- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৫
লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে দ্বন্দ্ব ! যৌনাঙ্গ কেটে ফেলে হাসপাতালে ভর্তি রূপান্তরকামী ইউপিএসসি পরীক্ষার্থী
লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব। পরিবার, সমাজ, ভবিষ্যতের চাপে চুপ করে থাকা। কিন্তু অবশেষে আর সামলাতে না পেরে কিশোর বেছে নিল এক চরম সিদ্ধান্ত। নিজের যৌনাঙ্গ কেটে ফেলল ২২ বছরের এক ইউপিএসসি পরীক্ষার্থী। বর্তমানে সে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ঘটনাস্থল উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজ। পরীক্ষার্থীর বাড়ি রাজ্যেরই এক প্রত্যন্ত গ্রামে। কৃষক পরিবারে একমাত্র আশার আলো সে। তাঁকে আইএএস বানানোর স্বপ্ন বুনেছিল সকলে মিলে। ছোটো থেকেই পড়াশোনায় ভালো, সিবিএসই বোর্ডে সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে সে চলে আসে প্রয়াগরাজে, এক নামী কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয় ইউপিএসসি-র প্রস্তুতির জন্য। কিন্তু বাইরে যতই আত্মবিশ্বাসের মুখোশ, ভিতরে ততটাই অস্থিরতা। লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপড়েনে ভুগছিল সে। হাসপাতালের চিকিৎসকদের সে জানিয়েছে, ১৪ বছর বয়সে স্কুলের এক অনুষ্ঠানে মেয়েদের সঙ্গে নাচ করার সময় সে প্রথম অনুভব করে ‘ভিন্নতা’। সে থেকেই তাঁর মনে হতে থাকে, সে হয়তো আসলে রূপান্তরকামী। কিন্তু সমাজের ভয়, পরিবারের আশাভরসা, বন্ধুবান্ধবের প্রশ্ন, সব মিলিয়ে নিজেকে চুপ করিয়ে রাখে সে।
প্রয়াগরাজে এসে কোচিংয়ের ফাঁকে শুরু করে গোপন অনুসন্ধান, কীভাবে একটি লিঙ্গ রূপান্তর হতে পারে। ইউটিউবে নানা ভিডিও, পড়ে বিভিন্ন ব্লগ পড়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়। সূত্র ধরে যোগাযোগ হয় এক তথাকথিত ‘চিকিৎসক’-এর সঙ্গে, নাম ড. জেনিথ। অভিযোগ, সেই জেনিথই তাকে বলে, নিজের যৌনাঙ্গ কেটে ফেললে ‘সমস্যা মিটে যাবে’। এমনকি কীভাবে তা করতে হবে, কী ওষুধ লাগবে, সবই বিস্তারিতভাবে বুঝিয়ে দেন তিনি। একা ঘরে বসে সমস্ত প্রস্তুতি সেরে ফেলে ওই তরুণ। অ্যানাস্থেসিয়া, ব্লেড, ব্যান্ডেজ সংগ্রহ হয় সবই। এবং একদিন রাতে, একা, সবার অজান্তে নিজের শরীরে অস্ত্রোপচার চালায় সে। তবে যন্ত্রণা অসহ্য হয়ে ওঠে, রক্তপাত বন্ধ হয় না। বাধ্য হয়ে অন্যদের সাহায্য চায়। বাড়িওয়ালা তৎপর হয়ে অ্যাম্বুল্যান্স ডাকেন। প্রথমে ভর্তি হয় তেজ বাহাদুর সাপ্রু হাসপাতালে, পরে স্থানান্তরিত করা হয় স্বরূপ রানি নেহরু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে তাকে স্বরূপ রানী নেহেরু হাসপাতালে রেফার করা হয়। এসআরএন হাসপাতালে ভর্তি করার পর বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের একটি দল তার চিকিৎসা শুরু করে। যুবকটি জানায়, ‘মেয়েদের প্রতি আমার কোনো আগ্রহ নেই। আমার মনে হয় আমার কণ্ঠস্বরও মেয়েদের মতো। আমার হাঁটার ধরণও মেয়েদের মতো।‘
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আপাতত তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল। বড়ো রকমের সংক্রমণ হয়নি বলেই রক্ষা। অস্ত্রোপচার করে তার মূত্রনালী নতুনভাবে তৈরি করা হবে। তবে মানসিক আঘাত গভীর। তাকে মনোবিদের তত্ত্বাবধানে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। ভবিস্যতে যদি সে তার লিঙ্গ পরিবর্তন করতে চায়, তাহলে এক বছর চিকিৎসা এবং হরমোন ওষুধের পর তার লিঙ্গ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া করা যেতে পারে। এর জন্য লিঙ্গ পুনর্নির্ধারণ সার্জারি প্রয়োজন। এ সম্পর্কিত বহুমুখী মেডিকেল টিম রয়েছে। এই টিমে সার্জন, প্লাস্টিক সার্জন, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, ইউরোলজিস্ট অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। সিনিয়র সার্জন সন্তোষ সিং-এর মতে, ‘ছাত্রটি জেন্ডার আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার বা জেন্ডার ডিসফোরিয়ায় ভুগছে। হাসপাতালে ইউপিএসসি পরীক্ষার্থীর মা বারবার কাঁদছিলেন—‘আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিন… ও আবার আগের মতো হয়ে যাক।’ কিন্তু চিকিৎসকেরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, এ ঘটনাকে কেবল শারীরিক চিকিৎসার দৃষ্টিতে দেখা যাবে না। এর গভীরে রয়েছে মানসিক, সামাজিক ও পরিচয়গত লড়াই।
ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে প্রশাসন। জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে ড. জেনিথকে। যদি প্রমাণ হয় তার ‘পরামর্শেই’ এই কাজ, তবে তার বিরুদ্ধে জামিন-অযোগ্য ধারায় মামলা দায়ের হবে বলে জানিয়েছেন এক পুলিশ আধিকারিক। এ ঘটনা আবারো চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল, সমাজ এখনো কতটা অজ্ঞ, কতটা নির্মম। লিঙ্গ পরিচয়কে ঘিরে থাকা নীরবতা, ভয় আর চাপে ভারতের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার পরীক্ষার্থী যদি নিজের শরীরেই অস্ত্র চালাতে বাধ্য হযন, এ দায় পরিবারের, পরামর্শদাতা চিকিৎসকের এবং সমাজের।
❤ Support Us







