Advertisement
  • ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
  • মার্চ ২৬, ২০২২

কালীকৃষ্ণ গুহ ও আনিছ উজ জামানকে রমানাথ ফাউন্ডেশন পুরস্কার । ৩ এপ্রিল গুয়াহাটিতে সস্মাননা অনুষ্ঠান ।

মননে, ভাবাবেগে সমারূঢ় পদ্মনাথের, রমানাথের আদর্শ।

বাহার উদ্দিন
কালীকৃষ্ণ গুহ ও আনিছ উজ জামানকে রমানাথ ফাউন্ডেশন পুরস্কার । ৩ এপ্রিল গুয়াহাটিতে সস্মাননা অনুষ্ঠান ।

এবার (২০২১)পদ্মনাথ বিদ্যাভবন’ আর রমানাথ ভট্টাচার্য স্মৃতি পুরস্কার পেলেন, যথাক্রমে, সুপরিচিত দুই কবি আনিছ উজ জামান আর কালীকৃষ্ণ গুহ । রমানাথ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সচিব শ্যমাশিস ভট্টাচার্য প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন, প্রতিটি পুরস্কারের অর্থমূল্য ৭৫, ০০০টাকা। ৩ এপ্রিল, রবিবার সন্ধ্যায়, গুয়াহাটির বিবেকানন্দ কেন্দ্রের সভাগৃহে অসমিয়া ও বাংলা ভাষার দুই সমসাময়িক কবির হাতে আনুষ্ঠানিক ভাবে সম্মান-স্মারক, মানপত্র এবং অর্থমূল্য তুলে দেওয়া হবে। মর্যাদাময় পুরস্কারটিকে ঘিরে সুধাংশু শেখর মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত বর্ণোজ্জ্বল, বহুমাত্রিক স্মারকগ্রন্থের মলাট উন্মোচণ করবেন রবীন্দ্রগবেষক আর বিদগ্ধ অধ্যাপক উষারঞ্জন ভট্টাচার্য। এ অনুষ্ঠানে পুরস্কৃত দুই কবির সঙ্গে প্রশ্নোত্তর-পর্বে যোগ দেবেন প্রতিবেশী দুইভাষার খ্যাতিমান কবি সমীর তাঁতী ও মিহির মজুমদার।

উল্লেখ করা জরুরি, বেসরকারি সাহিত্য পুরস্কারের মধ্যে রমানাথ সম্মানের মর্যাদা প্রশ্নাতীত। ২০১০ সাল থেকে বহুভাষিক, বিশেষ করে বাংলা আর অসমিয়া ভাষার কৃতী কবি ও সাহিত্যিকদের সম্মান জানিয়ে এই স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান যে ভাবে সম্মানিত করছে, তাতে আমরা উদ্ধুদ্ধ। ২০১০ সালে পুরস্কৃত হন লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ কবি বিজিৎকুমার ভট্টাচার্য ও বর্ষীয়ান অসমিয়া কবি অজিত বরুয়া। ২০১১ সালে পুরস্কৃত হন হীরেন ভট্টাচার্য ও পবিত্র মুখোপাধ্যায়, ২০১২ সালে নীলমণি ফুকন ও তরুণ সান্যাল, ২০১৩ সালে হীরেন্দ্রনাথ দত্ত আর স্বপন সেনগুপ্ত । গত ১১ বছর জুড়ে একইভাবে পুরস্কৃত ও সম্মানিত হয়েছেন সনন্ত তাঁতি, উদয়ন ঘোষ, সমীর তাঁতি, অজিত বাইরী, ভবেন বরুয়া, শ্যামল কান্তি দাশ, অনুভব তুলসী, পীযূস রাউত, নীলিম কুমার, রণজিৎ দাশ। অতিমারির কারণে, ২০২০ সালে কাউকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি। কিন্তু রমানাথ ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম থমকে যায়নি । বহুমুখী সেবা আর প্রকারান্তরে সাহিত্যসেবা অব্যাহত থেকেছে। জনপ্রিয়তার জন্য নয়, সৃজনশীলদের ত্যাগ ও সৃষ্টিশীলতার গাম্ভীর্য আর ধারাবাহিকতার নিরিখেই পুরস্কার দুটির সূচনা স্মরণীয় হয়ে আছে । ১২ বছরের ঐতিহ্য ছুঁয়েই এ বছর সম্মানিত করছে আনিছ উজ জামান ও কালীকৃষ্ণ গুহকে। দুজনেই সমসাময়িক। শিল্পস্বভাবে, শিল্পশর্তে সমধর্মী। সংযতভাষী। রোমান্টিক। দুই কবির কণ্ঠস্বরের সমদর্শিতা বিস্ময়কর। একি সমান্তরাল চিন্তার শ্যামল ও সজল ফসল?

পণ্ডিত পদ্মনাথ বিদ্যাবিনোদ ছিলেন ভারততাত্ত্বিক। অবিভক্ত শীহট্টের সন্তান। জন্ম হবিগঞ্জের বানিয়াচক রাজপরিবারে । অত্যন্ত মেধাবি ছাত্র ছিলেন পদ্ননাথ। পরে ভারতের অন্যতম অভিজাত কটন কলেজের গুণী অধ্যাপক। সংস্কূত ভাষাসাহিত্য আর ইতিহাস বিশারদ। অসমের ইতিহাস রচনার স্বনামধন্য এই পথিকৃতের রচিত ‘কামরূপ শাসনাবলী’ প্রাথমিক সূত্র (প্রাইমারি সোর্স) ও তথ্য উদ্ধার ও বিশ্লেষণ করে, ইতিহাসের পরবর্তী গবেষণার বহু দিনের রুদ্ধদ্বার খুলে দেয়। তাঁর উদ্যোগেই গড়ে ওঠে কামরূপ ‘অনুসন্ধান সমিতি’ ও ‘আসাম রিসার্চ সোসাইটি’। দেশের নানা অঞ্চলের, নানাভাষার, নানা ধর্মের গণমন ও বহুমাত্রিক সংস্কৃতি আমৃত্যু পদ্মনাথের বিদ্যাচর্চাকে ঐতিহ্যমুখী করে রেখেছে। প্রাচীন তত্ত্ব উদ্ধার করেছেন তিনি, বিশ্লেষণ করেছেন নতুন দৃষ্টিতে । অতীতের ঐতিহ্য তাঁকে আমৃত্যু উদ্ধুদ্ধ করেছে। কিন্তু কখনও অতীতের সঙ্গে বসবাস করেননি। নিজের সময়কে, সময়ের ভবিষৎকে দেখার অপরিহার্য দূরদৃষ্টি অর্জন করেছিল তাঁর ব্যক্তিপ্রতিভা। শ্রীহট্ট বহু বিরল মেধার জন্ম দিয়েছে। পদ্মনাথ বিদ্যাবিনোদ তাঁদের অন্যতম। কাল ও ভূগোলের সমস্ত সীমান্ত পেরিয়ে তাঁর স্মৃতি, তাঁর উজ্জ্বল কীর্তি আজ উদার নদ-নদীর অন্তঃস্রোতের মতো মননের দুকুলকে, তার অশেষ অববাহিকাকে ক্রমাগত প্রাণিত, সমৃদ্ধ করে তুলছে।
রমানাথ ভট্টাচার্যও বিদ্যাচর্চার একই ঐতিহ্যে লালিত। পরিশ্রমী, ন্যায়নিষ্ঠ ছাত্র ।পড়ুয়া বয়সে ‘অনুশীলন সমিতির’ সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন । বিট্রিশ শাসন থেকে দেশের মুক্তি তখন তাঁর দিনযাপনের আরেক অভিমুখ হয়ে ওঠে। সাইকেলে বার কয়েক ঘুরে বেড়িয়েছেন চার মহাদেশের নানা প্রান্তে। বিশ্বসফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিরিশটির বেশি সুখপাঠ্য ভ্রমন কাহিনী লিখেছেন । নিয়মিত কবিতা লিখতেন । এসব রচনা এখন দুষ্প্রাপ্য।

আমাদের বিনীত দাবি, ভূপর্যটক রমানাথের লেখা আর কবিতা আবার প্রকাশিত হোক। পড়ুয়াদের পাঠ্য তালিকার নাগালে আসুক। দুই কৃতির নামাঙ্কিত পুরস্কার আজ যেমন আরোপিত বিভাজনের মোকাবিলার সমারূঢ় উচ্চারণ, তেমনি তাঁদের জীবনবোধ তাঁদেরই সৃষ্টির মাধ্যমে সহজিয়া যাপনের, সহৃদয় মননের আদর্শ হয়ে উঠুক। রমানাথ ফাউনড্রেশনের সাধারণ সচিব ও ওই দুই কৃতির উত্তরপুরুষ শ্যামাশিস ভট্টাচার্যও একজন স্বীকৃত, মননশীল স্রষ্টা । হিন্দি টিভি সিরিয়ালের নির্মাতা । মুম্বাই-এর শকুন্তলা টেলিফিল্মের প্রাণপুরুষ । পূর্বগামীদের কর্মের স্মৃতি আর মর্মের ধ্বনি, প্রতিধ্বনিকে জাগিয়ে রাখতে তাঁর প্রচেষ্টা বিরামহীন। অভিনন্দন শ্যামাশিস।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!