Advertisement
  • ক | বি | তা রোব-e-বর্ণ
  • এপ্রিল ১৪, ২০২৪

কবিতার মনোবাসীর খোঁজে। পর্ব ১৮

অমিতাভ দেব চৌধুরী
কবিতার মনোবাসীর খোঁজে। পর্ব ১৮

 
‘এলোমেলো নিরাশ্ৰয় শব্দের কঙ্কাল’ নয়

 
কবিতা চর্চা, চিত্রতলে আবছা রং ছড়িয়ে ছবি আঁকা, রেখার ইঙ্গিত দুঃসাহসী মূর্তি বা বিমূর্ত অবয়ব নির্মাণ করে শিল্পশর্তকে দৃশ্যগ্রাহ্য করে তোলা সহজ কাজ নয়।সভ্যতার নানা পর্বে গুহাবাসীরা যখন দেওয়াল চিত্রে খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০তে নিজেকে ব্যক্ত করতে শুরু করলেন, রেখাচিত্রে, চারকোলের সাহায্যে, অভিনব ভাষায় প্রকাশ করতেন নিজেকে, তখনো স্তব্ধতা, নৈঃশব্দ তাঁদের শিল্পবোধের নিরালম্ব ভরসা ছিল হয়তো, চাইলেই লিখতে পারতেন, আঁকতে পারতেন তা  হয়তো নয়, এখনো সহজধর্মী ভাবনা মানুষেরে আয়ত্তের বাইরে। সে বলতে চায় যা, তা হয়ে ওঠে না অনেক সময়, যা ভাবে তাকে ভেতর থেকে বের করে আনতে দুর্গম ভাবন, আঁকাবুকির অসহজ অক্ষর ঢেকে দেয় তার সবার সম্মুখে আসার রাস্তা। তবু সে লড়ে যায়, সহজ থেকে সহজতর হতে চায়। গঙ্গাধর স্মৃতি পুরস্কার [২০০৩] গ্রহন করতে গিয়ে, লিখিত অভিভাষণে, কবি শঙ্খ ঘোষ তাঁর ‘দি পয়েন্টিং ফিঙ্গার অব্ সায়েলেন্স’ নিবন্ধের উল্লেখ করে বলেছিলেন, মানব মনের হৃদয়ের নৈঃশব্দকে স্পর্শ করতে চায় কবিতা, শব্দ মানেই সংযোগের আগ্রহ। হ্যাঁ, কিন্তু প্রায়ই আমরা ভুলে যাই শব্দ অনেক সময় তার সত্যতা হারিয়ে ফেলে এবং আমাদের এক আর আরেকের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা গড়ে তোলে। জীবনানন্দ দাশও ভাবতেন অনুরূপ। শব্দ যদি ঘন অনুভূতির বাহক হতে পারে, তাহলে তার কঙ্কালই দেখা যাবে শুধু। ‘অনুভূতি দেশ থেকে আলো/ না পেলে নিছক ক্রিয়া, বিশেষণ/ এলোমেলো নিরাশ্রয় শব্দের কঙ্কাল! জীবনানন্দ থেকে শঙ্খ এবং তাঁদের সমকালীন কবি স্বভাবের সুভাষ-শক্তি-আলমাহমুদ শব্দের রহস্যভেদ, শব্দের উন্মোচন আর শব্দমোহের গোপনীয় সব দরজা-জানালা খোলার আমৃত্যু সততা দিয়ে শিখিয়ে গেছেন, শিল্পের অন্তরে, আরো গহীনে, যে নির্বান্ধব খেলা করে, শব্দ দিয়েই তার মোদিত সুন্দরকে মুখের ভাষার কাছাকাছি নিয়ে আসা যে-কোনো শিল্প মাধ্যমের ঘোষিত আর সাঙ্কেতিক অভিমুখ হয়ে উঠুক; যদিও এ এক দুরূহ দায়িত্ব।
 
গুহামানবের চিত্রকথায় শিল্পভঙ্গিমার এটাই ছিল সম্ভবত সম্মেলিত শ্রোতা আর দর্শকের সমস্ত বিস্ময়ের রসদ। ‘সহজ কথা ঠিক ততটা সহজ নয়।’ বলেছিলেন শঙ্খবাবু, কবিতায়, যাপনের সবরকম আয়োজনের মুখরিত উচ্চারণেও। চন্ডীদাশ থেকে রায় গুণাকর ভারতচন্দ্র, মাইকেল থেকে বিহারীলাল, রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল সবাই দুর্বোধ্য নিরীহকে, ভাষা শিল্পের নিহিত সুন্দরকে নিয়ে, সরাসরি কিংবা ইঙ্গিতস্পর্শে জীবনের সহজকে দেখতে চেয়েছেন। তাঁরা সার্থক বলেই আমারা আমাদের চিত্রতলে, পটচিত্রে, গল্পকথায়, আমাদের শিল্পসত্তা, পায়ের ভিতর মাতাল/ আমার পায়ের নীচে মাতাল/ এই মদের কাছে সবাই খুনী/ ঝলমলে ঘোর দুপুরবেলাও সঙ্গে থাকে/ হ্যাঁ করা ওই গঙ্গাতীরের চন্ডালিনী/সেই সনাতন ভরসাহীন অশ্রুহীনা/তুমিই আমার সব সময়ের সঙ্গিনী না ?/ তুমি আমায় সুখ দেবে তা সহজ নয়/ তুমি আমায় দুঃখ দেবে সহজ নয়। ( শঙ্খ ঘোষ)
 
কবিতা নিয়ে, শিল্প নিয়ে, শিল্প স্বভাবের সঙ্গ আর নিঃসঙ্গতা নিয়ে এই ধরনের স্বস্তি আর অস্বস্তি হয়তো বিরল, বিরলতম হীরকদ্যুতি, নাগরিক হয়েও অযান্ত্রিক উদ্ভাসে, স্মৃতিসত্তার ঐতিহ্যে প্রায় হঠাৎ দেখার অনুভব নিয়ে বেঁচে থাকবার, নিয়মিত ভাববার বিপুল, রসগ্রাহী গৃহ নির্মাণ করেছিলেন শঙ্খ ঘোষ। তাঁকে নিয়ে বলবার জন্য যে মেধা দরকার, তার সূচনার অপেক্ষায় রইলাম, আমাদের সমবেত অভিপ্রায় সম্ভবত প্রস্তুত হচ্ছে। সম্ভবত বলতে হচ্ছে, কেননা তাঁর ইহজাগতিকতাকে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবাবেগ খতিয়ে দেখার আগ্রহ এখনো সংশয়াচ্ছন্ন, কাঁটা বনে শঙ্কিত। অবস্থা বদলাবে, অনুকরণহীন অনুশীলে অবশ্যই। কৃষিনির্ভর সমাজ যখন আর মুখ লুকিয়ে থাকবে না, তখন তার মেধা নগররামের জাহান্মমেও খুঁজে পাবে পুষ্পের হাসি; যখন সে ঐতিহ্যের শিকড়ে খুঁজবে আত্মকে, দ্বিতীয়-তৃতীয় আমির বিস্তৃতিকে, তখন তার নিভৃত, নিরালা, স্মিত হাসি ঔপনিবেশিকতা খোয়াড়েপনাকে তছনছ করে বেরিয়ে এসে শাশ্বত সহজকে, সহজের রহস্যময়তাকে জড়িয়ে ধরবে। বাংলাদেশের একাংশ কবি আর শিল্পীর মনোহর উদযাপনে, বরাকের কিছু সংখ্যক স্বাভাবিক অস্বাভাবিকের চর্চা আর চর্যায়, এই উত্তরণ আর ঊর্ধ্বারোহণের লক্ষ্য চোখে পড়ছে। সহজকথা সহজভাবে বলবার কসরতে তাঁর ব্যস্ত। সুধীর সেন থেকে রামেন্দ্র দেশমুখ, শক্তিপদ, উদয়ন-শান্তনু, ব্রজেন সিনহা, বিজিৎকুমার থেকে অভিতাভ দেব চৌধুরী পর্যন্ত বহুজনের শিল্পিত নিষ্ঠা দক্ষিণ অসমের ভুবনপাহাড় থেকে বরাক হয়ে, কুশিয়ারা হয়ে, সুরমা হয়ে কখনো উজান বাইছে, ভাঁটি দিচ্ছে কখনো বা। গদ্য শিল্পী আর কবি অমিতাভ-র এযাবৎ সব নির্মাণ আর সৃষ্টির নির্যাস স্পর্শ করে গম্ভীরকে, চিন্তার অতলকে, যা আমাদের উৎসের সন্ধান আর শিকড়ের বিরহের পরিসরকে অহেতুক ভারি করে না, সঙ্কেতধ্বনিতে বলে দেয়, ফুল ফোটে, ওই ফুল দেবো বলে রচি দেবতারে।আমাদের দেব বিষয়ক সনেট, অন্যান্য কবিতা, গল্প, উপন্যাসও আশা করি আবহমান ঐতিহ্যের বিত্তশালা হয়ে থাকবে ।
 
বাহার উদ্দিন। ১৪.০৪.২০২৪

 

আজকাল মনে হয়, কেউ আমাকে লিখিয়ে নেয়

♦  কবিতার মুহূর্তে কি খুব অস্থির হয়ে ওঠেন ?

না, অস্থির হই না। বরং মাথায় জলপটি দেবার মতো হয় ব্যাপারটা। মন শান্তিতে ভরে ওঠে।

 

♦  ভেবেচিন্তে লেখেন, না স্বতঃস্ফূর্তভাবে ?

প্রয়াত কবি গৌতম বসু শাহজাদা দারাশিকোহর একটি উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন। শেখ-উল-ইসলাম তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন: ‘ এর অর্থ কী —সহায়ক ছাড়াই ? ‘ উত্তরে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন: অর্থ হলো অনুসন্ধানবিহীন প্রাপ্তি, দৃষ্টিবিহীন দর্শন, কারণ দৃষ্টিশক্তিও একরকম অক্ষমতা ।’ আমিও না-ভেবেই, অপেক্ষাহীন পেয়ে যাই।

 

♦  কখনো কি মনে হয়, কেউ আপনাকে ভেতর থেকে লিখিয়ে নেয়, এমন কোনো মনোবাসী ?

হ্যাঁ, আজকাল তা-ই হয় । লেখা আমাকে তার মাধ্যম করে নেয় ।

 

♦   একটানা লেখেন, না থেকে থেকে লিখতে হয় ?

কবিতা একটানা লিখি।থেকে থেকে লিখলে স্রোতটা ব্যাহত হয়। বাধা পায়। ভেঙে যায়।

 

♦   লেখার আগে কি মনে মনে পংক্তি আওড়ান ?

কখনো কখনো।মনে মনে।শূন্য থেকে আসা এক ঝলক বিদ্যুৎপঙক্তি যেন।

 

♦   অন্তমিল, মধ্যমিল কি কবিতায় ফেরাতে চান ?

না, চেষ্টা করে আর কিছু করতে চাই না। হবার হলে, এমনি হয়ে যায় । এমনকী, ভুলগুলোও।

 

♦   ছন্দের ওলট পালট বা ভাঙচুর কতটা পছন্দ ?

ছন্দ ভাঙা টাঙা এগুলো যৌবনের ব্যায়াম।প্রৌঢ়র আত্মাঅতজিম-যাতনা ভালোবাসে না।

 

চিত্রকর্ম: ভবেশ চন্দ্র সান্যাল

রচনা

 
লিখি না এখন আর। লেখা হয়ে গেছে যা, তা দেখি।
জামদানি রূপময় দেখি চারপাশে লেখা আছে।
রবাবের তারে ঝরে বৃষ্টিও বাজায় সুরলিপি।
মণিময় সূর্য জাগে পৃথিবীপুরীর গাছে গাছে।
 
ভাবি না এখন, ভাবনা আমাকেই করে নির্বাচন
ভেবেছেন মনীষী ও মহাত্মারা যুগ যুগ ধরে
রবাবের তারে বৃ্ষ্টি লেখে সুর, ঋষিদের মন
ঐ সু্রে পশ্চিমের আকাশে বেদনা হয়ে ঝরে।
 
ফুল ফোটে, ঐ ফুল দেবো বলে রচি দেবতারে।
নাহলে ফুলের রূপ গাছ কি দেখবে কোনোদিন ?
রবাব, তোমার তারে বৃ্ষ্টি সুর হয়ে ঝরে পড়ে
পতন অনন্ত সত্য; অমরতা মৃত্যুরই কৌপীন।
 
ভাবি, কবি মখমালবাফ, দেখে তোমার  সৃজন
কখন  আমার হবে জন্মের প্রথম শুভক্ষণ ?

 

চিত্রকর্ম: ভবেশ চন্দ্র সান্যাল

চোখ

 
আমার দু’চোখ দিয়ে তুমিই তো দেখ, হে ঈশ্বর !
নিজের অনন্ত রূপ, নীলাকাশ, পীতাকাশ, সব
পুকুরে মাছের ঘাই, অন্ধকারে ঘাপটি-মারা স্বর
শব্দও তো দেখা যায়, হাওয়ার উড়ানে, অনুভব।
 
তোমার দু’চোখ দিয়ে আমিই তো দেখি, হে ঈশ্বর !
স্কুলে যেতে মাঝপথে ঘুড়ি-ধরা, দুপুরের ঘুম
গাছের স্নানের দৃশ্য, রোদ্দুরের নদী-বহা চর
আমিফুল ফুটে ওঠে। হৃদকমলেতে লাগে ধুম।
 
তবে কি তুমিই আমি, আমার নগ্নতা তুমি তাই ?
ঢাকবো না আর এই নগ্নতাকে। এ তোমার দান।
কাপড় পরেই আমি নগ্ন হবো, যেরকম রাই
নীলাম্বরী শাড়ি পরি আজো নীল যমুনায় যান।
 
বণিকের যুগে তুমি, হা ঈশ্বর, রাজার পুতুল।
আমার ভিতরে থাকো । মন্দির আসলে এক ভুল।

 

চিত্রকর্ম: ভবেশচন্দ্র সান্যাল

বাঁশের কেল্লা

 
বাঁশঝাড়, বাঁশঝাড়, গরীবের আব্রু রাখো তুমি
বাঁশঝাড়, বাঁশঝাড়, কবরে ঘুমায় আজ যারা
নানা, খালা, নানীমার সকলের ছায়াময় জমি
তুমি রচো, বাতাস দোলায় দেখি তোমার পাহারা।
 
আমার চুম্বন চুরি করেছে সে বসন্ত বাতাস
গিয়েছে যে দিন চলে যৌবনের মেহেদীর রঙে
এখন জানালা ঘেরে শীতের আকুল দীর্ঘশ্বাস
চারপাশে অতীতের পাতা ঝরে ফাল্গুনের ফ্রেমে।
 
একটি ফটোই আছে, আর কিছু নেই তার আর
তুমি আছ , বাঁশঝাড়, কবেকার সাক্ষী সোহাগের
একটি গ্রামের নাম প্রেম, তার সম্ভ্রমের ভার
তোমার ওপর আজ, বাঁশপাতা, ঝরে সে-দিনের।
 
এখনো প্রেমের মানে জানতে কবরে দিয়া জ্বালি।
আল্লার কসম, আমি আজো সখী অতীতের মালী।
 

♦–♦♦–♦♦–♦♦–♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!