- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৫
গাজায় ফের নিধনযজ্ঞ শুরু ইজরায়েলের, বাসিন্দাদের দক্ষিণে সরে যেতে নির্দেশ। ‘গণহত্যা চলছে ফিলিস্তিনে’ রিপোর্ট পেশ জাতিসংঘের
রাতভর বোমা বৃষ্টির পরে মঙ্গলবার ভোরে গাজা সিটির উপর ‘সম্প্রসারিত সামরিক অভিযান’ শুরুর কথা ঘোষণা করল ইজরায়েল। ‘হামাসের ঘাঁটি ধ্বংসের’ লক্ষ্যে শুরু হওয়া এ অভিযানকে ঘিরে উত্তাল হয়ে উঠেছে গোটা দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া। এদিকে, জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে বিষ্ফোরক অভিযোগ— ‘গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে ইজরায়েল।’
গাজা যেন আর কোনো ভূখণ্ড নয়, বরং এক বিশাল মৃত্যুক্ষেত্র। শহরের উপর আকাশপথে আগুন ঝরিয়ে এখন ইজরায়েলি সেনা ঢুকে পড়েছে স্থলপথেও। গাজা সিটিকে কেন্দ্র করে ইজরায়েলের সামরিক অভিযান প্রবেশ করেছে এক নতুন পর্বে, যেখানে লক্ষ্য শুধু হামাস নয়, কার্যত গোটা অঞ্চলটিকেই ‘নিরাপত্তাহীন’ করে তোলা। মঙ্গলবার ভোরে ইজরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়ে দিয়েছে, গাজা শহরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে তাদের সেনা, এবং ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ অর্জনের লক্ষ্যে এ অভিযান চলবে। এমনকি এক্স-এ দেওয়া পোস্টে ইজরায়েলের আরবিভাষী সরকারি মুখপাত্র আভিচাই আদ্রে বলেছেন, ‘গাজা সিটিতে হামলার দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়েছে। বাসিন্দাদের দ্রুত দক্ষিণে সরে যেতে হবে।’ ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজরায়েল কাটজও বলেন, ‘গাজা এখন আগুনে পুড়ছে। আমরা লৌহ মুষ্টিতে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়ছি। পিছু হটার কোনো প্রশ্নই নেই।’ এমনকী, এক দুর্নীতির মামলায় তেল আভিভের আদালতে সাক্ষ্য দিতে এসে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও জানিয়েছেন, গাজা-অভিযান এখন ‘এক গুরুত্বপূর্ণ পর্বে’ প্রবেশ করেছে। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, ‘যতক্ষণ না হামাস নির্মূল হচ্ছে আক্রমণ জারি থাকবে।’
সোমবার রাতভর গাজা শহরের উপর চলে মারাত্মক বিমান হামলা। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, শহরের পশ্চিমাঞ্চলে কয়েকটি আবাসিক বাড়ির উপর বোমার আঘাতে অন্তত ৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, জখম ৯০ জনেরও বেশি। শিফা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, এখনো বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে রয়েছেন। উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত বাধার মুখে পড়ছেন তাঁরা। গাজা শহরকে কার্যত যুদ্ধের ময়দান হিসেবে পরিণত করেছে ইজরায়েলি সেনা। চলমান বিভীষিকা দেখে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে— সত্যিই কি কেবল হামাসই এই যুদ্ধে লক্ষ্য? উত্তর মিলছে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্তে। মঙ্গলবার প্রকাশিত হয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার কমিশনের ৭২ পাতার বিস্ফোরক রিপোর্ট। তাতে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, গাজায় যা চলছে তা কেবল যুদ্ধ নয়, বরং তা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ‘গণহত্যা’। ৪টি পৃথক জাতিগত নিধনের ধারা, গণহারে হত্যা, শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতি সাধন, জীবনধারণের উপযোগী পরিস্থিতি ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস, এবং প্রজনন রোধের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যবস্থা— ফিলিস্তিনে সবই চালিয়েছে ইজরায়েল।
তদন্তের নেতৃত্বে থাকা জাতিসংঘ কমিশনের চেয়ারপার্সন নাভি পিল্লাই এদিন সাফ জানিয়েছেন, গাজায় যা চলছে তা কোনো বিচ্ছিন্ন প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নয়, বরং পরিকল্পিত, সুদূরপ্রসারী, এবং রাষ্ট্রীয় মদতে চালানো একটি নিষ্ঠুর অভিযান। তিনি বলেন, ‘শুধু গাজা নয়, পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমেও একইরকম উচ্ছেদের মনোভাব দেখা যাচ্ছে। লক্ষ্যমাত্রা শুধু হামাস নয়, বরং গোটা ফিলিস্তিনি জাতিগোষ্ঠী।’ জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভল্কার তুর্ক বলেন, ‘দোহায় ইজরায়েলের হামলা শুধু আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির প্রচেষ্টার উপরও আঘাত।’ তেল আবিব অবশ্য এই রিপোর্টকে ‘ভিত্তিহীন ও পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের বক্তব্য, ‘এ রিপোর্ট আসলে হামাসের অপপ্রচারের ফল। জাতিসংঘ কিছু পক্ষপাতদুষ্ট মহলের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।’ যদিও বাস্তব বলছে অন্য কথা। নানান আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসেব অনুযায়ী, ইতিমধ্যে গাজা ভূখণ্ডের প্রায় ৮৫ শতাংশ দখল করে ফেলেছে ইজরায়েলি বাহিনী। নয়া হামলার উদ্দেশ্য স্পষ্ট, বাকি অংশও হাতছাড়া করতে নারাজ নেতানিয়াহুর প্রশাসন। বস্তুত, বহুদিন ধরেই গাজা পুরোপুরি দখলের কথা বলে আসছেন নেতানিয়াহু। সে লক্ষ্যে একের পর এক আক্রমণ চলছে তাঁরা। ফিলিস্তিনি বাসভবন, স্কুল, হাসপাতাল, কোনো কিছুকেই রেহাই দেওয়া হচ্ছে না। বোমাবর্ষণে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে গোটা পাড়া, শরণার্থী শিবিরের উপরও আছড়ে পড়ছে আঘাত।
ইজরায়েল গাজা শহরের বাসিন্দাদের দক্ষিণে চলে যেতে নির্দেশ দিয়েছে। গত এক মাসে প্রায় ২,২০,০০০ মানুষ গাজা ছেড়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো— দক্ষিণে কোথায় যাবে বিপুল সংখ্যক নাগরিক? সেখানে ইতিমধ্যেই লক্ষাধিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। অস্থায়ী তাঁবুতে, উন্মুক্ত আকাশের নিচে চলছে দিনযাপন। খাদ্য, চিকিৎসা, পানীয় জল, সব কিছুরই হাহাকার। বহু বাসিন্দা অভিযোগ করছেন, গাজা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত যানবাহন নেই। যেটুকু আছে, তার ভাড়া এত বেশি যে সাধারণ মানুষ বহন করতে অক্ষম। ফলে যুদ্ধের মুখে পড়েও বহু মানুষ অসহায়ভাবে গাজা শহরের মধ্যেই আটকে রয়েছেন। এমতো অবস্থায় মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও, যিনি সম্প্রতি ইজরায়েল সফর সেরে কাতারে পৌঁছেছেন, স্পষ্ট বলেছেন, ‘এ যুদ্ধ আলোচনার মাধ্যমে বন্ধ করা না গেলে তা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেবে। আমাদের হাতে সময় খুব কম। হয় এখনই, নয়তো আর কখনও নয়।’
গত সপ্তাহে দোহায় হামলায় ৫ জন হামাস সদস্য এবং কাতারের এক নিরাপত্তা আধিকারিক নিহত হন। সে হামলার পর থেকেই কাতার ও অন্য আরব দেশগুলির মধ্যে প্রবল ক্ষোভ ছড়িয়েছে। কাতারে সম্প্রতি আয়োজিত এক আরব-ইসলামিক সম্মেলনে তীব্র নিন্দা করা হয় ইজরায়েলের সামরিক অভিযান ও দোহায় হামলার। যদিও এখনো পর্যন্ত কোনো বড়ো কূটনৈতিক চাপ কার্যকর করা হয়নি। অসহায় ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রশ্ন একটাই, এ কি কেবল সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই, না কি এক জাতির অস্তিত্বকে মুছে ফেলার নীলনকশা? গাজায় প্রতিমূহূর্তে বোমা পড়ছে, গুলি চলছে। শিশু, নারী, বৃদ্ধ কেউ রেহাই পাচ্ছেন না। শহরের রাস্তা উপচে পড়ছে মৃত্যুর মিছিল। ইজরায়েল বলছে, যুদ্ধ না করলে জিম্মিরা ফেরত আসবে না। জিম্মিদের পরিবার বলছে, যুদ্ধ চললে তারা ফেরত আসবে না। সোমবার রাতে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির সামনে জড়ো হয়েছিলেন গাজায় আটকে থাকা জিম্মিদের পরিবার। তাঁরা চোখের জলে বলছেন, ‘আমাদের প্রিয়জনেরা যদি বেঁচেও থাকে, এই হামলার পর আর ফিরবে কি?’ এসবের মাঝে যুদ্ধের কড়াল জালে আটকে বিশাল এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে গাজা। আর গোটা একটি জাতির অস্তিত্বের ভবিষ্যৎ প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড়িয়ে।
❤ Support Us








