- প্রচ্ছদ রচনা বি। দে । শ
- সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৫
ছাত্র-যুব বিক্ষোভে জ্বলছে নেপাল, পুড়ল প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতির আবাস। সেনার পরামর্শে ইস্তফা ওলির। সীমান্তে ‘হাই অ্যালার্ট’ জারি নয়াদিল্লির
সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত যেন এক ফোঁটা ঘি পড়ল বহুদিনের ক্ষোভের আগুনে। বিক্ষুব্ধ ছাত্র ও যুবদের দাপটে কার্যত দাউদাউ করে জ্বলছে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু। নেপাল সরকারের দাবি অনুযায়ী, সোমবার রাতেই সমস্ত সামাজিক মাধ্যম নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু তাতে চিঁড়ে ভেজেনি। বরং মঙ্গলবার সকাল থেকেই আন্দোলনের আঁচ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির পদত্যাগের দাবিতে ফের রাস্তায় নেমেছে ‘জেন-জি’। আগুন ধরানো হয়েছে রাষ্ট্রপতির বাসভবন ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে। সেনা নামানো হয়েছে রাজধানীর রাস্তায়, জারি রয়েছে কার্ফু। বন্ধ ত্রিভুবন বিমানবন্দর। সেনার পরামর্শে ইস্তফা দিলেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী । তিনি দেশ ছাড়তে পারেন, এমনই গুঞ্জন সে দেশের রাজনৈতিক মহলে।
প্রতিবেশি নেপালের সঙ্গে ভারতের প্রায় ১,৭৫১ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ—এই ৫ রাজ্য সরাসরি নেপালের সীমান্তবর্তী। নেপালে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির জেরে ৫ রাজ্যেই জারি হয়েছে ‘হাই অ্যালার্ট’। সশস্ত্র সীমা বল, রাজ্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি যৌথভাবে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি চালাচ্ছে। বিশেষ করে বিহারের ৭ টি সীমান্তবর্তী জেলা— পশ্চিম চম্পারণ, পূর্ব চম্পারণ, সীতামারহি, মধুবনী, আরারিয়া, সুপৌল ও কিষাণগঞ্জ-এ ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে টহলদারি। সন্দেহজনক কাউকে দেখলেই শুরু হচ্ছে তল্লাশি। বড়ো গাড়ি, ট্রাক সবকিছু থামিয়ে করা হচ্ছে চুলচেরা জিজ্ঞাসাবাদ। কেন্দ্র সরকারের তরফে সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারত থেকে নেপালের দিকে গাড়ি চলাচলে আংশিক নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। এসএসবি-র মুখপাত্র ডিসি অমিত কুশওয়াহা জানিয়েছেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছি। সীমান্তে কোনো অনধিকার প্রবেশ রুখতেই এই ব্যবস্থা।’ পাহাড় লাগোয়া দার্জিলিং জেলা থেকেও সরাসরি নেপালে প্রবেশের পথ রয়েছে। সেখানেও চূড়ান্ত সতর্কতা। মঙ্গলবার সকাল থেকেই শিলিগুড়ির পানিট্যাঙ্কি সীমান্তে নাকা তল্লাশি শুরু করেছে পুলিশ। প্রত্যেকটি গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি করা হচ্ছে। নামানো হয়েছে ডগ স্কোয়াড। তৈরি রাখা হয়েছে কুইক রেসপন্স টিমও। দার্জিলিংয়ের পুলিশ সুপার প্রবীণ প্রকাশ বলেছেন, ‘এখনো পর্যন্ত ভারতের দিকে অশান্তির কোনো খবর নেই। তবে সতর্কতা সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে। নেপাল পুলিশের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।’ পাশাপাশি, নেপালে আটকে থাকা ভারতীয়দের জন্য দার্জিলিং জেলা পুলিশ ২৪ ঘণ্টা সচল কন্ট্রোল রুম চালু করেছে।
বিক্ষোভের আগুনে যখন জ্বলছে গোটা নেপাল, তখন সে দেশের প্রধানমন্ত্রী ওলি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত বলে দাবি একাধিক সূত্রের। সেনাপ্রধান অশোক রাজ সিগদেল নাকি তাঁকে পদত্যাগ করার পরামর্শ দিয়েছেন। জবাবে প্রাথমিকভাবে ওলি জানিয়েছেন, দেশ ছাড়ার নিরাপদ বন্দোবস্ত হলে তবেই তিনি ক্ষমতা ছাড়বেন। পরে সেনার পরামর্শেই পদ ছাড়েন তিনি । সূত্রের দাবি, দুবাই হয়ে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি তাঁর সম্ভাব্য গন্তব্য। চিকিৎসার অজুহাতে তিনি দেশ ছাড়তে পারেন বলেও ইঙ্গিত মিলছে। ইতিমধ্যেই নেপালের একটি বেসরকারি বিমান সংস্থা—হিমায়ল এয়ারলাইন্সকে স্ট্যান্ডবাই থাকতে বলা হয়েছে। আজ সন্ধ্যা ৬টায় ওলি সর্বদলীয় বৈঠক ডেকেছেন, কিন্তু তার আগেই মন্ত্রিসভার দায়িত্ব হস্তান্তর করে দিয়েছেন উপ-প্রধানমন্ত্রীর হাতে। এক সরকারি বিবৃতিতে ওলি লিখেছেন— ‘এই কঠিন সময়ে আমি দেশের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করছি। সকল ভাইবোনকে শান্ত থাকার অনুরোধ করছি।’ তিনি জানিয়েছেন, একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ১৫ দিনের মধ্যে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। মৃতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের নিখরচায় চিকিৎসা দেবে সরকার। তবে পরিস্থিতি যে হাতের বাইরে, তা পরিস্কার।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বাতিল হয়েছে সব ফ্লাইট। গুঞ্জন, মন্ত্রীদের একে একে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার। অন্তত ৫টি সেনা হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে, যেগুলির মাধ্যমে ওলি-সহ একাধিক মন্ত্রীকে গোপন স্থানে স্থানান্তর করা হচ্ছে। সূত্রের দাবি, ওলিকেও বাড়ি থেকে বের করে সেনার তত্ত্বাবধানে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হবে। বিমানবন্দর এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে ৩০০-র বেশি সেনা।
নেপাল সরকারের দাবি ছিল, ভুয়ো অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ঘৃণাভাষণ, প্রতারণা ও গুজব রটানোর কারণে তারা সাময়িক ভাবে সামাজিক মাধ্যম বন্ধ করেছিল। তবে তরুণদের রোষ অন্য জায়গায়, দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, সরকারি দুর্নীতি ও প্রশাসনিক উদাসীনতা। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটল ‘জেন-জি আন্দোলনে’। সোমবার কাঠমান্ডুতে পুলিশের গুলিতে অন্তত ১৯ জন ছাত্র-যুবর মৃত্যু হওয়ার পর আন্দোলনের ঝাঁজ চরমে ওঠে। আন্দোলনকারীদের দাবি, এই রক্তপাতের পূর্ণ দায় প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির। আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশ্ন উঠছে ওলির ভূমিকা নিয়ে। মঙ্গলবার একে একে পদত্যাগ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখাক, কৃষিমন্ত্রী রামনাথ অধিকারী ও জলসম্পদ মন্ত্রী প্রদীপ যাদব। সরকার থেকে দূরত্ব বাড়াতে শুরু করেছে ক্ষমতাসীন দলের শরিকরাও। বিরোধী দলগুলির বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ওলির পদত্যাগের দাবি ওঠেছে। নেপালি কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক গগন থাপা বলেন, ‘এই রক্তপাতের দায় ওলিকেই নিতে হবে। তাঁর পদত্যাগ এখন একমাত্র ন্যায়সংগত পথ।’ এদিকে, সোমবার রাতেই ওলির ব্যক্তিগত বাসভবনে আগুন ধরিয়ে দেয় উত্তেজিত আন্দোলনকারীরা। মঙ্গলবার সকালে রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পৌডেলের সরকারি বাসভবনে চলে অগ্নিসংযোগ। পাশাপাশি ভাঙচুর হয়েছে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমল দহল ‘প্রচণ্ড’-র বাড়িতেও। বিক্ষোভকারীদের রোষে পড়েছে শুধু প্রধানমন্ত্রী ওলি নন, বিরোধী নেতারাও। আগুন লাগানো হয়েছে নেপালি কংগ্রেস পার্টির সানেপার কেন্দ্রীয় দফতর, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী দেউবার বাড়ি, তাঁর স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি বেসরকারি স্কুল, এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বিশ্ব পৌডেলের বাসভবনে। স্থানীয় সময় সকাল ৮টা থেকে রাজধানী কাঠমান্ডুতে কার্ফু জারি হয়েছে, কিন্তু তা উপেক্ষা করেই পথে নেমেছে হাজার হাজার ছাত্র-যুবক।
নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়। নেপালের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝে বিবৃতি দিয়েছে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক। জানানো হয়েছে— ‘নেপালে তরুণদের প্রাণহানিতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমেই পরিস্থিতির সমাধান হওয়া উচিত। ভারতীয় নাগরিকদের সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে এবং নেপালি প্রশাসনের নির্দেশ মানার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’ নেপালে নিযুক্ত ভারতীয় দূতাবাস এ দিন হেল্পলাইন নম্বর চালু করেছে, যাতে জরুরি প্রয়োজনে ভারতীয়রা সাহায্য চাইতে পারেন। ভারত সীমান্তে যে ভাবে সতর্কতা জারি করেছে, তাতে স্পষ্ট—দিল্লি চাইছে না প্রতিবেশীর আগুন তার উঠোনে ছড়াক। প্রশ্ন একটাই, এই ‘জেন-জি বিপ্লব’-এর সামনে কতটা টিকতে পারবেন কেপি শর্মা ওলি? না কি সেনার ছত্রছায়ায় শেখ হাসিনার মতো নিরাপদে দেশ ছাড়বেন?
❤ Support Us






