Advertisement
  • গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
  • অক্টোবর ২৬, ২০২৫

ভেসে যায় সময়

হেদায়েতুল্লাহ
ভেসে যায় সময়

 
ক্রান্তিকালের কথা । কালচক্রে এমন সময় অবশ্য ফিরে ফিরে আসে । যখন জরাজীর্ণ হয় ধরিত্রী, মানুষের চলার পথ বন্ধ হয়ে আসে, তখন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নতুন পথের সন্ধান করে । বছর পনেরো আগের ঘটনা। আমার কমপাউন্ডার কাহার সাহেব ক-দিনের ছুটি নিয়েছেন । সেখানে রেখে গেছেন ভাইপোকে। মাঝে মাঝে সে এখানে কাজ শেখে । খুব চঞ্চল। সেই বান্টি সেদিন হঠাৎ বলে উঠল, খবর শুনেছেন, স্যার ?
 
তরুণ যুবক । দুনিয়ার খবর তার নখ দর্পণে । ওর কথাবার্তায় অত কান দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করিনি । নিরাসক্ত গলায় বলি, সে তো অনেক কথাই কানে আসে ।
 
আমাকে সে শোনাবেই । উত্তেজিত কন্ঠে বলে, ঝটকা খবর বলতে পারেন।
 
দু-চার জন পেশেন্ট দেখা হয়ে গেছে । এখন একটু ফাঁকা । ফুরসতি গলায় বলি, তোর কী হয়েচে বল তো ?
 
কাল সারারাত জাগতে হয়েচে।
 
এই তোর ঝটকা খবর !
 
বিরক্তি আর উত্তেজনা মেশানো রুক্ষ গলায় সে উত্তর দেয়, পুরোটা শোনেন আগে !
 
টাকি রোডের ওপর দেগঙ্গাবাজারে আমার চেম্বার ।
 

ক-দিন ধরে এমনিতেই রোগীর আনাগোনা কম । তার মধ্যে পঞ্চায়েতের ভোট। এই ইলেকশানে গাঁয়ের লোক বড়ো বেশি মাতামাতি করে। রাজা উজির বনা কিংবা বানানোর খেলা। মারদাঙ্গা, লাশটাশও পড়ে।

 
দু-দিন আগেই তো ইলেকশান শেষ হয়েছে। তাই বলি, সেসব তো চুকেবুকে গেছে। আবার রাত জাগা কীসের ?
 
ইলেকশান তো শেষ হয়েচে কিন্তু আসল কাজ যে বাকি।
 
গণনা ?
 
তা আর বলচি কি !
 
তাতে আবার তোদের রাতজাগা কীসের ?
 
শুনুন সে কথা ।
 
বল।
 
আমাদের এখানে ব্যালটবাক্সগুলো বেড়াচাঁপা পলিটেকনিক কলেজে ভল্টে রাখা আছে।
 
সেখানে তো পুলিশ আর কেন্দ্রীয় বাহিনির পাহারা, তাকে থামিয়ে বলি।
 
সে তো নামকে ওয়াস্তে । নইলে কালাম মাস্টারের দল এত সাহস পায় !
 
তার কথার ফাঁকে একজন মেডিক্যাল রিপ্রেজেনটেটিভ মুখ বাড়ায় । তপন মণ্ডল । সে খানিক বক বক করে চলে গেলে আবার শুরু করে বান্টি– রাত তখন বারোটা হবে। একটু ঘুম ঘুম চোখে জেগে আচি। ভোটের রেজাল্ট নিয়ে চিন্তায় আছি। মনে মনে ভাবছি, আমাদের প্রার্থী জিতবে তো ! আমরা এবার নতুন মুখ নতুন ফুলের রং দেকতি পাবো তো ! পুরোনো সব যে পচে গেচে…এমন সময় করুণাদির ফোন।
 
চন্দনা গাঁয়ের করুণা পাল ? পালপাড়ায় বাড়ি ? তাকে চিনি । লাল দোপাটি থেকে নীল দোপাটি হয়েচে তো ?
 
আমার কথায় পাত্তা না দিয়ে বান্টি বলতে থাকে, জানেন স্যার, আমার ওপর খুব ভরসা করেন করুণাদি । সেই বিশ্বাস থেকেই আমাকে বললেন, ওরে ! সময় নেই রে ! গাঁয়ের লোকজনকে সব ডেকে নিয়ে আয় । আমি ঘুম চোখে থতমত খাই । কী করব ভেবে পাইনে ।
 

হঠাৎ মনে পড়ল, গাঁয়ের লোক এক জায়গায় করার একটায় উপায় । সঙ্গে সঙ্গে মসজিদের মাইকে হেঁকে দিলাম। কয়েকশো লোক বেরিয়ে পড়ল। তারা লাঠিসোঁটা নে ধাওয়া করতেই কালাম মাস্টারের লোক আঁধারে গা ঢাকা দিল।

 
তখন সবে তারা ভল্টের ঘরে ঢুকেচিল আরকি !
 
এখন ক্রান্তিকালের সময়। মানুষ বদল চায়। জানি, সারা জেলা জুড়ে কালাম মাস্টারের দাপট। শাসন, খড়িবেড়ের হাজার হাজার জলকর তার অধীন। তার বাহিনী এলাকায় অপরাজেয়। তবে, বান্টির কথা একেবারে উড়িয়ে দিতে পারিনে। তার লোক হয়তো উল্টো হাওয়া বুঝে ব্যালট বাক্স লুট করতে এসেছিল।
 
ভাবনায় ছেদ পড়ল। বাইরে থেকে আওয়াজ এল, ডাক্তারদা ! আসতে পারি ?
 
স্থানীয় নেতা স্বরূপ মিত্তির তার মাকে নিয়ে হাজির। তিনি আমার বহুদিনের রোগী। একরকম বিশ্বাসের জায়গা তৈরি হয়েছে বলা যায়। তাঁকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ওষুধপত্তর লিখে দিই । মাকে বাইরে বসিয়ে স্বরূপ আবার ভেতরে এসে বলে, আপনাকে একটা কথা বলব, ডাক্তারদা ?
 
এখনো এদের দাপট আছে। থানাপুলিশও এদের কথা মেনে চলে। আমি বলি, বলো !
 
কিছু কী শুনতে পাচ্ছেন ?
 
কী ?
 
চারিদিকে গুজব রটচে।
 
চুপ করে থাকি। আমার কাছে সবাই আসে। এখানে কোনো দলের ভেদ নেই । ধর্মের তফাৎ নেই । সব কথার জবাব দেওয়া যায় না। শুধু শুনে যেতে হয় । সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কী ভাবল কে জানে । নিস্তেজ গলায় বলল, সব রটনা । পলিটেকনিক কলেজে ব্যালট বাক্স কড়া পাহারায় আছে । লুট করা যায় নাকি ?
 
তবে এমন রটনা কেন ? কৌতূহল চাপতে না পেরে আমি জিজ্ঞেস করে বসি।
 
আরে, ডেকরেটারের লোকজন এসেছিল রাত তাদের কাজের জন্যে। আরো নাকি কিছু লাইট ফ্যান লাগাতে হবে। কিন্তু বিরোধীরা সবটাতে কালাম মাস্টারের ভূত দেখচে।
 
এটুকু বলেই স্বরূপ তড়িঘড়ি তার মাকে নিয়ে চলে গেল। ঠিক সে সময়েই বান্টি এক কাপ চা হাতে ঢোকে। বাঁকা গলায় দাঁত চিপে চিপে বলে ওঠে, যত্তোসব ! মিথ্যেবাদি ! রাত বারোটার সময় ডেকরেটারের লোক ! মস্করা করার আর যায়গা পায় না !
সত্যমিথ্যা যাচাই করা আমার কাজ না । এসব নিয়ে বেশি কথাবার্তা বলাও ঠিক না। রোগীর ভিড় বেড়েছে। কে কখন কোন কথায় কী করে বসে তাঁর ঠিক আছে !
 
দিন চারেক বাদে টাকি রোড়ে ডিজে আর পটকার আওয়াজ। মিছিল যাচ্ছে। কাহার সাহেব ফিরে এসেছে। হঠাৎ নীল আবির মেখে ঢোকে কয়েকজন।
 
স্যার ! আমরা জিতে গেচি । বান্টির কণ্ঠে উন্মাদনা । সেখানে জেতার চেয়ে মাতলামিই যেন বেশি ।
 
না ! তোরা জিতিসনি, তাঁর দিকে তাকিয়ে বলি। এরই মধ্যে করুণা পাল মধ্যমণি হয়ে ঘরে ঢুকেছেন ।
 
একটু থতমত খেয়ে বলেন, জনগণ জিতেচে !
 
তাই কি ?
 
তাহলে ?
 
তাহলে কিছুই না, আসলে কেউ জেতে না । সময়ের বিরুদ্ধে কথা বলার একটা জেদ যেন মনের চোরা কুঠুরি থেকে বেরিয়ে আমার চেতনায় চেপে বসে।
 
করুণা রুষ্ট কণ্ঠে বলেন, আপনি বুঝি গুজব নামে সত্যিকথায় অবিশ্বাসী ?
 
তা নয় । রাজারানিরা সব সময় কাল কানা হয়। নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করি। অকারণে এদের চটিয়ে লাভ নেই।
 
ঠিক বুঝলাম না । করুণা বলেন ।
 
আজকে এসব কথা থাক। আপনারা আনন্দ করুন।
 
আমার কথায় থমকে যাওয়া মুখ আবার খুশিতে ভরে ওঠে। আমাকে নীল আবির মাখিয়ে তারা চলে যায়।
 
পঞ্চায়েত গঠন হয়ে গেছে। বেশ কিছুদিন পরে করুণা এসে হাজির। তাঁকে ঠিক জোয়ারে ভেসে যাওয়া ব্যক্তিত্ব বলে মনে হয় না। হয়তো সে কারণে সেদিনের না পাওয়া উত্তর জানতে ফিরে এসেছেন।
 
রোগী দেখা শেষ করে আমি শুরু করি, অনেকদিন আগের কথা । কাজল ভুইঞা তখন শাসক দলের দুর্দম ছাত্রনেতা । ডায়মন্ডহারবার লোকসভায় দাঁড়িয়েছেন জে এম বোস। জ্যোর্তিময় বসু গতবার লোকসভায় প্রধান কমলা রানিকে ভয়ানক বিব্রত করেছেন। খুব দুর্মুখ ছিলেন। কোনো ভয় ভীতি বা লোভ তাঁকে টলাতে পারেনি। এবার তাঁকে হারাতে হবে। সেদিন কলেজ ক্যান্টিনে বসে আছি। এখনো স্পষ্ট মনে আছে। অমল কমল বিমল এবং ইন্দ্রজিত এসে হাজির।

 
হেদায়েত ! তুই এখানে বসে আছিস ?
কেন ?
তোকে খুঁজচি।
কী দরকার ?
যেতে হবে ।
কোথায় ?
জানিস নে– আজকে ভোট।
তাতে কী ?
যেতে হবে, অমল বলে।
কোথায় ?
ওই বানচোতটাকে হারাতে হবে, কমল বলে।

 
আমি চুপ করে আছি দেখে তারা অধৈর্য হয়। আমার হাত ধরে টেনে তোলে। বিমল বলে, কাজলদার অর্ডার। আমার পিঠে থাপ্পড় মারে ইন্দ্রজিত। লম্বা কৃষ্ণাঙ্গ চেহারা, আমাদের সঙ্গে হোস্টেলে থাকে। কাজলদাদের সঙ্গে ঘোরে। রগচটা আর মারকুটে বলে কুখ্যাতি আছে ওর।
 
সত্তর দশকের কথা। তখন নকশাল আগুন নিভে গেছে। সবাই কলেজ হোস্টেলে থাকি। ভুইঞার হুকুম অমান্য করার ক্ষমতা তখন নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজের কারো নেই । আমি তো কোন ছার !  ইন্দ্রজিতের হাত থেকে রেহাই পাব না ।
 
তখন পুলিশের বড়ো গাড়ি । কালো রঙের যমদূতে চড়ে আমরা দখিনে সাগরের দিকে রওনা দিলাম ।
 
মনে আছে, গাড়ি ছাড়ার পর ইন্দ্রজিত গম্ভীর কণ্ঠে বলেছিল, আমাদের যাত্রা শুভ হোক !
 
তারপর—?  আমার কথাগুলো মন দিয়ে শুনে প্রশ্ন করেন করুণা ।
 
ওই যে, আসলে কেউ জেতে না । জেতে কাল, সময় । যখন ক্রান্তির সময় হয় তখন শাসক কালের লেখা পড়তে পারে না।
আমাদের এই নীল দোপাটি কি তেমন নয় ? সে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে মানুষের মনে দীপ জ্বালবে ? অজান্তে আমার মুখে হাসির রেখা ফুটে ওঠে ।
 
সেদিকে তাকিয়ে করুণা বলেন, হাসলেন যে বড়ো !
 
আসলে কি জানেন, বড়ো বড়ো কথা, ভারি বচন প্রজারা শুনতে চায় না। তারা চায় রাজার ঔদ্ধত্বের লাগাম । তারা নিশ্চিন্তে শ্বাস ফেলবার ভরসা চায় ।
 
আমরা সে কাজ করতেই তো এসেছি।
 
কয়েকদিন পর, স্বরূপ মিত্তির এসে হাজির।
 
ডাক্তারদা ! আমার মা ভালো আচে।
 
আমি তাকে একমাস বাদে মায়ের খবরাখবর দিতে বলেছিলাম ।
 
বললাম, ঠিক আচে ! ওষুধগুলো তাহলে কন্টিনিউ করো !
 
মাথা নাড়িয়ে, সে চলে যেতে যেতে থমকে দাঁড়ায়। খবর শুনেছেন কিছু ?
 
কোন খবর ?
 
ওরা সুধাংশুবাবুর বাগান লুট করেচে।
 
কারা ?
 
ওই তো যারা বিজয় মিছিল করেছে, তারা।
 
হয়তো উচ্ছ্বাস, আমি সতর্ক গলায় বলি ।
 
আম জাম কাঁঠাল গাছ কেটে তছনছ করেচে জানেন, স্বরূপ বিমর্ষভাবে বেরিয়ে গেল ।
 
মন খারাপ হয়ে গেল ।
 

ত্রিশ চৌত্রিশ বছরের এক জগদ্দল পাথর নড়াতে আমার সায় ছিল না, তা নয় । মুখে যাই বলি না কেন । মানুষ মানুষকে শৃঙ্খল পরাতে পারে না । কোনো নীতি বা আদর্শের নামে বোকা মানুষের গলায় বকলেস পরানো কি বুমেরাং না ?

 
ক-দিন বাদে বান্টি হাজির, স্যার !
 
কীরে ! আজকাল তো তোর টিকিটুকুও দেখা যায় না…
 
একটা দরকারে এসেচি স্যার।
 
তাছাড়া আসবি কেন ? তা দরকারটা কী শুনি ?
 
আপনি দিলেই হবে।
 
কী দিতে হবে ?
 
একটা সার্টিফিকেট দিতি হবে । বিশ্বানাথপুর হাসপাতালে লোক নেবে । করুণাদির সঙ্গে কথা হয়েচে ।
 
তার চোখে মুখে উজ্জ্বল ছবি । যেন নতুন যুগের স্বপ্ন । বলি, ঠিক আচে— দোব ! তবে তার আগে একটা কথা জিজ্ঞেস করি ?
বুজেচি।
 
কী ?
 
আপনি সব সময় আগাপাশতলা উল্টেপাল্টে দেখেন ।
 
তাহলে আমার কথার জবাব দে । তোদের ওই কাজটা ঠিক হয়েছে ?
 
কোন কাজ ? সে থতমত খায় ।
 
সুধাংশুবাবু তো নিপাট ভালোমানুষ ।
 
সে একটু ইতস্তত করে, উনি ভালো হলে কী হবে ? ওনার বড়ো ছেলে তো রেশন ডিলার স্বপন বসুর মুহুরির কাজ করে । আর সেখানে কী কাজ হয় আপনি তো জানেন ।
 
শুধু সেজন্যে কী ? আমার কেমন সন্দেহ হয় । স্বপনবাবু তো ইদানীং ওদের সঙ্গে ঘুরছে । আমি একটু কড়া গলায় বলি, আসল কথাটা কী ?
 
ধমক খেয়ে একটু চমকে যায় । কাঁচুমাঁচু খেয়ে বলে, ওনার বড়োছেলে মহীতোষ আমাদের হবু প্রধান জয়নাল বিশ্বাসের নামে যা তা বলেচে । সে নাকি বোরো ধানের মাঠে পাম্পসেট চুরি করত ।
 
তাতে তো ওদের হার আটকায়নি । তাহলে এমনটা করার কি খুব দরকার ছিল ?
 
আপনি ওসব বুজবেন না । খামোখা একজনের নামে এসব কথা বলবে কেন ? তার গলায় চাপা হিংস্র ক্রোধ ফুটে ওঠে।
তথ্যের সত্যি মিথ্যে যাচাই করা বেশ দায়। বরং মনে মনে তর্কের কূট কাচালি করি। এ কথা যদি সত্যি হয়, মানে মহীতোষ যদি সত্যিই চোর হয়, তবে তাকে প্রধান করা ঠিক হবে না। আর যদি মিথ্যেও হয়, তাহলেও প্রতিবাদ এমন হবে ? সাক্ষী সাবুদ নিয়ে তাকে বিচারের মুখোমুখি ফেলা যেত। তাকে সতর্ক করা যেত। হিংসা দিয়ে কোনো বিজয় হাসিল হয় না। এরকম হিমেল স্রোত বইয়ে দেওয়া শিরদাঁড়ায় ? এখানে তো সত্যি প্রতিষ্ঠা করার চেয়ে বলের হুংকার বেশি । আমি বুঝলুম, ক্ষমতা সময়ের তাল কেটে দিচ্ছে। সে ছেলেমানুষ। তাকে আর কী বলব? সার্টিফিকেট নিয়ে চলে যায় ।
 
দিন পনেরো বাদে বান্টি আর করুণা পাল এসে হাজির। দু-জনের পরনে কেতাদুরস্ত পোশাক । হাতে মিষ্টির প্যাকেট ।
কী ব্যাপার ?
 
কাহার সাহেব বললেন, হয়তো সৌজন্যর কারণেই…।
 
কিসের সৌজন্য ? একটু ভয়ে ভয়েই থাকি।
 
ডাক্তারবাবু ! আপনার একটা কাজ করে দিলাম।
 
আমার কাজ! বিস্ময়ে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিই।
 
বুঝলেন না ? বান্টির চাকরিটা করে দিলাম ! করুণা পালের গলায় আত্মপ্রত্যয় না অহংকার ঠিক বুঝতে পারিনে।
 
বান্টি একটু সলাজ গলায় বলে, স্যার ! আমরা সেজন্যি আসিনি।
 
তবে ?
 
মিষ্টির প্যাকেটটা হাতে দিয়ে বলে, করুণাদি প্রধানের উপদেষ্টা হয়েচেন।
 
বাঃ! বেশ খবর! অজান্তে আমার গলায় সম্ভ্রম জেগে ওঠে।
 
আমরা তাহলে যাই । এখনো অনেক জায়গায় যেতে হবে। কথায় যেন বিনয়ের আভাস।
 
তারা চলে যেতে পা বাড়িয়েছে, আমি বলি, দাঁড়া তো বান্টি !
 
কেন স্যার? অবাক হয়ে পেছন ফেরে।
 
তোদের গা দিয়ে কীসের গন্ধ বেরোচ্চে ?
 
সে হো হো করে হেসে ওঠে। আপনি ঠিক টের পেয়েচেন।
 
টের না পাওয়ার কী আছে ?
 
গঙ্গাজল আর গোলাপপানির গন্ধ।
 
সে কী রে ? কেন ?
 
আপনি জানতে চাইচেন ? বলব ? সে করুণার দিকে তাকায়।
 
সে তোর মর্জি। তিনি বলেন।
 
পঞ্চায়েতঘর ধুয়ে দিয়েচি। অনেকদিনের পাপ তো! তারা হাসতে হাসতে নাচতে নাচতে চলে যায়।
 
পনেরো বছর পার হয়ে গেছে। চারিদিকে নীল দোপাটির অমোঘ ছায়া। করুণা পাল এখন দামি গাড়ি চড়েন। তাঁর নির্দেশ ছাড়া পঞ্চায়েতের কোনো কাজ হয় না। বান্টি হাসপাতালের বড়ো বড়ো ডাক্তারের সঙ্গে ঘোরাফেরা করে । হয়তো কেউ কেউ ভাববেন, এসব আমার অচেতন মনের ঈর্ষা । তা আমি অস্বীকার করিনে। তবে এটাই সব না ।
 

চারিদিকে আঁধার ঘনিয়ে এসেছে। একটা কাল সৃষ্টির সঙ্গে তার ধ্বংসের বীজ উড়ে বেড়াচ্ছে । বোকাসোকা মানুষ যারা তারা আরেক ক্রান্তিকালের অপেক্ষায় রয়েছে কি ?

 
একদিন বান্টি এল । ঘরখানা আগাপাছতলা জরিপ করে সে বলল, স্যার ! সবার উন্নতি হল। আপনার চেম্বারটা ঠিক আগের মতই রয়ে গেল। একটা সাইনবোর্ড পজন্ত নেই।
 
গরিব ঠেঙিয়ে কত আর আয়!
 
চাইলে পঞ্চায়েত থেকে ব্যবস্থা হতে পারে।
 
তাই কি আবার হয়?
 
পঞ্চায়েত তো আমাদের হাতের মুঠোয়।
 
ঠিক আছে। ভেবে দেখি।
 
মনের ভেতর অনেক কথা জট পাকিয়ে যায়। দ্বিধা-দ্বন্দ্বে মন ভাগ হয়ে যায় দু দিকে। একটা দিক বলে, সবাই তো সুযোগের সদ্ব্যবহার করছে। আমি কি ধোয়া তুলসি পাতা? কখনো কি কাউকে ঠকায় নি ? অত বাচবিচার করে চলার সময় এটা নয়। চেম্বারটা একটু সাজিয়ে গুছিয়ে নিলে ক্ষতি কি ? আরেকটা ভাগ নীতি-আদর্শে আরষ্ট হয়ে থাকে।
 
দিন তিনেক বাদেই করুণা পালকে নিয়ে বান্টি এল।
 
স্যার! আমরা খোলাখুলি কথা বলতে চাই।
 
আমার তাতে আর আপত্তি থাকতে পারে না । সপ্রতিভভাবে বলি, মন্দ কি ?
 
আপনাকে সব রকম সাহায্য করব । করুণা বলেন ।
 
একটু ইতস্তত করি । আমার স্বভাব অন্যরকম । সে জন্যই জীবনে দাঁড়াতে পারিনি । অন্যের কাছে হাত পেতে সাহায্য নিতে কুণ্ঠাবোধ হয়। বলি, এখন ঠিক বলতে পারছি না। ভেবে বলব।
 
আমাদের হাতে সময় নেই।
 
এখনই বলতে হবে ?
 
সেজন্যে তো এসেছি । করুণা বলেন ।
 
আমি তাহলে কৃতজ্ঞ থাকব ? গলা নিস্তেজ হয়ে আসে।
 
তা আপনাকে বলতে হবে কেন ? সলাজ গলা যেন করুণার, আমরা আপনার উন্নতি চাই।
 
কৃতজ্ঞতা—অকৃতজ্ঞতা—নাগপাশ—মুক্তি— অনেক চিন্তা আমাকে ঘিরে ধরে। জীবনের চলার ছন্দে বদল ঘটবে। সে কি আমার কাম্য? সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হচ্ছে। বান্টি অধৈর্য হয়ে বলে, কী ভাবছেন?
 
কী ভাবব? কী বলব? অতীত বর্তমান ভবিষ্যত সব এগিয়ে আসে। আমি জড়ানো গলায় বলি, তোমরা টের পাচ্ছ?
 
কী ?
 
সেই গন্ধটা—?
 
কোন গন্ধ?— করুণা পাল।
 
কোন গন্ধ স্যার?— বান্টি।
 
সেই যে— সেই যে— আমি অনাগত দূরের দিকে তাকিয়ে থাকি।
 
আমরা তো কিছু পাচ্ছি না। তারা বলে।
 
শেষে করুণা পাল অধৈর্য্য হয়ে বলেন, অত ভেবে কী হবে ডাক্তারবাবু ?
 
কেন ? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি।
 
আমরা আছি। থাকব। তার গলায় আঁধারের সংকেত।
 
আমি কী বলব ! আমার আর কী বলার আছে ? আমার আর কী উন্নতি চাই ? চারপাশ তখন ভেসে যাচ্ছে— গোলাপ পানির গন্ধে! ভেসে যাচ্ছে গঙ্গার জলে।
 
ঘড়ায় কলকল শব্দ। ভেসে যায় গঙ্গা । মনোনয়ন পত্রের ছেঁড়াছিঁড়ি । বিনা যুদ্ধে রণ বিজয় । উল্লাস রাজপথে । কিন্তু আবার সেই গন্ধ। কলকল শব্দ। ভেসে যাই আমি, ভেসে যায় সময় এবং করুণা পাল।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!