- এই মুহূর্তে দে । শ
- আগস্ট ৭, ২০২৫
প্রয়াত ইতিহাসবিদ রজতকান্ত রায়
৭৯ বছর বয়সে প্রয়াত আধুনিক ভারতের ইতিহাসচর্চার অন্যতম পথপ্রদর্শক, অধ্যাপক রজতকান্ত রায়। বুধবার নিউ টাউনের বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতাই মৃত্যু ডেকে আনে, জানিয়েছেন তাঁর স্ত্রী নুপূর চৌধুরী। রজতকান্ত রায় কেবল ইতিহাসের শিক্ষক নন, ছাত্রদের জন্য ছিলেন প্রাণোচ্ছল আলোকবর্তিকা, ইতিহাসের বিবর্ণ পাতাকে অনুভব, ব্যাখ্যা ও চিন্তায় নতুন পথে লালিল আর চালিত করতেন যিনি। ৩ দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রেসিডেন্সি কলেজে (বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) ইতিহাস পড়িয়েছেন। যাঁর ক্লাসে শ্রোতা হিসেবে উপস্থিত থাকতেন সাবেক রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধী।
১৯৪৬ সালের ৬ মে কলকাতায় জন্ম রজতকান্ত রায়ের। বাবা কুমুদকান্ত রায় ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি আধিকারিক, যিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্য সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। রজতকান্তের বেড়ে ওঠা এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে, সেখানেই পান জীবনের মহার্ঘ্য পাঠ, অল্প বয়সেই বুঝতে শেখেন শিক্ষার পাঠ কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক শেষ করে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে ইতিহাসে অনার্সে ভর্তি হন এবং পরে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অনিল শীলের তত্ত্বাবধানে। দেশে ফিরে আইআইএম কলকাতায় শিক্ষকতা শুরু করেন এবং কিছুদিন পর যোগ দেন প্রেসিডেন্সি কলেজে।
রজত রায় ছিলেন এমন এক সজল-সবল উচ্চারণ, যিনি কেবল ইতিহাসের তথ্য নয়, দৃষ্টিভঙ্গিও এঁকে দিতেন শ্রোতার মননে-চিন্তায়, ভাবনায়। তাঁর ক্লাসের বিষয় ছিল কখনো ফরাসি বিপ্লব, কখনো ১৮৫৭-র বিদ্রোহ, কখনো পলাশীর ষড়যন্ত্র—তবে সব কিছুর মধ্যেই থাকত ইতিহাসের ‘কেন’ ও ‘কীভাবে’র গভীর বিশ্লেষণ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক এবং রজতকান্ত রায়ের প্রাক্তন ছাত্র কিংশুক চট্টোপাধ্যায় স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘স্যার মার্কসীয় বিশ্লেষণ জানতেন, কিন্তু কখনো কট্টর মতাদর্শে বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু তাঁর বক্তব্য ছিল বিশ্লেষণের কঠিন পরিশীলন। ১৮৫৭ বিদ্রোহ পড়ার সময় তিনি আমাদের ইতিহাসের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের ভেতরকার টানাপোড়েন বুঝিয়েছিলেন, যা আজও মনে উদ্ধীপ্ত ভঙ্গীমায় জীবন্ত।’ তাঁর শিষ্যদের অনেকেই আজ বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ, শিক্ষক কিংবা গবেষক। এক প্রাক্তন ছাত্রী বলছিলেন, ‘প্রথম দিনেই স্যার আমাদের নিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজের মূল ভবন ঘুরে দেখিয়েছিলেন। হিন্দু কলেজের ইতিহাস থেকে প্রেসিডেন্সি ভবনের ঠিকানা পর্যন্ত আমাদের শেখানোর মধ্যেও ছিল এক ধরনের ঐতিহ্য-সচেতনতা।’ আরেক ছাত্র, জয়ন্ত সেনগুপ্ত, বর্তমানে আলিপুর মিউজিয়ামের ডিরেক্টর, বলেন, ‘স্যারের লেকচার আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছিল। ইতিহাসকে নিছক তথ্য নয়, চিন্তার সাধনা হিসেবে দেখা শিখেছিলাম।’
২০০৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালাম তাঁকে বিশ্বভারতীর উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ করেন। তাঁর কার্যকালে শান্তিনিকেতনের স্থাপত্য, ইতিহাস ও রবীন্দ্রস্মৃতি রক্ষায় নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। অনেকের মতে, রজতের প্রশাসনিক মেধাও ছিল অনন্য, যদিও তাঁর স্বাভাবিক স্বভাব ছিল নিভৃত গবেষণার মগ্ন থাকা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রধান অমিত দে-র চোখে অনুজদের প্রতি রজতকান্তের অকুণ্ঠ প্রশ্রয়ও অবিস্মরণীয়। তাঁর কথায়, ‘কৃষি-রাজনীতির ইতিহাসবিদ হিসেবে লেখালিখি শুরু করেও রজতকান্ত ক্রমশ সংস্কৃতি, মননের ইতিহাসকার হয়ে ওঠেন।’ রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘সম্মানিত ও প্রিয় অধ্যাপক ও ইতিহাসবিদ রজতকান্ত রায়ের প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তিনি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়িয়েছেন এবং বহু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ছাত্র গড়ে তুলেছেন। বাংলার সামাজিক-অর্থনৈতিক ইতিহাসে তাঁর অবদান আমাদের অতীতকে বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।’
রজতকান্ত রায়ের চিন্তাধারায় ছিল স্পষ্ট মৌলিকতা। ইতিহাসকে তিনি দেখতেন শুধু রাজনৈতিক ঘটনাবলির পরম্পরায় নয়, বরং মনন, সংস্কৃতি ও আবেগের ইতিহাস হিসেবে। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বইগুলির মধ্যে রয়েছে— The Felt Community: Commonality and Mentality Before the Emergence of Indian Nationalism, Social Conflict and Political Unrest in Bengal 1875–1927, Exploring Emotional History, Behind the Veil: Paintings of Rabindranath Tagore Reminiscent of Jivanadevata. শেষ জীবনে রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনদেবতা ভাবনা’র উপর ভিত্তি করে লিখছিলেন— ‘তিমির অবগুণ্ঠনে’। ধারাবাহিক প্রবন্ধ আকারে দেশ পত্রিকায় ছাপা হচ্ছিল। শেষ দিনেও তিনি সে রচনার ভূমিকা লেখার কাজে ডুবে ছিলেন বলে জানিয়েছেন অধ্যপকের শোকাতুর আত্মজনেরা। এভাবেই জীবনদেবতার আলোয় ইতিহাস খুঁজতে খুঁজতে পারাপারের দেশে চলে গেলেন। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্সির ২০৭তম প্রতিষ্ঠা দিবসে তিনি শেষবার সাবেক কর্মক্ষেত্রে এসেছিলেন। সেখানে তাঁকে ‘অতুলচন্দ্র গুপ্ত ডিস্টিংগুইশড অ্যালামনাস অ্যাওয়ার্ড’-এ সম্মানিত করা হয়। সে দিনই দিয়েছিলেন প্রতিষ্ঠা দিবস বক্তৃতা—প্রেসিডেন্সির ইতিহাস, নিজস্ব স্মৃতি আর নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে কিছু কথা। শুধু ইতিহাসের পাঠদাতা নন, সময়ের রাজনৈতিক অভিঘাতে সাড়া দেওয়া এক সজাগ কণ্ঠ অধ্যাপক রজতকান্ত রায়। সিডিশন আইনে কানহাইয়া কুমার বা উমর খালিদের গ্রেফতারির সময় তিনি সরব হয়েছিলেন। কলম ধরেছিলেন সরকারের বিরুদ্ধে, যুক্তির পক্ষে। তাঁর চলে যাওয়া বাংলা ইতিহাসচর্চায় এক দূরহ শূন্যতার বুনন তৈরি করে গেল। রেখে গেলেন স্ত্রী, দুই কন্যা এবং অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর মণিকোঠায় জমে থাকা স্মৃতি, আকণ্ঠ শ্রদ্ধা ও এগিয়ে চলবার, ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানোর অনুপ্রেরণা।
❤ Support Us







