- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৫
গণভোটের রায় অমান্য করে আমাজনের বুকে তেল-খনন প্রকল্প! ক্ষোভে ফুঁসছে ইকুয়েডরের মূলনিবাসী জনগোষ্ঠী
আমাজনের বুক চিরে তেল খননের নতুন পরিকল্পনা ঘিরে আবারও ক্ষোভে ফুঁসছে ইকুয়েডরের মূলনিবাসীরা। সরকারের ৪৭ বিলিয়ন ডলারের ‘হাইড্রোকার্বন রোডম্যাপ’ প্রকল্পের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে রুখে দাঁড়িয়েছে অন্তত ৭টি জনগোষ্ঠী। অভিযোগ, পূর্বপুরুষের ভিটেমাটিতে অনধিকার প্রবেশের ছক কষছে নোবোয়া সরকার। যার জবাব দিচ্ছে মূলনিবাসী জনগোষ্ঠী সংগঠনগুলি, সোচ্চারে তারা জানাচ্ছে ‘আমাজন বিক্রির জন্য নয়।’
গত আগস্টে ইকুয়েডরের শক্তি ও খনিজ মন্ত্রণালয় এক মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করে। তাতে বলা হয়, মোট ৪৯টি তেল ও গ্যাস ব্লকের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে। সম্ভাব্য বিনিয়োগ, ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সরকারের দাবি, এ উদ্যোগে আধুনিক হবে দেশের জ্বালানি শিল্প, আসবে বিদেশি মুদ্রা, স্থিতি ফিরবে অর্থনীতিতে। কিন্তু মূলনিবাসী জনগোষ্ঠী নেতৃত্বের সাফ কথা, উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধ্বংসের পরিকল্পনা চলছে। ওয়াওরানি নেত্রী নেমো গুইকিতা সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, ‘আমাদের ভূখণ্ডে তেল খননের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কোনোরকম পরামর্শ ছাড়াই। এ ভূমি শুধু মাটি নয়, আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, পরিচয়। এটি সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।’
একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে, ইকুয়েডর সরকার প্রস্তাবিত ৪৯টি তেল ব্লকের মধ্যে অন্তত ১৮টি ব্লক মূলনিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূখণ্ডের উপর পড়ছে। যার মোট বিস্তার বেলজিয়ামের ভূখণ্ডের চেয়েও বেশি। আন্দওয়া, শুয়ার, আচুয়ার, কিচওয়া, সাপারা, শিউয়ার ও ওয়ারানি— প্রধানত এই ৭টি জাতিগোষ্ঠীর বসবাস ওই অঞ্চলে। অন্যদিকে, সরকারের বক্তব্য, ২০১২ সালে যে ‘পরামর্শ প্রক্রিয়া’ সম্পন্ন হয়েছিল, সেটি এখনো বৈধ। ফলে, নতুন করে কোনো সংবিধান লঙ্ঘন হচ্ছে না। কিন্তু আন্দোলনকারী নেতাদের পাল্টা যুক্তি, সুপ্রিম কোর্ট নিজেই একাধিকবার বলেছে, তৎকালীন পরামর্শ প্রক্রিয়া ছিল অসাংবিধানিক। সে সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে আবারো পুরনো খেলা খেলতে চাইছে সরকার। পরিবেশপ্রেমীরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল নোবোয়া ক্ষমতায় এসেই পরিবেশ রক্ষার যে খোলস নিয়েছেলেন, পুঁজির লোভে তা ছিঁড়ে ফেলেছেন। স্বাধীন পরিবেশ মন্ত্রক তুলে দেওয়ার প্রস্তাব থেকে শুরু করে বেসরকারি সংস্থাকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ব্যবস্থাপনার ছাড়পত্র দেওয়া, সবকিছুই পরিবেশ ও আদিবাসীদের জন্য অশনিসঙ্কেত। কিচওয়া নেতা নাদিনো কালাপুচার বলেছেন, ‘ইয়াসুনি জাতীয় উদ্যানে খননের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালে গণভোটে ৫৯ শতাংশ মানুষ রায় দিয়েছিলেন। তার পরেও সরকার একই পথে হাঁটছে। জনগণের রায় উপেক্ষা করে তেল-সম্পদের পেছনে দৌড় মানে সংবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো।’
বিপদের মেঘ ঘনিয়েছে দেশের অর্থনৈতিক সংকটও। বিগত এক দশকে ইকুয়েডরের তৈল উৎপাদন কমেছে, সরকার রাজস্ব হারিয়েছে। বর্তমানে দিনে গড়ে ৪৮০,০০০ ব্যারেল তেল উত্তোলন হলেও, রাজস্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখননো আসে এ খাত থেকেই। ফলে সে ঘাটতি মেটাতে আন্তর্জাতিক লগ্নিকারীদের কাছে ফের হাত পাততে চাইছে নোবোয়া প্রশাসন। তবে সংগঠিত মূলনিবাসী মানুষদের তীব্র হুঁশিয়ারি, এই পরিকল্পনা একতরফা চাপিয়ে দিলে তার ফল ভাল হবে না। অতীতে যেমন আইনি লড়াই হয়েছে, বিদেশি সংস্থাকে পিছু হটতে হয়েছে, তেমনই ভবিষ্যতেও প্রতিরোধ চলবে। ‘আমাজন ওয়াচ’-এর জলবায়ু ও শক্তি বিভাগের ডিরেক্টর কেভিন কোয়েনিগ আন্তর্জাতিক মহলকে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেছেন, ‘এই প্রকল্পগুলো বৈধ নয়, টেকসই নয়, আর অর্থনৈতিক দিক থেকেও অচল। চলমান প্রতিরোধ আর আন্তর্জাতিক জনমত শেষ পর্যন্ত এ প্রকল্পকে রুখে দেবে।’ অন্যদিকে, এ আবহেই আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্য সেনেট একটি প্রস্তাব পাস করেছে—আমাজনের অপরিশোধিত তেল আমদানির পর্যালোচনার পক্ষে। কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে, আমাজনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের সঙ্গে যুক্ত থাকলে ক্যালিফোর্নিয়া আর সেই অপরিশোধিত তেল গ্রহণ করতে পারে না। ফলে প্রতিদিন ঘনীভূত হচ্ছে উত্তেজনা। ধর্মঘট, প্রতিবাদ, রাস্তায় সংঘর্ষ, সব মিলিয়ে ইকুয়েডর যেন ফুঁসে উঠছে। আর আমাজনের বুকে শোনা যাচ্ছে মূলনিবাসীদের স্পষ্ট আওয়াজ— ‘আমাদের ভূমি বিক্রির জন্য নয়। আমরা রুখে দাঁড়াবই।’
❤ Support Us







