Advertisement
  • খাস-কলম প্রচ্ছদ রচনা
  • মে ৪, ২০২৩

বিহারের জাত সুমারিতে আদালতের স্থগিতাদেশ। নীতিশের লক্ষ্যপূরণে জোর ধাক্কা। জাতি সমস্যাকে ইস্যু করেই ২৪এ ভোট লড়তে চায় বিরোধী জোট

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বিহারের জাত সুমারিতে আদালতের স্থগিতাদেশ। নীতিশের লক্ষ্যপূরণে জোর ধাক্কা। জাতি সমস্যাকে ইস্যু করেই ২৪এ ভোট লড়তে চায় বিরোধী জোট

২৫২৫ সালে আরএসএস-এর শতবর্ষ। ২০২৪-এ, দেশের ১৮তম লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে এক দেশ, এক জাতি, এক ভাষা তত্ত্বকে মজবুত ভাবে ভারতে কায়েম করার লক্ষ্য গেরুয়া শিবিরের । আর ঠিক একই সময়ে ২০২৪-এর লোকসভা  নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপির হিন্দুত্বের তাসের বিরোধিতা করে, কংগ্রেস সহ দেশের সব বিরোধী দল ক্ষমতায় ফিরে আসার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। ভারতে বিরোধী দলগুলি কাছে ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন একটা বড়ো চ্যালেঞ্জ। দেশে বিরোধীদের শক্তি এখন অনেকাংশে অস্তিত্বের সংকটে দীর্ণ। সেই আবহেই দেশে জাতিভিত্তিক জনগণনার আওয়াজ তুলে  জাতীয় স্তরে নিজেদের পুনরুজ্জীবিত করতে চাইছে বিরোধী শিবির।

কেন্দ্রের কাছে জাতিভিত্তিক জনগণনার যৌথ দাবি নিয়ে দেশ জুড়ে জনমত গড়ে তোলার প্রয়াস নিয়েছে কংগ্রেস, জনতা দল (ইউনাইটেড), সমাজবাদী পার্টি এবং রাষ্ট্রীয় জনতা দল। ২০২৪-এর নির্ধারিত লোকসভা নির্বাচনের আগে, এই দাবিকে সামনে রেখেই যৌথ ফ্রন্ট গঠন করে রাজনীতির ময়দানে নামতে চাইছে বিরোধীরা।

এই বছরের জানুয়ারিতে, বিহার জাতিভিত্তিক জনগণনা চূড়ান্ত করার সাথে সাথে, বিষয়টি উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু এবং কর্ণাটকের মতো অন্যান্য রাজ্যে গতি পেয়েছে।

বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার তাঁর রাজ্যে জাতিভিত্তিক জনগণনার ব্যয় ধার্য করেছে ৫০০ কোটি টাকা। জনগণনা শেষ করার সময়সীমা মে ২০২৩।জেডি (ইউ) সরকারের এর সপক্ষে যুক্তি,  জাতিভিত্তিক জনগণনার কল্যাণকর নীতিকে কাজে লাগিয়ে, পিছিয়ে থাকা শ্রেণীর আর্থ সামাজিক মানোন্নয়ন অনেকাংশে সুনিশ্চিত করা যাবে। নীতিশ কুমার আরও বলেছেন যে তথ্য ছাড়া, অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণীর (ওবিসি) জনসংখ্যা সঠিকভাবে অনুমান করা সত্যিই কঠিন। কংগ্রেসেরও এই বিষয়ে একই বক্তব্য, কিন্তু ভারতীয় জনতা পার্টি এবিষয়ে সহমত নয়, বলা যায় বিজেপি জাতিভিত্তিক জনগণনায় অনিচ্ছুক। যদিও আজই নীতিশের জাতিভিত্তিক জনগণনার সমীক্ষা কর্মসূচীকে আপাতত স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

এপ্রিলের শুরুতেই মাসে, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে একটি চিঠি লিখে একটি সর্বশেষ তথ্য সম্বলিত এবং সর্বশেষ তথ্যভিত্তিক জনগণনার রিপোর্ট দ্রুত তৈরী করার আবেদন জানান। এনিয়ে তাঁর এবং হাত শিবিরের অভিমত, এই তথ্যভান্ডার ছাড়া “সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ক্ষমতায়ন কর্মসূচি রূপায়ণ করার কাজ, বিশেষ করে ওবিসিদের জন্য, অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

কংগ্রেসের দাবিকে সমর্থন করে, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার একটি জাতীয় জাতিভিত্তিক জনগণনার দাবি জানিয়ে বলেছেন, জাতিভিত্তিক জনগণনার তথ্যভান্ডার সমাজের সব শ্রেণীর জন্য উপকারী হবে। বিহারের বিজেপি দল বিহারের নীতিশ কুমার সরকারের এই প্রস্তাবকে সমর্থন করলেও বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এই বিষয়ে এখনও কোনও সাড়াশব্দ করেনি।

২০২৪ -এর  লোকসভা নির্বাচনে তাই সংরক্ষণ একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়াচ্ছে শাসক-বিরোধী সবার কাছে। এই বিষয়ে শাসক ও বিরোধীদের পরস্পর বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে  ‘মণ্ডল বনাম কমণ্ডল’ রাজনীতির মধ্যেই, ২০২৪-এর লোকসভা নিৰ্বাচনের আগে দেশ জুড়ে যা ব্যাপক আকার নিতে চলেছে।

বিজেপি যেখানে একটি অখন্ড হিন্দু রাষ্ট্র সম্পর্কে তাদের বিজয় শিঙা বাজিয়া দিয়েছে, সেখানে বিরোধী দলগুলি জাতভিত্তিক বিহ্যাভন করে এই সময়টাকে মেরুকরণের রাজনীতির একটি উপযুক্ত মুহূর্ত হিসাবে কাজে লাগাতে চাইছে।

‘মন্ডল’, একটি শব্দ যা প্রায়শই অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণী বা ওবিসি এবং তফসিলি জাতিগুলির রাজনীতির জন্য উল্লেখ করা হয়, এর উৎপত্তি মন্ডল কমিশনে যা ১৯৭৯ সালে জনতা পার্টি সরকার কর্তৃক “সামাজিক বা শিক্ষাগতভাবে অনগ্রসর শ্রেণীগুলিকে চিহ্নিত করার জন্য” প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর  ‘কমন্ডল’-এর  আক্ষরিক অর্থ আধ্যাত্মিক চেতনা দ্বারা ব্যবহৃত জলের সেই পাত্র, যাতে করে  বছরের পর বছর ধরে হিন্দুত্ত্বের  রাজনীতি রূপক হয়ে উঠেছে।

“মন্ডল” শব্দটি ৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে দুটি হিন্দি কেন্দ্রস্থল – উত্তরপ্রদেশ এবং বিহারের জটিল রাজনৈতিক আবহে কেন্দ্রীয়তা লাভ করে এবং আঞ্চলিক দলগুলি দ্বারা ব্যবহৃত হয়, যা প্রধানত বর্ণ-ভিত্তিক রাজনীতিতে আটকে ছিল এবং বিজেপি, যারা হিন্দুত্বকে দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করেছিল মতাদর্শগতভাবে।

এদিকে কর্ণাটকের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক মুহূর্তে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির ইস্তেহারে এবং গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কর্ণাটক রাজ্যজুড়ে  প্রচার চালিয়ে যাওয়া নেতাদের ভাষণে যে শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তা হল ‘মণ্ডল’। এই মণ্ডলকে নতুন করে উদ্ভাবনের চেষ্টায়রত এখন কর্ণাটকের রাজনৈতিক নেতারা। বিজেপির ‘কমণ্ডল’ বা হিন্দুত্ববাদী তকমাকে মোকাবেলা করতে “মন্ডল” এখন সেই রাজ্যে বিরোধীদের প্রধান হাতিয়ার।

এর আগে কোলারে হাজার হাজার সমর্থকদের উপস্থিতিতে, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকারকে ২০১১ সালের আর্থ-সামাজিক ও বর্ণ শুমারি তথ্য “গোপন” করার জন্য অভিযুক্ত করেছিলেন, অথচ  কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকাকালীন নিজেই এই “গোপন” তথ্য প্রকাশ করেনি বা করতে পারেনি।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী আরও দাবি করেছিলেন যে তফসিলি জাতি এবং তফসিলি উপজাতিদের জন্য কোটা “তাদের জনসংখ্যার অনুপাতে” হওয়া উচিত। তাঁর এই বক্তব্যের সমর্থনে রাহুলবলেছিলেন,  “জিতনি আবাদি, উতনা হক।”

বিতর্কটি এমন এক সময়ে আবার দেখা দিয়েছে, যখন কর্ণাটক সরকার রাজ্যের দুটি সংখ্যাগত এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী সম্প্রদায় ভোক্কালিগাস এবং লিঙ্গায়তদের জন্য সরকারি চাকরি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুই শতাংশ করে কোটা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, পাশাপাশি  চার শতাংশ সংরক্ষণ বাতিল করেছে ওবিসি মুসলমানদের জন্য, যা মূলত একটি জাতভিত্তিক নির্বাচনী কৌশল ছাড়া কিছুই নয়।

কর্ণাটক নির্বাচনের ইস্তেহারে বিজেপি যখন এই যুক্তি দিয়ে মুসলমানদের জন্য কোটা বাতিল করেছে যে তারা “কখনও ধর্ম ভিত্তিক সংরক্ষণে বিশ্বাস করে না”, কংগ্রেস তখন বলেছে যে তারা এসসি, এসটি, ওবিসি এবং ওবিসিদের স্বার্থের জন্য কোটা বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ করবে। কংগ্রেস  তাদের ইস্তেহারে সংখ্যালঘু এবং মুসলিম কোটা পুনঃস্থাপন করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। কংগ্রেস ক্ষমতায় কর্ণাটকে ক্ষমতায় এলে জাতিভিত্তিক  জনগণনা ব্যবস্থা চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এই যখন পরিস্থিতি, তখন বিজেপি তৃতীয় বারের জন্য ক্ষমতায় আসার স্বপ্নের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিজেপি তার রাজনৈতিক আদর্শ ভান্ডার  বা  আদর্শিক পিতা – রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস – ২০২৫ সালের কথা মাথায় রেখে এগোচ্ছে।  শতবর্ষ পূর্তির প্রাক্কালে, তৃতীয় বারের জন্য ক্ষমতায় ফেরাকে বিজেপির তরফে আরএসএস-এর শতবর্ষ পূর্তির উপহার হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। তবে প্রায় দুটি পূর্ণ মেয়াদের পর বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সমালোচনা বাড়ছে, তাই  হিন্দু ভোটারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে এখন ধরে রাখতে প্রায়শই জাতপাতের রাজনীতি, ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে দেশ জুড়ে প্রকট হয়ে উঠছে। আর বিরোধীরাও এই জাতি-বর্ণের রাজনীতি করে জাতীয় রাজনীতিতে পুনরুজ্জীবিত হতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!