Advertisement
  • কে | রি | য়া | র-ক্যা | ম্পা | স ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
  • আগস্ট ২৭, ২০২৩

ধারাবাহিক আত্মকথা : আমাদের বিদ্যানিকেতন

জাকির হোছেন্
ধারাবাহিক আত্মকথা : আমাদের বিদ্যানিকেতন

আমিত্বহীনতার বৃত্তান্ত

 
কমিউনিস্টদের পূর্বতন মহাতীর্থ মস্কোকে, মস্কোর আশপাশের মফস্বল এলাকাকে টানা একমাস জুড়ে নিবিড় দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলেন গুয়াহাটির এন.ই.এফ এর শিক্ষাগুরু । তাঁর ওই দেখার চোখ আলাদা, কখনো বাঁকা, কখনো নিখুঁত পর্যটকের প্রগাঢ় বিস্ময়ে মিশ্রিত । খুঁজে দেখলেন ইতিহাসের বইয়ে পড়া সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজধানীর সঙ্গে ভাঙনোত্তর ওই দেশের নির্মানমুখর আর মুক্ত চিন্তাভাবনার বিন্যাস পর্ব । যেখানে উধাও অহেতুক সন্দিগ্ধ নজর, গরহাজির নিময়তান্ত্রিকতার আরোপিত বিধান । আগের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবরোধকে হটিয়ে অবাধ পরিসর খুঁজছে নতুনের প্রাণ চাঞ্চল্য; প্রকাশ্যে আড়ালেও, সংঘাত চলছে মস্কো বনাম মস্কোর । নব জাগ্রত এই রাশিয়া থেকে সম্রাজ্যবাদী, সামন্তবাদী জার শাসিত রাষ্ট্রের কিংবা বৃহত্তর সোভিয়েত ইউনিয়নের মিল নেই । আবার সংযোগও বিস্তর । মিল ঝকঝকে রাস্তাঘাটে, নগর বিন্যাসে, বড়ো বড়ো ইমারত আর বহুস্তরীয় পরিকাঠামোর নবায়নে। অমিল তলে তলে।
 
ক্ষয়িষ্ণু যাপনের শিকড় ছুঁয়ে সজোরে টান দিয়েছিল গর্বাচভ আয়োজিত গ্লাসনস্ত আর পেরেস্ত্রিকা, এতেই খান খান সাজিয়ে তোলা শৃঙ্খলার দাসত্ব, যার পূর্বাভাস বহু আগে আচ করেছিলেন বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ, ১৯৩০ সালে। ভেবেছিলেন ভবিষৎদ্রষ্টা কবি— নিয়মের যান্ত্রিকতা ভেঙ্গে পড়বে, হাঁপিয়ে উঠবে শাসিত জনশক্তি ।
 
একমাসের মস্কো সফরে মুক্তপ্রাণের, মুক্তচিন্তার, মুক্ত আবহাওয়ার দৃষ্টিগ্রাহ্য অব্যক্ত ছবিতে কী অবিষ্কার করলেন স্বপ্নময় শিক্ষাব্রতী ? পুরাতনকে কেবলই বর্জনের চিত্রমালা ? না নব্য চিন্তার সংযোজনও আকৃষ্ট করল তাঁর বস্তুনিষ্ঠ, তথ্য ও তত্ত্ব নিরপেক্ষ ভাবনাকে ?
 

সম্পাদক
২২.০৮.২০২৩

 
 

• নবম পর্ব •

মাত্র ৭২ ঘন্টায় তাসখন্দের সফর শেষ । বরাদ্দ সময় এইটুকুই । সফরের মেয়াদ বাড়ানোর উপায় নেই, পরের ওপর নির্ভরশীল, পকেটও ক্রমশ শূন্য হয়ে আসছে, ব্যয়বহুল মহানগর । যান-বাহন বলতে ট্রাম, মেট্রো আর রেল, ট্যাক্সি। কোত্থেকে কোথায় যেতে হবে, জানা নেই, স্থানীয় লোকজন রুশ আর উজবেক ছাড়া অন্য কোনো ভাষা জানে না, উর্দু, হিন্দি তাঁদের আয়ত্তের বাইরে, ইরানি, তুর্কি কিংবা আরবি জানা এরকম কোনো লোকের সঙ্গে আমার হয়নি, আমিও এসব ভাষায় জবরদস্ত অক্ষর, ঘুসি মারলেই তুর্ক-ইরানি শব্দ মুখ দিয়ে বের হবে না, চলা ফেরার শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে, কখনো শহরের প্রান্তিক এলাকায় ইতিহাসের নিদর্শন দেখতে ছুটে বেড়াচ্ছি । বই পড়ে যতটা, চির জীবন্ত ইতিহাসের পাশে দাঁড়িয়ে, দূর থেকে তার অতীতের দিকে তাকিয়ে মানুষ, শেখে অনেক বেশি। ইতিহাস অবশ্যই চলমান সঙ্গী।
 
আমার তাসখন্দ সফরের অভিজ্ঞতা সীমাবদ্ধ । বইয়ের চোখে কয়েকহাজার বছরের অতীতকে খুঁজতে হয়েছে যা ছড়িয়ে আছে মধ্য এশিয়ার বহুজনগোষ্ঠী, রাজা বাদশাহ আর তখনকার সাম্রাজ্যবাদীদের জয় পরাজয়ের কাহিনি আর তথ্যপ্রমাণে ।
 
এই সফরে আমি খুবই উপকৃত বোধ করছি । পাহাড়ি, অনুর্বর, জনপথবিহীন হলেও হাজার হাজার বছর জুড়ে, মধ্য এশিয়ায় বিস্তীর্ণ অঞ্চলে যে একসময় হিন্দু সভ্যতা, অহিংস বৌদ্ধধর্ম, ইরানের সাসানীয় রাজশক্তি, সেলুসিড সাম্রাজ্য, গ্রিকো ব্যাকটিয়ান রাজারা এবং আরবরা তাদের আধিপত্য বিস্তার করেছিল, গড়েছিল মিশ্র সভ্যতা । ওসমান তুর্কিরাও কয়েক যুগ ধরে রাজত্ব করেছে । এরকম বহু বিজয়ী শক্তি উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান সীমান্ত ঘেঁষা আফগানিস্তান ঢুকেও স্থানীয় সংস্কৃতি কিংবা ভাষাকে মুছে দিতে পারেনি । এক রাজশক্তি বিদায় নিয়েছে, তাদের শূণ্যতা পূর্ণ করেছে অন্য বিদেশি শক্তি, তবু স্থানীয় রীতিনীতি ও ভাষাকে খর্ব করতে পারেনি । এখনো পুরনো দিনের অজস্র নিদর্শণ দাঁড়িয়ে আছে স্বগৌরবে । কোনো রাজশক্তিই পূর্বস্মৃতিকে অতিক্রম করতে পারেনি, বরং সশ্রদ্ধায় অক্ষত রেখেছে কী কুষাণ, কী বৌদ্ধ, কী জুরাস্ত্রীয়, কী তুর্কিজাত মিশ্র রীতির দৃষ্টান্ত ।
 
ইসলামের স্বর্ণযুগে সাত শকত থেকে ১৩ শতক পর্যন্ত, কঠোর রক্ষণশীলতার বদলে সমরখন্দ, বুখারা, খিভ শহরগুলিতে এক ধরণের মুক্ত চিন্তা বিরাজ করত । বাগদাদ কিংবা স্পেন থেকে আরব ইরানি ভাবুকদের বিদ্যাচর্চার পীঠস্থান হয়ে ওঠে মধ্যএশিয় ভূখন্ড । ওমর খৈয়ামকে আমরা পারসি দার্শনিক,কবি বলে জানি । মধ্যযুগের সেরা চিকিৎসা বিজ্ঞানী আবু আলি সিনারও বিকাশ মধ্যএশিয় সন্নিবেশিত অঞ্চলে । তাসখন্দ তখন ওই এলাকার আর্থিক ও সাংস্কৃতিক রাজধানী । আগেই বলেছি, গোটা ভূখণ্ড তখন সিল্করুটের অন্তর্ভূক্ত । ফরাসি, ইংরেজরা যখন জলপথে নৌবাণিজ্য শুরু করল, রাস্তা বদলাল আমদানি রফতানির । সিল্করুটের ক্ষমতা হ্রাস পেল । সম্রাজ্যবাদী জার আমল, চিনও নজর ফেরাল ভিন্ন পথে । পরে, বলশেভিক বিপ্লবের পর আবার চাকা ঘুরল, মধ্য এশিয়ার হৃত গৌরব ফিরে পাবার প্রত্যাশা জাগাল । সোভিয়েত ইউনিয়ন ধীর কৌশলে, তীক্ষ্ণ সতর্কতায় মধ্যএশিয়াকে নিয়ে এল স্ববলয়ে, কিন্তু আফগানিস্তান আর ইরানকে এড়িয়ে গেল । ব্যস্ত হয়ে পড়ল পূর্ব ইউরোপ নিয়ে । চিনে মাওসেতুঙের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হল বটে, কিন্তু দুই বৃহৎ সাম্যবাদী শক্তি একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েও সরাসরি সঙ্ঘর্ষে জড়াল না । কমিউনিস্টদের ওই কৌশলগত অবস্থানের কারণ কী ?
 
আমেরিকা আর পুঁজিবাদী ইউরোপের যাবতীয় ষড়যন্ত্র রোখাই কি তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠলো । ইউরোপ ও এশিয়াপন্থী তুরস্ক, ইসলামি দুনিয়ার প্রশ্নহীন অভিভাবক সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন মুসলিম ভূখণ্ড থেকে প্রত্যক্ষ দৃষ্টি সরিয়ে নিল উদীয়মান আর শক্তিধর দুই কমিউনিস্ট মহাশক্তি । রাশিয়ার বিলম্বিত প্রবেশে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকে, সোভিয়েত ইউনিয়ন স্বাধীনতা প্রিয়, দুঃসাহসী, ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির রুচি অভ্যাসে হস্তক্ষেপ করল না, টিঁকিয়ে রাখল তাদের অস্মিতা ।
 
১৮শ শতকের শেষ দিককার কথা। আঞ্চলিক শক্তি তাদের ভিত শক্ত করতে চাইল। খিভ, বখারা আর কুকন সাম্রাজ্যের পতন হল, নতুন শক্তিবর্গ প্রভাব ছড়াল মধ্যএশিয়ার মধ্যস্থলে, জোর বাড়াল সামরিক শক্তি, সেচ ব্যবস্থা গড়ে তুলল । ঠিক ওই মুহূর্তেই কাজাকিস্তানে প্রভাব বাড়ছে রাশিয়ার, ভারতে তখন ব্রিটিশ রাজশক্তি সুপ্রতিষ্ঠিত, মধ্য এশিয়া দুই মহাশক্তির (রাশিয়া ও ব্রিটিশ) বিস্তৃত ক্রীড়াঞ্চল (গ্রেট গেম) । এলাকা দখল আর প্রভাব বিস্তারে তারা ব্যস্ত, কিন্তু মধ্য এশিয়ার ভাঙনমুখর শক্তি বুঝতে পারল না যে, তারা ইউরোপের দুই প্রবল রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখলের পরীক্ষাগার হয়ে উঠেছে, পরপর যুদ্ধে বিধ্বস্ত সামন্তবাদী কাঠামো ।
 
উনিশ শতকেই বৃহত্তর রাশিয়া তার সতর্কতা বাড়িয়ে তোলে, ব্রিটিশদের রুখতে চাইল, ব্রিটিশরা গায়ের জোরে রুশদের বস্ত্রশ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করছে । ইতিমধ্যে মধ্য এশিয়ার বস্ত্র, যুযুধান শক্তিবর্গের আর্থিক ক্ষমতার প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে, ইউনাইটেড স্টেসও বাজার নিষন্ত্রণে সমান উৎসাহী, বস্ত্র সরবারহে রাশিয়ার ভূমিকা নিষিদ্ধ করে দিল, মধ্য এশিয়ার বস্ত্র, সূতো তখন রাশিয়ার আয়ের বড়ো উৎস । রাশিয়া যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে বাধ্য হল, ১৮৫০ সালের শেষের দিকে ককাসাস এলাকা পুরোপুরি দখল করে নেয়, তাসখন্দ, কোকানন্দ, সমরখন্দ ছাড়তে হল ব্রিটিশ সেনাকে । ১৮৬৮ সালে, ফারগান উপত্যকার আওতাভূক্ত কোকনাদ দখল করল রাশিয়া, ১৮৭৩ সালে খিভ এবং ১৮৭৬ এর মধ্যে উজবেকিস্তান রুশদের দখলে কিংবা প্রভাবের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেল। খিভ ও বুখারার সঙ্গে রাশিয়ার চুক্তি হল, বিদেশি আগ্রাসন থেকে তারা তাদের রক্ষা করবে, তাদের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেবে মস্কো । ওই সময়ে রাশিয়া সমরখন্দ ও বুখারায় পরিকাঠামো গড়ে তোলে, নিজের স্বার্থেই, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন সূচিত হতে থাকে, উজবেক জনতা ও সামন্তশক্তি নিজেদের অনেকটা নিরাপদ অনুভব করল, উত্থান ঘটল স্থানীয় মধ্যবিত্তের, বস্ত্রপণ্যের উন্নয়ন রাশিয়ার ভূমিকায়— তারা স্বস্তি বোধ করল, রেহাই পেল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের ঔপনিবেশিক শোষণ থেকে, রাশিয়া ধীরে ধীরে পুরো মধ্যএশিয়ার রক্ষক, সদর্থক তার দৃষ্টিভঙ্গি ।
 
মধ্য এশিয়ায় এই মুহূর্তে বিচক্ষণ অথবা প্রবল রাজশক্তির প্রকট অভাব। আধুনিক শিক্ষা থেকে জনগণের অবস্থান অনেক দূরে। গোত্রীয় প্রভাব ও বিরোধে দীর্ণ ছোট ছোট রাজ্য, যা জাতি রাষ্ট্র নয়, জাতিরাষ্ট্রের মোহ আর অসংগঠিত আত্মপরিচিতি নিয়ন্ত্রণ করে তাদের সামাজিক শক্তিকে। রাশিয়া, তাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান ও সংলগ্ন ভূখণ্ডের এসব মনোভাবকে ব্যবহার করে কৌশলে, মূলত অর্থনৈতিক স্বার্থে । ব্রিটিশের সাম্রজ্যবাদী আগ্রাসনকে রুখতে।
 
তার মানে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রধানত নির্ভর করে অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর। এই ভিত দুর্বল হলে, রাষ্ট্র আর জনতা উভয়পক্ষই পরনির্ভর কিংবা পরাশক্তির দ্বারস্থ হয়ে ওঠে। ওইসব শক্তিও স্বস্বার্থে শিল্প আর উন্নয়নের মোহ দেখায়, স্থানীয় রসদকে ব্যবহার করে রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদনে ঐকান্তিকতা প্রদর্শন করে । ১৯১৭ সালের, বলশেভিক বিপ্লবের আগেই রাশিয়ার মধ্য এশীয় নীতিতে বদলের চিহ্ন দেখা দেয় । বিপ্লবের পর, বস্ত্র নির্ভর শিল্প কারখানা গড়ে তোলার স্বার্থে, রেলপথের দ্রুত উন্নয়ন ঘটে যায় । জার আমলের রাশিয়াই এ কাজ শুরু করেছিল, তখনই বস্ত্র উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পায় । মধ্য এশিয়ায় খাদ্য উৎপাদনের ঘাটতি ছিল না, সঙ্কট ছিল বস্ত্র চাষে, রাশিয়ার হস্তক্ষেপ আর সহযোগিতায় তৈরি হল উভয়ের ভারসাম্য, কৃষক প্রথাগত চাষবাস থেকে বস্ত্রের কাঁচামালের রসদ জোগাতে । রুশ বিপ্লবের আগেই মধ্য এশিয়ায় এও আরেক নিঃশব্দ বিপ্লব । এ বিপ্লব মধ্য এশিয়াকে, বিশেষ করে উজবেকিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রবেশকে সহজতর করে তোলে । লেনিন বুঝতে পেরেছিলেন, ব্রিটিশদের রুখতে হলে, মধ্য এশিয়ার খন্ড খন্ড আত্মচেতনাকে গুরুত্ব দিতে হবে । স্থানীয় মানুষের ভাষা ও যাপনের অভ্যাসে জোর খাটানো চলবে না, মানতে হবে তাদের সহজিয়া ঐতিহ্য,ধর্ম আর গোত্রজাত ঐতিহ্যকে । দ্বিতীয়ত অর্থনৈতিক বুনিয়াদের ভিতকে স্বনির্ভর করে তুলতে হবে রাষ্ট্রের সহযোগিতায় । কমিউনিস্ট সমাজতন্ত্রের সঙ্গে ইসলামের গোত্রীয় ও প্রাথমিক সাম্যবাদের পরোক্ষ সংযোগ মধ্য এশিয়ায় বিভিন্ন জাতিকে, আমার ধারণা ব্যাপক উৎসাহিত করে তোলে । তারা বুঝতে পারে, কমিউনিস্ট রাশিয়া তাদের শত্রু নয়, বরং নিরপেক্ষ মিত্র। সোভিয়েত রাশিয়ার প্রবেশে ব্রিটিশ ও আমেরিকার ঔপনিবেশিক মনোভাবের চেহরা আরো বেশি করে চিনতে পারল উজবেক, আজিক ও অন্যান্য জনগোষ্ঠী যে, কমিউনিস্টরা শোষক নয়, সাম্রাজ্যবাদী সাম্যবাদকে ছড়াতে চাইছে, বদলাতে চাইছে উৎপাদনের ভিত ও প্রথাগত চাষবাস । কয়েক দশকের মধ্যেই দেখা গেল, মধ্য এশিয়া বদলে যাচ্ছে, চাষবাসের জায়গা নিচ্ছে বস্ত্র নির্ভর কলকারখানা, নগরায়নেও পরিবর্তনের উদ্দীপনা । শিক্ষাব্যবস্থা বদলে যাচ্ছে । স্থানীয় বণিক আর জমিদার শ্রেণীর সন্তান সন্ততিরা মস্কোমুখী হয়ে উঠছে । বাড়ছে বিজ্ঞান চর্চা ও বিজ্ঞান চেতনা, দেশের নানা অঞ্চলে কর্মসারিতে যোগ দিচ্ছে তরুণ প্রজন্ম ।
 

চিকিৎসা বিজ্ঞানী আবু আলি সিনা এবং দার্শনিক কবি ওমর খৈয়াম

চিকিৎসা বিজ্ঞানী আবু আলি সিনা এবং দার্শনিক কবি ওমর খৈয়াম

ইতিমধ্যে প্রথম মহাযুদ্ধের মতো সর্বগ্রাসী ঘটনা বিশ্বকে কাঁপিয়ে তুলল, পূর্ব উজবেকিস্তানে গণবিদ্রোহ দেখা দিল ১৯১৬ সালে, কাজাকিস্তান আর উজবেকিস্তান জুড়ে তীব্র অসন্তোষ, উজবেক জনগোষ্ঠী অনুভব করল, বলশেভিক বিপ্লব তাদের শোষণ মুক্তিকে ত্বরান্বিত করবে, বস্তুত তাই ঘটল । ইতিহাস বইয়ে যে কঠিন কর্কশ সোভিয়েত ইউনিয়নকে এতদিন আমরা দেখেছি, পশ্চিমি প্রচার আর প্ররোচনায় যা আমাদের এতদিন দুর্ভেদ্য বন্দীশালা মনে হয়েছে, তাসখন্দ সফরের সুযোগ তা খতিয়ে দেখার সুযোগ ঘটল এবার ।সমরখন্দে তিনদিনে বারবার মনে হয়েছে, অন্যের চোখ দিয়ে এপর্যন্ত যা দেখেছি, ভিন্নজনের কানে যা শুনেছি, তার সবটা সত্য নয়। অর্থসত্য। অর্থসত্যের স্বরূপ উদঘাটন দরকার। জরুরি অখণ্ড, অবিভক্ত রাশিয়ার ইতিহাসের পর্যালোচনা। এরকম হলে যান্ত্রিকতাময় ইউরোপ আর আমেরিকার বিবেচনা আর ভাষ্যের সত্যমিথ্যার প্রশ্নহীন দাসত্বকে লঙ্ঘন করে গুরুত্ব দিতে হবে নিজের যুক্তি আর বিবেক কে ?
 

এনইএফ নার্সিং কলেজে, আর্তের সেবায় শপথ পাঠে শিক্ষার্থীরা

আমিত্বকে আমল দিই না । যার কোনো আত্ম নেই, সে কেন আত্মকথা বলবে ? সমাজ আর ইতিহাস কী ভাবছে, দর্শন কোন দিকে এগোনোর নির্দেশ দিচ্ছে, সেটাই আমার প্রধান বিবেচ্য । একাধিক শিক্ষা ক্যাম্পাস নির্মাণের এটাই প্রধান শর্ত ।এজন্যই এই শতকের শেষ পর্বে, অসমের মতো দারিদ্র্য পীড়িত, অনুন্নত রাজ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রবেশ করার আগে সোভিয়েত ইউনিয়নের এককালের অঙ্গরাজ্য উজবেকিস্তানে প্রবেশ করি প্রথম। ওখান থেকে, বৃহত্তর প্রেক্ষাপটকে তলিয়ে দেখতে উড়ে গেলাম কমিউনিস্টদের একদা মহাতীর্থ মস্কোতে। বিমানে সাড়ে তিন ঘন্টার যাত্রা। তাসখন্দের উত্তর পশ্চিমে। দুই শহরের দূরত্ব ৩৩৭৯ কিলোমিটার। এই দূরত্বের মতোই ব্যাপক তারতম্য তাদের নগর আর জনবিন্যাসে। যা বিস্তৃতভাবে বলা দরকার। পাশাপাশি, জরুরি ভাঙানোত্তর রাশিয়ার মুক্তযাপন, মুক্ত চিন্তা আর নবায়িত রাষ্ট্রের প্রশাসন ব্যবস্থা থেকে শিক্ষা ব্যবস্থা পর্যন্ত বহুমুখী অভিমুখের বিশ্লেষণ।এটাও আমার একমাসের মস্কো সফরের অন্যতম লক্ষ্য।
 
ক্রমশ…

♦—♦♦—♦♦—♦♦—♦

 
লেখক: উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রথম বেসরকারি কলেজ গোষ্ঠী এন.ই.এফ-এর চেয়ারম্যান। গুয়াহাটির বাসিন্দা
 
আগের পর্ব পড়ুন: অষ্টম পর্ব

ধারাবাহিক আত্মকথা : আমাদের বিদ্যানিকেতন


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!