Advertisement
  • গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
  • ডিসেম্বর ১৪, ২০২৫

সৈনিক সত্যেন

নিতাই ভট্টাচার্য
সৈনিক সত্যেন

অলঙ্করণ : দেব সরকার

 
” জয় হিন্দ ! ”
 
দেশপ্রিয়বাবুর দেশপ্রেমসিক্ত বক্তৃতা শুনে ভীষন উত্তেজিত হয়ে ওঠেন নিরঞ্জনবাবু। দেশপ্রেম জেগে ওঠে মনে। বার কয়েক বলে ওঠেন “জয় হিন্দ”।
 
” …ভাবুন তো আমাদের দেশের বীর সৈনিকদের কথা ! কত কষ্ট স্বীকার করে আমাদের দেশকে রক্ষা করছে। আমরাও যদি নিজেদের কর্তব্যটুকুও পালন করি দেশের অভ্যন্তরীণ প্রবলেম গুলো…”
 
একটানা অনেকক্ষণ বলেছেন দেশপ্রিয়বাবু। তার উপর এই গরম ! গলাটা শুকিয়ে গেছে। বেশ খানিকটা জল গলায় ঢেলে আবার বলা শুরু করবেন । আর ঠিক সেই সময় স্টাফরুমে হাজির ক্লাস এইটের সত্যেন। শক্তপোক্ত চেহারা, উজ্জ্বল দুটি চোখ, শ্যামলা মুখে পরিচিত হাসি। ” স্যার আমাদের ক্লাসে কোনো স্যার যায়নি। অনেকেই যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলছে। বারণ করলেও শুনছে না।”
 
স্টাফরুমের হওয়াও গরম। যুদ্ধ চলছে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে, সেই নিয়েই গুরুগম্ভীর আলোচনা। বক্তা দেশপ্রিয়বাবু, উপস্থিত জনা চারেক শিক্ষক শিক্ষিকার সামনে একটানা বলে চলেছেন। শ্রোতাদের তরফ থেকেও বক্তব্য আসছে মাঝে মধ্যে। এই মুহূর্তে শত্রুদেশের কোনো এক বন্দরের শোচনীয় অবস্থার বর্ণনা চলছে। শত্রু দেশের বিপর্যয়। চওড়া হাসি দেশপ্রিয়বাবুর মুখে। যেন সেই মাত্র নিজেই শত্রু সংহার করে ফিরলেন। নিরঞ্জনবাবু উত্তেজনায় আবার বলেন ‘ জয় হিন্দ, ভারত মাতা কি জয় !’ নীলিমা ম্যাডাম জয় হিন্দ বলে দেশপ্রিয়বাবুর উদ্দেশ্যে স্যালুট জানালেন, যেনো দেশপ্রিয়বাবু-ই বীর জওয়ানদের প্রতিনিধি। দেশভক্তির ঝড় উঠেছে স্টাফ রুমে আর সেই সময় হাজির সত্যেন। উপস্থিত সকলেই মনে মনে বিরক্ত হয়েছেন সত্যেনকে দেখে।
 
সত্যেনের কথা স্টাফরুমের পাখার হওয়ায় ঘুরপাক খেয়ে মিলিয়ে যায় বাতাসে। শিক্ষক শিক্ষিকারা সত্যেনকে আবারও এক ঝলক দেখে নিয়ে দেশপ্রিয়বাবুর মনোগ্রাহী বর্ণনায় মনোযোগী হয়ে ওঠেন। স্টাফরুমের মাঝের টেবিলে খোলা রয়েছে প্রভিশনাল রুটিনের খাতা। একবার নজর ফেললেই জানা যায় কাকে কোন ক্লাসে যেতে হবে। সেই কাজে মন নেই কারো। যার ক্লাস তিনিই দেখে নেবেন সময়ে, সেই ভরসাটুকু আছে সবার প্রতি সবার !
 

কয়দিন ধরে নতুন খেলার আমদানি হয়েছে স্কুলে ! যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা ! কাগজের প্লেন দু-তলার বারান্দা থেকে হওয়ায় ভাসিয়ে দিয়ে ছেলেরা বলছে সে গুলো নাকি ড্রোন, বোমা পড়বে এইবার। রাবার ব্যান্ডে ছোটো ঢিল আটকে এক অপরের দিকে ছুঁড়ে মারছে, সেটাই নাকি গুলি। খোলা পেন নয়তো স্কেল বা ছোটো লাঠি নিয়েও শুরু হয় লড়াই, সেটাই সব ক্লাসের ছেলেদের প্রিয় খেলা। যেনো উন্মুক্ত তলোয়ার হাতে উন্মত্ত যোদ্ধা !

 
” স্যার, আমাদের ক্লাসে কোনো স্যার…।” কথাটা আবারও স্যার ম্যাডামদের সামনে ভাসিয়ে দেয় সত্যেন। এইবার গলার স্বর আগের বারের চেয়ে কয়েক ধাপ উপরে। ঘাড় ঘোরান দেশপ্রিয়বাবু। সত্যেনকে একবার দেখে নিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, ” কি চাই এখানে ?”
 
” ক্লাসে এখনো কোনো স্যার যায়নি। সবাই পেন নিয়ে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলছে।” উদ্বিগ্ন সত্যনের উত্তর।
 
” সবাই বদমাইশি করছে আর তুমি চুপ ছিলে ?” নিরঞ্জনবাবু গলা চড়িয়ে বলেন।
 
থতমত খেয়ে চুপ করে যায় সত্যেন। এমন কথা যে শুনতে হতে পারে ভাবেনি !
 
বন্ধুদের যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলাকে বড্ড ভয়ে পায় সত্যেন। পেনের খোঁচায় কোনদিন না বিপদ হয় ! সেই ভাবনা থেকেই দৌড়ে আসা।
কয়দিন ধরে নতুন খেলার আমদানি হয়েছে স্কুলে ! যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা ! কাগজের প্লেন দু-তলার বারান্দা থেকে হওয়ায় ভাসিয়ে দিয়ে ছেলেরা বলছে সে গুলো নাকি ড্রোন, বোমা পড়বে এইবার। রাবার ব্যান্ডে ছোটো ঢিল আটকে এক অপরের দিকে ছুঁড়ে মারছে, সেটাই নাকি গুলি। খোলা পেন নয়তো স্কেল বা ছোটো লাঠি নিয়েও শুরু হয় লড়াই, সেটাই সব ক্লাসের ছেলেদের প্রিয় খেলা। যেনো উন্মুক্ত তলোয়ার হাতে উন্মত্ত যোদ্ধা ! একে অপরের সামনে পেন, স্কেল বা লাঠি ঘুরিয়ে অন্যকে আঘাত করার চেষ্টা, নিছক-ই মজার ছলে। আর এই বিষয়টাকেই ভীষন ভয় পায় সত্যেন। আবার কখন বিপদ হয় ! গতকালই ড্রোন ধরতে গিয়ে ফাইবের একটা বাচ্চা মুখ ঠুকে মাটিতে পড়ে দাঁত ভেঙেছে । এইবার পেনের খোঁচা লেগে না বিপদ বাঁধে। দিন কয়েক আগে বাঁশের কঞ্চি নিয়ে খেলতে গিয়ে চোখে আঘাত পেয়েছে শুকদেব, সত্যেনের পাড়ার ছেলে । ডাক্তার বলেছে আঘাত বড়ো বিপদজ্জনক, হয়তো এক চোখ নিয়েই বাঁচতে হবে শুকদেবকে। শুকদেবের কথা স্কুলে এসে বন্ধুদের শুনিয়েছে সত্যেন, যাতে সাবধান হয় সকলে। কোথায় কি !
 

নিজেকে সৈনিক ভাবে সত্যেন ! স্কুলের ভিতরের যুদ্ধটা থামানো প্রয়োজন ! একটা কর্তব্য বোধ জেগে ওঠে। নিজেকে নিজে মনে মনে বলে ” সৈনিক সত্যেন !” মুখের সেই নরম হাসিটা ফিরে আসে আবার। একটা দমকা আনন্দ বয়ে চলে ভিতরে ভিতরে। ফিরে যেতে চায় নিজের ক্লাসে

 
স্কুলের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক সুবীরবাবু প্রেয়ারের সময় নিষেধ করেছেন, ” এই খেলা বন্ধ করো তোমরা। কিভাবে বিপদ আসবে কল্পনা করতে পারবে না। তাই…।” স্টাফ রুমে এসে মাস্টার মশাইদের অনুরোধ করেছেন সুবীরবাবু ,” আপনারা সময়ে ক্লাসে যাবেন স্যার তাহলে ওরা ওইসব খেলার সুযোগ পাবে না।” সে সব বলা না বলা সমান !
 
সত্যেনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দেশপ্রিয়বাবু জিজ্ঞাসা করেন, ” কোন স্যারের ক্লাস এখন ?”
 
” সুশীলবাবুর অঙ্ক ক্লাস।”
 
” সুশীলবাবু আজ আসেননি। ওহ্ পড়ে সব ফাটিয়ে ফেলবে ! সময় হলে ঠিক কেউ যাবেন । ক্লাসে গিয়ে বোস, নয়তো সুবীরবাবুকে বল, তিনিই সব ক্লাস…।” ঝাঁঝালো গলায় কথা গুলো বলেন দেশপ্রিয়বাবু।
 
স্কুলে হেড মাস্টারমশাই নেই, অবসর নিয়েছেন। সুবীরবাবু ভার-প্রাপ্ত শিক্ষক। খানিক আগেই সেই ঘর থেকে ঘুরে এসেছে সত্যেন। দুইজন অচেনা লোকের সঙ্গে কাজে ব্যস্ত সুধীরবাবু, তাই…।
 
দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে তাকায় সত্যেন। আগের পিরিয়ড শেষ হবার পর থেকে প্রায় কুড়ি মিনিট হতে চললো। নিজের ক্লাসে ফিরে যাচ্ছিল সত্যেন কি মনে হয় দাঁড়িয়ে পড়ে স্টাফ রুমের সামনে আবার। যুদ্ধ, ড্রোন, মিসাইল, ব্যাংকার, রাডার, ফাইটার জেট ইত্যাদি শব্দগুলো পিছন থেকে টেনে ধরে সত্যেনকে। আমাদের দেশ যুদ্ধে জিতেছে ! সেকি কম কথা ! এই কয় দিন পথে ঘাটে সেখানেই যুদ্ধের আলোচনা শুনেছে দাঁড়িয়ে পড়েছে সত্যেন। শত্রুদের হারিয়ে দিয়ে দেশটাকে রক্ষা করছে আমাদের দেশের সৈনিকরা ! আজ কয়দিন ধরেই ভীষন খুশি সত্যেন। তারও ইচ্ছে যায় দেশের হয়ে লড়াই করবে। গতকাল স্কুলে এসেই গেমস টিচার ভোলানাথবাবুকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ” কি করে সৈনিক হওয়া যায় স্যার ?”
 
” পড়াশোনা করতে হবে। মজবুত শরীর থাকতে হবে আর থাকতে হবে দেশপ্রেম বুঝলি। দেশের মানুষের প্রতি…” ভোলানাথ স্যারের কথা গুলো কেমন নাড়া দিয়েছিল সত্যেনের মনে। শরীর তারও মজবুত। খেলাধুলা করে আরো সুঠাম করে গড়ে তুলবে নিজেকে। নিজের দেশের জন্য লড়াই করতে হবে। নিশ্চয় পারবে। গতকাল রাতের বেলায় স্বপ্ন দেখে সেনাদের পোশাক পড়ে হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দেশ পাহারা দিচ্ছে সত্যেন। এই মুহূর্তে মনে আসে সেই-স্বপ্ন দেখার কথা। নিজেকে সৈনিক ভাবে সত্যেন ! স্কুলের ভিতরের যুদ্ধটা থামানো প্রয়োজন ! একটা কর্তব্য বোধ জেগে ওঠে। নিজেকে নিজে মনে মনে বলে ” সৈনিক সত্যেন !” মুখের সেই নরম হাসিটা ফিরে আসে আবার। একটা দমকা আনন্দ বয়ে চলে ভিতরে ভিতরে। ফিরে যেতে চায় নিজের ক্লাসে। সেই সময় দেশপ্রিয়বাবু বলেন, ” শোন।” দাঁড়িয়ে যায় সত্যেন।
 
” ফাজিল ছেলে ! এখানে এসে দাঁত বের করে হাসছে ! পড়াশোনার নাম নেই… ।” গলা তুলে ধমক দিয়ে ওঠেন দেশপ্রিয়বাবু। ওই পাস থেকে নিরঞ্জনবাবু বলেন, ” ওটা ভীষন পাকা ছেলে। বজ্জাতটা ক্লাসে শুধু ফাজলামি করে। অপদার্থ একটা। ভাগ।”
সত্যেন দৌড় দেয় ক্লাসের দিকে। করিডর দিয়ে আসবার সময় বলে ” জয় হিন্দ !”
 
শ্যামল দাঁড়িয়ে ছিল করিডোরে। সত্যেনের মুখে জয় হিন্দ শুনে বলে ” কি হলো রে ? অতো আনন্দ কিসের ?” দাঁড়ায় সত্যেন। দুই চোখে চকমকির ফুলকি। শ্যামলকে বলে, ” বলো জয় হিন্দ। আমাদের দেশ যুদ্ধে জিতেছে ।” বলে ক্লাসে চলে আসে। শ্যামল তাকিয়ে দেখে সত্যেনকে। আজব ছেলে ! স্কুলে ভালো মন্দ যেকোনো ঘটনা ঘটুক না কেনো সত্যেন সবার আগে হাজির। সেদিন ফাইবের বাচ্চাটা আঘাত পেল, জল নিয়ে সত্যেন পৌঁছে গেয়েছিল সবার আগে !
 
ক্লাসে আসে সত্যেন। বন্ধুদের কাণ্ড দেখে হতাশ হয়। পাশের ঘরে যায়, সেখানে ভাস্করবাবু ছিলেন। ” স্যার চলুন…”।
ভাস্করবাবু এসে বেশ করে ধমক দিয়ে গেলেন। ছেলেরা কিছুক্ষণের জন্য ” সিজ ফায়ার” মেনে নিয়েছিল। তারপর আবার সেই…।
 
ওই পাশের করিডোর থেকে রমেনবাবু চিৎকার করে বলেন ” আমি গেলে একটারও পিঠের ছাল রাখবো না। একদম চুপ। কার ক্লাস ? ঘরে বোস। স্যার আসবেন।” ছেলেরা চুপ করে। তবে শ্যামল ভালোই বোঝে এইসব বাচ্চাদের চরিত্র। ক্লাসে যতক্ষণ না টিচার আসছে ওরা কিছুতেই থামবে না।
 
স্টাফ রুমের বাতাস এখনও গরম। দেশপ্রিয়বাবু অমৃতসরের বিপদ নিয়ে আতঙ্কিত হয়েছেন এই মুহূর্তে। যেকোনো সময়ে যা কিছু হতে পারতো। আমাদের জওয়ানরা সজাগ না থাকলে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই না করলে কি ভয়াবহ পরিণাম হতো সেই নিয়ে বিস্তারিত বলে সবে পা ফেলেছেন বেলুচিস্তানে। আবার হোঁচট খেতে হয়।
 
” স্যার ক্লাসে কোনো স্যার যায়নি সবাই যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলছে। বারণ করলেও শুনছে না।” এইবার সেভেনের ফার্স্ট বয় বাদল এসে হাজির। দেশপ্রিয়বাবু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন বাদলকে তার আগেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন নিরঞ্জনবাবু। এই পিরিয়ডে সেভেনে তার-ই ক্লাস, তিনি জানেনও সেটা। যুদ্ধের হওয়ায় ভেসে যাচ্ছিলেন এতক্ষণ, ইচ্ছে করেই। এমন যুদ্ধ তো আর রোজ হয় না। বাদলকে দেখে ক্লাসে যেতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। বাদল ছেলে সুবোধ নয় মোটেই। মাস খানেক আগেই নিরঞ্জনবাবুকে নাকানি চোবানি খাইয়ে ছিল। এই বছর পুণ্য কুম্ভে ডুব দেবার সুযোগ হয়েছিল নিরঞ্জন দাসের। তারপর থেকে প্রায় রোজ ক্লাসে গিয়ে কুম্ভ মেলা নিয়ে আলোচনা। আই আই টি-বাবা, কাঁটা-বাবা, পর্বত-বাবা। তাদের মাহাত্ম্য। ত্রিবেণী সঙ্গম। পাপ পুণ্য। শাহী স্নান। পড়াশোনা ডকে উঠেছিল। বাদল বিষয়টাকে ভালো চোখে দেখেনি। নালিশ জানিয়েছিল সঠিক জায়গায়। ভীষন বেকায়দায় পড়েছিলেন নিরঞ্জনবাবু, এই মুহূর্তে ক্লাসের দিকে হাঁটা দেন তাই।
 
শ্যামল আসে স্টাফরুমে। তখনও ড্রোন থেকে বোমা পড়ছে আমাদের প্রতিবেশী দেশের জঙ্গি-ঘাঁটিতে, অ্যাটিলারি ফায়ার চলছে, সীমান্ত উত্তপ্ত দেশপ্রিয়বাবুর বর্ণনায়।
 
” স্যার, এইটের ঘরে কোনো মাস্টারমশাই নেই। যেকোনো সময় বিপদ হয়ে যাবে। আপনারা কেউ যদি…।” নিজের অকৃত্রিম উদ্বেগের কথা জানায় শ্যামল।
 
শ্যামলের কথা শুনে রেগে আগুন দু একজন শিক্ষক শিক্ষিকা। নীলিমা ম্যাডাম বলেন, ” আপনি আমাদের কর্তব্য শেখাতে এসেছেন ! নিজের অধিকারের বাইরে যাবেন না শ্যামলদা। আমাদের সম্মানটা মাথায় রাখবেন। যান গিয়ে নিজের…।”
 
পরেশবাবু আর এক কাঠি উপরে চলেন। ” সত্যিই স্কুলের অবস্থা করুন ! একজন গ্রুপ ডি আমাদের মনে করিয়ে দিতে চাইছে…।”
 
এরপর আর এখানে থাকা চলে না। আজ তিরিশ বছর এই স্কুলে আছে শ্যামল। কত রকম শিক্ষক দেখলো !
 
” যাও তোমার ভার-প্রাপ্ত শিক্ষককে গিয়ে বলো। স্কুল যদি চালাতেই না পারবেন লাফিয়ে উঠে দায়িত্ব নেবার কি ছিল ! স্কুলে কি আর কোনো যোগ্য লোক ছিল না ?” বলেন দেশপ্রিয়বাবু। কথাটা সুবীরবাবুর উদ্দেশ্য বলা। হেড মাস্টারমশাই অবসর নিয়েছেন। মাস দুয়েক হলো স্কুলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সুবীরবাবুকে। সেটাই হয়েছে বেশ কয়েকজন শিক্ষক শিক্ষিকার রাগের কারণ। এতজন ‘ যোগ্য মানুষ ‘ থাকতে সুবীরবাবু কেনো ? যখনই কোনো সমস্যা নিয়ে স্টাফ রুমে হাজির হয়, দুই চারজন শিক্ষক শিক্ষিকার এই একটাই প্রশ্ন থাকে শ্যামলের কাছে ! মনে মনে হাসে শ্যামল, সকলেই দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী ! কি দিন এলো !
 
সুবীরবাবুর ঘরে আসে শ্যামল। সুবীরবাবু আজ স্কুলে এসে থেকে ব্যস্ত ভীষন। অডিটর এসেছেন বাইরে থেকে। কয়েক বছরের অডিট বাকি রয়ে গেছে। হাজার তথ্য দেওয়া নেওয়া করতে হবে। সদ্য দু মাস হলো চেয়ারে বসেছেন সুবীরবাবু। সব কিছু জানা হয়ে ওঠেনি এখনো। প্রভিশনাল রুটিনটুকু তৈরি করে দিয়ে বসেছেন অডিটারদের সঙ্গে। মাথা তোলার সময় নেই। সেই সময় শ্যামল আসে, ” এইটের ক্লাস হচ্ছে না। ভীষন হই হট্টগোল চলছে। কখন না একটা বিপদ…।”
 
” প্রভিশনাল রুটিন তো দেওয়া আছে, ক্লাস হচ্ছে না কেনো !” বলে স্টাফ রুমে আসেন সুবীরবাবু। দেখেন চেনা পরিবেশ ! প্রতিদিনই কোনো না কোনো বিষয়ে এই ঘরের আবহাওয়া গরম থাকে। সুবীরবাবু উপস্থিতিতে থমকে দাঁড়ায় আলোচনা। ” দেশপ্রিয়বাবু আপনার এখন ক্লাস রয়েছে তো !” রুটিনের খাতা দেখে বলেন সুবীরবাবু।
 
” মানে ? আপনি বললেই যেতে হবে নাকি !” উত্তেজিত ভীষন।
 
” টিচার না এলে প্রভিশনাল ক্লাস তো নিতেই হবে বলুন। জানেন তো আমাদের সংখ্যা এখন কত কম। সবাই মিলে এগিয়ে না এলে স্কুলটা কি করে চলে বলুন !” নম্র ভাবে বলেন সুবীরবাবু।
 
” এই গরমে পরপর দুটো ক্লাস নেবো না, যা করার করুন।” বলে চেয়ারে বসে পড়েন দেশপ্রিয়বাবু। যুদ্ধালোচনা স্থগিত। বন্ধ থাকে জওয়ানদের জয়গান।
 
” ক্লাসটা আছেই তো আর দশ মিনিট ! আপনার মত সিনিয়র টিচার…।” মুখের কথা শেষ হয় না সুবীরবাবুর, বন্দনা ম্যাডাম বলেন, ” রুটিনে পার্সিয়ালিটি হচ্ছে সুবীরবাবু। এইবার থেকে আমিও প্রভিশনাল ক্লাসে যাব না বলে দিচ্ছি ।” এমন অন্যায় অভিযোগ শোনার পরেও স্থির থাকেন সুবীরবাবু। বলেন, ” এইবার থেকে রুটিনের দায়িত্ব আপনি নিন ম্যাডাম আমি সব রকম সহযোগিতা করবো।” এ কথা শুনে দাঁড়িয়ে পড়েন বন্দনা ম্যাম। একটা যোগ্য জবাব দিতেই হয়। দেশপ্রিয়বাবু বলেন, ” কোনো দায়িত্ব আমরা নেবো না। স্কুলের মাথা আপনি…।”
 
” এটাই হলো আসল কথা। দায়িত্ব নেবো না, শুধু ভুল ধরবো, সমালোচনা করবো…।” কথা গুলো নিজেকেই শোনান সুবীরবাবু।
 
” কি বলতে চান আপনি ?” বন্দনা ম্যাডামের প্রশ্ন।
 

খবরটা ছড়িয়ে পড়েছে সারা স্কুলে। সব ছেলেরা ভিড় করেছে অফিস ঘরের সামনে। রমেনবাবু আরোও কয়েকজন শিক্ষক পরিস্থিতি সামলানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন

 
কথা এগিয়ে লাভ কি ! কয়েক মিনিট রয়েছে। এইটের ক্লাসে নিজেই পড়িয়ে আসবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন সুবীরবাবু। তবে একটা কথা না বললে দেশপ্রিয়বাবুর মতন শিক্ষকরা পেয়ে বসবেন। ” আমার কোনো সিদ্ধান্ত আপনাদের পছন্দ না হতেই পারে। আগে ছেলেদের ক্লাসটায় পড়িয়ে নিয়ে পরে আলোচনা করা যেতেই পারত, মনে রাখবেন আমাদের কাজটা কিন্তু আর পাঁচটা কাজের চেয়ে আলাদা। এখানে ছেলেদের স্বার্থটাই আগে। আজকের মত আমি ক্লাসে যাচ্ছি এরপর থেকে…।” স্টাফরুমটা হঠাৎ চুপ হয়ে যায়। করিডোর দিয়ে হাঁটা দেন সুবীরবাবু। সেই সময় দৌড়ে আসে একটি ছাত্র। স্যার যুদ্ধ থামাতে গিয়ে সত্যেন…।
 
বন্ধুদের থামাতে গিয়ে পেনের খোঁচায় ভীষন ভাবে আঘাত পেয়েছে ও। ডান চোখের পাশটা বিশ্রী ভাবে কেটেছে। গলগল করে রক্ত পড়ছে। সাদা জামা রক্তে লাল হয়ে উঠেছে। দুই হাতে ক্ষতস্থান চেপে বসে রয়েছে সত্যেন। শ্যামল বলে,” দেশপ্রিয়বাবু সময় এলে এমন বিপদ হয়তো ঘটতো না !”
 
ততক্ষণে টিফিন হয়েছে। সত্যেন আঘাত পেয়েছে খবরটা ছড়িয়ে পড়েছে সারা স্কুলে। সব ছেলেরা ভিড় করেছে অফিস ঘরের সামনে। রমেনবাবু আরোও কয়েকজন শিক্ষক পরিস্থিতি সামলানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ত্রিদিব স্যার বলেন ” তোদের রোজ প্রেয়ার লাইনে বলা হয় যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলবি না । হলো ! এইবার যদি দেখি…।”
 
প্রাথমিক চিকিৎসা হওয়ার পর সত্যেনকে নিয়ে হাসপাতাল গেছেন রমেনবাবু আর ত্রিদিব স্যার। টিফিনের পর আবার শুরু হয়েছে ক্লাস। স্কুলটা কেমন যেনো শান্ত হয়ে এসেছে নিজে থেকেই, ছেলেদের কলরব প্রায় নেই। ” একটা ছেলে আঘাত পেলে যেনো হাজার ছেলে ব্যথা পায়, আজ এত বছর ধরে তাই দেখে আসছি ! ছেলেরা বড়ো অদ্ভুত। ঠাকুর সত্যেনকে…।” বলে শ্যামল। চোখের কোল চিকচিক করে ওঠে শ্যামলের।
 
অডিটররা ফিরে গেছেন। এইবার মাথা তোলার সুযোগ হয়েছে সুবীরবাবুর। একটা দিন গেলো বটে ! শ্যামল ছুটির ঘণ্টা দিয়েছে। আজ নিঃশব্দে ফিরে গেছে ছেলের দল। ফাইল পত্র গুছিয়ে রাখছেন সুবীরবাবু। দেশপ্রিয়বাবু, নিরঞ্জনবাবু হেঁটে যাচ্ছেন করিডোর দিয়ে। ” বুঝলে নিরঞ্জন প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে এই যুদ্ধটা একটা শিক্ষা দিলো আমাদের। দেশের বীর জওয়ানরা নিজেদের কর্তব্যে অটল অবিচল, তাই দেশটা আজ সুরক্ষিত। আর সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে কর্তব্য বোধটা যদি না আসে তাহলে আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি কোনো দিনই…।” বলছেন দেশপ্রিয়বাবু।
 

ঘরের যুদ্ধ কি আর সৈনিক একা সামলাতে পারে ! সবাই এগিয়ে না এলে…।” কিছুক্ষণ চুপ থেকে কেটে কেটে কথা গুলো বলে সত্যেন। সকলের দৃষ্টি সত্যেনের দিকে। শ্যামলা মুখের পরিচিত হাসিটা ঢাকা পড়েছে অজানা কোন দুশ্চিন্তার ছায়ায়

 
শ্যামল তাকিয়ে থাকে করিডোরের দিকে। দেশপ্রিয়বাবুর ফেলে যাওয়া কথাগুলো ফাঁকা স্কুল-বাড়ির বাতাসে ঘুরপাক খেয়ে কেমন যেনো বিদ্রুপ হয়ে ফিরে এলো !
 
” চলুন শ্যামলদা সত্যেনের বাড়ি যাবো। রমেনবাবুরা ফিরেছেন হাসপাতাল থেকে। ভালো আছে সত্যেন।”
 
স্কুল গেটে তালা দিয়ে শ্যামল আর সুবীরবাবু সত্যেনের বাড়ির পথে পা ফেলেন। এতক্ষণ ভীষন বিমর্ষ ছিল শ্যামল। সত্যেন ভালো আছে সেই শুনে খুব খুশি।
 
শুয়ে রয়েছে সত্যেন। বেশ কয়টি স্টিচ হয়েছে ক্ষতস্থানে। যন্ত্রণায় কাবু । গায়ে জ্বরও । রমেনবাবু, ভোলানাথবাবু, ত্রিদিব স্যার, সুবীরবাবু বসে কথাবার্তা বলছেন সত্যেনের বাড়ির লোকজনের সঙ্গে। শ্যামল তাকিয়ে দেখে সত্যেনকে। বড্ড মায়া লাগে। সারাদিন বন্ধুদের সামলাতেই ব্যস্ত থাকে ছেলেটা। এখন কেমন ভাবে শুয়ে রয়েছে ! ” সত্যেন, এতটুকু ব্যথায় কাবু হলে হবে ! তুই না সৈনিক হবি।” বলে শ্যামল।
 
চোখ খোলে সত্যেন। সামান্য হেসে আবার দু চোখ বন্ধ করে। ওষুধের ঘোর। হঠাৎ স্কুলের করিডোরের কথা মনে পড়ে যায় শ্যামলের। ” বলো জয় হিন্দ, আমাদের দেশ…” বলেছিল সত্যেন। তখন আর বলা হয়নি, এখন স্যালুট ঠুকে শ্যামল বলে, ” জয় হিন্দ।” ঘটনাটা সকলেরই অজানা, তাই সকলেই অবাক হয় শ্যামলের এমন কাণ্ড দেখে।
 
চোখ খোলে সত্যেন। উঠে দাঁড়ায় ধীরে ধীরে। কষ্ট হলেও শরীর টানটান রেখে ডান হাত কপালে ছুঁইয়ে বলে, ” জয় হিন্দ, ভারত মাতা কি জয়।”
 
শ্যামল এগিয়ে যায়। আলতো ভাবে জড়িয়ে ধরে সত্যেনকে। বলে, ” তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠ, বন্ধুদের মধ্যে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলাটা সামলাতে হবে না ! ”
 
” ঘরের যুদ্ধ কি আর সৈনিক একা সামলাতে পারে ! সবাই এগিয়ে না এলে…।” কিছুক্ষণ চুপ থেকে কেটে কেটে কথা গুলো বলে সত্যেন। সকলের দৃষ্টি সত্যেনের দিকে। শ্যামলা মুখের পরিচিত হাসিটা ঢাকা পড়েছে অজানা কোন দুশ্চিন্তার ছায়ায়। নিষ্প্রভ চাউনি। দিন শেষের ম্লান আলোয় সত্যেনকে বড্ড ম্লান দেখতে লাগে।
 
সুবীরবাবু সত্যেনের পাশে এসে দাঁড়ান। ” হতাশ হলে চলবে সত্যেন ! আমরা সবাই মিলে সচেতন থেকে স্কুলের ভিতরের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা…।”
 
সুবীরবাবুর আশ্বাসে হাসি ফেরে সত্যেনের মুখে। দুই চোখে চকমকির ফুলকি দেখা দেয় আবার।
 
শ্যামল হেসে বলে, ” এই তো আমাদের চেনা সত্যেন !”

♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!