Advertisement
  • খাস-কলম পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • মে ৭, ২০২৩

বাংলার ব্যালট ব্যাটেল

শিবপ্রিয় দাশগুপ্ত
বাংলার ব্যালট ব্যাটেল

বাংলায় নির্বাচন মানেই ব্যালট ব্যাটেল। কার দখলে ব্যালট পেপার থাকবে, কে বুথ দখল করে “ভোট করাবে”, তার ওপর বাংলার কে শাসক হবে সেটা নির্ভর করে। এই রীতি কমবেশি বাংলার রাজনীতির পরিচিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৮ সালে বাংলার পঞ্চায়েত নির্বাচন কি ভাবে, কেমন ভাবে হয়েছে সেটা বঙ্গবাসী প্রত্যক্ষ করেছে। তৃণমূলের বিরুদ্ধে প্রার্থী দিতে গিয়ে বিরোধী শিবিরের মহিলা প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় রাস্তায় ফেলে মারা হয়েছে। এই ঘটনা সবচেয়ে যে জেলায় বেশি হয়েছিল সেই জেলার নাম বীরভূম। শান্তির দূত রবীন্দ্রনাথের বীরভূম তখন হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক অশান্তির আঁতুরঘর। আর এর নেপথ্যে ছিলেন বীরভূমের এক সময়ের বেতাজ বাদশা অনুব্রত মণ্ডল, যিনি এখন গরু পাচারের অভিযোগে দিল্লির তিহার জেলে কন্যা সহ রয়েছেন।

বাংলার পঞ্চায়েত নির্বাচনকে এই অশান্তির আবহ থেকে বার করে আনতে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ৬০ দিনের তৃণমূলে নবজোয়ার কর্মসূচি নিয়ে রাজ্য সফরে বেড়িয়েছেন ২৫ এপ্রিল, কোচবিহার থেকে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই কর্মসূচির পিছনে একটা মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে,তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তিনি ভারতের নির্বাচনের মূল স্লোগান “নিজের ভোট নিজে দিন” এর আদলে নিজের প্রার্থী নিজে নির্বাচন করুন স্লোগান তুলে রাজ্য জুড়ে জনসংযোগ কর্মসূচি শুরু করেছেন। তাঁর বক্তব্য, দল নয় , পঞ্চায়েতের প্রার্থী ঠিক করবে দলের সমর্থকরা। যিনি ৩৬৫দিন ২৪ ঘণ্টা মানুষের পাশে থাকতে পারবেন বলে দলের কর্মীরা মনে করবেন, মানুষ মনে করবেন তিনিই হবেন পঞ্চায়েতের প্রার্থী। এই কর্মসূচির অঙ্গ হিসেবে অভিষেক জেলায় জেলায় এই পঞ্চায়েতের প্রার্থী নির্বাচনের জন্য গণভোটের ব্যবস্থাও রেখেছেন।

তবে ২৫ এপ্রিল অভিষেকের এই জনসংযোগ কর্মসূচির শুরুর  দিনই ছন্দ কেটে যায় সিতাইয়ে । অভিষেক সিতাই-এর সভা শেষ করে চলে যাওয়ার পরই তৃণমূলের পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে তৃণমূলের গোষ্ঠী সংঘর্ষ হয়। লুঠ হয় ব্যালট পেপার, ব্যালট বক্স। তারপর সেই প্রথম দিনই মাথাভাঙ্গায় রাতে আবারও অভিষেকের সামনেই গণভোটের আয়োজনে অভিষেকের সামনেই গোষ্ঠী সংঘর্ষে জড়িয়ে পরে তৃণমূলের কৰ্মী-নেতারা।

এর পর আমরা পর পর দেখেছি অভিষেকের এই জনসযোগ কর্মসূচি বার বার তৃণমূলের গোষ্ঠী সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে তৃণমূলের নবজোয়ার । এরই মধ্যে হরিরামপুরে ব্যালট পেপার নিয়ে নিয়ে সংঘর্ষ হয়েছে ২ মে। সিতাই, মাথাভাঙায় প্রথম নবজোয়ারের দিনই তৃণমূলের বিবদমান দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

সিতাইয়ের ঘটনার পর অভিষেক দলের কর্মীদের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, বলেছিলেন, গায়ের জোরে ব্যালট লুঠ হতে দেবেন না। পাহারাদারের মনাম অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে কি অভিষেকের এই হুঁশিয়ারি দলের কর্মীরা মানছেন না? কেননা যত এই জনসংযোগ কর্মসূচির দিন সংখ্যা বাড়ছে ততই  কোনও না কোনও জেলা থেকে এই কর্মসূচিতে তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যেকার অশান্তি ও ব্যালট ছিনতাই, ব্যালট বাক্স ভাঙার ঘটনা ঘটছে।
মালদায় অভিষেকের উপস্থিতিতে ব্যালট পেপার , ব্যালট বাক্স নিয়ে হাতাহাতি হয়েছে। মালদার বিনোদপুরে যখন অভিষেকের জনসংযোগ যাত্রা পৌঁছয় তখন সেই দুপুরেই  গ্রামবাসীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নবজোয়ার যাত্রা। অভিষেকের সামনেই ওই জেলার পঞ্চায়েত শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষ প্রতিমা শীলের বিরুদ্ধে স্লোগান ওঠে প্রতিমা শীল চোর বলে। বিনোদপুর গ্রামে ঢুকতেই মালদা জেলা পরিষদের শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষ প্রতিমা শীলের নামে তৃণমূল কর্মীরা অভিযোগ করেন ও লিখিত অভিযোগপত্র অভিষেকের হাতে জমা দেন। অভিষেক অভিযোগ শুনে সমাধানের আশ্বাস দেন। তবে অভিষেক বলেন বিক্ষোভকারীরা তৃণমূলের কেউ নয় এরা সিপিএম। এর পর মালদার ইংরেজ বাজারেও অভিষেকের উপস্থিতিতে ব্যালট বাক্স নিয়ে তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে।

বিনোদপুরের ইংরেজ বাজারে তৃণমল কর্মীরা রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদ ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জিন্দাবাদ স্লোগান দেন, রাজ্যের মানুষের নজরে এই ঘটনা এসেছে। এই স্লোগান যখন চলছে অভিষেক তখন ওই রাস্তায় জনসংযোগ কর্মসূচিতে ছিলেন।মালদার জেলা সভাপতি এই ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন এটা চক্রান্ত হতে পারে খোঁজ নিচ্ছি। বিজেপি জেলার নেতা অম্লান ভাদুড়ি এই ঘটনায় বলেন দলটাই গোষ্ঠী কোন্দলে জেরবার।
উত্তর দিনাজপুর জেলায় তৃণমূলের সংগঠনের অবস্থা খারাপ  বুঝেই সাংগঠনিক সভা ডাকেন অভিষেক। এই জেলায় একের পর এক ঘটনায় মুখ পুড়েছে রাজ্যের শাসক দলের। তার ওপর আব্দুল করিম চৌধুরী ও জেলা সভাপতি কানহাইয়ালাল আগরওয়ালের দ্বন্দে বেহাল দোষ জেলার তৃণমূল সংগঠনের।
ইসলামপুরে অভিষেকের নবজোওয়ারে আসেননি করিম চৌধুরী। ইসলামপুরের পর ইটাহারেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নবজোয়ারে তৃণমূল বিধায়ক আবদুল করিম চৌধুরী অনুপস্থিত ছিলেন। আমন্ত্রণ পেলেও অভিষেকের ডাকা সাংগঠনিক বৈঠকে গরহাজির থাকলেন তিনি। বারবার দলীয় কর্মসূচি এড়ানোয় তৃণমূল তাঁর বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করে কি না তা নিয়ে দলের মধ্যেই গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
ইসলামপুরে অভিষেকের সভার দিন সভাস্থল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে নিজের বাড়িতে বসে ছিলেন করিম চৌধুরী। তাঁকে ঘিরে রেখেছিলেন সমর্থকরা। সেখানেই সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি স্পষ্ট বলেন, পঞ্চায়েতের প্রার্থী নির্বাচনের এই পদ্ধতি তিনি মানেন না। কে ভোট দিচ্ছে, কেন ভোট দিচ্ছে কিছুই জানেন না তিনি। এমনকী তিনি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে চেনেন না বলেও মন্তব্য করেন। বলেন, অভিষেকের সঙ্গে কোনও দিন দেখা হয়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমার নেত্রী। করিম চৌধুরী আরও বলেন, অভিষেক তাঁকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গেলে তবে তিনি সভায় যাবেন। সঙ্গে তাঁর হুঁশিয়ারি, তাঁর তৈরি করা প্রার্থীতালিকায় দল সম্মতি না জানালে নির্দল হয়ে লড়বেন তাঁরা।এবং নিজেকে বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়ক বলেই করিম চৌধুরী ঘোষণা করেন।

কর্ণাটকে ১০ মে বিধানসভা নির্বাচন। সেই রাজ্যের শাসক দল বিজেপি নির্বাচনী ইস্তেহারে ঘোষণা করেছে, নির্বাচনে জিতে এলে রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি আইন প্রণয়ন করবে। ওই রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন ঘোষণার মুখেই শাসক দল ৪% সংখ্যালঘু সংরক্ষণ তুলে দিয়েছে। কর্ণাটক রাজ্যে যে বিধানসভা নির্বাচন হতে চলেছে সেটা সেই রাজ্যের মানুষ বুঝতে পারছেন না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে রাজ্যের শাসকদলের বিবদমান দুই গোষ্ঠী বুঝিয়ে দিচ্ছে ভোট কাকে বলে। গান্ধীজি চেয়েছিলেন, পঞ্চায়েতে দলমুক্ত প্রতিনিধিত্ব। অভিষেক চেয়েছেন দলের পঞ্চায়েতের প্রার্থী দলের কর্মীরাই নির্বাচন করবেন। তবে সেই নির্বাচন ঘিরে যা হচ্ছে তাতে দলে শৃঙ্খলা ফেরানোর বদলে দলে আরও বিভাজন বেড়ে যাচ্ছে বলে বিরোধীরা মন্তব্য করছেন। তবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যতই চেষ্টা করুন, উন্নয়নমুখী রাজনীতিতে না থেকে পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি যদি শাসকদলের আগ্রহও বাড়ে তাহলে ব্যালট ব্যাটেল যে এই রাজ্যে জারি থাকবেই তাতে সন্দেহ নেই।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!