Advertisement
  • প্রচ্ছদ রচনা
  • জুলাই ৯, ২০২২

উল্টোরথ ঘিরে আবেগে ভাসছে পুরী। মাসির বাড়ি থেকে ফিরেও ৩ দিন মন্দিরের বাইরে জগন্নাথ।

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
উল্টোরথ ঘিরে আবেগে ভাসছে পুরী। মাসির বাড়ি থেকে ফিরেও ৩ দিন মন্দিরের বাইরে জগন্নাথ।

 

আজ ৯ জুলাই, শনিবার। আষাঢ় মাসের দশমী তিথিতে গুন্ডিচা মন্দির থেকে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে ফিরবেন মহাপ্রভু । এটি উল্টো রথ বা বহুদা যাত্রা নামেও পরিচিত। মাসি গুণ্ডিচার বাড়িতে আট দিন কাটিয়ে এদিনই ঘরে ফেরেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। উল্টোরথ শুরু হওয়ার আগে মন্দিরের পুরোহিত জগন্নাথদেবের দ্বাররক্ষীদের পুজো করেন, এটি দ্বারপাল পুজো নামে পরিচিত।
পুরাণ মতে, প্রায় দু’হাজার বছর পূর্ব থেকেই রথযাত্রা ও উল্টোরথ প্রচলিত হয়। ‘উৎকলখণ্ড’ এবং ‘দেউল তোলা’ নামক ওড়িশার প্রাচীন পুঁথিতে জগন্নাথদেবের রথযাত্রার ইতিহাস প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে, এই রথযাত্রার প্রচলন হয়েছিল সত্যযুগে। সে সময় আজকের ওড়িশার নাম ছিল মালবদেশ। সেই মালবদেশের অবন্তীনগরী রাজ্যে ইন্দ্রদ্যুম্ন নামে সূর্যবংশীয় এক পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা ছিলেন, যিনি ভগবান বিষ্ণুর এই জগন্নাথরূপী মূর্তির রথযাত্রা শুরু করার স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন।

মাসির বাড়ি থেকে ফেরার পরও জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলরাম প্রবেশ করেন না মূল মন্দিরে। তিন দিন এরকম ভাবেই বাইরে থাকে রথ-সহ বিগ্রহ। কিন্তু এখন প্রশ্ন হল বাইরে কেন বিগ্রহ? কারণ এই তিন দিন ধরে পালিত হয় কিছু অনুষ্ঠান। যার মূল কেন্দ্রবিন্দু-তে থাকেন জগন্নাথদেব। বছরে এক বার মাসির বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন জগন্নাথ, কিন্ত ফিরে আসার পর রীতিমত ধূমধাম করে সমারোহের সঙ্গে জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলরাম কে মন্দিরে রত্নবেদি-তে তোলা হয়। তিনদিন ধরে পালিত হয় বিশেষ অনুষ্ঠান। এই আচার-অনুষ্ঠানগুলি হল –
♥ সোনাবেশ—একাদশী তিথিতে জগন্নাথ সহ সুভদ্রা-বলরাম ও সেজে ওঠেন নানা সোনার গয়নার সাজে। পুনর্যাত্রার পর একাদশী তিথিতে পালিত হয় এই সোনাবেশ।
♥ অধরপনা—এই উৎসব পালিত হয় দ্বাদশীর সন্ধ্যায়। এই রীতি অনুযায়ী জগন্নাথদেবকে শরবত খাওয়ানোর পালা চলে।
♥ রসগোল্লা উৎসব—ত্রয়োদশীর দিন জগন্নাথদেবের উদ্দেশ্যে ভোগ হিসেবে কয়েকশো হাঁড়ি রসগোল্লা নিবেদন করা হয়।

♥ নীলাদ্রিবিজয় উৎসবে—সবশেষে নীলাদ্রিবিজয় উৎসবের মাধ্যমে শেষ হয় এই সমস্ত রীতি-রেওয়াজ। এই ভাবেই বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের পর জগন্নাথ-সুভদ্রা-বলরামকে মন্দিরে মূল রত্নবেদিতে তোলা হয়।

জগন্নাথের রথের নাম নন্দীঘোষ৷ রশির নাম ‘শঙ্খচূড়া নাগুনি’ ৷ জগন্নাথের রথে সওয়ার হন আরও ৯ দেবতা ৷ এঁদের মধ্যে রয়েছেন গোবর্ধন, কৃষ্ণ, নরসিংহ, রাম, নারায়ণ, হনুমান, রুদ্র ৷ জগন্নাথের রথে একজন রক্ষীও থাকেন৷ এই রক্ষীর নাম গারুদা ৷ রথে জগন্নাথের সঙ্গী হন মদনমোহন ৷ উচ্চতা ৪৫ ফুট। রথের গায়ে থাকে হলুদ এবং সোনালি রং। এই রথে রয়েছে সাত ফুট ব্যাসের ১৬টি চাকা। জগন্নাথের রথের সারথির নাম মিতালি। ৮৩২ কাঠের টুকরো দিয়ে তৈরি হয় এই রথ ৷ রথের মাথায় থাকা পতাকার নাম ত্রৈলোক্যমোহিনী ৷ রথে ৪টি ঘোড়া থাকে৷

দু’বছর পর ফের নীলাচল পুরীতে রথযাত্রার মতোই উল্টোরথ উৎসব ঘিরেও কয়েক লক্ষ মানুষের জমায়েতকে কেন্দ্র করে জনবিস্ফোরণ ঘটেছে। কিন্তু গোটা দেশের মতোই ওড়িশার পুরীতেও কোভিড সংক্রমণ বাড়তে থাকায় উদ্বিগ্ন মন্দির কর্তৃপক্ষ থেকে পুলিশ প্রশাসন। কিন্তু গুন্ডিচা মাসীবাড়ির ভিতর থেকে শুরু করে বাইরে রাজপথে লক্ষ লক্ষ মানুষের স্রোত দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, কোডিড নিয়ে আদৌ কিছু গুরুত্ব দিচ্ছে না কেউ । কারও মুখে মাস্ক নেই।পুরো মাস্কহীন তীর্থনগরী। অথচ, ভুবনেশ্বর বিমানবন্দর, পুরী স্টেশন এবং কালেক্টরেট অফিসে মাস্ক পরার জন্য কড়া বার্তা দেওয়া হচ্ছে। গতকাল বিকেল চারটায় গুন্ডিচা মন্দিরের দর্শন বন্ধ হয়।

আসলে অন্য বছর রাত দশটায় জগন্নাথ দর্শন বন্ধ হলেও এবার বিকেলেই তা হয়েছে প্রশাসনের সিদ্ধান্তে। এখানেই শেষ নয়, আজ অত্যাধিক ভিড় সামলাতে উল্টোরথ যাত্রা ও কাল সোনাবেশ নির্দিষ্ট সময়ের আগেই শুরু হবে। রথের পর উল্টোরথ ঘিরে লক্ষ লক্ষ মানুষ নীলাচলে পা রাখায় খুশি হোটেল মালিক, কর্মী থেকে শুরু করে অটোচালকরা। কারণ, দুবছর ব্যাবসা বন্ধ ছিল। কিন্তু তিন বছর আগে পুরীর মূল মন্দিরের সামনে যে সমস্ত জায়গায় দোকান, আস্তানা ছিল।সেগুলি সব গুঁড়িয়ে দিয়েছে। বদলে গিয়েছে গোটা এলাকা। তাই সোনাবেশ মুহূর্তে যে চাতালে দাঁড়িয়ে ভিআইপিরাও জগন্নাথ দেবের রাজবেশ দর্শন করতেন সেই চাতালটি আর নেই। স্বাভাবিকভাবে এবার ওড়িশা ও বাংলা, দুই রাজ্যের ভিভিআইপিরা কোথায় কিভাবে দাঁড়িয়ে রাজবেশ দেখবেন তা নিয়ে উল্টোরথের আগের রাতে জোর চর্চা চলছে। অন্য বছরের মতো এবার শুক্রবার বিকেলেই পুরী পৌঁছে গিয়েছেন বিদ্যুৎমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, কলকাতার ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষ, বিধায়ক দেবব্রত মজুমদারের মত বহু জগন্নাথভক্ত। কিন্তু সবাই এবারের জনবিস্ফোরনের ভয়ে কিছুটা স্তম্বিত। সবারই মনে প্রশ্ন, কিভাবে রথের দড়ি টানা যাবে ? কোন পথে এবার সোনাবেশ দর্শন হবে। তবে সবার বিশ্বাস, জগন্নাথদেব চাইলে তবেই সব মনোবাসনা পূর্ন হবে। নয়তো নয়।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!