- খাস-কলম পা | র্স | পে | ক্টি | ভ
- এপ্রিল ১৫, ২০২৩
বাংলা সালের ইতিবৃত্ত
বছরকয়েক আগে একটা দরকারে তাঁর জন্মসাল জানতে চাওয়ায় বর্ষীয়ান কথা-সাহিত্যিক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন— বাবা বলতেন, সেই যে-বার ভয়ংকর বন্যা হয়েছিল, ঘরবাড়ি সব ভেসে গিয়েছিল, সেবছরই আমার জন্ম। সে-কথা বলার পর অবশ্য তাঁর জন্মসালটি তিনি বলেছিলেন বটে। সেইসঙ্গে প্রশ্নকর্তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন বেশ কয়েক হাজার বছর অতীতে। কোনো-এক বড়ো ঘটনাকে মনে রেখে মানুষের সময় মাপার প্রাচীনতম পদ্ধতিতে।
পরে, আকাশের দিকে বহু বছরের অবাক দৃষ্টি ঘুরিয়ে মানুষ প্রথমে চাঁদ আর সূর্যকে চিহ্নিত করে। ক্রমে গ্রহ আর কিছু নক্ষত্রকেও চিনতে সক্ষম হয়। কিন্তু ওই যে চাঁদ আর সূর্যকে প্রথম চিনেছিল, সেই জ্ঞান আজও ভোলেনি। পরে সময় মাপার ক্ষেত্রে সবার আগে তার হিসেবে আসে মাথার উপর জ্বলজ্বল-করা চাঁদের আর সূর্যের উদয়-অস্তের কথা।
নিজের কক্ষপথে পৃথিবীর চারদিকে চাঁদের প্রদক্ষিণ করার সময়টিকে মানুষ মাপ হিসেবে নিয়েছিল। সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর প্রদক্ষিণ করাটাও ছিল আর একটা মাপ। চাঁদ নাকি সূর্য— কার প্রদক্ষিণের মাপ সে গ্রহণ করবে? কাছের বলেই হয়তো অগ্রাধিকার পেয়েছিল চাঁদ। সুমেরীয় সভ্যতায় সময় গণনার পরিমাপক ছিল চাঁদের গতিপথ। এবং তারা বছরের একটা কাঠামোও তৈরি করতে পেরেছিল। বছরটিকে ভাগও করেছিল ঠিক বারোটি মাসে, যা আজো আমরা মেনে চলি। তবে, সেটাই সম্ভবত বর্ষগণনার প্রাচীনতম নিদর্শন হলেও কয়েক হাজার বছরের মেসোপটেমীয় সভ্যতায় মাসগুলোর নাম কখনো-বা পালটে পালটে গেছে। এখানে ব্যাবিলনীয় বারো মাসের নাম আমরা দেখব— নিসান্নু, আইয়ারু, সিমান্নু, দু’উজু, আবু, উলুলু, তাসরিতু, আরাখসামনা, কিসলিমু, তেবেতু, শাবাতু এবং আদ্দারু।
পয়লা নিসান্নু— বসন্তকালের প্রথম দিনটি ছিল তাদের নববর্ষ। প্রায় চার হাজার বছর আগে ইরানিরা সুমেরীয় বর্ষগণনার পদ্ধতিকে সংস্কার করে সৌরবর্ষের রূপ দেয়। কেননা, সূর্যই ছিল তাদের প্রধান উপাস্য। এবং ঊষর ব্যাবিলনের তুলনায় ইরান ছিল সুজলা-সুফলা কৃষিভিত্তিক একটি দেশ। চান্দ্রবর্ষে কৃষিকাজের হিসেব রাখা ছিল শক্ত। চান্দ্রবর্ষের তুলনায় প্রাকৃতিক ঋতুগুলি সৌরবর্ষের হিসেবে একই সময়ে আসে। কেননা, চান্দ্রবছর সৌরবছরের চেয়ে এগারো-বারো দিন কম হয়। সৌরবছর হয় ৩৬৫ দিনের, আর চান্দ্রবছর হয় ৩৫৪ দিনের। একারণে চান্দ্রবছরে ঋতুগুলি একই সময়ে আসে না। চাষাবাদ বা ঋতুনির্ভর কাজকর্মের অসুবিধা হয়। তবে, এনসাইক্লোপেডিয়া ইরানিকা জানাচ্ছে, সুমেরীয় বছর যেমন শুরু হত বসন্তকালে, ইরানি বছরও শুরু হল সেই বসন্তকাল থেকেই। চার হাজার বছর ধরে বছরের শুরুর দিনটি, অর্থাৎ পয়লা ফাওয়ারদিন ইরানিরা তাদের নববর্ষ— নওরোজ নামে খ্যাত— অদ্যবধি সাড়ম্বরে উদযাপন করে আসছে। বহুবার অদলবদল হলেও ইরানি ক্যালেন্ডার আজও সৌরবর্ষকেই অনুসরণ করে।
মজার ব্যাপার হল, ভারতে যখন খ্রিস্টাব্দের আটাত্তর বছর পরে অর্থাৎ আটাত্তর খ্রিস্টাব্দে বর্ষগণনা শুরু হল শকাব্দ নামে, সেটাও ছিল বসন্তকাল। পয়লা চৈত্র। এক্সপ্ল্যানাটরি সাপ্লিমেন্ট টু দি অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যালামানাক (সম্পাদক: পি কেনেথ সেইডেলমান) জানাচ্ছে— প্রাচীন ভারতে এটিই প্রথম বিজ্ঞানসম্মত ক্যালেন্ডার। শকাব্দও ছিল সৌর ক্যালেন্ডার।
শকাব্দের উৎস নিয়ে ইতিহাসবিদদের একাধিক মত আছে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ ইতিহাসবিদের মতে, প্রাচীন ভারতীয় নৃপতি শালীবাহনের প্রয়াণদিবস থেকেই শকাব্দের সূচনা। কেউ কেউ বলেন, রাজা শালীবাহনের রাজত্বকালে একবার বহিরাগত শকজাতি তাঁর রাজ্য আক্রমণ করে। তখন শালীবাহন শকদের পরাজিত করে ‘শকারি’ উপাধি গ্রহণ করেন। সেই থেকেই এই অব্দের নাম হয় শকাব্দ। খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে শকাব্দকে নিখুঁত করার চেষ্টা হয়। এর মাস এবং দিনাঙ্ক নির্ধারিত হয় ওই সময় বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী বরাহমিহির রচিত প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিষয়কগ্রন্থ ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’-এর সৌরবর্ষ গণনার বিধি মান্য করে। অর্থাৎ রবিসংক্রান্তি অনুসারে।
সৌরমাস নির্ধারিত হয় সূর্যের গতিপথের উপর ভিত্তি করে। সূর্যের ভিন্ন অবস্থান নির্ণয় করা হয় আকাশের অন্যান্য নক্ষত্রের বিচারে। প্রাচীনকালের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সূর্যের বার্ষিক অবস্থান অনুসারে আকাশকে ১২টি ভাগে ভাগ করেছিলেন। এর একেকটি ভাগকে তাঁরা নাম দিয়েছিলেন রাশি। আর ১২টি রাশির সমন্বয়ে যে-পূর্ণ আবর্তনচক্র সম্পন্ন হয়, তার নাম রাশিচক্র। এই রাশিগুলোর নাম— মেষ, মিথুন, বৃষ, সিংহ, কর্কট, কন্যা, বৃশ্চিক, তুলা, কুম্ভ, মকর, ধনু আর মীন রাশি। সূর্যের বার্ষিক অবস্থানের বিচারে, সূর্য কোনো-না-কোনো রাশির ভিতরে অবস্থান করে। সূর্য যখন একটি রাশি থেকে অন্য রাশিতে যায়, তখন তাকে সংক্রান্তি বলে। এই হিসেবে এক বছরে বারোটি সংক্রান্তি পাওয়া যায়। একেকটি সংক্রান্তিকে একেকটি মাসের শেষ দিন হিসেবে গণ্য করা হয়।
শকাব্দ ছাড়াও অনেক অব্দের প্রচলন ভারতে বহু শতাব্দী ধরেই রয়েছে। আঞ্চলিক সেইসব অব্দ থাকলেও শকাব্দের প্রচলনও ছিল সারা ভারতে।
দেখা যাচ্ছে— নাম যা-ই হোক, বছরকে বারো ভাগে বিভক্ত করবার পদ্ধতিটি সেই সুমেরীয় সভ্যতা থেকেই চলে আসছে। যদিও সুমেরীয়দের বর্ষগণনার পদ্ধতি ছিল চাঁদের হিসেবে।
কিন্তু, বঙ্গাব্দের প্রচলনটা হল কখন?
কেউ কেউ বলেন, বঙ্গাব্দের প্রচলন শকাব্দের ঠিক ৫১৫ বছর পরে। সম্রাট আকবরের আমলে। এখনও পর্যন্ত এটাই অধিক মান্যতা পেয়ে আসছে। এই তথ্যটিকে আমরা একটু নেড়েচেড়ে দেখব।
আগে দেখি, বঙ্গ শব্দটিকে।
‘ঐতরেয় আরণ্যক’-এ সর্বপ্রথম মগধের সঙ্গে বঙ্গ নামের একটি জনগোষ্ঠীর কথা উল্লিখিত হয়েছে। বলা হয়েছে– ‘বয়াংসি বঙ্গাবগধাশ্চেরপাদাঃ’ (২/১/২)। বৌধায়ন ধর্মসূত্রেও একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে বঙ্গ নামের উল্লেখ রয়েছে, যারা আর্যসভ্যতার সীমার বাইরে কলিঙ্গের পাশেই বসবাস করত।
‘ঐতরেয় আরণ্যক’টি ঐতরেয় মুনি প্রণীত। এটির রচনাকাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতক। তবে সে-উল্লেখ সুখকর নয়, বরং অপমানজনক। ‘ঐতরেয় আরণ্যক’-এর বঙ্গবিষয়ক শ্লোকটি এরকম:
‘ইমাঃ প্রজা স্তিস্রো অত্যায়মায়ং স্তানীমানি বয়াংসি।
বঙ্গাবগধাশ্বের পাদান্যন্যা অর্কমভিতো বিবিস্র ইতি। (২/১/১)
অর্থাৎ, বঙ্গদেশবাসীগণ, বগধবাসীগণ এবং চের জনপদবাসীগণ, এই ত্রিবিধ প্রজাই কী দুর্বলতা, কী দুরাহার ও বহু অপত্যতায় কাক, চেটক ও পারাবত সদৃশ! ‘ঐতরেয় আরণ্যক’ রচনাকালে বৈদিক আর্যরা বগধ (মগধ?), চের এবং বঙ্গবাসীকে ‘পাখির মতো অস্ফূটভাষী অথবা যাযাবর’ মনে করত।
ঐতরেয় মুনির পর বঙ্গ সম্বন্ধে তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্য করেন আর্য ঋষি বৌধায়ন। ইনি ‘কল্পসূত্র’ লিখেছিলেন। তারই অর্ন্তগত ‘ধর্মসূত্র-এ বৌধায়ন লেখেন: ‘যিনি বঙ্গ, কলিঙ্গ ও প্রাণৃন (!) দেশ ভ্রমণ করবেন, তাঁকে পুনস্তোম বা সর্বপৃষ্ঠা ইষ্টি করতে হয়।’ অর্থাৎ বঙ্গে যে যাবে, তাকে প্রায়শ্চিত্য করতে হবে।
মহাভারতে বঙ্গ নামে এক দেশের উল্লেখ আছে। অঙ্গ, বঙ্গ, পুণ্ড্র, সুহ্ম, কলিঙ্গ— এই পাঁচটি দেশকে বলা হয়েছে ভারতবর্ষের নিকটবর্তী দেশ (৯/৬)। মহাভারত অনুসারে— এই পাঁচটি রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন একই বংশের সন্তান। এঁরা ছিলেন মগধের অধিবাসী গৌতম দীর্ঘতম ঋষির ঔরসজাত এবং বলি রাজার দত্তক পুত্র। বঙ্গদেশের রাজা ভগদত্ত কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৌরবদের পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন (১৭/৪)। মহাভারতে এছাড়াও বহু প্রসঙ্গে এসেছে বঙ্গের নাম। তবে এইসঙ্গে বলতে হয়, প্রাচীন যুগে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ— এই দেশ তিনটিকে ভারতবর্ষের বাইরের দেশ বলে গণ্য করা হত।
কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বঙ্গ নামের উল্লেখ রয়েছে একটি সর্বপ্রাচীন ভৌগোলিক এলাকা হিসেবে। বলা হয়েছে, এই অঞ্চলটিতে উৎকৃষ্ট মানের সাদা ও নরম সুতিবস্ত্র উৎপন্ন হত।
‘বাঙ্গকং শ্বেতং স্নিগ্ধং দুকূলং।
পৌন্ড্রকং শ্যামং মণি স্নিগ্ধং।’ (২/১১/১৭)
মহানিদ্দেশ (আনুমানিক খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতক) এবং মিলিন্দপনহো (আনুমানিক খ্রিস্টীয় প্রথম ও দ্বিতীয় শতক) অনুযায়ী বঙ্গের অন্তর্গত এলাকা সমুদ্রতীরবর্তী ছিল বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। শুধু বঙ্গ নয়, সঙ্গে সমতট, সুহ্ম, হরিকেল, পুণ্ড্র, রাঢ়, গৌড় নামেরও উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে একই সময় থেকে। কখনও কোনো এলাকা প্রসিদ্ধ হলে সেই এলাকার নামেই পরিচিতি পেয়েছে সমগ্র বাংলা।
উপরোল্লিখিত সব তথ্যানুযায়ী বঙ্গ ছিল পূর্বাঞ্চলীয় একটি দেশ, যা সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কিন্তু কেউই এর নিশ্চিত অবস্থানের ইঙ্গিত করেননি।
এ-সবই শাস্ত্রকথা। আর্যদের আসার পরেকার ব্যাপার। কিন্তু তার আগে কী ছিল? আর্যরা যে-যুগে বাংলাভূমিকে অপবিত্র জ্ঞান করত, সেই যুগে কারা বসবাস করত বাংলায়?
প্রায় সমস্ত সূত্র জানাচ্ছে, পণ্ডিতরাও এ-বিষয়ে এক মত যে, বাংলার আদি মানুষ ছিল অস্ট্রোলয়েড জাতি। পরে কখনো এসেছে দ্রাবিড়রা। উত্তরের পাহাড় পেরিয়ে এসেছে সিনো-টিবেটানরা। এসে সবাই মিশে গেছে।
অস্ট্রোলয়েড জাতির উপাস্য দেবতা ছিল বোঙ্গা। এই বোঙ্গা দেবতার নাম থেকেই বঙ্গ শব্দটির উৎপত্তি বলে কারো কারো ধারণা। কেউ কেউ বলেন, শব্দটি বং অথবা বাং নামক একটি দ্রাবিড়-ভাষী উপজাতি বা গোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত হয়েছে। বং জাতিগোষ্ঠী কত খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল, আজও জানা সম্ভব হয়নি। তবে দ্রাবিড় জাতির চিহ্ন বাঙালি জাতির আর বাংলা ভূখণ্ডের গায়ে প্রকট ভাবে ছড়িয়ে রয়েছে আজও। দক্ষিণী সূত্র থেকে উদাহরণ হিসেবে ধ্বনিসাযুজ্যের কথা মনে রেখে আমরা বলতে পারি বেঙ্গালুরু, বঙ্গারু এবং এরকম প্রচুর অধুনাপ্রচলিত দ্রাবিড় শব্দের কথা।
তবে বঙ্গ, বেঙ্গালা, বাঙ্গালা শব্দগুলোর আদি উৎস আজ উদ্ধার করা একরকম অসম্ভব। একটা ধারণা পাওয়া যায় মাত্র। কিন্তু দেশটা তো রয়েছে আর রয়েছে তার অধিবাসীরা।
এই যে মিশ্র জাতির দেশ, এরই উপর নজর পড়ল আর্য জাতির। ততদিনে তারা হরপ্পা সভ্যতা ধ্বংস করেছে। পশ্চিম এবং উত্তর ভারত থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে দ্রাবিড়দের। অস্ট্রোলয়েডদেরও। একটি সভ্যতাকে ধ্বংস করে নতুন এক মিশ্র সভ্যতার জন্ম দিয়েছে। এবং পাকাপোক্ত সাম্রাজ্য স্থাপনের পর আশপাশের ভূখণ্ডগুলোর দিকে মনোযোগ দিয়েছে।
প্রত্নকথা
প্রাচীন শাস্ত্রগুলোতে অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র, সমতট, হরিকেল, সুহ্ম, রাঢ় প্রভৃতি যে-সব দেশের নাম আমরা পাই— সমস্তই এই পর্বের। অথচ, আর্যরা আসার আগে এই উপমহাদেশে প্রাচীনতম সভ্যতার যে-বিকাশ হয়েছিল হরপ্পায়, সেই পর্বের সভ্যতার বহুল প্রমাণ রয়েছে বাংলায় সুবর্ণরেখা কাঁসাই দামোদর অজয় আর ময়ূরাক্ষী নদীর অববাহিকায়— বর্ধমানের মঙ্গলকোটে, ভেদিয়ার কাছে পাণ্ডুরাজার টিবিতে, বীরভূমের মহিষাদল গ্রামে, পুরুলিয়ায় এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের একাধিক জায়গায়। অন্তত সাড়ে চার হাজার বছরের সভ্যতার পাথুরে প্রমাণ রয়েছে এই ভূখণ্ডের। তারও হাজার হাজার বছর আগের প্লাইস্টোসিন যুগের যে-সব হাড়ের তৈরি আয়ুধ পাওয়া গেছে বাংলার মালভূমি অঞ্চলে, সে-প্রসঙ্গ তুললে বলতেই হয়— মানবসভ্যতার আদিম রূপের বিকাশও এই মাটিতে হয়েছিল। এমন এক ভূখণ্ডের লোকজন বর্ষগণনা করতে জানত না, বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।
যেমন দক্ষিণ আমেরিকার মায়া সভ্যতা। যত অবৈজ্ঞানিকই হোক, তাদের একটা পঞ্জিকা ছিল। মানুষের গড় আয়ু ৫২ বছর ধরে ১৮,৯৮০ দিনের একটি পঞ্জিকাচক্র ব্যবহার করত তারা। এই সময়ের বাইরের ঘটনার হিসেব রাখতে ৫১২৬ বছরের একটি অধিপঞ্জিকা তারা তৈরি করে, যার শুরু খ্রিস্টপূর্ব ৩১১৪ সালে এবং শেষ হল এই ২০১২ সালে। তাদের ধারণা ছিল— ২০১২ সালের ২১ ডিসেম্বর সময় শেষ হয়ে যাবে। অনেকের ধারণা, ওই দিন নতুন সময়ের শুরু হওয়ার কথা। ২০১২ পেরিয়ে গেছে। সময় ফুরিয়ে যায়নি। তবু তাদের একটা অব্দ ছিল, যেমন ছিল গ্রিকদের। গ্রিকদের বছর ছিল ১০ মাসের। ৩০৪ দিনের সেই বছর শুরু হত মার্চ মাস থেকে। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসদুটোর অস্তিত্বই ছিল না। মিশরে অবশ্য ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের পুরোনো সৌর-অব্দ ছিল। কেউ কেউ বলেন, সৌর-অব্দটি আরও প্রাচীন। ১২ মাসের আর ৪ ঋতুর এই অব্দের মাসগুলো ছিল ৩০ দিনের, কিন্তু কোনো নাম ছিল না। বছরের শেষে ৫ দিন যোগ করে ৩৬৫ দিনের বছর হত। লুব্ধক নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে আরও একটি অব্দ ছিল মিশরের।
কিন্তু, প্রাক্-আর্য যুগের বাংলাকে নিয়ে পুর্ণ গবেষণা আজও হয়নি বলে আমরা জানতে পারছি না সেই যুগের সর্বাঙ্গীণ চেহারাটা। তবে অনুমান করতে পারি, যারা অলংকৃত মৃৎপাত্র তৈরি করে ব্যবহার করত, পয়ঃপ্রণালীযুক্ত শহর তৈরি করতে পারত, বিদেশে নৌবাণিজ্যে যেত (সুদূর ক্রিট দ্বীপের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রমাণ রয়েছে), তারা বর্ষগণনার একটা পদ্ধতি অবশ্যই আবিষ্কার করেছিল। আমরা সেটা জানতে পারছি না মাত্র।
বাঙ্গালা: খ্রিস্টীয় নবম শতকের শুরু
বাংলার আদিম কৌম সমাজের কথা নিশ্চিত করে জানা আজ বেশ শক্ত কাজ। ওই পর্বটিকে তাই ছেড়ে আমরা ঢুকে পড়ব আদি ঐতিহাসিক যুগে। গুপ্ত যুগের (৩২০ থেকে ৫৫০ খ্রিস্টাব্দ) অবসানের পর ছিন্নভিন্ন ভারতীয় উপমহাদেশকে একটা সাম্রাজ্যের দড়িতে বাঁধতে চেষ্টা করেছিল অনেকগুলো রাজবংশ। পূর্বে পালবংশ, উত্তর-পশ্চিমে প্রতিহার বংশ এবং দক্ষিণে রাষ্ট্রকূটরাজ সাময়িকভাবে আংশিক সাফল্য পায়। এই রাষ্ট্রকুটরাজ তৃতীয় গোবিন্দের একটি তাম্রলিপিতে ধর্মপালকে বঙ্গপতি বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং দেশটিকে ভাঙ্গালা বা বাঙ্গালা বলা হয়েছে। ঐতিহাসিকরা বলছেন, যুদ্ধটি হয়েছিল ৮০৮ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জুলাইয়ের আগে। এটিই এ-পর্যন্ত পাওয়া প্রথম উল্লেখ, যেখানে স্পষ্টত বঙ্গ এবং বাঙ্গালা শব্দদুটি পাওয়া যায়। পরে ভোলা, ভাঙ্গালা, পাংখোলা ইত্যাদি নানা রূপভেদ হলেও, বাঙ্গালা শব্দটিকে একাধিক সূত্রে আমরা পাই।
দ্বাদশ শতকের শেষে মহম্মদ ঘোরির রেখে-যাওয়া সৈন্যদল থেকে উৎপত্তি মামলুক বংশ বা সুলতানি আমল থেকে চেষ্টা শুরু হয়, কিন্তু শেষমেশ ষোড়শ শতকে ভারতকে একটি বৃহৎ রাষ্ট্রে পরিণত করতে সফল হয় মোগলরা— বিশেষ করে সম্রাট আকবর। তাঁর প্রধানমন্ত্রী আবুল ফজল ইবনে মুবারকের ‘আইন-ই-আকবরী’-তে ফের আমাদের ভুখণ্ডের উল্লেখ পাই ‘বাঙ্গালা’, ‘বঙ্গাল’ নামে। সেই যে ভারতের রাষ্ট্রীয় বন্ধনে জড়িয়ে গেল বাংলা, ব্রিটিশরা সেই বাঁধনকেই আরও শক্ত করে তোলে। ফল হল এই যে, আবুল ফজলের উল্লেখের পর থেকে রাষ্ট্রীয় শক্তির জোরে প্রাচীন গৌড়, পুণ্ড্র, সমতট, হরিকেল, সুহ্ম, রাঢ় ইত্যাদি আর্য-উল্লেখিত অঞ্চলগুলোর বা তার নানা অংশের নাম ত্যাগ করে গোটা ভূখণ্ডে বাঙ্গালা নামটিই ক্রমশ সর্বজনমান্য হয়ে উঠল। সেইসঙ্গে একটা কথা মান্যতা পেয়ে গেল, যে, যাকে আমরা বঙ্গাব্দ বলি, সেই বাংলা সালের চল শুরু হয় সম্রাট আকবরের সময় থেকে। তিনিই নাকি বঙ্গাব্দের প্রচলন করেন। ব্যাপারটা একটু দেখব।
বরাহমিহির থেকে মেঘনাদ
প্রথমেই বলে নিতে হবে— যে-সময়েই চালু হোক না কেন, বঙ্গাব্দের প্রকৃত উৎস হচ্ছে ৫৫০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে রচিত বরাহমিহিরের (জীবনকাল আনুমানিক ৫০৫-৫৮৭, যদিও বহু মতভেদ আছে। বরং বলা ভালো, ষষ্ঠ শতক) ‘পঞ্চসিদ্ধান্তিকা’ নামে জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটি সংকলনগ্রন্থ। এতে গ্রিক, রোমান, মিশরীয় আর ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের আবিষ্কার এবং অনুমানগুলোর সার সংকলিত হয়েছে। পাঁচটি খণ্ডে বিভক্ত বইয়ে রয়েছে সূর্যসিদ্ধান্ত, রোমকসিদ্ধান্ত, পৌলিশসিদ্ধান্ত, পৈতামহসিদ্ধান্ত ও বাশিষ্ঠসিদ্ধান্ত। বরাহমিহির ছিলেন বর্তমান পাকিস্তান, আফগানিস্তান আর রাজপুতানা নিয়ে গঠিত শকস্তানের বাসিন্দা। রাজা বিক্রমাদিত্যের নবরত্নসভার এই সদস্যটি থাকতেন রাজধানী উজ্জয়িনীতে। রাজা শালীবাহনের শকাব্দকে তিনি প্রায় ৫০০ বছর পর সংস্কার করেন। চৈত্র মাসের বদলে বৈশাখ মাস থেকে বর্ষ শুরুর নিয়মটির প্রবর্তক তিনিই। নক্ষত্রের নাম থেকে হয় মাসের নামগুলি। যেমন বিশাখা থেকে বৈশাখ, জৈষ্ঠ্যা থেকে জৈষ্ঠ্য, পূর্বাষাঢ়া আর উত্তরাষাঢ়া থেকে আষাঢ়, শ্রবণা থেকে শ্রাবণ, ভদ্রা থেকে ভাদ্র, অশ্বিনী থেকে আশ্বিন, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক, মৃগশিরা থেকে মার্গশীর্ষ (এই মাসটি বঙ্গাব্দে নেই। এর পরিবর্তে বঙ্গাব্দে রয়েছে অগ্রহায়ণ। পরে এটি নিয়ে দু-কথা বলব।), পুষ্যা নক্ষত্র পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, উত্তরফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন, চিত্রা থেকে চৈত্র মাস। কিন্তু দিনের নাম এসেছে গ্রহ, উপগ্রহ এবং নক্ষত্রের নাম থেকে। যেমন রবি এসেছে রবি অর্থাৎ সূর্য নামের নক্ষত্র থেকে, সোমবার এসেছে সোম অর্থাৎ চাঁদ থেকে যা পৃথিবীর উপগ্রহ, মঙ্গল এসেছে মঙ্গলগ্রহ থেকে, বুধ গ্রহ থেকে বুধবার, বৃহস্পতি গ্রহ থেকে বৃহস্পতিবার, শুক্র গ্রহ থেকে শুক্রবার এবং শনি গ্রহ থেকে এসেছে শনিবার। তবে বরাহমিহিরেরও প্রায় দু-হাজার বছর আগে ভারতীয়রা বর্ষগণনা করতে জানত। যাকে এখন আমরা পঞ্চাঙ্গ বলি, সেই হিসেবই তখন ছিল চালু। বরাহমিহিরের সঙ্গে সেই বর্ষগণনার কোনো মিল নেই।
১৯৫৭ সালে বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার নেতৃত্বে সেই বরাহমিহিরের পদ্ধতির সংস্কার হয়। উক্ত কমিটি শকাব্দকে ঋতুনিষ্ঠ ও সর্বস্তরে ব্যবহারোপযোগী করে তুলতে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে প্রচলিত গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির সঙ্গে সমন্বয় রেখে চলতে এই অব্দকে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। সূর্যসিদ্ধান্তে উল্লিখিত নিরয়ণ বর্ষগণনারীতি পরিহার করে শকাব্দকে সায়ন সৌর অব্দে রূপান্তরিত করে এবং বারো মাসের দৈর্ঘ্য স্থির করে দেয়। এছাড়া বার্ষিক গতির সঙ্গে সমন্বয় রেখে অধিবর্ষে চৈত্রমাসে একটি অতিরিক্ত দিন যোগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। কমিটির ঘোষণা অনুসারে প্রত্যেক বছর মহাবিষুবের পরদিন অর্থাৎ গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির ২২ মার্চ শকাব্দ আরম্ভ হয় এবং শকাব্দের তারিখ অনুসারে সেই দিনটি হল ১ চৈত্র। কেবল অধিবর্ষে বর্ষারম্ভ হয় ২১ মার্চ।
তবে, বঙ্গাব্দ শুধুই সৌর অব্দ নয়। বর্ষগণনা সৌরমান অনুযায়ী হলেও, হিন্দু এবং মুসলমানের ধর্ম পালন হয় চান্দ্রবর্ষের হিসেবে।
বঙ্গাব্দ শব্দের প্রথম উল্লেখ
এখনও পর্যন্ত যা তথ্য, ‘বঙ্গাব্দ’ শব্দটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় বাঁকুড়া জেলার দুটি শিবমন্দিরে, উৎকীর্ণ লিপিতে। একটি ডিহরগ্রামে, অন্যটি সোনাতপন গ্রামে। বলা হয়, মন্দিরদুটির বয়স আনুমানিক হাজার বছর। এই তথ্য যদি ঠিক হয়, তাহলে ইতিহাসের পুনর্বিচার একটু করতে হবেই। সেটুকু কী?
বলা হয়— গৌড়বঙ্গের রাজা শশাঙ্ক থানেশ্বর জয় করে কর্ণস্বর্ণের সিংহাসনে আরোহণ করেন ৫৯৩ খ্রিস্টাব্দে, যদিও এই সালটি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মতানৈক্য রয়েছে। রাজা শশাঙ্কের সিংহাসনে আরোহণের বছরকেই বাংলা সনের আরম্ভ বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন। আর একটি মত হচ্ছে, শশাঙ্ক সিংহাসনে উপবিষ্টের পর সৌরমান অনুযায়ী একটি নতুন সন চালু করেন, যাকে আজ আমরা বাংলা সন বলে অভিহিত করে থাকি। আর একটি মত হচ্ছে, গৌড়ের সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ হিজরি সাল মেনে বাংলার শাসনব্যবস্থা চালানোর অসুবিধা দেখে চালু করেন বঙ্গাব্দ। এটিকে হুসেনি অব্দও বলা হয়। রাজা শশাঙ্ক কর্তৃক প্রবর্তিত বঙ্গাব্দকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করে হিজরি সনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সেই অব্দটি শুরু হয় হোসেন শাহের আমলে, যদিও শাহি দরবারে তখনও হিজরি সনেরও প্রচলন ছিল। এখানে উল্লেখ থাক, হোসেন শাহি স্বর্ণযুগে তিনি এবং তাঁর পরে পুত্র নুসরত শাহ নিজেদের পরিচয় দিতেন বাঙালি সুলতান হিসেবেই। পরে সম্রাট আকবরের সময় সেই কাজটিই আরও নিখুঁত ভাবে সম্পন্ন হয়— অর্থাৎ হিজরি আর ভারতীয় সৌরবর্ষকে একসূত্রে গেঁথে বর্তমান বঙ্গাব্দ প্রচলিত হয়। এটি কীভাবে হয়েছিল, আমরা দেখব। তার আগে দেখব, বঙ্গাব্দ এতটা প্রতিষ্ঠা পেল কী করে। সেইসঙ্গে এখানে উল্লেখ থাক, শশাঙ্কের বাংলা সন প্রবর্তনের আগেও এই ভূখণ্ডে নানা সময়ে নানা সন চালু ছিল। সেগুলো হল— চন্দ্রাব্দ, গুপ্তাব্দ, শকাব্দ, বুদ্ধাব্দ, বিক্রমাব্দ, লক্ষণাব্দ প্রভৃতি।
এক. ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে তুর্কিবিজয়ের পর বাংলার গুরুত্ব নানা কারণে বেড়ে যায়। একটু একটু করে রাজ্যের সীমানা বাড়িয়ে বাংলার সুলতানেরা একটা শক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করতে উদ্যোগী হন, যে রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য ছিল নিজ ভূখণ্ডের স্থায়িত্ব রক্ষা এবং সেইজন্য সুযোগ পেলেই দিল্লির বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা।
দুই. অৰ্থক্ষমতা। তুর্কিরা পৃথিবীকে আকাশের মতো বা স্বর্গের মতো সাত ভাগে ভাগ করেছিল। একেকটা ভাগকে বলত আকলিম বা ইকলিম। তাদের কাছে হিন্দুস্তান ছিল একটি আকলিম। আর হিন্দুস্তান নামক আকলিমের প্রথম বা প্রধান অংশ হিসেবে তারা জানত বঙ্গদেশকে। আদিনা মসজিদ তৈরির সময় সেটাই ছিল পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মসজিদ। বাংলার কোনো কোনো সুলতান কখনো এমন ঘোষণাও করেছেন যে— এমনকী আলাউদ্দিন হোসেন শাহও— তিনিই মুসলিমজাহানের খলিফা! তার অন্যতম কারণ, স্বাধীন হোক অথবা দিল্লির অধীন, সুলতানি আমল থেকে পলাশির যুদ্ধের আগে পর্যন্ত বাংলার রাজস্ব ছিল সারা ভারতের সব চেয়ে বেশি, প্রায় এক-চতুর্থাংশ বা তারও বেশি। এমনকী, অউরংজেব যখন দাক্ষিণাত্যে টানা ২৫ বছর বিদ্রোহদমনে রাজধানী-ছাড়া, আলিবর্দির পাঠানো খাজনা না-গেলে ভারত ছিল অচল।
তিন. বাংলা ছিল বরাবরই স্বাধীনচেতা। আর্য-পূর্ব যুগটি এখনো অন্ধকারে ঢাকা। তবে স্বাধীন যে ছিল, এই তথ্যটি নিয়ে সন্দেহ নেই। আর্য-প্রাধান্য যখন উত্তর-পশ্চিম ভারতে প্রবল, অবহেলা আর নীচু জাতের গঞ্জনা বর্ষিত হয়েছে বঙ্গবাসীর ওপর। বাঙালির স্বাতন্ত্র্যবোধের জন্ম হয়তো তখন থেকেই। মৌর্য আর গুপ্তযুগের শাসনের পর শশাঙ্ক থেকে ফের বাঙালির অন্য উত্থান, অর্থাৎ আর্য-প্রভাবিত বাংলার উত্থান।
পালযুগ এবং সেনযুগের পর তুর্কিরা এসেও এই মাটির আহ্বান যেন ক্রমে শুনতে পেয়েছিল। তাদের প্রভু শামসুদ্দিন মহম্মদ ঘোরিকে ভুলতে এবং স্বাজাত্যপ্রীতি ছিন্ন করতে তুর্কিদের মোটেও বেশি সময় লাগেনি। বারবার দিল্লির চাপ এসেছে, বারবার স্বাধীন হওয়ার এবং থাকার চেষ্টা করেছে বাংলা। সেই চেষ্টার পিছনে শুধুই কি ছিল নিজ সাম্রাজ্য গঠনের লোভ? মনে হয় না। অনধিক চারশো বছরের এই চেষ্টার সমাপ্তি ষোড়শ শতকের মোগল আক্রমণে। ফের স্বাধীনতা-স্পৃহার জন্ম উনিশ শতকে, ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতায়। কিন্তু এই স্বাধীনতা-চেতনার চূড়ান্ত রূপ দেখার জন্যে আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে বিশ শতকের সাতের দশক পর্যন্ত। ভূখণ্ডের একাংশে হলেও হাজার বছরের স্বপ্নপূরণ হয়েছে বাংলাদেশ নামের এক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মে। বঙ্গাব্দ সেখানে, সেই রাষ্ট্রের, সরকারি অব্দ।
আকবর? নাকি ফতেহউল্লাহ সিরাজি?
নানা মত থাকলেও বেশিরভাগ পণ্ডিত সম্রাট আকবরকেই বর্তমানে চালু বাংলা সনের প্রবর্তক বলে মনে করেন কেন? এমনকী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও? এঁদের যুক্তি হল: প্রথমত, সম্রাট আকবর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তখন হিজরি সন ছিল ৯৬৩, সোমবার, ২৭ রবিউল আখির। এবং বাংলা সনও ছিল ৯৬৩ বঙ্গাব্দ। দ্বিতীয়ত, আবুল ফজলের আইনই-আকবরি গ্রন্থে তারিখ-ই-ইলাহি অব্দ সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে: ‘আকবর বহুদিন ধরে হিন্দুস্থানের বিভিন্ন অঞ্চলে (দিন গণনার) সমস্যা সহজ করে দেওয়ার জন্য এক নতুন বছর ও মাস গণনাক্রম প্রবর্তন করতে ইচ্ছুক ছিলেন। তিনি হিজরি অব্দ ব্যবহারের বিরোধী ছিলেন। আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজির প্রচেষ্টায় এ অব্দের প্রবর্তন হল।’
১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১০ অথবা ১১ মার্চ সম্রাট আকবর সিংহাসনে বসার পর ক্রমে ভূমি ও রাজস্ব বিভাগের সংস্কার করে ফসলের মাধ্যমে সারা দেশে রাজস্ব আদায়ের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এই কাজটি করতে গিয়ে দরকার হয় ফসলি সনের, যাতে কৃষিকাজের সঙ্গে ঋতুগুলির মিল থাকে। আকবরের রাজত্বের উনতিরিশতম বছরে এই দায়িত্ব পালন করেন ইরানি জ্যোতির্বিদ আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজি।
কে এই ফতেহউল্লাহ সিরাজি?
ফতেহউল্লাহ সিরাজি ইরানের সিরাজ শহর থেকে ভারতে আসেন সম্রাট আকবরের আমলে। খাজা নিজামউদ্দিন আহমদের ‘তবাকত-ই-আকবরী’ গ্রন্থে আকবরের দরবারে ফতেহউল্লাহর আগমনের প্রথম দিনটি বর্ণিত হয়েছে। দিনটি তবাকত-অনুযায়ী ৯৯১ হিজরির ২২ রবিউস সানি। খ্রিস্টাব্দ ১৫৮৩। বর্ণনাটি এরকম— ‘এই সময়ে সৈয়দদের আধার, এই যুগের সর্বাপেক্ষা পণ্ডিত ব্যক্তি এবং বর্তমান সময়ের জ্ঞানীগণের নেতা আমীর ফতেহ উল্লাহ, যিনি ছিলেন শিরাজের একজন সৈয়দ এবং অবরোহ সিদ্ধান্তমূলক ও ঐতিহ্যগত জ্ঞানের জন্য খ্যাতি অর্জন করিয়াছিলেন, আর তিনি শিরাজ হইতে দাক্ষিণাত্যে গমন করিয়াছিলেন এবং আদিল খানের কার্যাবলীর কর্তৃত্ব গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহাকে ২২শে রবিউস সানী রবিবার দিন ফতেপুর শহরে আনুগত্য প্রকাশের অনুমতি দান করা হয়। নির্দেশ অনুযায়ী খান খানান এবং হাকিম আবুল ফতেহ তাহার সহিত সাক্ষাতের জন্য অগ্রসর হইয়া যান এবং তাহাকে সম্রাটের নিকট আনয়ন করেন। আমীর ফতেহউল্লাহকে সদরের (প্রধান বিচারক) মর্যাদাপূর্ণ পদে নিযুক্ত করিয়া সম্মানিত করা হয়।’
এ-ছাড়া ফতেহউল্লাহ সম্বন্ধে জানা যাচ্ছে— তিনি শুধু জ্যোতির্বিদই ছিলেন না, একাধারে ছিলেন দার্শনিক, চিকিৎসক, গণিতবিদ এবং নানা যন্ত্র-উদ্ভাবক। সম্রাট আবুল ফতেহ জালালউদ্দিন মহম্মদ আকবর তাঁকে ‘আজুদুদৌলা’ উপাধি দেন, যার অর্থ— সাম্রাজ্যের বাহু।
উদ্ভাবক হিসেবে তাঁর কৃতিত্ব রয়েছে বহু দিকে। এমন এক হাত-কামান তৈরি করেন তিনি, যেটি ছিল বহুনলবিশিষ্ট। একসঙ্গে ষোলোটি নল পরিষ্কার করতে পারে, কামান-সম্পর্কিত এমন একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেন, যেটি চলত গোরুর সাহায্যে। সিরাজি শুধু যুদ্ধোপকরণই তৈরি করেননি, আবুল ফজলের অনুরোধে একটি যানও নির্মাণ করেন। প্রয়োজনে সেটি ভুট্টা পেষাইয়ের কাজ করতে পারত। সম্রাটের নির্দেশে খাজনা আদায়, আইন আর ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজনে একটি সঠিক কালপঞ্জি তৈরি করেন তিনি। ফারসি বর্ষপঞ্জি ছিল তাঁর নখদর্পণে। হিজরি আর শকাব্দের সংমিশ্রণ করে সৌরভিত্তিক যে বর্ষগণনাপদ্ধতি তৈরি করেন সিরাজি, সেটিই এখনকার বঙ্গাব্দ, যা আজও চলছে। তার আগে ছিল তারিখ-ই-ইলাহি নামে এক অব্দ, যা ফারসি সৌরবর্ষের ভারতীয় রূপ। সে-বর্ষের মাস এবং দিনের নামগুলো ছিল ফারসি। পরে সূর্যসিদ্ধান্তিকা-অনুযায়ী এর মাস, বছর আর দিনের নামকরণ হয়। বঙ্গাব্দ সম্রাট আকবরের আমলের ২৯ বছরের মাথায় ১৫৮৪ সালের ১১ মার্চ প্রথম চালু করা হলেও এর গণনা শুরু হয় আকবরের সিংহাসনে আরোহণের দিন থেকে।
এ হেন ফতেহউল্লাহ সিরাজির মৃত্যুতে কাতর হয়ে পড়বেন আকবর, স্বাভাবিক। আবুল ফজল বলছেন, তাঁর প্রয়াণের পরে সম্রাট প্রায়ই বলতেন, তিনি ছিলেন আমার উকিল। তাঁর মৃত্যুর গুরুত্ব কেউই বোঝেনি। তিনি ছিলেন বহুমূল্য রত্ন। রাজকোষ শূন্য করেও তাঁকে কিনতে চাইলে সস্তাই হত তাঁর দাম।
সাল, সন, তারিখ
আমরা যে ‘সাল’ শব্দটি ব্যবহার করি, সেটি ফারসি শব্দ। ‘সন’ শব্দটি আরবি থেকে এসেছে। আর, ‘তারিখ’ শব্দটিও এসেছে আরবি থেকে। কিন্তু প্রাচীন বঙ্গাব্দটি কেমন ছিল? অধ্যাপক নীহাররঞ্জন রায় বলছেন, নবান্ন উৎসবই ছিল বাঙালির নববর্ষ উৎসব। ধানকেন্দ্রিক ভূখণ্ডে বছর শুরু হত খেত থেকে ধান বাড়িতে এলে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, নবান্ন উৎসবটি আজও সারা বাংলায় একই দিনে পালিত হওয়ার রেওয়াজ নেই। সবাই সবার বাড়ির উৎসবে যাতে অংশগ্রহণ করতে পারে, অর্থাৎ আত্মীয়স্বজনরা যাতে যোগ দিতে পারে উৎসবে, তাই ভিন্ন ভিন্ন দিনে হয় নবান্ন। তাহলে? বিভিন্ন দিনে বর্ষ শুরু হবে কী করে? কথা হচ্ছে, অগ্রহায়ণ মাসব্যাপী নবান্ন পালিত হয়। মাসটি সূর্যসিদ্ধান্তিকায় ছিল না। ছিল মার্গ শীর্ষ। বাঙালির কাছে মাসটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সংবৎসরের ফসল ওঠে এই মাসে। তাই নবান্ন। একসময় এই মাসটিতেই বাঙালির বছর শুরু হত বলে মনে হয়। অগ্রহায়ণ শব্দের আভিধানিক অর্থ— যেটি বছরের প্রথম মাস। অগ্ৰ অৰ্থে প্ৰথম, হায়ন অর্থে বছর। ভারতের ধানকেন্দ্রিক অঞ্চলে তথা দক্ষিণ, পূর্ব আর উত্তর-পূর্ব ভারতে নানা নামে পৌষসংক্রান্তি বা মকরসংক্রান্তি এক প্রধান উৎসব। এটিও ধান ঘরে তোলার পরের উৎসব। তাই সন্দেহ একটু থেকেই যায় যে, ওই দিনটিই বছরের শুরু দিন ছিল না তো !
যা-ই হোক, পুরোনো প্রসঙ্গ বেশি না-টেনে বলা যায়— পঞ্চাঙ্গ, সূর্যসিদ্ধান্তিকার পর হোসেন শাহি পথ ধরে হিজরি আর প্রাচীন বঙ্গাব্দ মিলিয়ে এখনকার নতুন বঙ্গাব্দটি দাঁড়িয়ে গেছে শুধু নয়, এটি এক আবেগের জন্ম দিয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশে, যদিও বাংলাদেশের বঙ্গাব্দের সঙ্গে পশ্চিমবাংলার বঙ্গাব্দের কিছু পার্থক্য রয়েছে। ১৯৫৭ সালে ভারত সরকারের উদ্যোগে শকাব্দের সংস্কারে সচেষ্ট হন বিজ্ঞানী মেঘনাথ সাহা যেমন, তেমনই ১৯৬৬ সালে বাংলাদেশেও বঙ্গাব্দ সংস্কার করা হয়।
পয়লা বৈশাখ বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম দিন। বাংলাদেশে বাংলা একাডেমী কর্তৃক সংশোধিত বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসারে এদিনটি পড়ে প্রতি বছরের ১৪ এপ্রিল তারিখে। যদিও পশ্চিমবঙ্গে সনাতন বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসারে দিনটি পড়ে ১৪ কিংবা ১৫ এপ্রিল। এটি পাশ্চাত্যের বর্ষপঞ্জির মতো নির্দিষ্ট নয়। ভারতের সমস্ত বঙ্গভাষী অধ্যুষিত অঞ্চলে সনাতন নিরয়ণ (জ্যোর্তিমণ্ডলে তারার অবস্থানের প্রেক্ষিতে গণিত, সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে পৃথিবীর প্রকৃত সময়ই নিরয়ণ বর্ষপঞ্জি। অর্থাৎ নিরয়ণ বর্ষপঞ্জির দৈর্ঘ্যহল ৩৬৫.২৫৬৩৬০২ সৌর দিবস, যা ক্রান্তীয় সায়ন বর্ষপঞ্জি থেকে ২০ মিনিট ২৪ সেকেন্ড দীর্ঘ।) বর্ষপঞ্জি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই বর্ষপঞ্জি ক্রান্তীয় বা সায়ন বর্ষপঞ্জি (যেমন সংস্কারকৃত বাংলা সন এবং গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি) থেকে ভিন্ন। এই উভয় ধরণের বর্ষপঞ্জির মধ্যে সময়ের যে গাণিতিক পার্থক্য রয়েছে, তার কারণেই বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের নতুন বর্ষ শুরুতে দিনের পার্থক্য হয়। এই সময়ের পার্থক্যের কারণে নিরয়ণ সৌর বর্ষপঞ্জিতে মাসের দৈর্ঘ্যে পার্থক্য রয়েছে। যেমন পার্থক্য রয়েছে নববর্ষ উদযাপনের আন্তরিকতায়, উৎসাহে আর উদ্দীপনায়। অবশ্য অতিসম্প্রতি এ-বাংলাতেও নববর্ষ উদযাপনে মানুষ পথে বেরোতে শুরু করেছে এবং আশা করা যায়, অদূরভবিষ্যতেই নববর্ষ একটি প্রধান উৎসবের গৌরব পাবে।
এসো হে বৈশাখ
বাংলাদেশ কীভাবে এই গৌরব অর্জন করল? বলতেই হবে, তাদের জাতীয় সংকট থেকে। ফিল্ড মার্শাল আয়ুব খান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট (১৯৫৮-১৯৬৯) হওয়ার পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর বাংলা-বিরোধী নানা ফরমান জারি হতে থাকে। বাঙালির সংস্কৃতির ওপর পুনঃপুনঃ ফৌজি খড়্গাঘাতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পুববাংলা। নেমে আসে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা। এবং একই সঙ্গে সরব হয় মানুষের প্রতিবাদ। এমনই পরিস্থিতিতে জন্ম হয় ‘ছায়ানট’ নামে একটি সংস্থার, যে-নামটি আজ বহুবিখ্যাত। আজকের বাংলাদেশে নববর্ষবরণের এই যে বিশাল উৎসব, এই উৎসবের প্রেরণা এসেছে রবীন্দ্রনাথ থেকে। কেমন করে? ছায়ানট-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করতেই হচ্ছে। তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে লেখা রয়েছে: বাংলা ১৩৬৮, ইংরেজি ১৯৬১ সালে রবীন্দ্ৰশতবার্ষিকী পালন করবার ঐকান্তিক ইচ্ছায় পাকিস্তানি শাসনের থমথমে পরিবেশেও কিছু বাঙালি একত্র হয়েছিলেন আপন সংস্কৃতির মধ্যমণি রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষপূর্তির উৎসব করবার জন্যে। তমসাচ্ছন্ন পাকিস্তানি যুগে কঠোর সামরিক শাসনে পদানত স্বদেশে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও রবীন্দ্রভাবনা অবলম্বন করে ছায়ানট যাত্রা শুরু করে। সারাবিশ্বে শতবার্ষিকীর আয়োজন বাংলার এই প্রান্তের সংস্কৃতিসচেতন মানুষের মনেও চাঞ্চল্য জাগায়। বিচারপতি মাহবুব মুর্শেদ, ডক্টর গোবিন্দচন্দ্র দেব, অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী প্রমুখ বুদ্ধিজীবী যেমন উদ্যোগী হলেন— তেমনি ঢাকার কিছু সংস্কৃতিকর্মীও আগুয়ান হলো শতবর্ষ উদযাপনের উদ্দেশ্যে। অগ্রাহ্য হলো অনতিউচ্চারিত নিষেধ। সংস্কৃতি-প্রাণ মানুষের মনে আত্মবিশ্বাস এনে দেয় রবীন্দ্ৰশতবার্ষিকীর সফল উদ্যোগ। শতবার্ষিকী উদযাপন করবার পর এক বনভোজনে গিয়ে সুফিয়া কামাল, মোখলেসুর রহমান (সিধু ভাই), সায়েরা আহমদ, শামসুন্নাহার রহমান (রোজ বু), আহমেদুর রহমান (ইত্তেফাকের ‘ভীমরুল’), ওয়াহিদুল হক, সাইদুল হাসান, ফরিদা হাসান, সন্জীদা খাতুন, মীজানুর রহমান (ছানা), সাইফউদ্দীন আহমেদ মানিক-সহ বহু অনুপ্রাণিত কর্মী সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে যাবার জন্যে সমিতি গঠন করার সিদ্ধান্ত নেন। জন্ম হয় ছায়ানটের। ছায়ানট আপাতদৃষ্টিতে একটি সঙ্গীতশিক্ষার প্রতিষ্ঠান মাত্র। কিন্তু, এমন একটি প্রতিষ্ঠানই ক্রমে হয়ে উঠল একটা জাতির জেগে ওঠার অন্যতম পতাকা। বঙ্গীয় সংস্কৃতির ওপর আক্রমণের, বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে, রবীন্দ্রনাথেরই ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’ গানটি গেয়ে ছায়ানট ১৩৭২ বঙ্গাব্দের (১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দ) পয়লা বৈশাখ প্রথম নববর্ষ উদযাপন শুরু করে রমনা ময়দানের বটমূলে। তারপর যত দিন গেছে, বিপুল জনসমর্থন লাভ করেছে এই অনুষ্ঠান। স্বাধিকার আন্দোলনের চেতনায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নীতির বিরুদ্ধে ও বাঙালি আদর্শের লালনে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় বাংলা নববর্ষ পালিত হতে থাকে। স্বাধীনতা-উত্তরকালে সংস্কৃতি অঙ্গনে নববর্ষ উদযাপন বিশেষ গুরুত্ব পায়। বাংলা বর্ষবরণ এখন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। এর কৃতিত্ব যেমন ছায়ানটের, তেমনই বাংলাদেশের অগণিত সংস্কৃতি-কর্মীর— যারা আসলে যোদ্ধা।
তাঁরা চেয়েছিলেন— দুই ধর্মের এই দেশে এমন একটা উৎসব চাই, যা হিন্দুরও নয়, মুসলমানেরও নয়। প্রতিটি বাঙালির। এটা তাঁরা পেরেছেন শুধু নয়, পয়লা বৈশাখ সে-দেশের সবচেয়ে বর্ণময় একটি দিন। একটা অংশের বিরোধিতা সত্ত্বেও নববর্ষ বাংলাদেশের জাতীয় উৎসব। সে-উৎসবের দিনটি রাজা শশাঙ্ক বা আলাউদ্দিন হোসেন শাহ বা সম্রাট আকবর নিয়োজিত আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজি— যাঁর কৃতিত্বেই নির্ধারিত হোক না কেন।
এপারের বাঙালির জাতীয় উৎসব কী? দুর্গাপুজো। এখানে আমরা একধাপ পিছিয়ে রয়েছি বাংলাদেশের থেকে! আমাদের জাতীয় উৎসবে সবাইকে সামিল করতে পারিনি। বা, এমন কোনো উৎসব খুঁজে নিইনি, যেটি প্রকৃত অর্থে সর্বজনীন হতে পারে। তাহলে কি আমাদের উত্তরণের কোনো আশা নেই? আছে। আর তার বর্ণিল পতাকা এখন দেখা যাচ্ছে পয়লা বৈশাখের দিনটিতেই, সেদিনটির গায়ে যতই লেগে থাকুক না কেন ১৪ বা ১৫ এপ্রিলের ছোট্ট অস্বস্তির সংশয়টুকু।
তথ্য-সহায়তা
১। PANCASIDDHANIKA OF VARAHAMIHIRA with translation and notes by TS Kuppanna Sastry, P.P.S.T. Foundation. Adyar. Madras. 1993.
২। Concise review of the Iranian Calendar by M Heydari-Malayeri, paris Observatory.
৩। W Hartner, ‘Old Iranian Calendar’ in Cambridge History of Iran-111, 1985.
৪। ‘The Indian Calendar’, https://eclipse.gsfc.nasa.gov/SEhelp/calendars.
৫। Clarence-Smith, William Gervase, Science and Technology in Early Modern Islam, c. 1450-c.1850, Global Economic History Network, London School of Economics.
৬। Nitish K. Sengupta, Land of Two Rivers: A History of Bengal from the Mahabharata to Mujib Penguin Books India, 2011. ISBN 978-0-14-341678-4.
৭। Kunal Chakrabarti; Shubhra Chakrabarti, “Calendar”. Historical Dictionary of the Bengalis. Scarecrow Press. 2013. ISBN 978-0-8108-8024-5
৮| বাঙ্গালীর ইতিহাস আদি পর্ব, নীহাররঞ্জন রায়, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০০১
৯। বৃহৎ বঙ্গ, দীনেশচন্দ্র সেন, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০০৬
১০। প্রাগৈতিহাসিক বাংলা, পরেশচন্দ্র দাশগুপ্ত, অণিমা প্রকাশনী, কলকাতা, ১৯৮১
১১। পাল অভিলেখ সংগ্রহ, অশোক চট্টোপাধ্যায় শাস্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তকপর্ষৎ, কলকাতা, ১৯৯২
১২| মহেঞ্জদড়োর লিপি ও সভ্যতা, রাজমোহন নাথ, বি-ই, তর্কভূষণ, নাথ পাবলিশার্স, শিলং, ১৯৬১
১৩। বৌদ্ধযুগের ভারত, হিউয়েন সাঙ, অনুবাদ: যোগীন্দ্রনাথ সরকার, সম্পাদনা: বারিদবরণ ঘোষ, পত্রলেখা, কলকাতা, ২০১৬
১৪। রিয়াজ-উস-সালাতিন, গোলাম হুসেন সলীম, রামপ্রাণ গুপ্ত সম্পাদিত, দিব্যপ্রকাশ, ঢাকা, ২০০৭
১৫। গৌড়ের ইতিহাস, রজনীকান্ত চক্রবর্তী, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯৯৯
১৬। বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, অতুল সুর, জিজ্ঞাসা, কলকাতা, ১৯৭৭
১৭। হোসেন শাহী আমলে বাংলা ১৪৯৪-১৫৩৮: একটি সামাজিক রাজনৈতিক পর্যালোচনা, মমতাজুর রহমান তরফদার, অনুবাদ মোকাদ্দেসুর রহমান, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৭১
১৮। তবাকাত-ই-আকবরী, দ্বিতীয় খণ্ড, খাজা নিযামউদ্দীন আহমদ, অনুবাদ আহমদ ফজলুর রহমান, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৭৮
১৯। বাঙালির জাতিতত্ত্ব ও কৃষিজীবী সম্প্রদায়, সুহৃদকুমার ভৌমিক, অস্ট্রিক, পূর্ব মেদিনীপুর, ১৯৮৬
২০। http://bn.banglapedia.org, পহেলা বৈশাখ, বাংলাপিডিয়া।
২১। http://chhayanaut.org, জন্মকথা।
♦♣♦–♦♣♦ ♦♣♦–♦♣♦
❤ Support Us








