঘেঁষতে পারতো না। সেই দেবী জয়দুর্গার অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে এই ধারাবাহিক…

রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে জয়দুর্গা মন্দিরের সন্ধ্যারতির ঘন্টা বেজে ওঠে আবার । সব যেন ঠিক আবার আগের মতো । বসার ঘরে বিভীষণ মণ্ডল আর অমূল্যজ্যেঠুকে ঘিরে সকলে বসে রয়েছে । রঙ্গীল বলল,”কে এই জয়রাম সিং জ্যেঠু ?”জ্যেঠু সামান্য ভেবে বলল ।
–তবে শোনো । আমার এই রাজবাড়ির শত্রু তেমন নেই । নাড়াজলের রাজপরিবার অন্য রাজাদের মতো অত্যাচারী ছিল না । তারা ছিল প্রজাবৎসল। যুদ্ধ নয় । রাজারা ধর্ম কর্মতেই বেশি আগ্রহী । কিন্তু ১৭৪০ সালের আশপাশে একদল মারাঠি লুঠেরা সেই নাড়াজলের উপরে যখন আছড়ে পড়ল,রাজারা অস্ত্র তুলে নিতে বাধ্য হলেন । তোমাদের জয়দুর্গার সেই ঢাল তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধ করবার গল্প আগেই বলেছি । সেই সময়কার রাজা অভিরাম খান আর তার পুত্র ত্রিলোচন খান ঠিক করলেন তারা বর্গীদের তাঁদের রাজ্যে ঢুকতে দেবেন না । ততোদিনে বর্গীরা ক্ষীরপাই এ সাহেব সৈনিক এডওয়ার্ড বাবারশাহের হাতে আচ্ছা করে হেনস্থা হয়েছে । বাবরশাহ মিষ্টির নাম যে এভাবেই রঙ্গীল তো তুমি জানোই । কিন্তু ক্ষীরপাইএর হারের বদলা বর্গীরা নাড়াজল আক্রমণ করে নেবে বলেই ঠিক করল । সেই বর্গীদলের নেতা ছিল জ্যোতিরাম সিং । বর্গীদলে থাকলেও তার বাবা ছিলেন রাজপুত । মা মারাঠী । জ্যোতিরাম তরবারি আর ভল্লবিদ্যায় পারদর্শী । এছাড়াও তার বদনাম ছিল । সে যে গ্রামে যেত,লুঠ করবার পর সে সেই গ্রাম জ্বালিয়ে দিত । এটাই ছিল তার রীতি । অভিরাম খান ঠিক করলেন তিনি এদের যে করেই হোক আটকে দেবেন । তার সঙ্গে হিন্দুমুসলমান নির্বিশেষে সমস্ত নাড়াজোলবাসী একত্রিত হয়ে যুদ্ধ করবে ঠিক করল । পরিখার ধারে ভয়ানক যুদ্ধ হল । যুদ্ধে জ্যোতিরাম সিং শোচনীয়ভাবে হেরে গেলেন । যুদ্ধে পরাস্ত অধিনায়কের শিরোশ্ছেদ করাই রীতি । কিন্তু রাজা অভিরাম খান সেই রীতি মানলেন না । জ্যোতিরামকে তিনি ক্ষমা করে দিলেন । হত্যার রাজনীতি নাড়াজোল করে না । জ্যোতিরাম প্রাণে বেঁচে গেলেন বটে,কিন্তু মারাঠা বাহিনীর কাছে তিনি হয়ে উঠলেন কলঙ্কিত নায়ক । সকলে তাকে ভীরু কাপুরুষ ভাবতে শুরু করল । শেষমেশ জ্যোতিরাম সিং ও তার পরিবারকে মারাঠা বাহিনী থেকে বের করে দেওয়া হল চিরকালের জন্য । তারপর কী হয়েছিল কেউ জানে না । মারাঠা বর্গীদের আক্রমণের কথা আমার অগ্রজ পূর্বপুরুষ রাজা মহেন্দ্রলাল খান তার দিনলিপিতে লিখেছেন । সেখানে জ্যোতিরামের কথা নেই । এ গল্প আমি আমার বাবা,আমার বাবা তার বাবার কাছ থেকে শুনে এনেছিলেন ।
–তারপর কী হলো ? তিন্নি মন দিয়ে শুনছিল ।

– জ্যোতিরামের গল্প নাড়াজোলের চিত্রকর পাড়ায় এখনও পুরনো দিনের কোনও কোনও শিল্পী বলে থাকেন । তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নূরচাচা । জয়রাম সিং এই জ্যোতিরাম সিংএরই উত্তরসূরী । হয়তো নাড়াজোলের বিরুদ্ধে পারিবারিক প্রতিশোধস্পৃহা জ্যোতিরামের পরিবার বংশানুক্রমে পুষে রেখেছিল । রাজা অভিরামের আত্মীয় ছিলেন কর্ণগড় রাজ যশোমন্ত সিংহ । তারপর রাজা চুণীলাল খান হন রাণী শিরোমণির সহযোদ্ধা । সুতরাং লঙ্কাগড়ের গুপ্তধনের কথা জয়রাম পারিবারিক সূত্রেই জেনে এসেছিল হয়তো । সে সেই উদ্দেশ্যেই বছর দেড়েক আগে গবেষক সেজে নাড়াজোল আসে । এসে প্রাথমিক গবেষণার পর সে বুঝতে পারে লঙ্কাগড়ের গুপ্তধন নেহাত কল্পকথা নয় । মনে মনে সে ভাবল হয়তো প্রতিশোধ নেবার পাশাপাশি এই সুযোগে গুপ্তধনটাও হাতিয়ে নেওয়া যাবে ।

–একেই বলে রথ দেখা আর কলা বেচা । সুনন্দাদিদি বলে ।
– ঠিক তাই । জয়রাম ততোদিনে শহরের ধনী স্বর্ণব্যবসায়ী । মার্বেলের ফলক নিলামে কিনে সে বুঝল শুধুই টাকা দিয়েই লঙ্কাগড়ের গুপ্তধন হাতানো যাবে না । আসলে বর্গীয়ানা জয়রামের রক্তে মিশে আছে । সে লুঠ করে জ্বালিয়ে দিতে জানে । কিন্তু দারু শিল্পের শৈল্পিক দক্ষতা তার নেই । জয়রাম প্রথমে অবনী আর গোপালকে হাত করতে চাইল । পরিচিতি আর প্রচারের লোভ দেখিয়ে রামতনু কাহারকেও হাত করল সে । অবনী জয়রামের ফেলে রাখা সেই ফাঁদে পা দিলেও রামতনু আর গোপাল আমার বিরুদ্ধে যেতে রাজি হলো না । এদিকে জয়রাম অস্ত্র আর প্রাণভয় দেখিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করে দিল । এই গোপন আলোচনাটি দেখে ফেলেছিল আমাদের চন্দন । বাকিটা চন্দন বলুক ।
– রাজাজ্যেঠুকে ছোটবেলা থেকে চিনতাম আমি । বাবা যে এই ষড়যন্ত্রে রাজি হয়নি প্রথমে বুঝিনি । কিন্তু এটা বুঝেছিলাম যে ওই উল্কি আঁকা লোকটা রাজাবাবুর ক্ষতি করতে চায় । এদিকে সরাসরি রাজাজ্যেঠুকে কিছু বললে ওই লোকটা ক্ষতি কুরে দিবে । তাই ঠিক করলাম চিঠি দিব ।
– আর রাজু যাদব ?
বিভীষণ মণ্ডল এবার বলতে শুরু করে ।
– রাজুকে আমি সেই ট্রেনিংএর দিনগুলো থেকে চিনতাম । যেমন সৎ তেমনই সিনসিয়ার । ওকে লালবাজার স্পেশাল মিশনে লঙ্কাগড় পাঠিয়েছে শুনে প্রথমে আমি ঘাবড়ে যাই । পরে জানতে পারি ওই জয়রাম সিং শুধুই একজন সোনাব্যবসায়ী নয় । ‘সিম তুপুৎ’ থুড়ি থুড়ি ‘মোরগ লড়াই’এর মতো সারা দেশ জুড়ে চোরা অস্ত্রশস্ত্র আর মাদকের একটা স্মাগলিং রাকেট চালায় ও । ইনটেলিজেন্স এর কাছে ইনফরমেশন ছিল । লোকটা এখানেই আছে । রাজুর সঙ্গে চন্দনের দেখা হয়ে গেল । কিন্তু কিছু করবার আগেই এক ‘তিকেন বেড়া’ থুড়ি থুড়ি দুপুরবেলা রাজুকে ওরা একটা কোল্ড স্টোরেজে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করে তারপর আগুন জ্বালিয়ে দিল । খবরের কাগজ,মিডিয়া,এমনকি প্রথম প্রথম আমরাও কিছুই জানতে পারলাম না ।
এসব কথা শুনে মাম দুকান চেপে বলে,”বাপরে । কী সাঙ্ঘাতিক লোক ।”
সত্যিই সাঙ্ঘাতিক লোক জয়রাম সিং । বিভীষণ মণ্ডল এইবার উঠে পড়ে । তাকে থানায় রিপোর্ট করে জেরা করে বের করতে হবে খবর।
– একটা কথা।জয়রাম সিং যতোক্ষণ ধরা না পড়ছে ততোক্ষণ কেউ এদিকওদিক যাবেন না । ইঞ থুড়ি থুড়ি আমি আপনাদের সুরক্ষার জন্য দুজন কনস্টেবলকে এখানে পোস্ট করে যাচ্ছি । কাল দেখা হচ্ছে ।
বিভীষণ মণ্ডল চলে গেল বনবিভাগের জিপ চড়ে । খাবার ঘরে নৈশভোজের ডাক পড়ল সকলের । কিন্তু রঙ্গীলের মন যেন ছটফট করতে থাকে । সবই তো হলো,কিন্তু লঙ্কাগড়ের গুপ্তধন টা যে শেষ অবধি দেখাই হলো না তার । তার চেয়েও তার মনের আফশোস থেকে গেল । ধাঁধাঁর শেষ দুটো সূত্র যে সমাধান হলো না শেষ অবধি । রঙ্গীলের মুখে চোখের সেই উদাসীনতা বাপির চোখ এড়ালো না ।
– কী হলো তোর ? মন খারাপ কেন ?
চন্দন বলল,”আমারও মন খারাপ।”
– কেন রে তোদের মন খারাপ?
রঙ্গীল বলল,”লঙ্কাগড়ে গুপ্তধনটা কোথায় আছে সমাধান না করেই আমরা চলে যাব ? এটা মন থেকে ভালো লাগছে না আমার ।”
চন্দন বলল,”আমারও ঠিক সেই কারণেই মন খারাপ।”
ওদের কথোপকথন কীভাবে যেন জ্যেঠুর কানে পৌঁছে গেল । অমূল্যজ্যেঠু বলল,”কেন হবে না রহস্য সমাধান ? কালকেই আমরা সেই গুপ্তধন খুঁজে বের করব । এবার খুশি রঙ্গীল আর চন্দন?”
–কিন্তু বিভীষণ মণ্ডল যে আমাদের একা একা বাইরে যেতে বারণ করে গেল?
– আমি নাড়াজোলের বড়কুমার । এতোদিন বাদে আমার শিকারী বন্দুক আমি এমনি বের করেছি।আসতে দাও জয়রামকে । ওর রক্তে যদি বর্গী রক্ত থাকে,আমার রক্তেও তবে নাড়াজোলের রাজরক্ত বইছে ।

ক্রমশ..


❤ Support Us
error: Content is protected !!