- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬
ইজরায়েল সফরে মোদি, কনেসেটে বক্তৃতার প্রস্তুতি। গাজা নিয়ে কী অবস্থান, প্রশ্ন বিরোধী শিবিরের
পশ্চিম এশিয়ার অস্থির আবহাওয়ার মাঝেই দু–দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বুধবার সকালে ইজরায়েলের পথে পাড়ি জমিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২০১৭ সালের ঐতিহাসিক সফরের পর এ বার দ্বিতীয়বারের মতো ইহুদি রাষ্ট্রে তাঁর পদার্পণ। কূটনৈতিক মহলের মতে, সময়টা যেমন তাৎপর্যপূর্ণ, তেমনই স্পর্শকাতর— গাজায় অনিশ্চিত যুদ্ধবিরতি, ইরান-আমেরিকা টানাপোড়েন, আর আরব দুনিয়ায় নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত; সব মিলিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এ সফর নিছক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পর্যালোচনায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৃহত্তর ভূ–রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতেও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি ঠাসা। ইজরায়েলের জাতীয় সংসদ বা কনেসটে বক্তৃতার পাশাপাশি নেতানিয়াহুর সঙ্গে প্রতিনিধি স্তরের বৈঠক, যৌথ বিবৃতি, একান্ত নৈশভোজ; সবই রয়েছে। পাশাপাশি জেরুজালেমে উদ্ভাবন সংক্রান্ত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ও ইয়াদ ভাশেম হলোকাস্ট স্মারক কেন্দ্র পরিদর্শনের কথা রয়েছে তাঁর। ইজরায়েলের রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হারজোগ–এর সঙ্গে সাক্ষাৎও নির্ধারিত। সে দেশের বসবাসরত ভারতীয় ও ভারতীয়-ইহুদি প্রবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে মতবিনিময়ের কথাও জানিয়েছেন মোদি।
তবে এ সফরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মুহূর্ত হতে চলেছে কনেসটে-এ প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ। প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এ ভাষণ নিঃসন্দেহে ইতিহাসে জায়গা করে নেবে। সফর শুরুর আগে দেওয়া বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেছেন, ‘এ সম্মান দুই দেশের সংসদীয় ও গণতান্ত্রিক বন্ধনের প্রতি এক শ্রদ্ধার্ঘ্য।’ তিনি আরও বলেছেন, ভারত ও ইজরায়েলের সম্পর্ক এখন ‘দৃঢ় ও বহুস্তরীয়’। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, কৃষি, জল ব্যবস্থাপনা, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, এমনকি জনগণের মধ্যে যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই সহযোগিতার বিস্তারই তাঁর আলোচনার মূল লক্ষ্য। নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের জন্য তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে, এই সফর দুই গণতন্ত্রের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পারে। রাষ্ট্রদূত জে পি সিং-ও সফরকে ‘নতুন অধ্যায়ের সূচনা’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা যে আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে, তা প্রায় নিশ্চিত। ইজরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের অন্যতম প্রধান সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি সরবরাহকারী। চলমান প্রতিরক্ষা প্রকল্পগুলির অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সহযোগিতার রূপরেখাও নির্ধারিত হতে পারে। ভারতের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘সুদর্শন চক্র’ গঠনের পথে ইসরায়েলের ‘আয়রন ডোম’-এর কিছু প্রযুক্তিগত উপাদান অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সূত্রের খবর। পাশাপাশি পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতেও দুই নেতার মধ্যে মতবিনিময় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গাজা পরিস্থিতি, পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক উত্তেজনা এবং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণও আলোচনায় উঠে আসতে পারে বলে ধারণা। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও গতি আনার প্রচেষ্টা স্পষ্ট। গত নভেম্বর মাসে বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়ালের ইজরায়েল সফরের সময় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সংক্রান্ত আলোচনার শর্তাবলি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সেপ্টেম্বরে দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে। প্রযুক্তি, স্টার্ট-আপ, কৃষি ও জল ব্যবস্থাপনায় যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনা নিয়ে দু–পক্ষই আশাবাদী।
জানা যাচ্ছে, তেল আভিভে পৌঁছনোর পর প্রধানমন্ত্রীকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানাবেন নেতানিয়াহু এবং তাঁর স্ত্রী সারা। নেতানিয়াহু ইতিমধ্যেই এই সফরকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং মোদিকে ‘ডিয়ার ফ্রেন্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জেরুজালেমে এক অনুষ্ঠানে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, “কে আসছেন আগামী সপ্তাহে? নরেন্দ্র মোদি।’ সে ঘোষণার পর থেকেই সংবাদমাধ্যমে জোর জল্পনা শুরু হয়। তবে প্রধানমন্ত্রী মোদির এ সফর ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও কম নয়। ভারতের বিরোধী শিবিরের একাংশের বক্তব্য, গাজা পরিস্থিতি ও পশ্চিম তীরে উত্তেজনার প্রেক্ষিতে এ সফরের সময়কাল প্রশ্ন তুলছে। কংগ্রেস নেতারা সরব হয়ে দাবি করেছেন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রশ্নে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া উচিত। অন্যদিকে বিজেপি শিবিরের যুক্তি, কৌশলগত স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করাই প্রাধান্য পাওয়া উচিত।
কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ বলেছেন, ‘গাজা প্রসঙ্গে গোটা বিশ্ব যখন নেতানিয়াহুর সমালোচনায় সরব, তখন মোদির এ সফর ‘নৈতিক দুর্বলতা’র পরিচায়ক।’ তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ১৯৬০ সালে জওহর লাল নেহেরু গাজায় গিয়ে রাষ্ট্রসংঘের ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। ১৯৮৮ সালে ভারত আনুষ্ঠানিক ভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধি আশা করছেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি কনেসেটে ভাষণ দেওয়ার সময় গাজায় হাজার হাজার নিরীহ নারী, পুরুষ ও শিশুর মৃত্যুর প্রসঙ্গ উল্লেখ করবেন এবং তাঁদের জন্য ন্যায়বিচার দাবি করবেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লিখেছেন, ‘ভারত বরাবর স্বাধীন জাতি হিসেবে ইতিহাস জুড়ে ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, সে ঐতিহ্য বজায় রেখে বিশ্বকে সত্য, শান্তি ও ন্যায়বিচারের আলো দেখানো উচিত।’
ইজরায়েলের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক টানাপোড়েন স্পষ্ট। তেল আভিভের বিরোধী দল ইঙ্গিত দিয়েছে, যদি সে দেশের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ইৎজহাক অমিত –কে প্রোটোকল অনুযায়ী আমন্ত্রণ না জানানো হয়, তবে তারা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ বয়কট করতে পারেন। যদিও সরকারি মহল আশাবাদী, সফরের আনুষ্ঠানিকতায় কোনো বিঘ্ন ঘটবে না। ইজরায়েলের বিরোধী দলনেতা ইয়ার ল্যাপিড সোশ্যাল মিডিয়ায় হিন্দিতে পোস্ট করে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ‘ইজরায়েলের প্রকৃত বন্ধু’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর কথায়, সমগ্র ইজরায়েল মোদিকে স্বাগত জানাতে পেরে আনন্দিত। ভারত-ইজরায়েল সম্পর্ক কেবল কৌশলগত সমীকরণে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা গভীর বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। পশ্চিম এশিয়ায় বৃহৎ মার্কিন সামরিক সমাবেশ, ইরানের অনমনীয় অবস্থান এবং গাজায় টেকসই শান্তির অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে পশ্চিম এশিয়া এখন অগ্নিগর্ভ। এমন প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহু ‘হেক্সাগন’ জোটের ধারণা সামনে এনেছেন— ভারত-সহ একাধিক দেশের সঙ্গে বৃহত্তর কৌশলগত সমন্বয়ের লক্ষ্যে। দিল্লি যদিও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান জানায়নি।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের ফলাফল কেবল চুক্তিপত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং তা নির্ধারণ করবে আগামী দশকে ভারত-ইজরায়েল সম্পর্কের গতি ও গভীরতা। ২০১৭-র সফর যেমন সম্পর্ককে ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’-এর স্তরে উন্নীত করেছিল, তেমনই ২০২৬-এর সফর সেই অংশীদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পারে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দৃঢ়তা যেমন পরীক্ষা দেবে, তেমনই আন্তর্জাতিক রাজনীতির অগ্নিপরীক্ষাও এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। বহুল আলোচিত এ সফরের শেষে যৌথ বিবৃতিতে কী বার্তা উঠে আসে, সেটাই এখন দেখার।
❤ Support Us





