- Uncategorized
- আগস্ট ২১, ২০২৫
দক্ষিণ সুদানে ফিলিস্তিনিদের ‘নির্বাসন’-এর ছক ! গাজায় শুরু ইজরায়েলের তীব্র অভিযান, মোতায়েন ৬০ হাজার সৈন্য
গাজার উপকণ্ঠে ইতিমধ্যেই অবস্থান নিয়েছে ইজরায়েলি সেনার ৬০ হাজার বিশেষ জওয়ান। সেনা মুখপাত্র জানিয়ে দিয়েছেন, খুব শিগগিরই গাজা শহরে শুরু হবে পূর্ণ মাত্রার সামরিক অভিযান। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকার নতুন দফার লড়াইয়ের জন্য ৬০ হাজার রিজার্ভ সৈন্যকে তলব করেছে, সঙ্গে আরও ২০ হাজার সেনার পরিষেবা মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সেনা মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজরায়েল কাটজ ইতিমধ্যেই এ অভিযান পরিকল্পনার অনুমোদন দিয়েছেন। এবার প্রধান সেনাপতির চূড়ান্ত ছাড়পত্র পেলেই শুরু হবে ‘জঙ্গি দমন’ অভিযান। সেনা সূত্রে খবর, গাজার জেইতুন ও জাবালিয়া অঞ্চলে হামাসের উপস্থিতি সন্দেহে সেখানেই প্রথম হামলার সম্ভাবনা রয়েছে। ইজরায়েলি সেনার মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডেফরিন বলেছেন, ‘গাজা শহরের প্রান্তে ইতিমধ্যেই আমাদের সেনারা পৌঁছে গিয়েছে। এবার ধাপে ধাপে অভিযান এগোবে।’ গাজার বহু অংশ এখন কার্যত ধ্বংসস্তূপ। খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধের মজুত তলানিতে। তার মধ্যেই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক—গাজা দখলের পরে সেখানকার প্রায় ২০ লক্ষ বাসিন্দাকে স্থায়ী ভাবে আফ্রিকার দক্ষিণ সুদানে পাঠিয়ে দেওয়ার ছক কষছে ইজরায়েল।
নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর দাবি, নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে ইতিমধ্যেই একাধিক দেশের সঙ্গে গোপন আলোচনা শুরু করেছে তেল আভিভ। যদিও ইজরায়েল সরকার বিষয়টিকে বলপ্রয়োগ বলে মানতে নারাজ। তারা বলছে, অভিবাসন হবে ‘স্বেচ্ছায়’। কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলের অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত, বোমার আঘাতে ভস্মীভূত একটি ভূখণ্ড থেকে মানুষ প্রাণ বাঁচাতে পলায়ন করলে তাকে ‘স্বেচ্ছা’ বলা চলে কি? অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর মতে, এর মধ্যে রয়েছে একেবারে স্পষ্ট জাতিগত নির্মূলের লক্ষণ। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংগঠন ‘ইউএনএইচসিআর’-ও মনে করছে, এ পরিকল্পনা সরাসরি ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার লঙ্ঘন। জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, ‘দীর্ঘ যুদ্ধের পরিবেশে বহু ফিলিস্তিনি ঘরছাড়া। এখন নতুন অভিযান মানেই আরেক দফা গণচ্যুতি। গোটা একটা প্রজন্ম ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে।’আন্তর্জাতিক শিশু সুরক্ষা সংস্থা ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’-এর আঞ্চলিক পরিচালক আহমেদ আলহেনদাওয়ি মন্তব্য করেন, ‘গাজার শিশুদের জীবনের এই বেদনাময় অধ্যায় ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।’
এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, হঠাৎ দক্ষিণ সুদানই কেন ? সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, গত কয়েক মাসে ইজরায়েলের একাধিক কূটনীতিক এবং বিশেষ প্রতিনিধি দক্ষিণ সুদানে সফর করেছেন। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে বিপুল অর্থ সহায়তার আশ্বাস দিয়ে, সেখানে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে হয়েছে। সেখানেই হয়েছে ‘পুনর্বাসন’ নিয়ে আলোচনা। যদিও দক্ষিণ সুদান সরকার প্রকাশ্যে জানিয়েছে, এই আলোচনা ‘ভিত্তিহীন’। কিন্তু রাষ্ট্রসংঘে নিযুক্ত একাধিক কূটনীতিক জানিয়েছেন, গোপনে আলোচনা চলছে। অর্থনৈতিক ভাবে বিধ্বস্ত, যুদ্ধ-জর্জরিত দক্ষিণ সুদানকে বিপুল অর্থ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেখানে তাড়াতাড়ি ‘অস্থায়ী শিবির’ তৈরির পরিকল্পনা করছে ইজরায়েল। ওয়াশিংটনেও এ বিষয়ে ইজরায়েলি প্রভাব খাটানোর চেষ্টা চলছে। তবে নতুন অভিযান ঘিরে, ইজরায়েলের অভ্যন্তরেও ক্ষোভ তীব্র। যুদ্ধবিরতির দাবিতে হাজার হাজার মানুষ ইতিমধ্যেই রাস্তায় নেমেছেন। বেশ কিছু রিজার্ভ সৈন্য প্রশ্ন তুলেছেন যুদ্ধের উদ্দেশ্য নিয়ে। তাঁদের অভিযোগ, সরকার রাজনৈতিক স্বার্থে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করছে, অথচ জিম্মিদের মুক্ত করার কোনো বাস্তব পরিকল্পনা করা হচ্ছে না। প্রাক্তন এয়ারফোর্স পাইলট গাই পোরান, যিনি যুদ্ধবিরতির দাবিতে ভেটেরানদের এক আন্দোলন শুরু করেছেন, তিনি বলেছেন, ‘অনেকেই এবার যুদ্ধে যেতে চাইছেন না। পরিবার, ব্যবসা আর ক্লান্তি, সব মিলিয়ে রিজার্ভ সৈন্যদের একটা বড় অংশ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।’
ইজরায়েলি এহেন পরিকল্পনার পিছনে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও স্পষ্ট। বিগত কয়েক মাস ধরেই ইসরায়েলি ডানপন্থী রাজনীতিকদের মুখে ঘুরছে একটিই কথা— ‘গাজা দখল চাই।’ ২০২৩ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজা দখলের পরে বলেছিলেন, সেখানকার বাসিন্দাদের প্রতিবেশী দেশে পুনর্বাসনের রূপরেখা ভাবা হচ্ছে। নেতানিয়াহু সে কথাই কার্যকর করতে চাইছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘যুদ্ধের আইন অনুযায়ীও সঠিক কাজ হবে যদি সাধারণ মানুষ সরে যান, এবং তারপর আমরা শত্রুর বিরুদ্ধে সর্বশক্তি প্রয়োগ করি।’ ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে কোথাও ফিলিস্তিনিদের ‘ নিজের ভূ-খণ্ডে ফেরত আসার অধিকার’-এর কোনো স্থান নেই। এ মুহূর্তে গাজায় ত্রাণশিবিরগুলো উপচে পড়ছে। রাস্তায়, স্কুলে, উড়ালপুলে, এমনকি গোরস্থানের ফাঁকা জায়গাতেও ছাউনি খাটিয়ে দিন কাটাচ্ছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। খাদ্য নেই, পানীয় জল নেই, ওষুধ নেই। দলে দলে মানুষ গাজা শহর ছেড়ে দক্ষিণে পাড়ি দিচ্ছেন, কিন্তু যেখানেই যান, নিরাপত্তা নেই। তার মধ্যেই নেতানিয়াহুর সরকারের এই ‘স্বেচ্ছা অভিবাসন’-এর ছক, যা আদতে গাজা ফাঁকা করে দেওয়ার একটি উপায় বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যদি সত্যিই ফিলিস্তিনিদের দক্ষিণ সুদানে ‘নির্বাসন’-এ পাঠানো হয়, তবে তা ভয়াবহ ধর্মীয় সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। মনে রাখা দরকার, সুদান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ২০১১ সালে গঠিত হয় দক্ষিণ সুদান, যার প্রধান জনসংখ্যা খ্রিস্টান ও অ-আরব। ওই অঞ্চলে ইসলামফোবিয়া দীর্ঘদিনের সমস্যা। এখন সেখানে যদি লাখ লাখ ফিলিস্তিনি মুসলিমকে পাঠানো হয়, তবে স্থানীয় জনতার অসন্তোষ জাগবে। দক্ষিণ সুদানের সমাজকর্মী এডমান্ড ইয়াকানি সরাসরি বলেছেন, ‘দক্ষিণ সুদান কোনো ডাম্পিং গ্রাউন্ড নয়। রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরির নামে আমরা আমাদের দেশে বারুদের স্তূপ তৈরি করতে পারি না।’ এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন একটাই, গাজার মানুষ যদি গাজায় থাকতে না পারেন, অন্য দেশেও যদি নিরাপদ না হন, তবে তাঁদের স্থান কোথায়? এবং ইজরায়েল যদি গাজার মানুষদের জন্য চিরস্থায়ী দেশান্তরের ব্যবস্থা করে, তবে তা আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং ইতিহাস, সব কিছুর সঙ্গেই সরাসরি সংঘাত বাঁধবে।
প্রসঙ্গত, হামাস ইতিমধ্যেই ৬০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে বলে জানিয়েছে মিশর ও কাতার। তবে তা নিয়ে ইজরায়েল কোনো মন্তব্য করেনি। এক ইজরায়েলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাঁরা এখনো মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, হামাস বলেছে, জিম্মি মুক্তি ও বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ হোক। কিন্তু নেতানিয়াহুর স্পষ্ট বার্তা, ‘হামাস পুরোপুরি নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে।’বুধবার উত্তর গাজার জিকিম ক্রসিংয়ে মানবিক সহায়তা নিতে যাওয়া জনতার উপর গুলি চালায় ইজরায়েলি সেনা, এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। কমপক্ষে ২৭ জন নিহত, আহত ১০০-র বেশি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী, ইজরায়েলি সেনার অভিযানে এ পর্যন্ত প্রায় ৬২,১২২ জন নিহত, যাদের প্রায় অর্ধেকই নারী ও শিশু। অপুষ্টিতে মৃত্যু হয়েছে ১৫৪ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১১২ শিশুর।
❤ Support Us








