Advertisement
  • এই মুহূর্তে বৈষয়িক
  • সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৫

আদানির ‘ভূ-সাম্রাজ্য’! ছয় রাজ্যে জলের দরে কয়েক হাজার একর বনাঞ্চল আর জমি পাচ্ছে আদানি গোষ্ঠী?

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
আদানির ‘ভূ-সাম্রাজ্য’! ছয় রাজ্যে জলের দরে কয়েক হাজার একর বনাঞ্চল আর জমি পাচ্ছে আদানি গোষ্ঠী?

শিল্পায়নের মোড়কে দেশ জুড়ে জমি দখলের অভিযোগে লাগাতার খবরের শিরোনামে আদানি গোষ্ঠী। বিরোধীদের দাবি, নানা প্রকল্পের ছুতোয় এখনো পর্যন্ত গোটা দেশে আদানি গোষ্ঠীর অধীনে চলে এসেছে প্রায় ৬০ হাজার একর জমি। এবং তা এসেছে জলের দরে, কোথাও ২ টাকা কোথাও ৩০ টাকা বিঘা প্রতি দামে। যদিও সরকারি নথি বা জমি রেকর্ডে এমন দাবির সুনির্দিষ্ট সংখ্যার প্রমাণ নেই, তবু বিভিন্ন প্রকল্প ও অধিগৃহীত জমির হিসাব কষে কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ হাজার একরের সুনিশ্চিত প্রমাণ মিলছে। আরো অনেক জমি হয়তো গোপনে বা বিতর্কিতভাবে হস্তান্তরিত হয়েছে, যার খবর এখনও প্রকাশ্যে আসেনি বলে দাবি জানাচ্ছে ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ।

আদানির জমি সংগ্রহ শুরু গুজরাট থেকেই। ১৯৯৩ সালে মুন্দ্রা বন্দরের জন্য গুজরাট সরকার প্রায় ১৫ হাজার ৯৪৬ একর জমি তুলে দেয় আদানির হাতে। সে সময় রাজ্যে বিজেপি সরকার থাকলেও মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন কেশুভাই পটেল। পরে নরেন্দ্র মোদি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর আরও জমি হস্তান্তর হয়। আদানি দাবি করেন, জমিগুলি ছিল অনাবাদি ও মরু অঞ্চল, কৃষকের জমি নয়। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি ভিন্ন। পরবর্তী সময়ে এ জমির একটি বড়ো অংশ ব্যবহৃত হয়েছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিদ্যুৎ প্রকল্প ও বাণিজ্যিক কারখানার জন্য।

মহারাষ্ট্রেও আদানি গোষ্ঠীর বিস্তার চোখে পড়ার মতো। নবি মুম্বই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জন্য মহারাষ্ট্র সরকারের মালিকানাধীন সংস্থা সিআইডিসিও প্রায় ২,৮৬৬ একর জমি দিয়েছে আদানিকে। এ ছাড়াও, ওই এলাকার কাছেই আদানি রিয়্যালটি আরও এক হাজার একর জমিতে একটি বিশাল টাউনশিপ প্রকল্প শুরু করার তোড়জোড় চালাচ্ছে। শুধু তাই নয়, মুম্বইয়ের বিতর্কিত ধারাভি পুনর্বিকাশ প্রকল্পেও আদানি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে এসেছে ১,০৮০ একরেরও বেশি জমি। জমির মধ্যে রয়েছে কুরলা ডেয়ারি, ডিওনার ডাম্পিং গ্রাউন্ড, মাধ আইল্যান্ডের সরকারি জমি, এমনকি কিছু বনাঞ্চলও, এমনটাই দাবি করেছেন প্রাক্তন মন্ত্রী আদিত্য ঠাকরে। যদিও মহারাষ্ট্র সরকার বলছে, জমিগুলি মূলত পুনঃউন্নয়নের জন্যই দেওয়া হয়েছে এবং এতে কোনও বেআইনি দিক নেই।

বিহারেও দেখা যাচ্ছে একই ছবি। ভাগলপুর জেলার পীরপাইন্টি অঞ্চলে আদানি পাওয়ার (ঝাড়খণ্ড) লিমিটেডকে দেওয়া হয়েছে প্রায় ১,০৫০ একর জমি মাত্র এক টাকার বার্ষিক ইজারায়। কাটা পড়েছে কয়েক লক্ষ গাছ। বিপুল পরিমানের কৃষি ও বাগিচা জমির প্রকৃত মূল্য কত ছিল, কীভাবে এত কম মূল্যে হস্তান্তর হল— এসব প্রশ্ন ঘিরেই সরব হয়েছে কংগ্রেস। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় কৃষকদের মতামত ছাড়াই জমি অধিগ্রহণ হয়েছে, এবং অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয়নি। চলমান এ বিতর্কের মধ্যেই উত্তাল হয়েছে উত্তর-পূর্বের রাজ্য আসাম। রাজ্য সরকারের সঙ্গে চুক্তি করে আদানি গোষ্ঠী গোলপাড়া ও কামরূপ জেলায় একটি সিমেন্ট গ্রাইন্ডিং ইউনিট এবং একটি লজিস্টিক হাব গড়ে তুলতে চায়। যদিও সরকার বলছে, এ জমিগুলি অনাবাদি ও উন্নয়নযোগ্য, পরিবেশবিদদের দাবি, প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত জমির বড়ো অংশই সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও আদিবাসী জনপদের অন্তর্গত। আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্যদের বক্তব্য, তাদের কোনও অনুমতি ছাড়াই জমি চিহ্নিত করা হয়েছে, এবং ইতিমধ্যেই স্থানীয় বনজ সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদ শুরু করে অল অসম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন। তাদের তরফে গৌহাটি হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে প্রকল্প বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত সমস্ত জমি হস্তান্তর স্থগিত রাখতে হবে। আদালত আপাতত প্রকল্প সংক্রান্ত সকল নির্মাণে স্থগিতাদেশ দিয়েছে। আদানি গোষ্ঠীর মুখপাত্র যদিও বলেন, সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া মেনেই জমি নেওয়া হয়েছে এবং এতে বন আইন লঙ্ঘনের কোনও প্রশ্ন নেই।

ওড়িশার বলাঙ্গির জেলাতেও দেখা যাচ্ছে বিতর্কিত জমি অধিগ্রহণের নজির। গন্ধমর্দন পাহাড় সংলগ্ন অঞ্চলে, যেখানে বহু প্রাচীন ধর্মীয় ও মূলনিবাসী জনপদের ঐতিহ্য রয়েছে, সেখানে ১১২.৮৬ একর জমি অধিগ্রহণ করেছে আদানি গোষ্ঠীর সহযোগী সংস্থা মহনদী মাইনস অ্যান্ড মিনারেলস। বলা হচ্ছে, এটি ‘কম্পেনসেটরি অ্যাফরেস্টেশন’-এর জন্য অর্থাৎ কয়লা খনির ক্ষতিপূরণস্বরূপ বনসৃজন। তবে পরিবেশবিদদের দাবি, এ অঞ্চল অত্যন্ত জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এবং কোনো ধরনের শিল্প প্রকল্প সেখানে পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। পুণে শহরের উপকণ্ঠে ২৫ একর জমি কিনেছে আদানির সংস্থা একটি ডেটা সেন্টার স্থাপনের জন্য, যেখানে ফিনোলেক্স গোষ্ঠীর জমি ছিল আগে। আবার গুজরাটের খোদাইয়ার এবং গান্ধীনগরের ডান্তালি এলাকায় গরুর চরাগাছের জমি অর্থাৎ ‘গাউচার’ জমি চেয়ে আবেদন করেছে আদানি, যার পরিমাণ প্রায় ৯৪,০০০ বর্গমিটার (২৩ একর)। যদিও সংস্থা জানিয়েছে, এর বদলে সরকারকে অন্যত্র জমি দেওয়া হবে।

এ সব বনাঞ্চল ও জমি হিসেব করলে মোট জমির পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ২২ হাজার একর ছুঁইছুঁই। বিরোধীদের দাবি, এগুলি কেবলমাত্র সরকারি ও প্রকাশ্য জমির হিসাব। প্রকৃত চিত্র আরও বিস্তৃত এবং অনেক জমি হয়তো ইতিমধ্যেই কোম্পানির দখলে চলে গেছে বিভিন্ন রাজ্যের স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে, যেগুলির তথ্য এখনই প্রকাশ্যে আসেনি। অভিযোগ, আদানি গোষ্ঠী বিজেপি সরকার এবং দেশের নীতিনির্ধারকদের প্রিয়পাত্র হওয়ার সুবাদে ‘নামমাত্র মূল্যে’ এবং ‘বিরোধিতা শূন্য পরিবেশে’ জমি পেয়ে যাচ্ছে। অনেকে বলছেন, একেই বলে ‘নতুন যুগের জমিদারি’— যেখানে রাজ্য সরকারেরাই হয়ে উঠছে কর্পোরেটের জমি-সরবরাহকারী। উন্নয়ন বনাম অধিগ্রহণ, শিল্প বনাম পরিবেশ, এ দ্বন্দ্ব আজ আর কেবল আদানির সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। এটি হয়ে উঠেছে ভারতীয় গণতন্ত্রের একটি মুখ্য প্রশ্ন। যে প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে প্রশাসনকে, আদালতকে এবং সবচেয়ে বড়ো কথা প্রকৃতির উপর করাতসম অত্যাচারের এর খেসারত জনগণকে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!