- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- এপ্রিল ২, ২০২৩
ভয়
২৫ ডিসেম্বর থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত গড়িয়া শ্রীপুরে চলে উৎসব। বিনোদনের চূড়ান্ত আয়োজন, শুধু ২৩ থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত হয় দেশপ্রেমের কার্নিভ্যাল। তখন কলকাতা মুম্বাইয়ের বিখ্যাত গায়ক গায়িকা আর নায়ক নায়িকাও থাকেন। এবার হিমেশ রেশমিয়া গাইবে কাঁচা বাদাম সঙ্গে থাকবে ভুবন বাদ্যকর আর রানু মণ্ডল। এলাকা পুলিশে পুলিশ সিভিক ভলাণ্টিয়ার আর ব্যাজ লাগানো পাড়ার ছেলেদের দখলে থাকে। পার্ক সার্কাস আর ব্যারাকপুর থেকে ছোটো হাতি বোঝাই করে আসে বিরিয়ানি, দুপুর থেকে রাত্তির পর্যন্ত। এই তেত্রিশ দিন এলাকায় কোনো অশান্তি হয় না। বছরের বাকি ৩৩২ দিনও কেউ রা কাড়ে না।
এর মধ্যে একটা ছোটো ঘটনা ঘটে যায়।
উত্তরদাঁড়ির একটা পুরনো ফ্ল্যাট বাড়ি থেকে নেমে আসেন এক প্রৌঢ়, হাতে বাজারের থলে। টি শার্ট আর জিন্স প্যান্টে বয়স অনেকটা কম লাগছে। রাস্তার এদিক ওদিক শুধু দোকানপাট, তিনিও তাকাচ্ছেন, সবাই হাসি বিনিময় করছে। রিন্টুর মুদি দোকানের সামনে সবসময় ভিড় থাকে, আজ একটু বেশি জটলা হচ্ছে, সবাই খদ্দের নয়। হঠাৎ চড় চাপাটির শব্দ, তিনি দোকানের সামনে যেতেই সব শেষ। তাও তিনি দোকানে গেলেন না, রিন্টুর কাছ থেকে যা কেনার ফেরার পথেই নেবেন । একটা পাউরুটি আর দুধ এক প্যাকেট না নিয়ে গেলেও মহাভারত অশুদ্ধ হবে না বাড়িতে। বিকল্প আছে অনেক।
ফেরার পথে রিন্টু যা বলল, মানে চড়চাপাটির ঘটনা তাকে নিয়েই, কালু নামের ছেলেটি যে মার খেয়েছে, সে নাকি বলছিল ম্যানেজার বাবু টাকা খেয়ে লোন দিয়েছে পাড়ায়। মাথাগরম দিলীপ তখন তাকে দুঘা বসিয়ে দেয়। তিনি মানে ম্যানেজার বাবু বললেন—এসব ছোটো কথা, এ নিয়ে হাত চালাতে হয় ?
রিন্টুর বাড়িও তো তার দেওয়া লোনে কেনা হয়েছে। তাই চাপড়ানোর ঘটনাকে সমর্থন করে । বলে— দিলীপ ঠিক করেছে স্যার।
ম্যানেজার বাবুর নাম কেউ জানে না, কিন্তু সবাই চেনে। যারা হোম লোন নিতে পারে নি তারাও আফশোস করে বলে, স্যার থাকতে নেওয়া হল না, এখন কত ফ্যাঁকড়া, নতুন ম্যানেজার না দিতে পারলেই বেঁচে যায়।
তিনি নির্বিরোধী মানুষ, ছাপোষা। ছেলে মেয়ে দুটো অনেকদিন চাকরি বাকরি পায়নি, এক প্রাইভেট প্রি-প্রাইমারি স্কুলে চাকরি করত বড়ো মেয়ে, সেই সুবাদে শশধর কাউন্সিলের ছেলেমেয়ের গৃহশিক্ষক ছিল বছর খানেক। চাকরি পেয়ে চেন্নাই চলে যেতেই ছোটো ভাইকে দিয়ে যায় বকশি বাড়ির চাকরি। সেও এক বছর পর চলে যায় পুনে। কাউন্সিলার সবে বাম থেকে নির্দল হয়েছেন, তখন ঘোলাজল, জল মাপতে মাপতে শাসক দলেই গেলেন। তারপর তো উত্থান শুধু। এমএলএ থেকে মন্ত্রী।
বাম আমলে উত্তরদাঁড়ি এলাকায় ব্যাপক লোন দেওয়ার সুবাদে ম্যানেজার বাবুর যখন খুব নাম হল, তখন পার্টি থেকে তাকে সম্বর্ধনা দেওয়ার কথা বলল, শশধর কাউন্সিলারই উদ্যোগ নিয়েছিল, পত্রপাঠ না করে দেন তিনি। নতুন জমানা আসতে আসতে তিনিও রিটায়ার করে যান। তবে পার্টি রাজনীতির ব্যাপার স্যাপার তার পছন্দ না হলেও লাল পার্টিকেই ভোট দেন। যদিও জানেন কেউ তার জন্য কিছু করবে না। এপ্রিল মাসের এক তারিখ নাকি পার্টি থেকে পোস্টার দিয়েছিল মজার—
‘একা একা বোকা হলে এপ্রিল ফুল
রাজ্য জুড়ে বোকা হলে ঘাসফুল
দেশজুড়ে বোকা হলে পদ্মফুল।’
কেউ একজন এপ্রিল ফুলের জায়গায় লিখে দিয়েছে লালফুল। মনে মনে হেসেছেন খুব। মনে পড়ে গেছে পার্টিতে ঘুন ধরার দিনের কথা। চাইনিজ খাবারের দোকানদার তখন আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে। সব কাজে টাকা চাই তার। একটা বাচ্চাদের স্কুলের এডমিশনেও চাই। ভেবেছিলেন ছেলেকে বাংলা মিডিয়ামে পড়াবেন, সল্টলেকের সরকারি স্কুলে ভর্তির জন্য শশধরকে বলেছিলেন, সে তখন পার্টি করে। না করে দিল। বলল— এবার হল না দাদা, পরের বার ট্রাই করব।
বাংলা ইস্কুলে পড়েনি বলে ছেলে মেয়ে দুটোই এখন ঘর ছাড়া, বাংলায় পড়লে একটা স্কুল মাস্টার হলেও তো কাছাকাছি থাকত। জমানা বদলালেও ওরা বদলায়নি, ভোটের সময় কলকাতায় থাকলেও কিন্তু শশধর কাকুকে ভোট দেয় না। শশধরের ছেলে মেয়ে বাড়ি এসে স্যার ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করে যায়। চেন্নাই গেলে ম্যাডামের বাড়িতে গিয়ে ঘরের রান্না খেয়ে আসে।
ছাপোষা মানুষ ম্যানেজার বাবুর সুনাম থাকলেও কেউ জানে না তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়। যদিও আমুদে মানুষ হিসেবে খ্যাতি আছে তাঁর, কিন্তু রাজনীতির কথা উঠলেই উঠে পড়েন আড্ডার আসর থেকে। মধ্যবিত্তের চিহ্নিত হয়ে যাওয়ার শঙ্কা । কিন্তু যেখানে ভূতের ভয় সেখানেই যে সন্ধ্যে হয়। ধরা পড়ে গেলেন। বিধান সভা নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়ে দেখেন ফাঁকা ভোটকেন্দ্র, পোলিং এজেন্টের বেঞ্চিতে জনাকয়েক মানুষ, তাঁরা দুজন যেতেই ওরা অবাক, সব কিছু দেখে টেখে সই করিয়ে হাতে কালি লাগিয়ে বলল— যান।
মানে ভোট মেশিনের দিকে যান, বাম ক্যান্ডিডেট কে দাঁড়িয়েছে জানেন না তবু পরিচিত চিহ্ন কাস্তে হাতুড়ি তারার বোতাম টিপলেন, শব্দ হল দীর্ঘ। স্ত্রীও একই রকম করলেন। বেরিয়ে বেশ ফুর্তিতে বাড়ি চলে এলেন, স্ত্রীকে বললেন — আমরা কিন্তু কখনও রিগিং ফিগিং কিংবা বুথ দখল দেখিনি। কেমন নির্বিঘ্নে ভোট দিয়ে এলাম বলো।
স্ত্রীকে মনে হল সন্তুষ্ট নন, বললেন— হুম।
পরদিন সকালে রিন্টু দোকানদার বলল— ভোট দিয়েছেন স্যার।
ম্যানেজারবাবু সদা প্রসন্ন মুখে বললেন— দিয়েছি। ফাঁকা বুথ ছিল, দুপুর গেছি ভোট দিয়েছি আর এসেছি।
— না স্যার, আমাদের বুথে রিপোলিং হচ্ছে আজ। দেবেন না?
— তাই? দেব।
ম্যানেজারের স্ত্রী শুনে আরও মারাত্মক তথ্য দিলেন। বললেন— তখনই আমার সন্দেহ হচ্ছিল। তুমি যখন ভোট দিচ্ছিলে তোমার ঠিক পিছনে একটা লোক দাঁড়িয়ে দেখছিল।
— দেখেছে?
— দেখেছে নিশ্চয়।
— কাকে ভোট দিয়েছি দেখেছে?
— দেখার জন্যই তো দাঁড়িয়েছিল।
— তুমি বললে না কেন?
— তখন বুঝি নি কিছু।
তার মানে খবর পৌঁছে গেছে বাবার কানে। চিহ্নিত হয়ে গেছে কারা বিরোধী। তিনি যে শাসক দলের চিহ্নে বোতাম টিপেননি তা পাড়ার দলপতি দলকর্মীরা জেনে গেছে। শশধরের কানে পৌঁছে গেলে তো হয়েছে। পাড়ায় থাকা মুশকিল হয়ে যাবে।পাড়া ছাড়তে হবে। অবশ্য এমনিতেই সাতশ স্কোয়ার ফুটের ফ্ল্যাট বাড়িটা তাদের পুরো পরিবারের জন্য খুবই ছোটো। ছেলে মেয়ে দুটো একসঙ্গে এলে জামাই বউ নাতিদের খুব অসুবিধা হয়। তাই তার স্ত্রী অনেকদিন থেকেই নতুন বাড়ির কথা বলছিলেন। এবার ম্যানেজারও বললেন — এ পাড়ায় আর থাকব না।
একটা ভালো খদ্দের পাওয়া গেল, দামও দিচ্ছে ঠিকঠাক। তা বাড়ি বিক্রি করব বললেই তো আর করা যায় না। ছেলে মেয়েদের মতামতটাও জরুরি। জন্ম থেকে আছে, বাড়িটার প্রতি একটা মায়া তো থাকতেও পারে । তলব যেতেই ওরা এসে উপস্থিত। মেয়ে বলল — বাড়িটা থাকুক না। পারলে অন্য একটা কিনে নাও। ভাই বোনের জন্য দুটো হল। আর শশকাকুর ভয়ে কেন পালাবে, কোথায় যাবে? একমাত্র কেরালায় এখন বাম শাসন।
ছেলে বলল— বাড়ি বিক্রি করে ডাউন প্যামেন্ট দিয়ে দাও। আমি একটা বড়ো ফ্ল্যাট বুক করে নিই। আমি তো আর কলকাতায় আসব না, তোমরাই থাকবে।
স্ত্রী একান্তে ডেকে সাবধান করে দেন— ওদের কথায় থাকবে না। নিজে পারলে কর। টাকা হাতছাড়া করবে না হরগিজ। শেষ বয়সে ভিখারি হওয়ার সাধ নেই আমার।
আপাতত মুলতুবি রইল বাড়ি বিক্রির প্রকল্প।
আবার অনেকদিন পর আবার সেজে উঠল পাড়া।কন্টিনিউ করল ফেব্রুয়ারির ফার্স্ট উইক পর্যন্ত। মন্ত্রী শশধরের মেয়ের বাগদান অনুষ্ঠান হয়ে গেল জে ডব্লিউ ম্যারিয়েট হোটেলে। ম্যানেজারবাবু ছেলে মেয়েকে টেলিফোন করলেন — নিমন্ত্রণ করেছে?
দুজনই বলল— না তো, জানি না।
এরপর বিয়ের অনুষ্ঠান পাড়ার ক্লাবে, সাততারা হোটেল থেকে কম নয় আয়োজন। ছেলে মেয়ে বলল — না জানি না। জানায়নি।
শীতের মাছ সবজি খেতে ওরা যখন কলকাতায় তখন টেলিফোন এলো ম্যানেজারবাবুর কাছে। স্বয়ং শশধর বলল — মেয়ের বিয়ের রিসেপশনে আসতে হবে, কার্ড পাঠাচ্ছি ।
ম্যানেজার বললেন — যাব।
বললেন — ছেলে মেয়েও আছে এখানে।
— বেশ তো ওদেরকেও নিয়ে আসবেন।
ছেলে মেয়ে বলল — ছাত্রী টেলিফোন করেছে, বলেছে আসতেই হবে। বাবা যে কেন বলে দিল আমরা কলকাতায়।
ম্যানেজারের স্ত্রী কিন্তু খুব খুশি।মন্ত্রী নিজে নিমন্ত্রন করেছে। আত্মীয় স্বজন যে যেখানে আছে সবাইকে জানিয়ে দিলেন মন্ত্রীর মেয়ের বিয়েতে যাচ্ছেন। ম্যানেজারও স্ত্রীকে বললেন — যাক একটা সমাধান হয়ে গেল, আর বাড়ি বিক্রি করতে হবে না। এবার মিটমাট হয়ে যাবে। শেষ বয়সটা কোনক্রমে কাটিয়ে দিতে পারব নিজের পাড়ায় , কী বলো?
রিসেপশনের দিন যত এগিয়ে আসে, ম্যানেজারবাবুর মনটাও বেশ ফুরফুরে হয়ে যায়। শশধর বকশিকে আনুগত্য দেখানোর একটা সুযোগ পাওয়া যাবে ভেবে স্বস্তি হয়। স্ত্রীও খুব খুশি, মন্ত্রীর বিয়ে বলে কথা। কোন শাড়ি পরবেন ঠিক করতে মেয়েকে বলেন। মেয়ের কোনো উৎসাহ নেই । চুলে রঙ করাবেন, একটু আপার লিপ আইব্রো বেশি না হলে পেডিকিওরটাও করিয়ে নেবেন।ছেলেকে বললেন আরবান কোম্পানি বুক করে দিতে, ছেলে খুব হাসল। বলল — কেউ দেখবে না মাম্মি, লাইন দিয়ে ঢুকবে প্যাকেটটা দেবে আর যোশোকাকুর কেটারিংয়ে খেয়ে বেরিয়ে আসবে। কেউ তোমাকে পুছবেও না।
— যাই না যাই দেখা যাবে, এই পেত্নির মতো যাব নাকি?
তেরো মার্চ রবিবার নলবনে যাওয়ার প্রস্তুতিতে দাড়ি টাড়ি কেটে প্রস্তুত হয়ে থাকেন ম্যানেজারবাবু। তার স্ত্রীও প্রস্তুত, মেয়েকে বলেন,
— তুই কী পরবি?এখনও রেডি হোস নি?
মেয়ে বলে,
— কী আবার পরব।
ওদের কোনো উৎসাহ নেই। ছেলে তো সরাসরি বলেই দেয়,
— তোমরা চলে যাও মা। তোমরা গেলে কাকু খুশি হবে।
ওরা আর কী করে যান। ওদের সুবাদেই তো পরিচয়। স্বামী স্ত্রী দুজনেরই মনখারাপ হয়, কী জানি কী একটা হারিয়ে ফেললেন জীবন থেকে,নাকি হেরেই গেলেন নিজে। ছেলে মেয়েদের তো কিছুই না, ওরা বাইরে থাকে,বুঝবে না সন্দেহজনক ভোটার হয়ে থাকার যন্ত্রণা।
পরদিন সকালে রিন্টু রিপোর্ট করে,
— ভালো খাইয়েছে স্যার, তবে গিফট দেওয়ার লাইন ছিল এক মাইল লম্বা। পাড়ার সবাই তো নিমন্ত্রিত।
— শশধর ছিল?
— দাদা থাকবে না? মেয়ের বিয়ের রিসেপশনে? তবে আমি দেখিনি। সিএমকে নিয়ে ব্যাস্ত ছিলেন।
— ও।
— আপনারা যান নি?
— গেছি। আমিও দেখিনি।
ম্যানেজারবাবু মিথ্যে কথাটা বলে ফেলেন অবলীলায়।
রিন্টু খবর আদান প্রদান করে।
রিন্টু মারফৎ খবরটা অন্তত পৌঁছে গেলেই হল জায়গা মতো।
♦♣♦–♦♣♦–♦♣♦
❤ Support Us








