Advertisement
  • খাস-কলম দে । শ
  • নভেম্বর ১৪, ২০২৩

ক্ষমতামত্তের নগ্নতাকে প্রশ্ৰয় কেন ?

বাহার উদ্দিন
ক্ষমতামত্তের নগ্নতাকে প্রশ্ৰয় কেন ?

প্রথম আর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর, ভিয়েতনামে আমেরিকার অনর্গল বোমা, ইরাকের ওপর বর্হিদেশীয় হামলা আর সিরিয়ায় রাশিয়ার অগ্নিসংযোগের বিরুদ্ধে নিশ্ছিদ্র প্রতিক্রিয়ায় গর্জে ওঠে দুনিয়ার সমমেত বিবেক । বিবেকের কোলাহল দেখে থমকে যায় অগ্রাসনের নগ্নশক্তি । এবার ভিন্নচিত্র দেখতে হচ্ছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার ধ্বংসলীলা বা রাশিয়া বিরোধী ন্যাটোর তোড়জোড় বিলকুল প্রশ্নহীন নয় । ফাঁক আর ফাঁকি দুপক্ষকেই প্রশ্রয় দিচ্ছে। তেলআবিভে, ইসরাইলের অন্যান্য শহরেও আচমকা গাজা স্ট্রিপের আল হামাসের বে আব্রু আক্রণণে, পশ্চিমের একতরফা চিন্তায় জোর ধাক্কা লাগল বটে, কিন্তু বিশ্বের নিঃশব্দ গরিষ্ঠের (সায়লেন্ট মেজরিটি) উদাসীনতা, বিস্মিত, প্রশ্নময় করে তুলছে? প্রকারন্তরে পশ্চিমের গাছাড়া মনোভাব যুদ্ধবাজদের প্রতি ইউরোপীয় শক্তিবর্গের এ আরেক প্রশ্রয় নয় তো ?

গাজা এখনো অশান্ত, সন্ত্রস্ত, কখনো প্রকাশ্যে, কখনো গেরিলা কায়দায় হামাসের প্রতিরোধ চলছে। ইসরাইল দাবি করেছে, আল হামাস ভূমধ্যসাগরের সংলগ্ন ভূখন্ডে ক্ষমতাচ্যুত, তারা পালাচ্ছে । ইসরাইলের এরকম দাবির ভিত্তি কী ? হামাস পাল্টা কোনো বয়ান পেশ করেনি ।

একমাস পাঁচ দিনের সঙ্ঘর্ষে প্রথমে হতভম্ব হয়ে পড়ে তেল আবিভ । সঙ্গে সঙ্গে তার পাশে দাঁড়ায় আমেরিকা ও পূর্ব-পশ্চিম ইউরোপের বহু দেশ । ওয়াশিংটন অস্ত্র এ যুদ্ধ বিমান পাঠিয়ে তটস্থ করে তোলে উপসাগরীয় ভূখন্ডকে । ইরান ও প্রতিবেশী দেশগুলিতে অবস্থানরত হিজবুল্লাহ সরাসরি পাল্টা আক্রমণের হুমকি দেয়, কার্যত তাদের হম্বিতম্বি কতটা বাস্তবায়িত, তা অপ্রমাণিত ।

আমরা দেখতে পেলাম সিরিয়ায় ইরানি যুদ্ধবিমান পুড়ছে, সরাসরি বিদেশি ক্ষেপণাস্ত্র তীব্র আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ঝাপিয়ে পড়ছে, ইসরাইলের বিমান হামলায় গাজা অনেকটাই কবরস্থানের আকার নেয়, অন্তত ১২ হাজার ফিলিস্তিনি, শিশু নারী নির্বিশেষে, গণহত্যায়, হাসপাতালে, গৃহালয়ে প্রাণ হারালেন, পালাবার সুযোগ পেলেন না বহু সংখ্যক নিরীহ । ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের রক্তাক্ত স্রোত বইল জলে-স্থলে, রাতারাতি গৃহহীনদের নতুন তাঁবু তৈরি হল জর্ডন, লেবানন ও সিরিয়া সীমান্তে । গোড়ার দিকে আরবরা গর্জন করল, ঐক্যের আওয়াজ বেজে উঠল কন্ঠে, কিন্তু সে আওয়াজ বুকে বাজল না, হয় তারা ভয়ে পিছিয়ে গেল, নয়তো শিয়া ইরানের আধিপত্য বেড়ে উঠবে, এই আশঙ্কায় সুন্নি আরব মুখে কুলুপ আঁটল । রাষ্ট্রসঙ্ঘ গণহত্যা বন্ধের প্রস্তাব পেশ করে, সদস্য দেশগুলির বড়ো অংশ পক্ষে ভোট দিল, কোনো কোনো রাষ্ট্রের সংশয় ছিল, পরে তারা ভোট দিয়ে মতামত ব্যক্ত করল, ফিলিস্তিনি গণহত্যা চলতে দেওয়া যায় না, ইসরাইলের সংযত হওয়া দরকার ।

এসব ঘটনা, প্রতি ঘটনা নিছক নাটক ছাড়া আর কী, ১৯৪৮ সাল থেকে ফিলিস্তিনিরা নাটকের মর্মান্তিকতার অসহায় সাক্ষী । নেহরু-ইন্দিরার ভারতবর্ষ, অখন্ড রাশিয়া ছাড়া আর কোন্ বড়ো শক্তি ট্রাজিক নাটকের অবসান চেয়েছে ? ৭৫ বছর জুড়ে বিদ্বেষ আর হিংসার বলি ফিলিস্তিনিরা । ইয়াসের আরাফত জমানা পর্যন্ত একটি জোরালো, গ্রহণযোগ্য কন্ঠ ছিল । আল ফতেহ তখন সবার যৌথ মঞ্চ । ইসরাইল ছাড়া প্রায় সব দেশে স্বীকৃত । ১৯৭৩ সালের পর আরাফতও তাঁর পুরনো জেদ আর সঙ্কল্প থেকে বর্হিচ্যুত, শেষ জীবনে অনেকটাই তাঁকে গ্রাস করল ক্ষমতাপ্রীতি । তাঁর মৃত্যুর পর ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় বসলেন মাহমুদ আব্বাস । আত্মকেন্দ্রিক ঠুঁটো জগন্নাথ । দেড় দশক ধরে ক্ষমতাসীন । তাঁর নেতৃত্বে ফিলিস্তিন ভোটহীন, গণতন্ত্রহীন, দিশাহীন । দেশে দেশে বেহাল তার দূতাবাস । দূতাবাসের কর্মীদের কাজ কী ? আয়েস। সরগরম আনন্দ । আর ভুল স্বপ্ন যাপনের পটভূমি নির্মাণ ।

এই যে, গত কয়েক মাস আগে, একে একে কিছু সংখ্যক আরব রাষ্ট্র ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলল, কোনো এক পরাশক্তির মধ্যস্থতায়, তখন বিত্তশালী সৌদি আরব আর অস্ত্রবলী ইরান ছাড়া ব্যতিক্রমী প্রতিক্রিয়া জানাল কোন্ কোন্ দেশ? ফিলিস্তিনি দূতাবাসের তথাকথিত কূটনীতিক আর দানের অর্থে ফেঁপে ওঠা অভিজাত, উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্তদের কন্ঠের স্বরধ্বনি শোনা যায়নি, কেন? এরকম আরোপিত শূণ্যতার সুযোগ নিল আল হামাস । আমাদের ধারণা, নির্দেশিত সন্ত্রাসের ছক সাজিয়ে নিরীহ ফিলিস্তিনিদের খতম অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়ল পার্শ্ববর্তী শক্তিধর । ইসরাইলের এরকম মানবিক কান্ড নতুন নয় । যে হামাসকে তারা সংগঠিত, মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমিনের সহযোগী বানিয়েছিল, আজ তাদের নির্মূল করতে, সে রাষ্ট্রেই গা জোয়ারি কৌশল চাপিয়ে দিচ্ছে ।
পরিত্রানহীন সঙ্কটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, কেবল গাজা নয়, কেবল বয়তুল মক্কদস (জেরুজালেম) নয়, গোটা উপসাগরীয় পশ্চিম এশিয়া, সবাই রক্ত ঝড়ের ভয়ে কম্পমান ।

ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, গাজা স্ট্রিপে হামাস অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে, ফিলিস্তিনিরা আস্থা হারাচ্ছে, তাঁর এই বিবৃতিতে সত্যের চিহ্ন কী, আমাদের জানা নেই । দূরের সরল, গা-বাঁচানো অবস্থান নিয়ে এইটুকু বলা সম্ভব, ইসরাইলের বর্হিদেশীয় বিরাদরের অভাব নেই । কন্ঠ বাজিয়ে তেল আবিভকে তারা ক্রমাগত মদত দেবে । প্রতিদিন পরমাণু অস্ত্র তৈরির পরীক্ষা নিরিক্ষায় অভ্যস্ত, সফল, ওখানকার রাষ্ট্রশক্তি, উগ্র জাতীয়তাবাদীরা হামাসের হামলার প্রতিশোধের জন্য, তাদের পণবন্দীদের মুক্ত করবার যেকোনো ভয়ঙ্কর ঝুঁকি নিতে পারে ।

মুক্তধারার রচনাকাল থেকে রক্তকরবী পর্যন্ত জাতীয়তার উগ্রতা নিয়ে বারবার উদ্বেগ জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ । তাঁর দৃষ্টিতে তখন ইউরোপের আগ্রাসী ছায়া । যে একই সঙ্গে বেদনাকাতর এবং প্রতিশোধকামী । ইসরাইলের আগ্রাসন, হামাসের অস্ত্রাঘাত এবং পশ্চিম এশিয়ায় বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া, প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরবর্তী বিধ্বংসী পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির সঙ্কেত ও সঙ্কট ডেকে আনবে না, কে বলবে !

পাড়ায়, খেলার মাঠে, রাজনীতির ময়দানে জয়ী আর পরাজিত শক্তি যে দেহভঙ্গি, যে কন্ঠভঙ্গি প্রয়োগ করে, তা সভ্যভব্যের ভাষা নয়, গুহাবাসী, জঙ্গলবাসীর শব্দ ও বাক্য তাদের ধাওয়া করে । যুদ্ধরত রুশ-ইউক্রেন কিংবা গাজা-ইসরাইলের যুযুধানদের, একই ধরণের রক্তখেকো উগ্রতা থেকে দূরে থাকা কি সম্ভব ? না দ্বিতীয় মহাযুদ্বের পরে, যে কালো ঘোড়া দাপিয়ে দাপিয়ে বিজ্ঞানের মহৎ অবদানে আলকাতরা লেপ্টে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল, তাকেই প্রশ্রয় দিচ্ছে অস্ত্রবাজ আর অস্ত্রব্যবসায়ীদের মত্ত, কৌশলরত উর্বর মস্তিস্ক ? একথা বলতে গিয়ে বড্ড অসহায় বোধ করছি । দৃষ্টিতে ভেসে উঠছে ইউক্রেন কিংবা গাজা স্ট্রিপের শিশুদের ঝলসানো দেহ, ভস্ম-অর্ধভস্ম বাড়ি, নিস্পত্র বৃক্ষ এবং কঙ্কাল । তবু, অস্ত্রাঘাতের বিরাম নেই, ধেয়ে আসছে অগ্নিযানের কবন্ধেরা । এই বুঝি আমাদেরও উড়িয়ে দেবে, পুড়িয়ে খাবে সর্বাঙ্গ । প্রেমহীন, হৃদয়হীন, নির্জলা পূথিবীকে কতদিন বরদাস্ত করতে হবে আর । নেতিকে প্রশ্রয় দিতে নেই, কিন্তু নেতি যখন সর্বময় হয়ে ওঠে, তখন তাকে প্রত্যাঘাত করতেই হবে, নয়তো গিলতে হবে গোগ্রাসে নিজেকে, খেতে হবে নিজের রক্ত । আমরা কি আমাদের সন্তান আর ভবিষ্যতের লাশ নিয়ে তান্ডব দেখে যাব, এরকম রক্তলোভী ধ্বংসপ্রবণ পরিস্থিতি মানা যায় না । যুদ্ধকে ধিক্কার । ধিক্ সায়লেন্ট মেজরিটির বিভ্রান্ত, অবরুদ্ধ কন্ঠ ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!