- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- নভেম্বর ২৩, ২০২৫
তার চোখে মধু
১
সন্ধেতে প্রিয়দর্শিনীর ছেলে নীলমণি মাতৃহীন সরোবরের সিঁড়িতে নেমে এল ৷ বেশ কিছুক্ষণ সে এখানে বসে থাকবে — সূর্য চলে যাওয়ার পরের আকাশটুকু দেখবে ৷ চাঁদ অব্দি নীলু অপেক্ষা করতে পারে না ৷ সন্ধে সাতটায় গরম জলে ওষুধ গুলে মাকে খাওয়াতে হয় ৷ ওষুধের আগে দুটো হরলিক্স বিস্কুট খান মা ৷ বিস্কুট দুটো কুড়ি টুকরো করে নীলু – প্রিয়দর্শিনী একটু একটু করে বিস্কুট চোষেন ৷ প্রিয়দর্শিনীর জিভময় ঘা ৷ মুখের যে কোনো খাবারে রক্ত লাগে ৷ হরলিক্স বিস্কুটেও লাগে হয়ত ! নীলু খেয়াল করতে চায় না ৷ খেয়াল করলে সে মাকে পথ্য ওষুধ দিতে পারবে না ৷
পাড়ার হরিমতী পিসি নীলুকে বলেছে, মায়ের ঘা দেখিস নে নীলু ৷ জানলার দিকে মুখ ফিরিয়ে ওষুধ দিস ৷ নীলু তাই দেয় ৷ সেই সময় জানলা দিয়ে দেখে, চাঁদ উঠছে ৷
জানলার শিকের দুপাশে চাঁদ দু টুকরো হয়ে থাকে ৷ শিক ভেঙে চাঁদ জোড়া লাগাতে নীলু পারে না ৷ নীলু ভাবে –আমি ছোটো ছেলে ৷ আমি কি পারি শিকের এপারের চাঁদের সঙ্গে অন্যপারেরটা জুড়ে দিতে ! মা সেরে উঠুক ৷ মা লাগাবেন অখন ৷
প্রিয়দর্শিনী সন্তানের মন টের পান ৷ নীলুর হাত জড়িয়ে রাখেন ৷ সন্তানকে পূর্ণচাঁদ দেখাবার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেন বারবার ৷ নীলুও বিশ্বাস করে, ঘা সারলেই প্রিয়দর্শিনী চাঁদ জুড়ে দেবার ক্ষমতা পাবেন ৷
২
প্রিয়দর্শিনী জগবন্ধু ঘোষের ভালোবাসার বউ ৷ জগবন্ধুর সঙ্গে বড় মায়ায় সংসার করেছে সে ৷ বিয়ের পর কেবল নতুন বউকে আল্হাদ দিতে জগবন্ধু বাড়িতে বিশাল পুকুর থাকা সত্ত্বেও একটি সরোবর কাটান ৷ কিছু রঙিন মাছ ও জলজ ফুল দিয়ে বউয়ের প্রিয় জলাশয় সাজান ৷ হরি পিসি বলে, পোয়াতি অবস্থায় প্রিয়দর্শিনী সরোবরে রাতের হাওয়া খেত প্রাণভরে ৷ সেসময়, পূর্ণিমা এলে বাবা জগবন্ধু বউয়ের পায়ের মসৃণ চামড়ায় আলতার ফুল আঁকত ৷ জগবন্ধুর আঙুলের টানে পায়ের পাতার লাল শতপাপড়ি হয়ে যেত ৷ হরিপিসিটা একবারে হরেকেষ্ট একটা ৷ এ সব কেউ ছেলেকে বলে ! দেখে, নীলু লজ্জা পাচ্ছে ৷ তাও পানের রসে দাঁত ডুবিয়ে বলেই যায়, বলেই যায় ৷ নীলুর গায়ে কাঁটা দেয় ৷ হরিমতী বলে, নীলু তোর লোম সোজা হয়ে গেছে ৷ হাত দিয়ে লোম ছোঁ ! ছোঁ না !
নীলুর জন্মের পর জগবন্ধু বড় পুকুরটি বুজিয়ে একটি মনসা মন্দির করেন ৷ প্রিয়দর্শিনী দশ মাস অব্দি সাপের স্বপ্ন দেখেছেন ৷ তাই জগবন্ধুর মানত ছিল, ছেলে হলেই মনসা মন্দির ৷ বড়ো হয়ে হরিপিসির মুখে এসব গল্প শুনে অব্দি নীলু সরোবরের সঙ্গে কথা বলে৷ পড়াশুনোর কথা, স্কুলের কথা, তার মা আর হরিপিসির ঝগড়ার কথা ! ছোট থেকে কত কথা যে বলে গেছে নীলু ! মায়ের সরোবরের সঙ্গে নীলু এক কথাসেতু গড়েছিল ৷
কিন্তু গত তিনদিন ধরে নীলুর একমাত্র কৌতুহল–
বড়ো পুকুর বুজে গেলে সরোবর দুঃখ পেয়েছিল কি ! পেলে কতটা ? মা চলে গেলে কতটা দুঃখ পেয়েছিল সরোবর ৷ ছেলেবুদ্ধি কিনা ! নীলু ভেবেছে – অদেখা সেই বড়ো পুকুর সরোবরের মা ৷
এখনও আকুল গলায় একই প্রশ্ন করল নীলু, মা ছেড়ে থাকতে কত কষ্ট হয় রে তোর সরোবর ?
সরোবর হাসে, জ্যামিতি না এলজেব্রাতে হিসেব দেব নীলু ?
ভেতর থেকে হরিপিসির চিৎকার এল, নীলু আজ আর তোর হরলিক্স বিস্কুট লাগবে না রে !
নীলু বুঝল, একটা কিছু চিরতরে গেল ৷ তাও উঠে ভেতরে গেল না ৷ ভেতরে গেলেই জানলার সেই শিক ! সেই দুটুকরো চাঁদ ৷ তাছাড়া আজ কাজও তো নেই কিছু ৷ মন দিয়ে অনেক যত্ন করে হাতের পাতায় চাঁদের আলো দেখল নীলু ৷ আকাশের গোলটার সঙ্গে হাতের গলা চাঁদ মেলাল ৷
ধীরে ধীরে মনসা মন্দিরে ঢুকল ৷ আজ কি মনসার গলায় নতুন হার পরিয়েছে হরিপিসি ? সাপগুলোকে এত তেল চুকচুকে করে ফেলেছে !
নখ দিয়ে জোরে জোরে মাথা চুলকোল নীলু ৷ নিজের ভাবনার চলাচল আজকাল নিজেই ধরতে পারে না ৷ সকাল থেকে মায়ের পাশেই ছিল হরিপিসি ৷ মা শ্বাস নিচ্ছিলেন ফোঁস ফোঁস ! হরিপিসি মুখে অল্প অল্প জল দিচ্ছিল ৷ জল মৃত্যুপথযাত্রীর শ্বাসকে সহজ করে, পাশে বসা নীরব নীলুকে এমনই বলেছিল হরিপিসি ৷নীলু চুপই।
আর বাবা ? বাবা যেন কী বলেছিলেন ! নীলু মনে করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যায় ৷ বাবার তখনকার কথাগুলো নিজের মনেই বিড়বিড় করে নীলু – ডাক্তার বলে গেছেন আরো কিছুক্ষণ যেতে সময় নেবে নীলুর মা ৷হরিমতী তুমি মুখে কিছু দাও ৷ তোমার শরীর নষ্ট হলে আমি ৷
মা প্রিয়দর্শিনীকে কাঠের কাজকরা পালংকে তোলা হচ্ছে, নতুন বেডকভার ৷ দুর্গন্ধ ঢাকতে মরা প্রিয়দর্শিনীর গায়ে আজো কি বেদম পাউডার ঢালবেন বাবা ! দিনরাত কড়িবরগার দিকে শুয়ে থাকতেন প্রিয়দর্শিনী ৷ পিঠ বাতাস পেত না, চামড়া উঠে মাংস গন্ধ ছড়াত ৷ একদিন মায়ের গলায় কেমন এক কাতরানি শুনেছিল, মৌমাছির ডাকের মতো ছিল সে ধ্বনি ৷ জানলা দিয়ে নীলু দেখেছিল, নাকে গামছা দিয়ে জগবন্ধু ৷ আর মায়ের ব্লাউজ ঘাড়ের কাছে তুলে দিয়ে হরিপিসি এক শিশি তরল পিঠে ঘষছে ৷ জিজ্ঞেস করতে জগবন্ধু বলেছিলেন, ওর নাম বেটাডিন ৷ ও একটা তরল–পাউডার ৷
মনসা মন্দিরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মাকে দেখার চেষ্টা করল নীলু ৷ পালংকে একটি দেহের অবয়ব দেখা গেল ৷ মাটির সাপগুলোর দিকে তাকিয়ে হাসল নীলু ৷ অন্ধকারে দেখা গেল না সে হাসি, মৃদু এক স্রোতের শব্দ কেবল ৷
৩
পরবর্তীকালে নীলমণি ঘোষ কলকাতার সেরা মেডিক্যাল ছাত্র হলেন ৷ ফাইনাল রেজাল্ট বেরোবার পর তিনি মন্দির ভেঙে ফের পুকুর কাটেন সে মাটিতে ৷ বড় পুকুর তার ছেলের কাছে ফিরে এসেছিল ৷ নীলমণি আর কাউকে মা ডাকতে পারেননি বটে তবে বন্ধু সরোবরকে নতুন মা দিয়েছিলেন ৷
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
❤ Support Us








