- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- নভেম্বর ১০, ২০২৪
ফুরুরাণী
অলঙ্করণ: দেব সরকার
বহুদিন এমন বর্ষণ হয়নি। ফুরুরাণীর মনটার মতোই বহু বছর যাবৎ পুকুর-পুস্কুরণী, খাল-বিল শুকিয়ে খট খট করছিল। নদ-নদীতে জল থাকলেও তা ছিল খুবই সামান্য। একেবারেই স্রোত বইত না। তবে ভূগর্ভ থেকে তোলা জলে মাঠে অল্পস্বল্প ধান ফলত। আর ভাত খাওয়ার জন্যে বরফ-ঢাকা মাছ আসত সমুদ্র থেকে। যাদের সামর্থ ছিল, সেই মাছ কিনে খেত। বাকিরা তাকিয়ে দেখত। বড়জোর জোরে শ্বাস টেনে টেনে গন্ধ শুঁকত। রোজ কেয়ামত যে আসন্ন, সবাই তা নিজের নিজের শ্বাসপ্রশ্বাসেই টের পাচ্ছিল। ঠিক এরকম পরিস্থিতির মধ্যে সবাইকে অবাক করে জ্যৈষ্ঠের শেষ সপ্তাহে বঙ্গোপসাগরে জোড়া ঘূর্ণাবর্তের ধাক্কায় আকাশের দখল নিল প্রাক বর্ষার মেঘ। ‘সুবহানাল্লাহ্’ বলে জুম্মাবারে মসজিদে মোনাজাতে বসে আল্লার কাছে শুক্রিয়া আদায় করল তার উম্মতেরা। কেউ কেউ খুশিতে মসজিদে মসজিদে সিন্নি বিতরণ করল পর্যন্ত। আল্লা যে রাহমান ও রাহিম এবং এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর এই মাখলুকাতে তিনি ছাড়া আর যে কেউ মামুদ নেই, তাঁকে ছাড়া কারও কোনও গতি নেই, তা আরও একবার হাড়ে হাড়ে মালুম পেল সবাই।
কিন্তু এ কী ! আষাঢ় পেরিয়ে শ্রাবণ গেল গেল ! ভাদ্রও প্রায় দোরগোড়ায় ! অথচ একটা দিনের জন্যে কী, এক বেলার জন্যেও সেই মেঘ আকাশের দখল ছাড়ছে না। ইচ্ছে মতো বর্ষণের পর বর্ষণ করে যাচ্ছে। কখনও মুষলধারে তো কখনও বা টিপ টিপ। দীর্ঘ এক যুগ যখন বৃষ্টির অভাবে পুকুর-পুস্কুরণী, খাল-বিল, নদ-নদী বুজে যাওয়ার জোগাড় তখন এমন বর্ষণ মানুষের জীবনে আল্লার রহমত হয়ে নয়, বরং নূহনবীর আমলের মহাপ্লাবন হয়ে দেখা দিল। চারদিকে জল আর জল- অথই জল! জল ছাড়া আর কোথাও কিছু নেই। মাঠ-ঘাট সাদা হয়ে গিয়েছে। গ্রামের পর গ্রাম সব জলের তলায়। যেসব গ্রামের অবস্থান উঁচু ডিহিতে, সেগুলিও প্রায় ডুবু ডুবু। মানুষ নাচার হয়ে যখন জান মাল নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বাঁধপুল কিংবা কোনও উঁচু জায়গায় উঠে গিয়েছে বা যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে বাহান্নবিঘার ফুরুরাণী নিজেকে বাঁচানোর বদলে তার নিজের ডিহিতে বসে ঘরের ভেতর পুরনো প্যাটরা খুলে তন্ন তন্ন করে কিছু খুঁজছে। এরকম এক বর্ষণমুখর বর্ষার রাতে যেটা সে হাতে পেয়েছিল বাখরপুরের গোবিন্দ ভকতের কাছ থেকে। যার দৌলতে ‘ফুরু’ নামের সামান্য এক ছাগলচরানি-মেয়ে থেকে তার পরিচয় হয়েছিল ‘বাহান্নবিঘার ফুরুরাণী’ নামে।
ফুরুরাণীর নাম যে একসময় ফুরু খাতুন ছিল, সেকথা তার নিজেরই মনে ছিল না এতদিন। এই বর্ষণ যেন সেটা তাকে ইয়াদ করিয়ে দিচ্ছে। নাড়ুখাকির চরের গ্রামে আর পাঁচটা মেয়ের মতো সে কীভাবে বেড়ে উঠেছিল ! চরের মাঠে ছাগল চরিয়ে। অড়হরের জমির বুক থেকে চাপাতি ঘাস উপড়িয়ে। কলাইয়ের খেতের আলের ঘাস কেটে। বর্ষায় যখন পদ্মানদীর প্লাবন ধেয়ে আসত তাদের চরের গ্রামগুলিতে, সেই প্লাবনের জলে সাঁতার কেটে কিংবা মাছ ধরে। সবকিছু পষ্ট মনে পড়ছে তার। তারপর সাধারণ নিয়মেই একদিন পাড়াপড়শি কোনও ছেলের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কথা, বিয়ে অবশ্য হয়েওছিল, পাশের গ্রামে। আর পাঁচটা মেয়ের মতো সংসারী হয়ে তার জীবনটাও কেটে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নশীবের ফের ! বিয়ে হলেও শেষপর্যন্ত সংসারী হতে পারেনি। পরিবর্তে চরের গ্রামের সামান্য এক ছাগলচরানি মেয়ে থেকে রাজরাণী হয়েছিল। এই বাহান্নবিঘার মালকিন হয়েছিল। এই বর্ষণে সেই কথাটাই খুব করে মনে পড়ছে তার। বিশেষ করে তার নামে এই বাহান্নবিঘার দলিলখানা, যেটা বহুদিন যাবৎ খুব যত্ন সহকারে তার সংরক্ষণে ছিল, সেটাকেই সে খুঁজছে এখন। কিন্তু পাচ্ছে না। ওদিকে বর্ষণের জল লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে তার ডিহিতে। গতরে তাকত থাকলে এতক্ষণ হয়ত প্যাটরাটাকে মাথায় করে আর সবার মতো সেও নিরাপদ আশ্রয়ে উঠে যেতে পারত। কিন্তু এখন তার বয়স হয়েছে। গতরে আর আগের সেই তাকত নেই যে মাথায় ওরকম ভারি প্যাটরা তুলবে। তার ওপর আজকাল চোখে কিছুই পষ্ট দেখতে পায় না । সবকিছু কেমন ঝাপসা ঝাপসা লাগে। অগত্যা সে নিজের ঘরে বসে ভাঙা প্যাটরাটাকে ওলোটপালট করছে। তন্ন তন্ন করে হাতড়াচ্ছে। কিন্তু দলিলখানা পাচ্ছে কই ? গোল করে বেঁধে লাল ত্যানায় জড়িয়ে রেখেছিল ! বাড়িতে বাড়িতে লাল ত্যানায় জড়ানো থাকে পবিত্র কোরআন ! কোরআন হারায় না । বান-বন্যা, ঝড়-তুফানেও কোরআনের কিছু হয় না। আগুনে পুড়ে না। এমন কী ইঁদুরেও কাটে না। খোদার কালাম বলে কথা ! বান-বন্যা, ঝড়-তুফান, আগুন, এমন কী ইঁদুরও সেকথা জানে। তাই কোরআন যেমনকার তেমনি থাকে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে। তাদের বাড়িতেও একখানা ছিল। ঘরের ভেতর বড় কুঠিটার ওপর রাখা থাকত। যাতে কারও নাপাক হাত সেটাকে স্পর্শ করতে না পারে ! শ্বশুরবাড়িতেও একখানা দেখেছিল শাশুড়ির ঘরে আলমারির সবচেয়ে ওপরের থাক-এ। তাহলে তার অমন যত্নে প্যাটরায় রাখা গোবিন্দ ভকতের দেওয়া ওই দামি কাগজের টুকরোখানা কোথায় কী ভাবে হারিয়ে যায় ?
বর্ষণের জলে নিজের ডুবে যাওয়ার ভয় নয়, দলিলখানা হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা ভেতরে ভেতরে ফুরুরাণীকে অস্থির করে তুলেছে।প্যাটরার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে এটা ওটা সেটার ছোঁয়া পাচ্ছে তার হাত। সেগুলি বের করে সে তার ঝাপসা চোখে দেখছে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। কিন্তু সেসব জিনিসের কোনটাই যে তার এই বয়সে কোনও কাজের নয় তা সে বুঝতে পারছে। তাই যেখানকার জিনিস আবার সেখানেই রেখে দিচ্ছে। এই করতে করতে বঁড়শির টোপ আছে না খসে গিয়েছে দেখতে গিয়ে মাছুড়ের ছিপে যেমন চিংড়ি উঠে আসে, ঠিক সেভাবেই হঠাৎ একসময় তার হাতেও উঠে এল একজোড়া পেতলের কানপাশা ! হ্যাঁ, কানপাশা। ঝাপসা চোখেও সে এবারে পষ্ট দেখতে পেল। তবে পেতলের কানপাশাজোড়াকে নয়, সে আসলে দেখতে পেল নাশুকে। সাদাতুল্লা মোড়লের বাড়ির রাখাল নাশু। তার প্রেমিক নাশু। তার জান নাশু। একসময় যার সঙ্গে সে পদ্মার চরে ছাগল চরাতে যেত। একসঙ্গে সঙ্গে বাঘবকরি খেলত। কী জানি কেন, নাশুকে তার খুব ভাল লাগত। নাশুও যে তাকে ভালবাসত খুব ! তার ছাগলের জন্যে ঘাস কেটে দিত কলাইয়ের খেতের আল থেকে। চাপাতি ঘাস উপড়ে আনত অড়হরের জমি থেকে। কাঁটা ভর্তি বুনো কুল গাছ-বাবলা গাছে চড়ে কচি কচি পাতা কেটে দিত, বাবলার ফল পেড়ে দিত। চাপাতি ঘাস আর বাবলা ফল খাওয়ালে নাকি দাইড় ছাগলের ওলহানে প্রচুর দুধ জমে। নাশু তাকে এসব কথাও বলত।
কানপাশাজোড়া হাতে পেয়ে প্যাটরা খুলে কী খুঁজছিল, সেটাই ভুলে গেল ফুরু। পরিবর্তে তার চোখে ভেসে উঠল ধূ ধূ চরের মাঠ। তার মধ্যে কোথাও কলাইয়ের খেত। কোথাও অড়হরের জমি। কোথাও বা কাশের জঙ্গল। কোথাও আবার শুধুই সবুজ ঘাসের জঙ্গল- রমণা। আর এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাবলা গাছ।
ফুরুর মনে পড়ে ওই সবুজ ঘাসের জঙ্গল- রমণায় নাশু তাকে একদিন নিয়ে গিয়েছিল। আর এই কানপাশাজোড়া উপহার দিয়ে তাকে আদর করেছিল। মুখে বলেছিল, হামি যে তোকে খুব ভালোবাসি রে ফুরু ! তোকে ছাড়া হামি জানে বাঁচব না। তুই হলি হামার অন্তরের জান। হামার প্রাণ।
তারপর আরও অনেকবার নাশু তাকে ওই রমণায় নিয়ে গিয়েছে। আরও অনেক অনেক কথা বলেছে। মনের কথা। জানের কথা। প্রাণের কথা। সঙ্গে এটা ওটা সেটা উপহার দিয়েছে। রমণার সবুজ ঘাসের বিছানায় শুইয়ে আদর করেছে। গ্রামের আহাদভায়ের মুদির দোকান থেকে চানাচুর, লবেঞ্চুশ কিনে নিয়ে গিয়ে খাইয়েছে। একবার তো, কী কাজে গেরস্থ সাদাতুল্লা মোড়লের সঙ্গে পদ্মা পেরিয়ে তেঘরি বাজারে গিয়েছিল। সেখান থেকে লুকিয়ে জিলাপি কিনে এনে খাইয়েছিল। জিলাপি কী জিনিস, তখন সেটাই জানত না সে। আগে কখনও চোখে দেখেনি। তাই নাশুকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘এটো আবার কী জিনিস জী ? পাক দিন দিন পাক দিন দিন পুঙ্গায় পুঙ্গায় রস !’ শুনে খুব হেসেছিল নাশু। হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘এটোকে জিল্পি বুলে রে খেপি। একরকমের মিষ্টি। খেয়ে দ্যাখ, খুব ভালো খেতে।’ নাশুর কথা শুনে সে জিলাপি খেয়েছিল। খেতে সত্যিই খুব ভাল। সঙ্গে তার জন্যে আর একটা জিনিস কিনে এনেছিল নাশু। মেয়েদের পরণের ইল্যাস্স্টিকের ফিতেওয়ালা গেঞ্জির মতো কী একটা ! টকটকে লাল রঙের। সেটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে সে আবার জিজ্ঞেস করেছিল, ‘এটো আবার কুন জিনিস জী ?’ নাশু বলেছিল, ‘জানিস না ! এটোকে বডিস বুলে। এটো পিঁধলে বিটিছেল্যার বুক আটোসাটো হুই থাকে। উথলে উঠে না, উপচেও পড়ে না। বুক দেখতেও খুব সুন্দর লাগে।’
সবুজ ঘাসের জঙ্গলে নীল আকাশের নীচে রঙহীন বাতাসে ভাসছে তার উদোম শরীর। যে শরীর আগলে আছে নাশু- তার জান ! আকাশ এবং বাতাস কী বুঝেছিল কে জানে, ওরা সেই লাল রঙের বডিসটাকে নিয়ে লোফালুফি খেলেছিল। আর সে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল নাশুর বাহুতে। নাশুর সঙ্গে নিজেও মাখামাখি হয়েছিল আদর,ভালবাসায়
কী সুন্দর খাপের মধ্যে ভরা ছিল জিনিসটা ! মেয়েছেলের পরনের জন্যেও যে এমন গেঞ্জি হয়, খাপের ওপরের ফোটোটা না দেখলে সে বিশ্বাস করত না। ওই ফোটোতে খুব সুন্দরী একটি মেয়ে ওই রকম বডিস পরেছিল। নাশু তাকে সেটা দেখিয়ে বলেছিল, ‘তুইও পিঁধ। তা হইলে তোর বুকও অমুন আটোসাটো হুই থাকবে। তোকেও দেখতে অমুন সুন্দর লাগবে।’
কিন্তু ফাঁকা মাঠের মধ্যে পরনের ফ্রক খুলে সেটা পরবে কী করে ? নাশুকে জিজ্ঞেস করেছিল সে, ‘কী করে পিঁধবো জী, এই ফাঁকা মাঠের ভিতর ? সব দেখ্যা লিবে জী ! হামার শরম লাগবে না খো ?’
নাশু বলেছিল, ‘ঘাসের জঙ্গলের আঁহোতে চলে যা ! কেহু কিছু দেখতে পাবে না।’
সেই তো ! সবুজ ঘাসের জঙ্গল- রমণার কথা তার খেয়ালে ছিল না। নাশুকে সে তখন বলেছিল, ‘হামার ছাগল ক’টা দেখি রাখিও তা হইলে। হামি আসছি।’ বলেই বডিস হাতে করে ছুটেছিল ঘাসের জঙ্গল- রমণায়। তারপর পরনের ফ্রক খুলে একেবারে উদোম শরীরে ওই বডিস কী করে পরতে হয় বুঝতে না পেরে হা করে দাঁড়িয়ে ছিল।
কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল কে জানে ! নাশু পেছন থেকে কাঠবিড়ালীর মতো এসে তার চোখের সামনে একটা আয়না ধরেছিল। আর ওই আয়নায় সে নিজেকে ভাসতে দেখেছিল। সবুজ ঘাসের জঙ্গলে নীল আকাশের নীচে রঙহীন বাতাসে ভাসছে তার উদোম শরীর। যে শরীর আগলে আছে নাশু- তার জান ! আকাশ এবং বাতাস কী বুঝেছিল কে জানে, ওরা সেই লাল রঙের বডিসটাকে নিয়ে লোফালুফি খেলেছিল। আর সে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল নাশুর বাহুতে। নাশুর সঙ্গে নিজেও মাখামাখি হয়েছিল আদর,ভালবাসায়। তারপর নাশু তাকে নিয়ে আর কী কী করেছিল, সে মনে করতে পারে না।
তার দৃষ্টি আবার ঝাপসা হয়ে আসে। সে তখন ওই আয়নাটাকে খোঁজে। পেতলের কানপাশাজোড়া আছে যখন, ওই আয়নাটাও এই প্যাটরায় থাকবে নিশ্চয়। নাশু তাকে শুধু পেতলের কানপাশা কিংবা বডিস দেয়নি, আয়নাটাও দিয়েছিল। তার মনে পড়ে ওই তিনটে জিনিস সে এক জায়াগায় করে পুঁটলি করে বেঁধে রেখেছিল। না, তিনটে নয়, নাশুর দেওয়া টুকিটাকি আরও কত জিনিস একটা লাল ত্যানায় বেঁধে পুঁটলি করে রেখেছিল।
প্যাটরা হাতড়াতে হাতড়াতে হঠাৎ তার ডান হাতের কড়ে আঙুলে খ্যাঁচ করে কীসে খোঁচা লাগে। মাছ যেভাবে টোপ গিলতে গিয়ে বঁড়শির খাঁচে খ্যাঁচ করে কানকষায় খোঁচা খায়, অনেকটা সেরকম খোঁচা। যদিও কোনও কোনও মাছের বঁড়শিতে আটকে থাকার মতো প্যাটরায় তার হাত আটকে থাকে না। একটু ব্যথা লাগলেও সে তার হাত আস্তে করে টেনে বের করে। কড়ে আঙুলের ডগায় এক ফোঁটা রক্তবিন্দু দেখতে পায়। না, সে ভয় পায় না। কীসে খোঁচা লাগল জানতে খুব সাবধানে আবার প্যাটরায় হাত ভরে খুব সাবধানে জিনিসটাকে বের করে আনে। আর দেখে নাশুর দেওয়া সেই আয়নাটাকে। তার ঝাপসা চোখ নিমেষেই ভাল হয়ে যায়। এবারে সে সবকিছু পষ্ট দেখতে পায়। আকাশে ঘনঘোর বর্ষার মেঘ। যেমন বৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মেঘের গর্জন। বাজ পড়ছে কড়কড় কড়াৎ শব্দে। যেন টুকরো টুকরো হয়ে আসমান ভেঙে ভেঙে পড়ছে জমিনে।
অথচ নাশুর কোনও ভয়ডর নেই। সে মনের আনন্দে গেরস্থ সাদাতুল্লা মোড়লের মোষজোড়াকে চরাতে নিয়ে বেরিয়েছে। একটা মোষের পিঠে নিজে বসে আছে শাহাজাদার মতো। অন্য মোষটার গলার দড়ি নিজের হাতে ধরে রেখেছে। মোষ দু’টি আপন মনে চরে বেড়াচ্ছে সবুজ ঘাসের জঙ্গল- রমণায়। আর সে মোষের পিঠের দুলুনিতে মনের আনন্দে গান ধরেছে :
“ ও সোনার ময়না পাখি
কোন দেশেতে গেলা উইড়া
দিয়া মোরে ফাঁকি
আমার সোনার ময়না পাখি।
সোনা বরণ পাখিরে আমার কাজল বরণ আঁখি
দিবানিশি মন চায়রে বাইন্ধা তরে রাখি
আমার সোনার ময়না পাখি।
দেহ দিছি প্রাণ রে দিছি
আর কিছু নাই বাকি
শত ফুলের বাসন দিয়া
অঙ্গে দিছি মাখি
আমার সোনার ময়না পাখি।
যাইবা যদি নিঠুর পাখি ভাসাইয়া মোর আঁখি
এ জীবন যাবার কালে রে ও পাখি রে
একবার যেন দেখি রে
আমার সোনার ময়না পাখি… ”
আয়নায় ফুরু সবকিছু পষ্ট দেখছে। শুধু দেখছে না, সেই গান কানে শুনতে পাচ্ছে পর্যন্ত। আর তার মনে হচ্ছে, পারলে যেন এক্ষুনি সে-ও সবুজ ঘাসের জঙ্গল- রমণায় ছুটে গিয়ে ওই মোষের পিঠে চড়ে তার জানের গলা জড়িয়ে সেই গান ধরে :
“দেহ দিছি প্রাণ রে দিছি
আর কিছু নাই বাকি
শত ফুলের বাসন দিয়া
অঙ্গে দিছি মাখি
আমার সোনার ময়না পাখি … ”
যদিও সেটা সে করতে পারে না। একে তুমুল বর্ষণ, তার ওপর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সঙ্গে আবার কড়কড় কড়াৎ শব্দে বাজ পড়ছে। তাছাড়া সে একটা মেয়ে! বেরোতে চাইলেও এই দুর্যোগে বাড়ির কেউ তাকে বাইরে বেরোতে দেবে না। গোহিলে ছাগলগুলো যেমন ব্যাঁ ব্যাঁ করছে তাকেও ঘরে বসে তেমনি ব্যাঁ ব্যাঁ করতে হবে। কিন্তু সে ছাগল নয়। তাহলে সে বেনাহাক ঘরে বসে ব্যাঁ ব্যাঁ করবে কেন ? একথা ভাবতে ভাবতে নাশুর দেওয়া আয়নাটাকে নিজের চোখের সামনে ধরে থাকে সে। আজকাল লোকে যেমন মগ্ন হয়ে টিভি দেখে, সে-ও ওই আয়নায় মগ্ন হয়ে পড়ে। খোদার কী করিশ্মা, প্রেমিক নাশুকে দেখতে পায় সে ! শুধু নাশুকে দেখতে পায় না, নাশুর কত কী দেখতে পায় ! এত দেখে তাও যেন তার জান ভরে না। এর মধ্যেই হঠাৎ সে দেখতে পায় ভয়ঙ্কর সেই দৃশ্য- আশমান চিরে এক খন্ড আগুনকে ছিটকে আসতে। তার চোখ ঝলসে যায়। তারপর আর চোখে কিছুই সুঝে না। তবে কানে আশমান ভেঙে পড়ার শব্দ ভেসে আসে। কড়কড় কড়াৎ! তার কান ঝালাফালা হয়ে যায়। তখন আর কানেও কিছু শুনতে পায় না। নিমেষে কী যে ঘটে যায় তার কিছুই বোধগম্য হয় না। তারপর অনেকক্ষণ পর একটু ধাতস্থ হলে চোখ কচলে সে যখন আবার সেই আয়নায় চোখ রাখে, দেখে, আয়নাটার খন্ড খন্ড রূপ। আর সেই খন্ড খন্ড আয়নায় ভেসে ওঠে রমনায় সবুজ ঘাসের বিছানায় সাদাতুল্লা মোড়লের দু’টি মোষের সঙ্গে তার জান নাশুর চিৎপাত হয়ে পড়ে থাকার দৃশ্য। পাশের একটা চারা খেজুর গাছে দাউ দাউ আগুন জ্বলছে তখন।
♦•♦♦•♦ ♦•♦♦•♦
❤ Support Us








