Advertisement
  • প্রচ্ছদ রচনা বি। দে । শ
  • সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৫

নেপালে সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে ‘জেন জি বিপ্লব’! পুলিশের গুলিতে নিহত ১৪, জখম অন্তত ৮০

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
নেপালে সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে ‘জেন জি বিপ্লব’! পুলিশের গুলিতে নিহত ১৪, জখম অন্তত ৮০

সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞা ঘিরে ফুঁসছে নেপালের তরুণ প্রজন্ম। রাজধানী কাঠমাণ্ডুর রাস্তায় সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিলেন তারা।‘জেনারেশন জি’— দেশের স্কুল-কলেজ পড়ুয়ারা এ বিক্ষোভের মুখ হয়ে উঠেছেন। সোমবার সকাল হতেই কাঠমান্ডুর বাণেশ্বর এলাকায় দফায় দফায় বিক্ষোভ, স্লোগান, আর পুলিশের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। ব্যারিকেড ভেঙে পার্লামেন্ট ভবনে ঢুকে পড়লেন ছাত্র-যুবরা। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, পুলিশ শূন্যে গুলি ছোঁড়ে, টিয়ার গ্যাস আর রবার বুলেট। প্রাণ হারান ১৪ জন। আহতের সংখ্যা ৮০ ছাড়িয়েছে। কাঠমান্ডুর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় জারি করা হয়েছে কার্ফু।

এদিন, রাজধানী কাঠমান্ডুতে মৈতিঘর মন্ডলা থেকে শুরু হয় ‘জেন জি’-দের বিক্ষোভ মিছিল। গন্তব্য— সংসদ ভবন। পথে পড়ে ছিল পুলিশের একের পর এক ব্যারিকেড। কিছুতেই দমে যায়নি আন্দোলনকারীরা। ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যায় উত্তেজিত তরুণ-তরুণীরা। স্লোগান ওঠে, ‘স্বাধীন কণ্ঠস্বর আমাদের অধিকার’, ‘করদাতার টাকা কোথায় গেল?’— ব্যস্ত রাস্তাজুড়ে তখন উত্তাল ‘জেন জি বিপ্লব’।

ঘটনার সূত্রপাত ৪ সেপ্টেম্বর। নেপালের কেপি শর্মা ওলি সরকার ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব, এক্স (সাবেক টুইটার), ইউটিউব-সহ ২৬টি সমাজমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। অভিযোগ, এই প্ল্যাটফর্মগুলি সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালের কাছে যথাযথ নথিভুক্তি না করেই দেশের ভিতরে অনৈতিকভাবে কাজ চালাচ্ছিল। ২৮ আগস্ট সরকারের তরফে ৭ দিনের সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল। ৩ সেপ্টেম্বর সময়সীমা শেষ হলেও কোনো সংস্থা সরকারের নির্দেশ মানেনি। পরদিন, অর্থাৎ ৪ সেপ্টেম্বর, কার্যকর হয় নিষেধাজ্ঞা। সরকারের দাবি, এটা জাতীয় সুরক্ষার প্রশ্ন। কিন্তু ছাত্র-যুবদের চোখে এটা কণ্ঠরোধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ।

চমকপ্রদভাবে, সরকারি নজরদারি এবং ইন্টারনেট শাটডাউন সত্ত্বেও টিকটক, রেডিট ও ভিপিএন-এর সাহায্যে অনান্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে আন্দোলনের বার্তা। প্রতিবাদকারীদের অভিযোগ, ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত শুধু প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ নয়, সরকারের দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, এবং স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ দমন করেতেই এমন কঠোর সিদ্ধান্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্দোলনের বিস্ফোরণ হয় ঠিক তখনই, যখন জনগণের ক্ষোভ আর সরকারের নিপীড়ন একসঙ্গে চূড়ায় পৌঁছয়। যদিও আন্দোলন হিংসাত্মক রূপ নেওয়ার পর আন্দোলনের উদ্যোক্তারা বিবৃতি জারি করে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তাঁদের বক্তব্য, ‘যাঁরা সংসদ ভবনের ভিতরে ঢুকেছেন, তাঁদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। মিছিলের পরিকল্পনা ছিল একটি নির্দিষ্ট যায়গা পর্যন্ত। তার পরে যারা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়েছে, তাঁরা আমাদের মিছিলের আওতাভুক্ত নন।’

প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছিল নেপাল। সংবিধান বদলে, ‘ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক’ রাষ্ট্র হিসেবে নতুন শাসনব্যবস্থা চালু হয় ২০১৫ সালে। কিন্তু স্বাধীনতার ১৭ বছরে দেশটিতে ১৩ বার সরকার বদল হয়েছে। শান্তি আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আজও অধরাই। বর্তমানে ক্ষমতায় রয়েছে চিনপন্থী হিসেবে পরিচিত কেপি শর্মা ওলি নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি অফ নেপাল (ইউএমএল)। তাঁর সরকারকে ইতিমধ্যেই বারবার বিরোধী কণ্ঠস্বর ও সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। গত মার্চে রাজতন্ত্র ফেরানোর দাবিতে কাঠমান্ডুতে বিশাল বিক্ষোভ-মিছিল হয়েছিল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনা পর্যন্ত নামাতে হয়েছিল। তার ঠিক ৬ মাসের মধ্যেই ফের একবার অশান্তির আগুন জ্বলে উঠল নেপালের বুকে।

তবে, আন্দোলনের ঝাঁজ যাই থাকুক, প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি নিজের অবস্থানে অনড়। তিনি বলেছেন, ‘জাতীয় স্বার্থ ও স্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস নয়। বিদেশি সংস্থাদের মনোমতো আইন অমান্য করা বরদাস্ত করা হবে না।’ তাঁর দাবি, ‘জাতীয় স্বার্থের থেকে কিছু মানুষের চাকরি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। যারা আইন মানবে না, তাদের ঠেকাতেই এই পদক্ষেপ।’ কিন্তু দেশে যখন একের পর এক বিক্ষোভে রাস্তায় নেমে পড়ছে তরুণ প্রজন্ম, যখন দেশের ভবিষ্যৎ কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলছে ‘অনেক হয়েছে আর বরদাস্ত নয়’, তখন কণ্ঠরোধ করে কি সরকার সত্যিই দেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারবে? নাকি বরং ক্ষোভের আগুন আরও উসকে দেবে?


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!