Advertisement
  • ক | বি | তা রোব-e-বর্ণ
  • অক্টোবর ৮, ২০২৩

গুচ্ছ কবিতা

রিমি দে
গুচ্ছ কবিতা

চিত্র: প্রকাশ কর্মকার

উপচে পড়ছে গাছের সবুজ, দরজা খুলে দিচ্ছে মাঝরাত

নাগরিক উন্নাসিকতায় আক্রান্ত, সংক্রমিত কলকাতা দেখে কম, চেঁচায় বেশি। শহরের বাইরে, দূরে আরও দূরে যে সব মন-মনোহর ভেসে বেড়ায়, ছড়িয়ে দেয় সহজ গভীর সংলাপ, তা অনেক সময় এড়িয়ে যায় সে, আমাদের বলতে বাধ্য করে সংস্কৃতির নগরকেন্দ্রিকতা বড্ড চতুর আর চটুল। যে-কোনো অবক্ষয়ের সম্মুখে দাঁড়িয়ে বিভ্রান্ত, সংশয়াচ্ছন্ন হয়ে পড়ে তার নাগরিকতার আত্মসর্বস্ব বিচ্ছিন্নতা। খানিকটা সাহস সঞ্চয় করে বলতে হচ্ছে, নগরকেন্দ্রিক কবিতা, গল্প, গান আর রং–রেখা পথ ক্রমশ হারাচ্ছে। ভুলে যাচ্ছে তার শিকড় আর পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রতিস্পর্ধী দৃঢ়তা। কলকাতা থেকে দূরে, শিলচরে কিংবা শিলিগুড়িতে— এসব এলাকার গ্রাম ছোঁওয়া শিল্পিতস্বভাবে, সৃজনকর্মে, যে সব কলম ঐকান্তিকতায় নিবেদিত আর নিরত, তা তথাকথিত সাংস্কূতিক রাজধানীর খেলোয়াড়দের নজরে আসে না কেন ? কেন স্বাতন্ত্র্যের স্বর আর গার্হস্থ্য উপেক্ষা করতে থাকে প্রাতিষ্ঠানিকতার ইচ্ছাকৃত, আরোপিত নীরবতা ? এতে আবহমানের অভিপ্রায়কে কন্ঠহীন করে তোলা কি সম্ভব ?
 
আমৃত্যু উত্তরবঙ্গে শারীরিক উপস্থিতি আটকে রেখেছিলেন অমিয়ভূষণ মজুমদার। মফস্বলীয় কিংবা আঞ্চলিকতা দুষ্ট ভাষা, বিষয় তাঁর মননকে ছুঁতে পারেনি। জলপাইগুড়িতে জীবনের অর্থেক কেটেছিল বিস্ময়কর লেখক দেবেশ রায়-এর। উত্তরবঙ্গের নানা মুখ, নানা প্রান্ত, নদী তাঁর লেখকতার, তাঁর দৃষ্টিপাতের চরিত্র হয়ে ওঠে। নগরজীবনের সংকীর্ণ বসবাস কাবু করতে পারেনি দেবেশকে। গল্পে, উপন্যাসে, প্রবন্ধে কালজয়ী আন্তর্জাতিকতাবোধকে সঙ্গে নিয়ে কাটিয়ে গেলেন পূর্ণাঙ্গ জীবন। সমরেশ মজুমজারের প্রস্তুতিপর্বেও উত্তরবঙ্গের ছায়াপাত অস্বীকার করবে, এমন দুঃসাহসী কোথায়? গত শতাব্দীর ষাটের দশকের বেপরোয়া কবি শামসের আনোয়ারের উত্থানে জলপাইগুড়ি যে আধুনিকতা, যে আশ্চর্য শিখা জাগিয়েছিল, সে স্মৃতি ভুলে যাওয়া কি সম্ভব ? গ্রহনশীলতা আর গ্রহনযোগ্যতায় কলকাতা অতুলনীয় শহর। এখানে যাঁরা আসেন, যে গড়ে তোলেন স্থায়ী ঠিকানা, তাঁদের দৃষ্টি ক্ষুদ্রতা, আত্মসর্বস্বতার কবলে পড়লেই ব্যক্তিকতার বিপদ বাড়ে, তারা তখন কেবল নিজেকে দেখেন, চারপাশের
দু-একজনকেই দেখতে পায় শুধু যে পটভূমি, যে বৃহতের সংস্পর্শে তাঁদের নির্মাণের আরম্ভ, সেখানকার সূর্যমুখী, কালো গোলাপের বিমূর্ত আলো ধীরে ধীরে সরে যায়। তৈরি করে নেয় নিজস্ব প্রবাহ, চর্চা আর চর্যার একান্ত, অদম্য অববাহিকা।
 
রিমি দে শিলিগুড়ির মহিলা। কবিতা, গল্প প্রবন্ধে সাবলীল তাঁর বিকশিত অনুশীলন। কঠিন আর বিচিত্র বিষয়ে অনায়াসে, সহজে বলবার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ তাঁর মনন ও খনন। রিমির সব লেখা পড়বার সুযোগ হয়নি। তবু মনে হচ্ছে, সম্ভবত নিয়ন্ত্রিত সংযম রিমির স্বভাব ধর্ম। তাঁর কবিতা সমগ্র বের করেছে দিল্লির ‘হওয়া কল’। চমৎকার প্রকাশনা সংস্থা, ঝুঁকি নিয়েছে। রিমিও ঝুঁকিপ্রবণ অগ্নিরেখা, জলে আর জঙ্গলে জ্বলে উঠতে চায় তাঁর মর্মভেদী সংলাপ, শব্দ ও বাকপ্রতিমা। রিমির পরবর্তী উচ্চারণের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমাদের দূঢ় বিশ্বাস, উপচে পড়বে গাছের সবুজ। দরজা খুলে দেবে মাঝরাত।

 

বাহার উদ্দিন
০৮/১০/২০২৩

 
 

সম্পর্ক ও অন‍্যান‍্য

এক

 
এই গাছ ঝেড়ে কাশে না
কাশেরও আড়াল থাকে
শাদা শাদা ধাঁধাঁ,গাঢ় কুয়াশার
আড়ালের বিস্ময়কর ঘ্রাণ,ভিজে
মাটি ফুঁড়ে শিকড় ছড়িয়ে এক রাশ পাতাল পরিবার
আমি ও আমার অন‍ন‍্য অন‍্যান‍্য পিপাসা
শ্বাসরোধী মাটিজানালার পাশে কবিতার দু-এক কুচি ঘাসপাতা  লতাগুল্ম
 
কাশি তুমি এভাবেই শ্বাসকষ্ট হয়ে থাকো না হয় !
 
অনেকটা কবিতার কাছাকাছি..

 

 

দুই

 
উপচে পড়ছে গাছের সবুজ
আর্তিগুলো মাটি আঁকড়ে থাকছে
দরজা খুলে দিচ্ছে মাঝরাত

 

চিত্র: প্রকাশ কর্মকার । শিরোনাম: আমার গ্রামের সকাল

 

তিন

 
গাছের গায়ে গা লাগিয়ে বসে আছে পাখি
পাখি এক আশ্চর্য সেয়ানা সন্ন‍্যাস
কিছুটা উল্লাস,বাকিটা
নীরব কাকলি ছড়িয়ে পায়ের অতলে
 
নবান্নের সুর ঢেলে দেয়…
 
হে পাখসাট তোমার ডানায় কিছু ধান গুঁজে দিও গোপনে…
 
 

চার

 
একরাশ আলো ভাসিয়ে দিয়ে
গুটিয়ে নিয়েছে বৈভব দ্রুত
 
অন্ধকার স্তনের শরীরে আমার জিহ্বার গান লেগে আছে এখনও
কোমল সাগর থেকে গান্ধার রক্ত পান করে
নৈঃশব্দ রেখেছ চঞ্চুতে
মৌন গানে এইসব উৎসব ছুঁয়ে থেকে থেকে
ধান আর পুস্পগন্ধে জ্বলে উঠছে গা ও গয়না
 
এতটা বিপুল থেকে সরে আসছি একটু একটু করে..

 

চিত্র: সুহাস ভুজবল

 

পাঁচ

 
কবিতা অনন্ত প্রদাহ নিয়ে এলে
আমি তার অগাধ খুলে দিতে থাকি
একে একে আমাদের সমস্ত অন্ধকার ছিন্নভিন্ন হয়
 
ছন্দহীন দুপুর বিস্ময় মেলে রাখে
দুপুর ফুরিয়ে গেলে কবিতা কাবু হয়ে বাবু হয়ে বসে
মাছ ভাত খায়
তারপর দ্বিপ্রাহরিক ঘুম…
 
ঘুম থেকে উঠে দেখি ধুধু মাঠ আবছা গোধূলি
গোটা পৃথিবী এসে ধাক্কাধাক্কি করে বুকের ভেতর
কবিতার এই রেশটুকু বড়ো বেশি যন্ত্রণা দিলে
কবিতা লেখা ছেড়ে দিতে হয়…

 

 

ছয়

 
পুড়ে যাবার পর
পান্ডুলিপিতে কম্বল চাপিয়ে আগুন নিভিয়েছি
পোড়া চামড়ার গা থেকে এখন খুঁটে খাচ্ছি সম্পর্কের
দধিমঙ্গল…

 

♦–♦♦–♦♦–♦♦–♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!