- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- এপ্রিল ২৩, ২০২৩
মানুষের মতো
অলঙ্করণ: দেব সরকার
গোলাপী ব্লাউজের অনাবৃত অংশ দিয়ে খোঁচা খোঁচা বুকের লোম গুলো অবাধ্য রকমের উঁকি মারছে। তার ওপর ছপছপে বৃষ্টির হাড় জ্বালানো গরমে মুখের ফাউন্ডেশন ঘামের সাথে মিশে একেবারে সাদা হয়ে ফেনিয়ে উঠছে যেন!তালি মারলেই পয়সা। দশমাইল দুর থেকে শুনলেও বোঝা যায়।
ফট ফট ফটাস….
শহরের বৃষ্টি পিচের পথকে ধুইয়ে আরো কালো করে তোলে।তখন পথের মাঝে আবর্জনা গুলো আরো বেশী স্পষ্ট হয়ে ওঠে।গতকাল রাত থেকে লোডশেডিং ! আজ সকালে রায় বিহারী স্ট্রিটের একেবারে রাস্তার ধারের দরজাটা খুলতেই দেখা গেল, মন খারাপের বৃষ্টি এসবেসটার চুঁইয়ে সিঁড়ির দুটো ধাপকে একেবারে ছুঁয়ে গেছে। পা বাড়ালেই শাড়িটাকে আর একটু তুলতে হবে। মাথাটা কার না গরম হয় ! কিন্তু কিছু করার নেই ! বেরোতে যে হবেই ! বেরোনোর সময় জঙধরা দুলটা জোর করে পড়তে গিয়ে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল শৈল। গতকাল শোয়ার আগেই ফলো করেছে বুকের লোম গুলো দুদিনেই আবার মাথা চাড়া দিয়েছে।ঈশ্বর কিছু মানুষের সাথে এই ভাবেই ভুল অঙ্ক কষে ! কি দরকার ছিল ওই একমুঠো চুল বুকের মাঝখানে ছড়িয়ে দেওয়ার ! ঘষে ঘষে যতই রং মাখো আর লিপস্টিক লাগাও না কেন, কিছু করেই ছাপটাকে আর ঢাকা গেলনা !
দশটা বাইশে মল্লিক পাড়া থেকে রতন অটোতে তুলবে। আগে থেকে অটোতে বসে থাকবে জবা আর গীতা। রতন ওদের বাঁধা ধরা ড্রাইভার। আজ তিনটে বাড়িতে যাওয়ার কথা। এই হল রোজকার জীবন ! দর দাম কড়ায় গন্ডায় উঠলে বুকটা ভরে যায় ! আর নয়ত কতটা নীচে যে নামতে হয় তা শৈলর কিছু অজানা নয় ! শৈল জানে যে হিজরাদের কোনো সম্মান নেই ! অথবা সম্মান থাকলে তাদের পেটে ভাত নেই।হৃদয় টুকুর কিন্তু কোনো বিভেদ নেই! শুধু একটু ব্যতিরেক জীবন, আর এইটুকুতেই সব ওলট পালট ! অন্যায় না করেও এ এক সমস্ত জীবনের চরম শাস্তি ! অন্যকে অসম্মান করে নিজের সম্মানের জন্য প্রতি মুহূর্তে অন্নের জন্য লড়াই ! যার সব আছে তার আরো পাওয়ার লড়াই, আর যার পাওয়ার সবটুকু ঈশ্বর করুন ভাবে ছিনিয়ে নিয়েছে তার সম্পূর্ণ জীবনটাই লড়াই…!
এই দিকটায় শৈলরা কখনো আসেনি।মল্লিক পাড়ার খেলার মাঠের উল্টো দিকটা। রতন অটো থামিয়ে কলপাড়ে একটা ছেলেকে জিজ্ঞেস করল— ” ভাই এই দিকে কানাই মিত্তিরের বাড়ি কোন দিকটায় ?”
ছেলেটি আঙুল টিকে যতটা পারা যায় ততটাই সোজা করে বলল— “ওই যে ওই ওই ওইইই.. দিকটায়।” অটো থামল একেবারে মিত্তির বাড়ির গেটে। এক বৃদ্ধ গেট থেকে বেরিয়ে এসে বললেন কি চাই ?
শৈল এতক্ষণ গীতার গায়ে হেলান দিয়ে অটোতে বসে পায়ের ওপর পা তুলে পান চিবোচ্ছিল। হালকা করে মুখটা বাড়িয়ে তালি মেরে বলল—
“কি চাই আবার ! তোর নাতিরে চাই। আমাদের দেখে বুঝতে পারছিসনা ! নাচাতে এইছিরে নাচাতে এইছি।”
শৈল জানে যে হিজরাদের কোনো সম্মান নেই ! অথবা সম্মান থাকলে তাদের পেটে ভাত নেই।হৃদয় টুকুর কিন্তু কোনো বিভেদ নেই! শুধু একটু ব্যতিরেক জীবন, আর এইটুকুতেই সব ওলট পালট ! অন্যায় না করেও এ এক সমস্ত জীবনের চরম শাস্তি !
বৃদ্ধ কাচুমাচু মুখ করে বলল ও হ্যাঁ আসুন আসুন ভিতরে আসুন। গেট পেরিয়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতেই শৈল গীতারে ঠোনা মেরে বলল—
“মাথারিদের পয়সা আছেরে।শুটকো বুড়োটারে দেখলে বোঝা যায় না !”
জবার উদ্দেশ্যে শৈলর হালকা করে সাবধান বাণী।
—”বেশি দরদ মারালে ক্যাঁত করে একটা লাথি মারব।”
গীতা আর শৈল এই লাইনে পোড় খাওয়া মাল। এমনিতেই জবা একটু শান্ত। মানুষের কষ্ট সে মোটে দেখতে পারেনা ! কিন্তু করে তো খেতে হবে ! তাই গীতা আর শৈল কথা বললে জবা চুপ করে থাকে। বৃদ্ধ তার নতুন মা হওয়া বউমা আর নাতনিকে নিয়ে বৈঠক খানায় এলো। শুরু হল দর কষাকষি !
মেয়ে হয়েছে বলে গীতা এবারের মতো বারো হাজার টাকা নেবে। নয়ত ছেলে হলে পাক্কা কুড়ি হাজার চাইত। শুনেতো নতুন মায়ের মাথায় হাত ! একেতো সেদিন নার্সিংহোমে ওতো গুলো টাকা গেল! আবার এর মধ্যেই !
বৃদ্ধ প্রায় হাতে পায়ে ধরে—
“আপনাদের আশীর্বাদ থেকে আমার নাতনিকে বঞ্চিত করবেন না ! এবার টা পাঁচ হাজার রাখুন। আবার তো কিছু দিছু দিনের মধ্যেই আমার ছোট ছেলের ঘরে বাচ্চা হবে তখন না হয় আপনাদের বাকিটা পুষিয়ে দেব !”
বলা মাত্রই পাশের ঘর থেকে সুঠাম এক যুবক বাইরে বেরিয়ে এসে তীব্র প্রতিবাদ করল—
“কি হচ্ছে কি বাবা ! এটাকি মাছের বাজার নাকি ? আর কি বলছ এসব! আমার বাচ্চা হলে বাকিটা পুষিয়ে দেবে মানে টা কি ! আর এই যে আপনারা? একেবারে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়েছেন ! বেরোন এখান থেকে বেরিয়ে যান বলছি! কুড়ি হাজার টাকা গাছ ঝারা দিলেই পড়ে তাইনা? আসলে কষ্ট করে কামাতেতো হয়না! বুঝবেন কি করে ?
রাগেতে গীতা মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে ! এত বড় সাহস ! যে জবা কখনো রাগেনা আজ সেও রেগে গেছে ! কিন্তু শৈল ? চুপটি করে একটা কোনে দাঁড়িয়ে আছে !
ওদিকে গীতা আর জবার সাথে বৃদ্ধর ছোট ছেলের প্রায় হাতাহাতি টুকু হয়ে যাওয়ার জোগাড় ! জবা তালি দিয়ে বাড়িটা প্রায় ফাটিয়ে ফেলার উপক্রম করল। আর এরই মধ্যে গীতা রাগেতে পায়ের কাপর মাথায় তুলে খিস্তির বন্যা বইয়ে দিল ! ওদিকে বৃদ্ধর ছোট ছেলে, সেও কিছু কম যায়না ! গীতা না পেরে শেষে ঢোলের মধ্যে জল ঢেলে দিতে গেলে শৈল দৌড়ে গিয়ে গীতার হাতটা ধরে বলে—
“দোহাই গীতা।রাগের মাথায় এমনটা করিসনা ! বাচ্চাটার অকল্যাণ হবে !”
গীতা আরো রেগে যায় ! কিন্তু এ এক শৈলর অন্য রূপ ! গীতা খিস্তি মেরে শৈলর চোদ্দ পুরুষ উদ্ধার করে।মুখে ঝামটা মেরে সোজা গিয়ে রতনের অটোতে গিয়ে বসে ! যাওয়ার সময় শুধু শৈলর উদ্দেশ্যে বলে যায়—
“কিছু ছিনালীও জানিস বাপু !”
শৈলকে সমীহ করে, অতএব ইচ্ছে থাকলেও গাল দেওয়ার উপায় নেই ! তাই রাগে কটমট করতে করতে জবাও অটোতে গিয়ে বসে। ওদিকে ততক্ষণে নতুন মা আর বৃদ্ধ নবজাতিকাকে নিয়ে অন্দরমহলে দৌড় লাগিয়েছে। উঠোনে ওখন শুধু শৈল আর মিত্তির বাড়ির ছোট ছেলে ! ছেলেটি শৈলর উদ্দেশ্যে মাটির ওপর সজোরে দু দুবার থুতু ফেলল !
“ছিঃ ছিঃ ছিঃ!! প্রয়োজনে তোরা এতটা নিচে নামতে পারিস !
শৈল: শান্ত হ দীপু।
দীপু: শান্ত হব বলছিস! তোদের এই নোংরামি গুলো দেখার পরেও শান্ত হতে বলছিস !
শৈল: শান্ত হ !
দীপু: তুইতো জানিস আমার আগাগোড়াই রাগ উঠে গেলে মাথার ঠিক থাকেনা ! আর তুই ও ! শেষ পর্যন্ত তুইও ? এর জন্যই কি পড়াশোনাটা কমপ্লিট করলিনা ? লোকের কাছ থেকে হাত পেতে টাকা নেওয়ার মজাটাই আলাদা বল ?
শৈল: যেটা বলছিস একবার মন থেকে ভেবে বল ! আমি সত্যিই জানতাম না এটা তোদের বাড়ি। আর আমার পড়াশোনা ,আমার ক্লাস,আমার ক্লাসের সম্মান তোর কাছে তো কিছু অজানা নয় !
দীপু: কি জানব বল? আমিতো তোকে কোনোদিনো ক্লাসে অসম্মান করিনি !
শৈল: কিন্তু কেউ অসম্মান করলে কখনো কোনো প্রতিবাদও করিসনি। বরং হাত ছেড়ে দিয়েছিস বহুবার।
দীপু: হুম দিয়েছি। দিতে বাধ্য হয়েছি ।কারন তুই জানতিস।টিন এজ লাইফের আবেগে তুই যেটা চাইতিস আমার পক্ষে দেওয়া সেটা কোনো দিনো সম্ভব ছিলনা !
শৈল: জানি।সব জানি। আজ আর কিছু জানতেও চাইনা ! শুধু তুই ভালো থাক এটা সবসময় চেয়েছি ।তাই অনেক দুরে সরে গিয়েছি ।কারন একটা সময়ের পর আমি বুঝেছিলাম তোদের মতো স্বাভাবিক মানুষদের কাছে আমাদের কিছুই চাইতে নেই ! ভাগ্যের কি বিড়ম্বনা দ্যাখ! আবার হয়ত দুদিন বাদে তোর সন্তান কে কোলো নিয়ে তোর কাছেই আমাকে চাইতে হবে । তবে এবারটা প্রেম নয় । পয়সা !
দীপু: আমার সন্তান তো দুরের কথা । ঈশ্বর করুন তোর ওই মুখটাই যেন আমাকে কখনো দেখতে না হয় !
শৈল সেদিন কাঁদতে কাঁদতে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিল। একেতে রাগ, তার ওপর দেরি হচ্ছে দেখে জবা আর গীতা অটো নিয়ে অনেক আগেই বেরিয়ে পড়েছিল । অনেক দিনের পুরানো ব্যথা নতুন শহরে আজ আবার অনেক দিন পরে করুন সুরে বাজছিল ! শৈল বুঝে পাচ্ছিল না এমনটা কেন হয় তার জীবনে বারংবার । সে সারারাত ছাতা মাথায় শহরের ওপর দিয়ে বৃষ্টি ভেজা পথে হেঁটেছিল…
♦♣♦ ♦♣♦ ♦♣♦
❤ Support Us








