Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • জুলাই ১১, ২০২৫

পাকিস্তানে জাতিগত সহিংসতা অব্যাহত ! বালোচিস্তানে বাস থেকে নামিয়ে ৯ যাত্রীকে গুলি করে হত্যা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
পাকিস্তানে জাতিগত সহিংসতা অব্যাহত ! বালোচিস্তানে বাস থেকে নামিয়ে ৯ যাত্রীকে গুলি করে হত্যা

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই থামিয়ে দেওয়া হল বাস। পরিচয়পত্র দেখে বেছে নেওয়া হল নির্দিষ্ট যাত্রীদের। কিছু ক্ষণের মধ্যেই তাঁদের আর্তনাদ মিলিয়ে গেল পাহাড়ি অন্ধকারে। শুক্রবার সকালে মিলল গুলিবিদ্ধ দেহ— এক, দুই নয়, একেবারে ৯ জন। পাকিস্তানের বালোচিস্তান প্রদেশে ফের একবার রক্তাক্ত হল জাতিগত সম্পর্কের ইতিহাস।

বালোচিস্তান প্রাদেশিক সরকারের মুখপাত্র শাহিদ রিন্দ জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কোয়েটা থেকে লাহোরগামী একাধিক বাস থামিয়ে অস্ত্রধারীরা যাত্রীদের নামিয়ে পরিচয়পত্র পরীক্ষা করতে শুরু করে। যাঁরা পাঞ্জাব প্রদেশের বাসিন্দা, তাঁদের আলাদা করে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় কাছাকাছি এক দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে। পরে রাতে তাঁদের গুলিবিদ্ধ দেহ উদ্ধার করে নিরাপত্তা বাহিনী। এখনো পর্যন্ত কোনো সংগঠন এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার না করলেও, প্রশাসনের মতে, এ কায়দা তাঁদের খুব চেনা। এর আগেও ঠিক এইভাবে হামলা চালিয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদী বালোচ জঙ্গি সংগঠনগুলি। বিশেষ করে বালোচ লিবারেশন আর্মি— যারা বালোচিস্তানের স্বাধীনতার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলন চালাচ্ছে, তাদের দিকেই সন্দেহের তীর। স্থানীয় প্রশাসনিক আধিকারিক নবীদ আলম জানিয়েছেন, ‘দেহগুলিতে গুলি করার স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে। পরিচয়পত্র দেখে পরিকল্পিতভাবে বেছে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে।’

পাকিস্তানের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে খনিজ-সমৃদ্ধ প্রদেশ বালোচিস্তান। তেল, গ্যাস, সোনা, তামা এবং অন্যান্য খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার এটি। অথচ এখানকার অধিকাংশ মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে। এ এলাকা থেকে উত্তোলিত কোটি কোটি টাকার খনিজ রফতানি হলেও, প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে দিনগুজরান করেন। ক্ষোভ আর বঞ্চনা থেকে জ্বলছে আগুন। বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর অভিযোগ— ইসলামাবাদ ও পাঞ্জাব ভিত্তিক ক্ষমতাসীন শ্রেণি বালোচিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ লুটে নিচ্ছে, অথচ স্থানীয় বালোচ জনগণ এই সম্পদের কোনো সুফল পাচ্ছে না। পাচ্ছে না শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিকাঠামোর ন্যূনতম সুযোগ। তাদের অভিযোগ, তারা রাজনৈতিকভাবে বঞ্চিত, অর্থনৈতিকভাবে অবহেলিত এবং সাংস্কৃতিকভাবে নিপীড়নের শিকার। ফলত, প্রতিবাদ রূপ নিচ্ছে সহিংসতায়।

বালোচ বিদ্রোহীরা প্রায়ই এমন হামলা চালায়, যেখানে তারা পাঞ্জাবি জাতিসত্তার মানুষদের টার্গেট করে। তাদের মতে, পাঞ্জাবি জাতিগোষ্ঠী পাকিস্তানের সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তির মূল কেন্দ্র এবং তারাই বালোচিস্তানের সম্পদ শোষণের প্রধান উপভোক্তা। সে কারণে এর আগেও এমন বহু ঘটনা ঘটেছে যেখানে বাস থামিয়ে যাত্রীদের পরিচয় যাচাই করে শুধুমাত্র পাঞ্জাবি যাত্রীদের হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডও সম্ভবত ওই ধরনেরই একটি জাতিগত বিদ্বেষমূলক হামলা। এবারো যাত্রীদের গন্তব্য ছিল লাহোর। খাস পাঞ্জাব। আর ঠিক সেই কারণেই টার্গেট হয়ে উঠলেন তাঁরা। মৃতদের নাম-পরিচয় এখনো সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানাচ্ছেন, হামলাকারীরা মুখ ঢেকে এসেছিল, আধা-সামরিক কায়দায় কাজ চালিয়ে দ্রুত পাহাড়ের দিকে চলে যায়।

এই ধরনের ঘটনাগুলো শুধু সহিংসতা নয়, বরং একটি গভীরতর মানবিক সংকট ও জাতিগত বিভেদের প্রতিচ্ছবি। বালোচিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং সেনাবাহিনী, আধা-সামরিক বাহিনী, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী এবং স্থানীয় মিলিশিয়াদের মধ্যে নিয়মিত সংঘর্ষ হয়ে থাকে। বর্বর এ ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছে একাধিক মানবাধিকার সংস্থা। তাদের মতেও, এই ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন হামলা নয়, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে চলা জাতিগত ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিফলন। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিশ্বমঞ্চে প্রায়শই অভিযোগ তোলে যে, পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী বালোচিস্তান অঞ্চলে গোপন অপারেশনের মাধ্যমে স্থানীয়দের গুম, আটক ও হত্যা করে থাকে, যার ফলে প্রতিবাদী মনোভাব আরো ঘনীভূত হয়েছে। ফলে সে অঞ্চলের যুবাদের একাংশ ক্রমেই ঝুঁকে পড়ছে চরমপন্থার দিকে। পাক-প্রশাসন বলছে, জঙ্গিদের বিরুদ্ধে তীব্র অভিযান চলবে। কিন্তু সাধারণ বালোচ মানুষের মনে প্রশ্ন— কখন মিলবে শান্তি? এই প্রশ্নের উত্তরই আপাতত সবচেয়ে দুর্লভ। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি শুধুমাত্র সামরিক শক্তি দিয়ে দমন করা সম্ভব নয়, প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, ন্যায্য সম্পদ বণ্টন, আর আলোচনাভিত্তিক সমাধান।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!