- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- মার্চ ১২, ২০২৩
এক খিলি পান
নতুন বউয়ের মুখে আঙুর-কিসমিস দেয় আর তৈমুদ্দি এক খিলি পান দিয়েছিল জাহেদাকে ! চোখে দুষ্টুমির হাসি খেলিয়ে বলেছিল, ‘চিবোও, আমার নিজের হাতে গড়া, এমন স্বাদের পান জীবনে কখনও খাওনি
অলঙ্করণ: দেব সরকার
এক খিলি পান মুখে পুরে বকবক করেই যাচ্ছে তৈমুদ্দি। পানের সাথে কথাও চিবোচ্ছে ! মাঝেমধ্যে ঘাড় নিচু করে পিক ফেলার পাত্রটায় ‘পিক’ ফেলছে। পানের বোঁটায় লাগানো চুন থেকে মাঝেমধ্যে একটুখানি চুন জিভের ডগায় ঠেকাচ্ছে আর বকবক করে যাচ্ছে। কচমচ শব্দে এমন মজা করে পানের ভেতরের সুপুরি চিবোচ্ছে যেন দুনিয়ার সবচেয়ে মজার খাবারটা সে খাচ্ছে! লোকের দেখলেই লোভ লাগবে। দুনিয়ার সব কথা যেন তৈমুদ্দির এই মুখে ভরা থাকে! বললে বলে, বকাই তো আমার ব্যবসা। দশটা-পাঁচটা লোক আসবে বসবে গপ্পো করবে তবেই তো আমার পানকটা বিক্রি হবে, নাকি? শুধু কি বকা, লোকের গিল্লাও কম করে না তৈমুদ্দি। আর তার খদ্দেরগুলোও তাই, এক পেট কেচ্ছা নিয়ে বসে তৈমুদ্দির চটে ! সপ্তায় দু-দিন। এই দু-দিনে সাত দিনের ইহকাল-পরকাল গেহে যায়। পান বেচা তৈমুদ্দির তিন পিড়ির কারবার। তার বাপ ছালেমুদ্দি পানওয়ালাও এই জায়গাতে পান বিক্রি করত। পানওয়ালা তৈমুদ্দি কথা গাহাতে বাপের শতগুণ বাড়া। সপ্তাহে দুই হাট করে তৈমুদ্দি। হপ্তায় দুদিন এই ধরমপুরের হাট আর দুদিন শ্রীপুরের হাট। দুই হাটই ছোট ভৈরবের পাড়ে বসে। নদী বরাবর হেঁটে গেলে ঘণ্টাখানেকের পথ। তৈমুদ্দি হেঁটে না গেলেও হাটুরেরা হেঁটে যায়। তৈমুদ্দির একটা সাইকেল আছে। দুনিয়ায় তিনটে জিনিস তার বাপত্তির সম্পত্তি; ভিটে, পানের কারবার আর এই সাইকেলটা। বাপ মরে কবেই মাটি হয়ে গেছে কিন্তু এই সম্পত্তিগুলো এখনও থেকে গেছে। শ্বশুরের দেওয়া সম্পত্তি একটা, সেটা হল তার দুই বেটা আর এক বিটির মা জাহেদা। যেমন দুবলাপাতলা তেমন হিড্ডি। হাড়-মাংসের দেহে শাড়ি পরানো থাকে না শুকনো খড়ির গায়ে শাড়ি পরানো থাকে তা ঠাহর করা যায় না ! তবুও গা ডুবিয়ে ভালোবাসে তৈমুদ্দি। সোহাগ ঢেলে বলে, হাটের পান আর বাড়ির বউখান, এই নিয়েই তো আমার ইহকাল। আয়েশ করে পান জাহেদাও খায়। তার পানের বাটা খালি হলে হয়, সেদিন পানের টানে তার ইহকাল উঠে যাওয়ার উপক্রম হয়! নেশাটা তৈমুদ্দিই ধরিয়েছে। সে কি আজকের কথা? বাসর রাতে সব মরদে নতুন বউয়ের মুখে আঙুর-কিসমিস দেয় আর তৈমুদ্দি এক খিলি পান দিয়েছিল জাহেদাকে ! চোখে দুষ্টুমির হাসি খেলিয়ে বলেছিল, ‘চিবোও, আমার নিজের হাতে গড়া, এমন স্বাদের পান জীবনে কখনও খাওনি।‘ ঠোঁটের মাঝে একবার ফিক করে হেসেছিল জাহেদা। তারপর তৈমুদ্দির হাত থেকে টুক করে পানটা তুলে মুখে পুরে যখন ঘোমটার আড়াল দিয়ে সম্মুখে তাকিয়েছিল জাহেদা তখন তার কাজলপারা সুরমাটানা ফালি চোখগুলো থ হয়ে গেছিল! চেরি রঙের ঠোঁটগুলোও অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। তৈমুদ্দির হাতে একটা আস্ত নতুন পানের বাটা! জাহেদা অমন করে পানের বাটাটাকে দেখলে তৈমুদ্দি একগাল হাসি বের করে বলেছিল, ‘নতুন বউকে নাকি সোনা উপহার না দিয়ে ছুঁতে নেই? গোনাহ হয়। এই নাও আমার সোনা।‘ বলে পানের বাটাটা জাহেদার হাতে তুলে দিয়েছিল তৈমুদ্দি। জাহেদা সেই যে পানের বাটাটাকে আপন করে নিলো তো নিলোই। এখন এক বেলার জন্য বাইরে কোথাও গেলেও আঁচলে পান বেঁধে নিয়ে যায়! আর রাতের বেলায় আহারের পর যখন দুই মেয়ে-মরদে পা ছড়িয়ে আয়েশ করে পান চিবোয় তখন মনে হয় তাদের চেয়ে দুনিয়ায় আর কোনও সুখী মানুষ নেই !
নদীর যেদিকটায় আধখানা আসমান ঢেকে পাকুরগাছটা দাঁড়িয়ে আছে সেদিকটায় পানের হাট। পায়কাররা নদীর আরও পাড় লেগে বসে। আর তৈমুদ্দির মতো খুচরো পান বিক্রেতারা কিছুটা সম্মুখে বসে। তৈমুদ্দি পায়কারদের কাছ থেকে পান কিনে খুচরোয় বিক্রি করে। মাঝেমধ্যে ত্রিমোহিনির পানের বরজ থেকে কিম্বা ত্রিমোহিনির পানের হাট থেকে পায়কারি দরে পান কিনে আনে তৈমুদ্দি। ত্রিমোহিনি দূরের পথ। শরীর এলে যায়। হ্যাপা বেশি। তবুও দুটো বেশি পয়সা লাভের জন্য ত্রিমোহিনি যায় তৈমুদ্দি। তবে বেশিরভাগ সময় হাটেই পান কিনে হাটেই বিক্রি করে। বিয়েসাদিতেও পান বানানোর বরাত পায় তৈমুদ্দি। তার বানানো পান খেয়ে বিয়ে বাড়ির মানুষ বাহ বাহ করে। তৈমুদ্দি যে শুধু একজন পানওয়ালা তাই নয়, সে যে একজন পানখোর তা তার দাঁত-ঠোঁট আর গায়ের জামাকাপড় দেখেই বোঝা যায়। কি বুকে কি পেটে জামার সব জায়গাতে পানের পিকের দাগ! যখন দাঁত বের করে খিলখিল করে হাসে তখন দাঁতের চুন-জর্দার ছোপছোপ দাগগুলোও খিলখিল করে। লাল-কালো রঙ। ছিদল ছিদল ছাপ। শুধু ঝাঁকাটাতেই পান থাকে না তৈমুদ্দির, তার গা-গতরেও পান থাকে! পানওয়ালা তৈমুদ্দিকে এ কথা বললে সে তার সেই পান-জর্দা খাওয়া লাল-কালো দাঁতগুলো বের করে খিখি করে হাসে। মজ্জেমের মুখ থেকে ‘শরীলখানায় তো ছেলিমানুষি ভালোই ধরি রেখিচ’ কথাটা শুনে সেই লাল-কালো দাঁতগুলোই খিলখিল করে উঠল তৈমুদ্দি। গোল মুখ। সে মুখের ওপরে মোটা নাক। কুতকুতে চোখ। যেন দুই কোটরে দুটো অড়হরের বীজ বসানো আছে! দাড়িগুলো কেবলই ফিনফিনে হয়ে উঠছে। বছরটা ঘুরলেই ধানের শিকড় হয়ে ঝুলবে। মজ্জেমের এত করে বলাতেই দাড়ি রেখেছে তৈমুদ্দি। দাড়ি হল আল্লাহর নবির সুন্নত। সেটা কাটলে হয়? আর কাটবে না মনস্থির করেছে তৈমুদ্দি। শেষ কামান দিয়েছে গেল হপ্তায়। এখন হদ্দিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখে দাড়িগুলো কত বড় হল। মাঝেমধ্যে মাথায় গোল টুপিও পরে থাকে তৈমুদ্দি। সেও তো আল্লাহর নবির সুন্নত। এসবই মজ্জেমের অবদান। মজ্জেম তার গাঁয়ের মানুষ। নদীর ওপারেই সে গাঁ শঙ্করপুর। বিঘে খানেক জমি আছে মজ্জেমের। সে জমিতে কখনও বেগুন কখনও ঢেঁড়স কখনও করলা আবাদ করে সে। সেসব বিক্রি করার জন্য হাটে আনে। বিক্রি হয়ে গেলেই পানওয়ালা তৈমুদ্দির কাছে এসে বসে। দেশ-দুনিয়ার গল্প করে। লোকের কেচ্ছা গাহায়। আর বলে, হাদিস-কোরআনের কথা। শরীয়তী-মারফতি, হানাফি-ফরাজি, আহেলে হাদিস, পির-বাউল কত কি থাকে সেসব গল্পে! এসব শোনে, গাহায় আর আড়চোখে পার্বতীর দিকে তাকায় তৈমুদ্দি। চাঁইপাড়ার পার্বতী তৈমুদ্দির সামনের চটেই সবজি বিক্রি করে। শিবু খোঁড়ার বউ পার্বতী। শঙ্করপুরের ঘাটে বালি খালি করতে গিয়ে সেই যে ট্রাক দুর্ঘটনায় একটা পা চলে গেল শিবুর আর ফিরে পেল না। তারপর বাড়িতেই অথর্বের মতো বসে থাকে শিবু। শুধু তার খুঁটল চোখ দিয়ে ঘুলঘুল করে চারপাশ দেখে। স্বামীটা অথর্ব অ-খেটনে হয়ে পড়ায় সংসারের ভাত-রুটির দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে পার্বতীকে। পার্বতী পায়কারদের কাছ থেকে সবজি কিনে হাটে বসে। পরনের কাপড়টাকে কোমরের সাথে এঁটে বাঁধে। ক্লিপ এঁটে খোঁপা করে বেঁধে রাখে চুল। যাতে খদ্দেরদের কাছে সবজির সাথে মাথার চুল না চলে যায়। আঁচলখানা এঁটে বাঁধে বলে দুই সন্তানের মা পার্বতীর বুকটা ফুলে থাকে। তারপর যখন আলু মুলো পটল ঝিঙে করলা নানান আনাজ টানতে ছাপড়ায় তখন সে শ্যামলা বুকটা কিছুটা আলগা হয়ে বেরিয়ে আসে। বুকের সে এঁটেল রঙ চুকচুক করে। তৈমুদ্দি চুরি করে সে দিকে তাকায়। জৈনুদ্দির ডিহি আর ছালামের পগারের মাঝে যে একটা ফালি খাত আছে সেরকম একখানা খাত পার্বতীর বুকে দেখতে পায় তৈমুদ্দি। ছুকছুক করে দেখে। পার্বতী সেটা বুঝতে পারে। গায়ে মাখে না। পরনের কাপড়খানা দিয়ে সে আলগা হয়ে যাওয়া বুকটাকে ঢাকেও না। বরং সে ফিক করে হাসে। এ হাসির রহস্য কেউ বুঝুক না বুঝুক তৈমুদ্দি বোঝে। যখন হাট জমে না, একটা দুটো খদ্দের কেবলই আসতে শুরু করে, তখন তৈমুদ্দি পার্বতীর সাথে জমিয়ে গল্প করে। সে গল্প করা দেখে পাশের পানওয়ালা ফরিদ মিঞা ফুট কাটে, ‘দেখিস, ভুল করে পানে চুন না ঢলে চুনে পান ঢলে ফেলিস।‘ তৈমুদ্দি তখন তার দাঁতগুলো বের করে বলে, ‘চুনের সঙ্গে পানের পিরিত, তুমি কী বুঝবে, চাচা? এক গোহালেই তো জীবন ফুরিয়ে দিলে।‘ ফরিদ তখন খ্যাঁক করে ওঠে। যেন সুপারিতে নয়, কথাতে যাঁতির চাপ দেয়, বলে, ‘থাম, পান থেকে চুন খসুক, তখন দেখবি মজা।‘ ফরিদ কথার হেঁয়ালিতে তৈমুদ্দিকে অন্য কিছুর ইঙ্গিত করে। সে ইঙ্গিত বুঝতে অসুবিধা হয় না তৈমুদ্দির। ফরিদ চাচা মাঝেমধ্যেই পার্বতীকে নিয়ে তৈমুদ্দিকে ঠেস মারে। রাগায়। ঠাট্টা করে। তৈমুদ্দির নাকি নজর খারাপ। সে নজরের ইমান নেই। ফরিদ চাচা সে নজর দেওয়া নিয়েও ঠাট্টা করে তৈমুদ্দিকে, বলে, ‘চোখে ইমান টান, তৈমুদ্দি, নাহলে তোর ওই নেক-নজর তোর পরকালের কাল হবে। আখেরাতের পরীক্ষায় পাশ করতে পারবি নে।‘ তৈমুদ্দি তখন তার সামনের দাঁতের পাটির সমস্ত দাঁতগুলো কেলিয়ে বলে, ‘তোমার কাঁধে চেপে বসব। তুমি পালাবে কোথায়? তোমাকে একা বেহেশতে যেতে দেব ভাবছ?’ তারপর রসিকতা করে তৈমুদ্দি বলে, ‘আমরা বেহেশতে না গেলে বেহেশতবাসীদের জন্য ওখানে পান বেচবে কে? নবি-রসূলরা থোড়ায় পান বেচবেন? পান সেই আমাদেরকেই বেচতে হবে।’ ফরিদ মিঞা তখন চোখ কটমট করে তৈমুদ্দির দিকে তাকায়। যেন পারলে তার সেই ঘোলা চোখ দিয়ে দোজখের আগুনকে দেখায়। আর তৈমুদ্দি খিখি করে হাসে।
আজ পার্বতী মাড় না ভাঙা নতুন শাড়ি পরে এসেছে। সে শাড়ি আবার কুচি করে বাঁধা। বেগুনি পাড় গোলাপি রঙের সে শাড়ি পরে পার্বতীকে খুব মানান লাগছে। মনে হচ্ছে, নতুন বউ। ব্লাউজের রঙও গোলাপি। তৈমুদ্দি তার চোখের মণিগুলোতে দুষ্টুমির হাসি মাখিয়ে বলল, “কী গ, আজ যে অ্যাকিবারে গুলাপি হয়ী এসচ ! কী ব্যাপার।”
“দেখি, কাহুর চোখে লাগি কি না।“ বলেই ঠোঁটে একটা লাজুক হাসি হাসল পার্বতী। খুচরো খদ্দেররা তখনও সেভাবে ভিড় করে আসতে শুরু করেনি হাটে। তখনও মাল খালাসের জায়গা থেকে পায়কারদের হাঁক-ডাক শোনা যাচ্ছে। ফড়েরাও হাঁকাহাঁকি করছে। কিছু হাটুরে ঘাড়ে-মাথায় আনাজের বস্তা নিয়ে ঢুকছে। কেউ আনাজপাতি সাজাচ্ছে। কেউ বস্তা-ডালি-ঝুড়ি থেকে মাল নামাচ্ছে চটে। আড়ত থেকে তখনও ঢুকছে আলুর গাড়ি। বেলা আর কত? সূর্যটা সবেমাত্র এক পড়ন শেষ করে দুই পড়নে গড়া দিতে শুরু করেছে। হাটের মধ্যে যে ঝাঁকড়া পাকুর গাছটা আছে তার পুব দিকের মগ ডালে, যে ডালটা আবার জামে মসজিদের গগনচুম্বি মিনার ছুঁয়ে আছে, সে ডালটার ঠিক মাথায় সুদেব কংসবণিকের কাঁসা গলানো ছাঁচের আগুনে জ্বলজ্বল করতে থাকা কাঁসার থালার মতো জ্বলছে সূর্যটা ! আর গাছটার ছায়া গুঁড়ি ছাড়িয়ে পশ্চিমে চিৎ হয়ে শুইয়ে আছে। এই বেলাকে তৈমুদ্দি বলে, ‘এক বিহেনের বেলা’। পার্বতীর কুঁচি করে শাড়ি পরাটা ফরিদ চাচাও আড় চোখে দেখল। তৈমুদ্দি পানে জলের ছিটা দিচ্ছে আর পার্বতীকে দেখছে। আর তখনই হেলতে দুলতে হাতে একটা নাইলনের ব্যাগ নিয়ে মজ্জেম হাজির। মজ্জেমকে দেখে তৈমুদ্দি বলল, “কী গ, আজ এত বিহেন বেলায় ?”
“কডা পটল তুলিছিনু। দর ভালো পানু না। ছস্তায় বেচি দিনু।“
“আজ হাটে সবজির ক্যামুন দাম?” ঝাঁকা থেকে একটা পানের বান্ডিল নামাতে নামাতে জিজ্ঞেস করল তৈমুদ্দি। মজ্জেম মুখ ভার করে বলল, “ছস্তার তিন দশা। কপি তো গড়ি বেড়াচ্চে! ল্যাওয়ারই লোক নাই। বেগুনও তাই। লুসকানে বেচতে হচ্চে। আবার পিঁয়াজ আগুন! পঞ্চাশ টাকা কেজি!”
পগারের মাঝে যে একটা ফালি খাত আছে সেরকম একখানা খাত পার্বতীর বুকে দেখতে পায় তৈমুদ্দি। ছুকছুক করে দেখে। পার্বতী সেটা বুঝতে পারে। পরনের কাপড়খানা দিয়ে সে আলগা হয়ে যাওয়া বুকটাকে ঢাকেও না। বরং সে ফিক করে হাসে।
“এটাই তো আড়তদারদের কেরামতি। চাষিধের কাছ থেকি ছস্তায় কিনি হিমঘরে ভরি থুয়ি অ্যাখুন চওড়া দামে বিক্রি করছে। খালে খা আর না খালে শুকি থাক।“ আড়তদারদের কথা উঠতেই মজ্জেম বলল, “তা আর বুলচ, ই বচ্ছর ভাগের জমিটায় ভালোই পিঁয়াজ হয়ী ছিল। কিন্তুক, যেই ভুঁই থেকি পিঁয়াজ উঠল অমনি হপ করি দাম পড়ি গেল! বেচার গাহাকই পালাম না সেরকম। দশ বস্তার পিয়াজের মধ্যে দু বস্তা মুতন পচি গেল। বাকি পিঁয়াজগুলেন লিয়ি ঘর উঠেন টানাহ্যাচড়া হল খুব। তাতে আরও বস্তাখানেক লষ্ট হয়ী গেল। শেষমেশ পানির দরে, পনের টাকা পাল্লা করে এক গাহাককে বেচি দিনু।”
“আর সেই পিঁয়াজ এখন পঞ্চাশ টাকা কেজি ! চাষিধের লেগি কেহু না গ। না সরকার না কুনু পার্টি।“ মুখটা ভারি হয়ে উঠল তৈমুদ্দির। মজ্জেম বলল, “আড়তদারদের সাথে সরকারের লাইন আছে। তানাহলে পারে, তিন টাকায় কিনা পিঁয়াজ পঞ্চাশ টাকায় বিক্কিরি করতে? সব শালো, চাষিকে চুষতে চায়। একবারও ভাবে না, চাষি আবাদ করা বন্ধ করি দিলে কী মাহাল খাবে?” রাগে গজগজ করে উঠল মজ্জেম। এক মুখ দাড়ির মুখটা পিতল রঙের হয়ে উঠল। খুঁটল চোখগুলো হয়ে উঠল লাল। মজ্জেম সরকারের ওপর রেগে উঠল। সরকারকে গালমন্দও করল, “শালোর সরকারডাও তাই, সার বিষের দাম হরদম বেড়ে যাচ্চে কিচ্চু করছে না! ফসলের যা লুসকান হচ্চে, চাষি বিষ পুকাকে না খাইয়ে লিজে খাতে বাধ্য হবে।“ এই সুযোগটারই অপেক্ষায় থাকে তৈমুদ্দি। মজ্জেম সরকারের ওপর রাগলেই তৈমুদ্দি তাকে খচায়। আজও মজ্জেমকে খোঁচাল তৈমুদ্দি, “তুমি কুন হরিদাস পাল হে যে সরকার তুমার হিত দেখবে? তুমি কি টাটা-বিড়লা না আম্বানি ?”
“দ্যাশটা তো অধেরই হয়ী গেলচে গ। চাষি মল্লো কি বাঁচল কেহু খোঁজ লেয় না।”
“ইবের থেকি চাষি নাকি আর লিজের ইচ্চে মুতন আবাদ কত্তে পারবে না। দ্যাশে কী একটা আইন আসচে!”
“আইন! কীসের আইন? জমি কি কাহুর বাপের?”
“কাহুর বাপের না হোক, সরকারের বাপের তো?”
“হেঁয়ালি না মেরি আসল কথাডা খুলি বুলো।“
“ওই আইনডা এলে পড়ে, শিল্পপতিরা জমির মালিক হয়ী যাবে। তারা য্যামুন বুলবে ত্যামুন আবাদ কত্তে হবে। তারপর সে উৎপন্ন ফসল আর হাটে বিক্রি হবে না। দ্যাশ থেকি হাট উঠি যাবে।”
“হাট উঠি যাবে !” মজ্জেমের চোখগুলো ভ্রূতে আটকে গেল। তৈমুদ্দি বলতে থাকল, “হাট থাকবে তবে এরকম হাটের মুতন লয়। উ হাটে এসি থাকবে। চলন্ত সিঁড়ি থাকবে। মানুষ উঠানো-নামানোর ঘর থাকবে। আনাজপাতি গুলেন সব ঝা চকচকে কাঁচের মধ্যে রাখা থাকবে। উ হাটকে বুলে মল। ত্যাখুন সবাই ‘হাট কত্তে যাচ্চি’ বুলবে না বুলবে ‘ছপিং কত্তে যাচ্চি’।”
“বাব্বা! তুমি এত কিচু কৈত্থেকে জানলে তৈমুদ্দি?” চোখ ফেড়ে তৈমুদ্দির দিকে তাকাল মজ্জেম। তার মুখটা তখন শুকিয়ে এক খামচা হয়ে গেছে।
“সেদিন হাটেই শুন্নু, কুনু একটা পার্টির নেতারা মাইকে বুলছিল।”
“উসব করা অতই কি সুজা? আন্দোলন হবে। গায়ে জান থাইকতে অ কত্তে দিব না।“ দাঁত এঁটে উঠল মজ্জেমের। তৈমুদ্দি ঠেস মারল, “ওই লাঙল যার জমি তার, ওই আন্দোলন নাকি, মজ্জেমভাই?”
“হ্যাঁ, ওরকমই, তবে ছোলোগানডা হবে একটুখানি আলাদা, জমি যার আবাদ তার।”
“বাব্বা, লতুন করি আবার নাস্তিক দলডায় নাম লিখালা নাকি?”
“মানুষের প্যাটে যখুন কেহু লাথি মারে ত্যাখুন মানুষকে কুনু দলটলে নাম লিখাতে হয় না। এমনি এমনি কাস্তে হাতে কুদাল হাতে রাস্তায় নেমি পড়ে।“
“এই লাও, আগে পানডা মুখে দ্যাও। তারপরে উসব গাহাও।” তৈমুদ্দি হাতে গড়া একটা পান মজ্জেমের হাতে দিল। হাটে এলেই এই পানটা মজ্জেমের পাওনা। এই পানটা না খেলে তার জানে শান্তি আসে না। খুইখুই করে। পানটা নিয়েই মুখে পুরে দিল মজ্জেম। এক খিলি পানে তার গাল ভরে গেল। তারপর যখন একটুকরো সুপারি আর পানের বোঁটায় করে চুন নিয়ে মুখে দিল মজ্জেম তখন বেহেশত থেকে এক ডালি সুখ নেমে এল মজ্জেমের চোখে-মুখে। তৈমুদ্দিকে ‘মল হাট’এর প্রসঙ্গ টেনে মশকরা করল, “উসব এছির হাটে তুমার হাতে বানানে এই পানডা পালেই হবে। আর কিচ্চু লাগবে না।”
“আমি বসলে পরে তো? আমাকে থোড়াই বসতে দিবে। আমি কুন হরিদাস পাল যে আমার মুতন মুখ্যুসুখ্যু আবোড় মানুষকে মলের দুকানদার বানাবে?” কথাটা বলেই ছাপুর চোখে পার্বতীর দিকে তাকাল তৈমুদ্দি। পার্বতী তখন পালংশাকগুলোর ওপর জলের ছিটা দিচ্ছে। আঙুলের ডগা দিয়ে কয়েক ফোটা জল তৈমুদ্দির গা লক্ষ্য করে ছুড়েই ফিক করে একবার হাসল।
দু ♦ ই
সন্ধ্যা যখন ত্রিপলের ছাউনির ভেতর ঘুচুরমুচুর করতে শুরু করল তৈমুদ্দি তখন চট গোটাতে লাগল। ফরিদ মিঞা সন্ধ্যা নামার আগেই পসরা গুটিয়ে নিয়েছে। হাটের মসজিদ থেকে মাগরিবের নামাজ পড়ে এসে তার গোটানো পানের বোঝাটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। খদ্দেরও কমতে শুরু করেছে। হাঁকডাক নেই বললেই চলে। দূরের মাঠ থেকে ভেসে আসছে শেয়ালের হুক্কাহুয়া। তৈমুদ্দির বিক্রি না হওয়া পান-সুপারি-চুন গোটানো শেষ হলে দাঁড়িয়ে থাকে পার্বতীর জন্য। আজ পার্বতীর আনাজপাতি বেশি পড়ে নেই। হুরিয়ে বিক্রি হয়ে গেছে। তা দেখে তৈমুদ্দি ঠাট্টা করল, “কী গ লতুন গোলাপি শাড়ির কামাল নাকি? আজ দেখচি, কানা-পুকড়ে-পচা-ধসা সব বিক্কিরি হয়ী গেচে!”
“পরের হাট থেকি তুমিও গোলাপি জামা পরি আসো। গাহাক লিতে পারবা না।“ পাল্টা মশকরা করল পার্বতী। তারপর আবারও সেই ফিক করা মিস্টি হাসিটা হাসল। এই হাসিটা তৈমুদ্দির ভেতরটাকে কেমন একটা নাড়া দেয়। তৈমুদ্দিও ছায়াছবির হিরো হয়ে ওঠে। শরীর থেকে এক ঝটকায় ঝরে পড়ে আধখানা বয়স। মনের ভেতরে একটা আইবুড়ো বয়সের দুষ্টুমিও সুড়সুড়ি দেয়। তখন পার্বতী যে পরের বউ তা ভুলে যায় তৈমুদ্দি। পার্বতীর এঁটেল মাটির মতো নিরমেদ চামটা পেটটা তাকে টানে। এত দোয়া-কালাম পড়েও চোখদুটোকে দমিয়ে রাখতে পারে না তৈমুদ্দি, ছুপছুপ করে চলে যায় পার্বতীর শরীরখানার দিকে। মনে হয়, বেওয়ারিশ শরীরটাকে একবার আদর করি। ছুঁই।
মালপত্তর গোটানো শেষ হলে বোঝাটা মাথায় তুলল পার্বতী। তৈমুদ্দিও তার অবিক্রিত পানের বোঝাটা মাথায় তুলেছে। তারপর দুজনে যখন নদীর ধারের রাস্তায় এল তখন সন্ধ্যা ঘুটঘুটে হয়ে নদীর পাড়ে ঝুপ মেরে বসছে। আজ আকাশে পার্বতীর কপালে দেওয়া আধখানা টিপের মতো চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোতে নদীর পাড়ের আঁকাবাঁকা মাটির রাস্তা জ্বলজ্বল করছে। মনে হচ্ছে, একটা আঁকাবাঁকা সিঁথি নদীর পাড় বরাবর চলে গেছে সোজা দক্ষিণে। রাস্তার পাড়ের দিকে ভাঁট-ঢোলকলমি-পিটুলির বুন। আর রাস্তার ঢালের দিকে খাড়া হয়ে নেমে গেছে নদী। রাস্তাটা যেখানে দক্ষিণে কদমগাছটার কাছে বেঁকে নিচে নেমে গেছে সেখান থেকেই পার্বতীদের গাঁ শুরু। চাঁইপাড়া। এক গেরাম চাঁইদের বাস। আর নদীর ওপারে তৈমুদ্দিদের গ্রাম শঙ্করপুর। সরকারদের ডিহির কাছে যেখানে রাস্তাটা কিছুটা নিচে নেমে আবার উপরে উঠেছে সেখানে ঢোলকলমির ঝোপটার আড়ালে আসতেই খপ করে তৈমুদ্দির হাত ধরল পার্বতী। মায়াবী চোখে মাতলামো চাহনি। এ চাহনি দেখে তৈমুদ্দির ভেতরটাও ধড়াক করে উঠল। পার্বতী যেন সে ধড়াক শব্দ শুনতে পেল। ফিসফিস করে বলল, “কী গোলাপিকে ছুঁতে মুন চাহাচ্চে না?” তৈমুদ্দি মুখে কিছু বলল না। কামুক চোখ দিয়ে দেখতে লাগল, কীভাবে চাঁদের আলোতে ভিজে পার্বতী নদীর পাড়ের রাজকন্যে হয়ে উঠছে! নদীটাকে যেমন শুইয়ে থাকা অপরূপা এক নারি মনে হচ্ছে পার্বতীকেও সেরকম এক নদী মনে হচ্ছে। ফারাক শুধু ঢেউয়ে। নদীতে সেরকম জল নেই। ঢেউও নেই। কিন্তু পার্বতীর শরীরের থৈথৈ জল! সে জল উছাল মারছে অনবরত। সে উছালের শব্দ দুনিয়ার কেউ শুনতে পাক না পাক তৈমুদ্দি শুনতে পাচ্ছে। এ তো শুধু উছাল নয়, ডাক। যৌবনের ডাক। তৈমুদ্দি ফিসফিস করে বলল, “চলো, নদীর নিচে নামি।“ বলেই মাথার বোঝাটা পাড়ের একটা ঝোপের কাছে রাখল। হাত দিয়ে ধরে পার্বতীর বোঝাটাও নামিয়ে দিল। তারপর পার্বতীর একটা হাত ধরে নদীর নিচে দিকে নামতে লাগল। চাঁদের আলোও তখন পাড় বেয়ে নামছে নদীর নিচে। সে আধক্ষোয়া চাঁদের আলোতে পার্বতীর পরনের গোলাপি শাড়িটা ঝিলমিল করছে। পার্বতীর চোখে-মুখেও তখন সে ঝিলমিলে রঙ। কচুরিপানার ঝোপের পাশের হাঁটুজলের কাছে এসে দাঁড়াল দুজনে। চাঁদটা তখন নদীর সে হাঁটুজলের নিচে খিলখিল করছে। তৈমুদ্দি জলের নিচের সে চাঁদকে দেখে বলল, “জানো পার্বতী, তোমার ভেতরেও এরকম একখানা চাঁদ আছে। আমি সে চাঁদখানা দেখতে পাই।“
“এবার ছুঁয়ে দেখো। কাছেই তো আছে?” মিস্টি হাসি হাসল পার্বতী। তৈমুদ্দি তখন তার পান খাওয়া গালে একটা দুষ্টু টোল ফেলে বলল, “আজ হাট থেকি এই চাঁদখানাই তো বুকে করি বাড়ি লিয়ি যাব।“ পার্বতী এবার ঠোঁট টিপে হাসল। তখন তৈমুদ্দি আচমকা নদীর জলে নেমে পড়ল। হাট ধরে টানল পার্বতীকেও। রাতের অন্ধকারে দুজন মেয়ে-মরদ নদীর জলে থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। তৈমুদ্দি ছাপড়াল। নদীর জলের তলা থেকে এক মুঠো কাদা তুলে, সে কাদার কিছুটা পার্বতীর গালে মাখাল। আর বলল, “মাটির শরীরখানায় আরও কিছুডা মাটি মাখিয়ে লিই। তবেই শরীরখানা নদী হয়ী উঠবে।“ পার্বতী তখন ফিসফিস করে বলল, “এই পানওয়ালা, তার আগে এক খিলি পান তো দ্যাও?”
♦♦♦♦♦♦—♦♦♦♦♦♦—♦♦♦♦♦♦
❤ Support Us








