Advertisement
  • ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
  • আগস্ট ৩১, ২০২৫

হিরণবালা । পর্ব ১৯

হিরণের মনে হল আজকের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে ওর নিজের জীবনের কত মিল! দেশভাগ তো শুধু ওপার বাংলাকে কেড়ে নেয়নি এপার বাংলার থেকে, এপার বাংলাকে দিয়েছে নতুন করে গড়ে ওঠার সুযোগও...তারপর

অংশুমান কর
হিরণবালা । পর্ব ১৯


৩৩

চিনের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধ লেগেছে। কাঁথির হেলথ সেন্টারের মতো নিয়মিত রাজনৈতিক আলোচনা রামসাগর হেলথ সেন্টারে হয় না। কিন্তু, যুদ্ধের আঁচ এমনভাবেই বাড়ছে যে, এবার হাসপাতালেও তার তাপ এসে পৌঁছচ্ছে। ডা. শিট এমনিতে কোনো বিতর্কিত বিষয়ে মন্তব্য করেন না। কিন্তু চিনের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ায় উনি প্রবল ভাবে চিন বিরোধী হয়ে গেছেন। হাসপাতালে শিক্ষিত কোনো রুগি এলেই একথা সেকথার পর যুদ্ধের কথা চলেই আসছে। কেননা হু হু করে হঠাৎই জিনিসপত্রের দাম বাড়তে শুরু করেছে। যুদ্ধ হলেই এমনটা হয় হিরণ আগেও দেখেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও এমনটাই হয়েছিল। আর শিক্ষিত সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর যুদ্ধের আঁচ এসে লাগলে তারা তখন নানা বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেয়। ঠিক সেরকমটাই হচ্ছে এবার। কেউ না কেউ এসে ঠিক একটি দু-টি মন্তব্য করে ফেলছে যুদ্ধ নিয়ে আর ডাক্তার শিট তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন আলোচনায়। কাঁথি হাসপাতালে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে তর্ক হতো। এখানে তর্ক হচ্ছে না। কারণ চিনের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধে সবাই তো ভারতেরই পক্ষ নিচ্ছে। সবাই প্রধানমন্ত্রী নেহেরুকে সমর্থন করছে। ডাক্তার শিট অবশ্য বলছেন যে, বামপন্থীদের একটা অংশ নাকি এই যুদ্ধে ভারতের পক্ষে নেই। তারা নাকি চিনকে সমর্থন করছে। বলছেন যে, কমিউনিস্টরা নাকি এরকমই হয়।

হিরণের এটা শুনে খুব অবাক লেগেছে। যুদ্ধ লাগুক কখনোই ও চায় না। কিন্তু যুদ্ধ যদি সত্যিই লেগে যায়, তখন কি কেউ দেশের বিরুদ্ধে যেতে পারে? ডাক্তার শিট বলছেন অবস্থা এমনই যে, ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট পার্টি নাকি ভেঙে যেতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা জ্যোতি বসু আর আরও কয়েকজন মিলে নাকি আলাদা দল করতে পারেন। কারণ ওরা এই যুদ্ধে চিনকে সমর্থন করছেন। হিরণের মনে হচ্ছে, জ্যোতি বসুরা চিনকে সমর্থন করে যদি কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙে দেন তবে ঠিক কাজ করবেন না। যুদ্ধ লাগায় একটা জিনিস অবশ্য হিরণ বুঝতে পেরেছে।

ওর প্রাণ পড়ে আছে এখনও নড়িয়াতেই। চোখ বুঁজলেই এখনও ও পদ্মাকে দেখতে পায়। কিন্তু, এই দেশটাকেও আস্তে আস্তে একটু একটু করে ও ভালোবাসতে শুরু করেছে। সেজন্য মনেপ্রাণে ও চাইছে এই যুদ্ধে ভারত জিতুক, নেহেরু জিতুক। ও বুঝতে পারছে যে, আস্তে আস্তে ও হয়ে উঠছে একজন খাঁটি ভারতীয়।

সত্য বাড়ি আসায় যুদ্ধের আরও কিছু খবর পায় হিরণ। কলকাতার রাস্তায় কারা নাকি লিখে দিয়েছে, চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান। যুদ্ধ নিয়ে সত্যর অবস্থান খানিকটা আশ্চর্যজনক। ও খানিকটা সমর্থন করছে জ্যোতি বসুদের। চিনকে ও সমর্থন করছে না ঠিক। কিন্তু ও বলছে যে, দেশে একটা বিরোধী স্বর থাকা ভালো।

কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া যেভাবে নেহেরুর সুরে সুর মেলাতে শুরু করেছে সেটাও নাকি ঠিক হচ্ছে না। যারাই নেহেরুর সমালোচনা করছে সেই সমস্ত কমিউনিস্ট নেতাদের পুলিশ নাকি জেলে পুরে দিচ্ছে। ঠিক হচ্ছে না এই কাজটাও।

এজন্যই সত্য খানিকটা নেহেরু বিরোধী হয়ে গেছে। যুদ্ধে ভারতকে ও সমর্থন করছে ঠিক। কিন্তু নেহেরুর পুলিশ যেভাবে দেশজুড়ে কমিউনিস্ট নেতাদের ধরপাকড় করছে সেটা ওর একেবারেই ভালো লাগছে না। এই যুদ্ধ যুদ্ধ বাতাবরণের মধ্যেই আরেকটা বড়ো কাজ ঘাড়ে এসে পড়ল হিরণের। ঘোঁতনের অন্নপ্রাশন। এই অন্নপ্রাশনেরও অনেকখানি খরচ হিরণকেই বহন করতে হবে। দাদারর ঋণ এজন্যই শোধ করতে আরও খানিকটা সময় লাগবে ওর।


৩৪

নির্মলাকে যে এভাবে খুঁজে পাবে, হিরণ তা ভাবতেই পারেনি। জীবন গত কয়েক বছরে এমন ভাবে বইছিল যে, নির্মলার কথা প্রায় যেন ভুলতেই বসেছিল ও। মাঝে মাঝে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময় একবার দু-বার যে নির্মলার কথা ওর মনে হয়নি, তা নয়। কিন্তু ওইটুকুই। এজন্য অবশ্য হিরণের কোনো অপরাধবোধ নেই। নির্মলাকে তো ও নিজের সঙ্গে আনতেই চেয়েছিল। ওকে তো নির্মলাকে এ দেশে আনতে দেওয়া হয়নি। আর এদেশে এসে প্রথম প্রথম যতখানি ওর মনখারাপ করত নির্মলার জন্য, ক্রমশ তা কমতে থাকে।

ওই মানুষটার জন্যই এখন আর ঠিক মনখারাপ করে না। কেমন একটা ক্ষীণ আশা কেবল বুকের মধ্যে সন্ধেবেলায় ঠাকুরের সামনে জ্বেলে দেওয়া প্রদীপের মতো জ্বলতে থাকে–কোনো একদিন হয়তো মানুষটার সঙ্গে ঠিক দেখা হয়ে যাবে।

মানুষটার জন্য সত্যিই মনখারাপ আর সেই অর্থে নেই। কাজেই নির্মলার জন্য ওর মনখারাপ যে আস্তে আস্তে কমে আসবে, সে তো স্বাভাবিকই ছিল। নির্মলা ওর সৎ মেয়ে বলেই যে এমনটা হয়েছে, তা নয়। নির্মলার জায়গায় গীতা থাকলেও হয়তো এটাই হতো। জীবনের এটাই ধর্ম। সে সামনের দিকে ছুটতে চায়। জলের মতো। পেছনের দিকে বয় না। ছুটতে ছুটতে অনেক কিছুকে সে সঙ্গে নিয়ে যায়। অনেক কিছুকে ফেলেও যায়। জীবনের যা কিছু প্রাপ্তি, যা কিছু সঞ্চয়, যা কিছু ক্ষোভ–সেই সব কিছুকে নিয়ে সামনের দিকে ছুটে যাওয়া যায় না। কিছু কিছু জিনিস পেছনে ফেলে রেখে আসতে হয় সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। নির্মলাকেও তেমন হিরণ জীবনের এক বিন্দুতে রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। আজ আবার তাকে ফিরে পেল।

কোন্নগর যাবে বলে হাওড়া স্টেশনে গোবিন্দর হাত ধরে নেমেই হঠাৎ করে হিরণ শোনে, মেয়েলি গলায় কেউ ওকে ডাকছে, মা—

প্রথমটা ঘাবড়ে গিয়েছিল হিরণ। গীতার গলা তো এটা নয়। গীতা হাওড়া স্টেশনে আসবেই বা কেন! পিছন ফিরে দ্যাখে নির্মলা। শরীর অনেক ডাঁটো হয়েছে, কিন্তু মুখশ্রী আর গলার আওয়াজ একই আছে। চিনতে এক মিনিটও সময় লাগেনি হিরণের। হিরণ বলেছিল, তুই? তুই এহানে কী কইর‍্যা?

নির্মলা ওকে আর গোবিন্দকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, হে অনেক কথা মা। পরে কমু। তুমি যাইতাস কোথায়?
হিরণ ওকে বলে গীতার বিয়ের কথা। ঘোঁতনের অন্নপ্রাশনের কথা। বলতে বলতেই খেয়াল করে নির্মলার সিঁথিতে সিঁদুর নেই। ও চমকে ওঠে। নির্মলার তো বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। কী হল মেয়েটার? প্রবল কৌতূহল হয় হিরণের। কিন্তু, কিছুতেই নির্মলাকে জিজ্ঞেস করে উঠতে পারে না ওর বরের কথা।

দু-দিন পরে ঘোঁতনের অন্নপ্রাশন শুনে নির্মলাই ওকে বলে, ঘোঁতনের অন্নপ্রাশনে ও যাবে। গীতার বাড়ির ঠিকানা যেন হিরণ ওকে দেয়।

নির্মলার এই প্রস্তাবে বেশ হকচকিয়ে যায় হিরণ। দীর্ঘদিন ও নিজে সিঁদুর পরে না। মানুষটা বেঁচে আছে কি না ও সত্যিই জানে না। কিন্তু সিঁদুর ও আর পরে না। সকলেই জানে ও বিধবা। একা একা তিন ছেলেমেয়েকে মানুষ করেছে। এখন ওর জীবনে নির্মলার এই হঠাৎ প্রবেশে সবকিছু আবার তছনছ হয়ে যাবে না তো? মনোরঞ্জনের মা বা মনোরঞ্জন যদি জানতে পারে ওদের অতীত তাহলে কি গীতার প্রতি ওদের মনোভাব পালটে যাবে? হঠাৎ অদ্ভুত এক ভয় ঘিরে ধরে হিরণকে। আবার এতদিন পরে নির্মলাকে ফিরে পেয়ে মনের ভেতরে যে তিরতির করে আনন্দের এক নদী বইছে তাও বুঝতে পারে ও। বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে নিয়ে গিয়ে জীবন হিরণকে মানুষ হিসেবে অনেকখানি পরিণত ও দড়ো করে দিয়েছে। কিন্তু এই প্রথম সৎ মেয়ে ওর নিজের মেয়ের ঠিকানা চাওয়ায় ও কী উত্তর দেবে বুঝে উঠতে পারে না।

♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦

ক্রমশ..

আগের পর্ব পড়ুন: হিরণবালা । পর্ব ১৮

হিরণবালা । পর্ব ১৮

 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!