- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৫
একটানা ৫ ঘণ্টার রেকর্ড বৃষ্টিতে তিলোত্তমা জলমগ্ন, শহর জুড়ে দুর্যোগ, বাস, ট্রেন, মেট্রো চলাচল ব্যাহত, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত ৭ , দিকে দিকে আতঙ্কের ছবি
রাতভর প্রবল বৃষ্টিতে জলমগ্ন শহর কলকাতা। এমন ভয়ঙ্কর দুর্যোগ ও জলযন্ত্রণার ছবি শেষ কবে কলকাতা দেখেছে সেটা অজানা। পুজোর আগে কার্যত সেজে ওঠা কলকাতা এক কথায় বিপর্যস্ত । গলি থেকে রাজপথ সর্বত্র জলস্রোত বহমান। কোথায় কোমর-জল , কোথাও বুক-জল। দিকে দিকে আটকে গাড়ি। ৫ ঘণ্টায় রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টির সাক্ষী থেকেছে কল্লোলিনী কলকাতা। সবথেকে বেশি বৃষ্টি দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়ার কামডহরিতে। এদিকে ব্রিশটীর জমা জলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। সকাল থেকে চলেনি মেট্রো, ট্রেন, বাস, উবর । ফলে চূড়ান্ত নাজেহাল অবস্থা হয়েছে অফিসে যাত্রী সহ নিত্যযাত্রীদের।
কলকাতা পুরসভার তথ্য অনুযায়ী ৫ ঘণ্টার ব্যবধানে কখনও এত পরিমাণ বৃষ্টি নথিবদ্ধ হয়নি। কলকাতার প্রায় সর্বত্র বৃষ্টি হয়েছে। তার জেরে অধিকাংশ এলাকায় জল জমেছে। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে গড়িয়ার কামডহরিতে, ৩৩২ মিলিমিটার। ভোর চারটে থেকে গঙ্গার সব লকগেট খোলা হয়েছে। কিন্তু দুপুর ১২টায় আবার লকগেট বন্ধ করা হবে। ফলে ওই সময় ফের ভারী বৃষ্টি হলে জলযন্ত্রণা আরও বাড়বে। কলকাতা পুরসভা থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে জলমগ্ন এলাকায় কেউ যাতে বিদ্যুতের বাতিস্তম্ভে হাত না দেন।
কলকাতা পুরসভা সূত্রে জানা গেছে কোথায় কত বৃষ্টি হয়েছে :
কামডহরি (গড়িয়া): ৩৩২ মিলিমিটার
যোধপুর পার্ক: ২৮৫ মিলিমিটার
কালীঘাট: ২৮০.২ মিলিমিটার
তপসিয়া: ২৭৫ লিমিমিটার
বালিগঞ্জ: ২৬৪ মিলিমিটার
চেতলা: ২৬২ মিলিমিটার
মোমিনপুর: ২৩৪ মিলিমিটার
চিংড়িঘাটা: ২৩৭ মিলিমিটার
পামার বাজার: ২১৭ মিলিমিটার
ধাপা: ২১২ মিলিমিটার
সিপিটি ক্যানাল: ২০৯.৪ মিলিমিটার
উল্টোডাঙ্গা: ২০৭ মিলিমিটার
কুঁদঘাট: ২০৩.৪ মিলিমিটার
পাগলাডাঙা: (ট্যাংরা)২০১ মিলিমিটার
কুলিয়া (ট্যাংরা): ১৯৬ মিলিমিটার
ঠনঠনিয়া: ১৯৫ মিলিমিটার
প্রবল বৃষ্টিতে সকাল থেকে ব্যাহত হয়েছে রেল পরিষেবা। শিয়ালদা দক্ষিণ শাখায় ভোরে শুরুই হয়নি ট্রেন চলাচল। শিয়ালদা মেন, বনগাঁ শাখায় দেরিতে ট্রেন পরিষেবা শুরু হয়েছে। বাতিল করা হয়েছে কলকাতা-হলদিবাড়ি এক্সপ্রেস ট্রেন। শিয়ালদা-হাজারদুয়ারি ও শিয়ালদা-জঙ্গিপুর এক্সপ্রেস বাতিল করা হয়েছে। প্রায় ৩-৪ টি এক্সপ্রেস ট্রেনের সময়সীমা পরিবর্তন করা হয়েছে। টিকিয়াপাড়া কারশেডে জল, হাওড়া ডিভিশনেও দেরিতে চলছে ট্রেন।
পথে বেরিয়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন যাত্রীরা। শিয়ালদা মেন আর বনগাঁ শাখায় নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশ কিছুক্ষণ দেরিতে শুরু হয় ট্রেন পরিষেবা। অন্যদিকে, মেট্রো রেলের ট্র্যাকে জল ঢুকে যাওয়ায় ব্যাহত হয়ে পড়ে মেট্রো পরিষেবাও। দক্ষিণেশ্বর থেকে ময়দান পর্যন্ত আপ ও ডাউনে পরিষেবা স্বাভাবিক থাকলেও, ময়দান স্টেশনের পর বাকি অংশে মেট্রো চালানো সম্ভব হচ্ছে না।

আবহাওয়া দফতর সূত্রে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে গড়িয়ার কামডহরিতে, ৩৩২ মিলিমিটার। এরপর যোধপুর পার্কে ২৮৫ মিলিমিটার, কালীঘাটে ২৮০ মিলিমিটার, তপসিয়ায় ২৭৫ মিলিমিটার। ভোর চারটে থেকে গঙ্গার সব লকগেট খোলা হয়েছে। কিন্তু দুপুর ১২টায় আবার লকগেট বন্ধ করা হবে। ফলে ওই সময় ফের ভারী বৃষ্টি হলে জলযন্ত্রণা আরও বাড়বে বলে কলকাতা পুরসভা ও আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে।
এখনও পর্যন্ত খবর, সারারাত বৃষ্টির ফলে পূর্ব রেলের হাওড়া ব্যান্ডেল শাখায় ট্রেন চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। কারশেডে জল জমে যাওয়ার কারণে ট্রেন স্টেশনে ঢুকতে যথেষ্ট দেরি হচ্ছে। সিগন্যাল সিস্টেম কাজ না করায় এই সমস্যা। এর জেরে অফিস টাইমে যাত্রীদের দুর্ভোগ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পুজোর দ্বিতীয়া মঙ্গলবার। দ্বিতীয়ার দিনই নিম্নচাপের বৃষ্টি কলকাতাকে প্লাবিত করলো। রাতভর তুমুল বৃষ্টির জেরে কলকাতা, সল্টলেক এবং লাগোয়া এলাকা বানভাসি রূপ নিয়েছে। কোথাও কোমর সমান জল, কোথাও আবার হাঁটু পর্যন্ত। গাড়িয়া, কামডহরী, গাঙ্গুলিবাগান সহ বহু এলাকার বাড়ির একতলায় জল ঢুকে গেছে। বিভিন্ন এলাকায় পুজোর প্রস্তুতি সংকটে পড়েছে। কোথাও ভেঙে পড়েছে নির্মীয়মাণ স্টল। কোথাও আবার বিজ্ঞাপনের গেট।
শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার আপ ও ডাউন লাইনে ট্রেন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ। বারুইপুর স্টেশন থেকে সকাল ৫টা ৮ মিনিটে একটি আপ শিয়ালদহ লক্ষীকান্তপুর লোকাল ছাড়ে। তার পর থেকে আপ ও ডাউন লাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ। পথে বেরিয়ে নাকাল নামখানা, লক্ষ্মীকান্তপুর, ডায়মন্ড হারবার, ক্যানিং ও বজবজ লাইনের রেল যাত্রীরা।
জল জমেছে টিকিয়াপাড়া কারশেডেও। রেল লাইনে জল জমায় ব্যাহত ট্রেন চলাচল। রেল সূত্রে খবর, দূরপাল্লার ট্রেনগুলি হাওড়া স্টেশনে ঢুকতে পারছে না। বিভিন্ন স্টেশনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
হাওড়া থেকে নির্ধারিত সময়ে ছাড়েনি হাওড়া-পুরী এবং হাওড়া-এনজেপি বন্দে ভারত এক্সপ্রেস-সহ একাধিক ট্রেন। লোকাল ট্রেন পরিষেবা একই ভাবে ব্যাহত এই ডিভিশনে। কোনওক্রমে দু’ একটি লোকাল ট্রেনকে হাওড়া স্টেশন পর্যন্ত আনার চেষ্টা চলছে। শালিমার স্টেশনে সিগন্যাল সিস্টেমই খারাপ হয়ে গিয়েছে। ফলে পরিষেবা ব্যাহত সেখানেও। যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সিগন্যাল সারানোর কাজ চলছে।
রেলের তরফে এখনও অবধি পাওয়া তথ্য বলছে
১. আপ হাজারদুয়ারি এক্সপ্রেস আজকের জন্য বাতিল
২. শিয়ালদহ জঙ্গিপুর এক্সপ্রেস বাতিল
৩. শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখায় ট্রেন চলাচল আপাতত বন্ধ
৪. চিৎপুর ইয়ার্ড ও লাইনে জল জমে যাওয়ায় চক্ররেল বন্ধ
হাওড়া ডিভিশনে ব্যাহত রেল পরিষেবা
১. হাওড়া থেকে পুরী, এনজেপি যাওয়ার বন্দে ভারত এক্সপ্রেস নির্ধারিত সময়ে স্টেশন ছাড়তে পারেনি
২. হাওড়া রাঁচি শতাব্দী, গণদেবতা, ব্ল্যাক ডায়মন্ড এক্সপ্রেস ছাড়েনি
৩. হাওড়া-মশাগ্রাম, হাওড়া-ব্যান্ডেল, হাওড়া-তারকেশ্বর, হাওড়া-হরিপালগামী একাধিক লোকাল ট্রেন বাতিল
৪. এ ছাড়াও আরও বহু লোকাল, দূরপাল্লার ট্রেন থমকে রয়েছে।
উৎসবের মরশুমে বিপর্যয়। টানা বৃষ্টিতে জলমগ্ন কলকাতা-সহ বাংলার বিস্তীর্ণ এলাকা। সেই জমা জলে পরে তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শহরের বিভিন্ন জায়গায় মৃত্যু হয়েছে কমপক্ষে ৭ জনের। ইতিমধ্যেই দেহ উদ্ধার করে পাঠানো হয়েছে ময়নাতদন্তে।
কলকাতার যাদবপুর, পার্কসার্কাস, তারাতলা, একবালপুর, ভবানীপুর-সহ সর্বত্র যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল। মঙ্গলবার সকালে বাড়ি থেকে বেরনোই কাল হল ফল বিক্রেতা বাবু কুণ্ডুর। জানা যাচ্ছে, এদিন সকালে নেতাজিনগর এলাকা দিয়ে সাইকেলে যাচ্ছিলেন তিনি। কোনও কারণে বিদ্যুতের খুঁটিতে হাত দেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে তড়িদাহত হয়ে ছিটকে পড়েন রাস্তায়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তাঁর। একবালপুরে তড়িদাহত হয়ে মৃত্যু হয়েছে এক বৃদ্ধের। তাঁর নাম জিতেন্দ্র সিং। অচৈতন্য অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে এসএসকেএমে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত বলে ঘোষণা করেন। এছাড়াও কালিকাপুর, গড়িয়াহাট, বেনিয়াপুকুর থেকেও মৃত্যুর খবর মিলেছে। শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী মোট মৃতের সংখ্যা ৭। তবে তা বাড়তে পারে বলেই আশঙ্কা।
বৃষ্টিতে চরম দুর্ভোগ কলকাতা শহরের একাধিক মেডিক্যাল কলেজে। ন্যাশনাল মেডিক্যাল থেকে কলকাতা মেডিক্যাল, এসএসকেএম হাসপাতাল থেকে আর জি কর মেডিক্যাল, এক রাতের ভারী বৃষ্টিতে জলমগ্ন শহরের প্রথম সারির সবকটি সরকারি হাসপাতাল। ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে জলে হাবুডুবু খাচ্ছে জরুরি বিভাগ। ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে ওয়ার্ডের ভিতরেও হাঁটুজল। রোগীদের বেডের পায়ার প্রায় পুরোটাই জলের তলায় ডুবে। জলে ভাসছে ডিজিটাল এক্স রে রুম। ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে MRI রুমও জলের তলায় ডুবে। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে কার্যত হাঁটুজল ঠেলে যাতায়াত করতে হচ্ছে সবাইকে।
প্রকৃতি শান্ত না হলে বাঙালির সেরা উৎসব দূর্গা পুজোর আনন্দ মাটি না হয় এই আশংকায় ভুগছে শহরবাসী থেকে শুরু করে পুজো উদ্যোক্তারা।
❤ Support Us






