- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- অক্টোবর ৫, ২০২৫
দেশপ্রেমী বিজয়লাল
বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়
শহর থেকে দূরে । পর্ব ৪
ষষ্ঠীর ভোরে প্রতিবছরের মতো আকাশবাণী প্রচার করল ‘দুর্গা দুর্গতিহারিণী’। প্রথমবার ১৯৭৬ সালে মহালয়ার ভোরে প্রচার হওয়ার পর উত্তমকুমারকে যখন প্রশ্ন করা হয় ‘দুর্গতিহারিণী’ কেন জনসাধারণের মনে ধরল না ? উত্তরে তিনি বলেছিলেন ঠাকুরঘরকে রেনোভেট করে বসার ঘর করা হলে যা হয় তাই হয়েছে। কিন্তু ধ্যানেশনারায়ণ চক্রবর্তীর সেই রচনাও যেমন ছিল অসাধারণ তেমনি ছিল সঙ্গীতশিল্পী এবং যন্ত্রীগণ। শুধু ছিলেন না একজন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র এবং সুপ্রীতি ঘোষের জীবনের সেরা কন্ঠদান। তফাৎ এখানেই।
গতবছর যখন কেনাকাটার শেষে কৃষ্ণনগরের কাছ দিয়ে আসছিলাম মধুমিতারা এতো গরম লাগছে কেন জিজ্ঞেস করায় বলি কৃষ্ণনগর তো কর্কটক্রান্তি রেখার ওপর দাঁড়িয়ে। গরম তো লাগবেই। এই শহরের আরো বৈশিষ্ট্য অবিভক্ত বাংলায় নদীয়ার অন্যান্য শহর যেমন কুষ্ঠিয়া, পাবনা, নাটোরের মানুষজন খুবই আসাযাওয়া করতেন বাউল, লিচু এবং আনারসের শহরে । তার বেশ কিছু চিহ্ন এখনো ছড়িয়ে আছে শহরের বিভিন্ন জায়গায়। আমি ছুঁয়েছি এই শহর একটি বন্দির বিষয়কে ঘিরে। নয়ের দশকে দমদম সেন্ট্রাল জেলের একজন বন্দির কেস ছিল তেহট্ট কোর্টে। বারবার ডেট পড়ছে কিন্তু কোর্টে পাঠানো যাচ্ছে না কারণ অস্থির চিত্তের বন্দিকে বিচার করা যায় না। আমরা কেবল ডাক্তারের রির্পোট পাঠিয়েই যাচ্ছি। একবার ডাক্তারের রির্পোট সহ জেল কতৃপক্ষের হাজিরা চাইলে আমি রওনা দিলাম। কৃষ্ণনগরে কিছুক্ষণ কাটিয়ে বাস ধরি তেহট্টের। এজলাস শুরুর আগে পৌঁছে যাওয়ার ফলে জজের কাছে কাজ হয়ে গেল দ্রুত। সেবার করিমপুরও যাই। স্মরণীয় করতে সেখানে কিনি একটি জ্যাকেট, অর্থাৎ গিয়েছি শীতকালে। শিকারপুর যেতে চাইলে কেউ সাবধান করালেন বাড়ি ফিরতে পারবেন না।
সাম্প্রতিককালে কৃষ্ণনগর মানে কবি দেবদাস আচার্য এবং সুধীর চক্রবর্তীর শহর, কবি সুধীর দত্ত ও আদম প্রকাশনীর প্রাণপুরুষ গৌতম মন্ডলের কর্মস্থল। সুধীর চক্রবর্তীর ছিল অনেকগুলো সত্তা। কবি, গদ্যকার, অধ্যাপক, সমালোচক, সঙ্গীত সমঝদার, বাউলমন ইত্যাদি। অনেকের মতো কবিতায় দাগ রেখে যেতে চাইলেও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়পর সহপাঠী ও বন্ধু উদারহৃদয় ড. সুধীর চক্রবর্তী গদ্যেই ‘আনন্দ পুরস্কার’ পেয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন । আমরা জানি ড. সুধীর চক্রবর্তীকে কিন্তু কৃষ্ণনগরবাসী বেশি জানে তাঁর দাদা দেবপ্রসাদ চক্রবর্তীকে। অকৃতদার সমাজসেবী দেবপ্রসাদ দীর্ঘদিন ছিলেন শহরের ‘রামকৃষ্ণ পাঠাগারে’র দায়িত্বে। এই পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় ছিলেন কাজী নজরুল ইসলামের বন্ধু। নজরুল কিছুদিন কৃষ্ণনগরে বাস করলেও তাঁদের প্রথম দেখা বহরমপুর জেলে। যেটি এখন মানসিক হাসপাতাল।
বহরমপুর তখন চাঁদের হাট। অধ্যাপক রেজাউল করিম, নোয়াখালি অভিযানখ্যাত নির্মলকুমার বসু, বাংলার হরিজন পত্রিকা সম্পাদক রতনমণি চট্টোপাধ্যায়, আচার্য সুধীরচন্দ্র লাহা আরো কতোজন। অতিউৎসাহী বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় জেলে বসেই গড়ে তোলেন চারণদল। চারণদলের উৎস যদিও রাজস্থান। দেশকে ভালবেসে দেশপ্রেমীদের গান রচনা এবং দল বেঁধে গাওয়া। বাংলায় এই কাজ করলেন মুকুন্দ দাসের পর বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়
একটি ধ্রুব সত্যি চালু আছে যে রোগী সেরে উঠলেও বাড়ির লোকজন তাকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে যেতে চায় না যদি বিষয়টা সম্পত্তি সম্পর্কিত হয়। একবার আমি রাঁচি মানসিক হাসপাতাল গেলে জানলা দিয়ে কিছুজনের আকুতিসহ ঠিকানা পাই আর একবার এই বহরমপুর মানসিক হাসপাতালে প্রখ্যাত প্রদীপ ঘোষকে নিয়ে গেলে অনেকে প্রদীপদাকে আকুতি মিনতি করে ঠিকানা দেয়, তারা ভাল হয়ে গেছে, বাড়ি ফিরতে চায় কিন্তু প্রদীপদার আন্তরিক চেষ্টায়ও কোনও কাজ হয়নি। পরাধীন ভারতে এই বহরমপুর জেল ছিল বহু স্বাধীনতা সংগ্রামীর তীর্থক্ষেত্র। গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনে যুক্ত হয়ে নজরুল দেখলেন এ পথে কিছু হবে না, বলে বিপ্লবীদের সমর্থন করে লিখলেন কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’: ‘হান্ তরবার আন্ মা সমর, অমর হওয়ার মন্ত্র শেখা / মাদীগুলোর কর্ মা পুরুষ, রক্ত দে মা, রক্ত দেখা।’ এমন লেখার কবিকে প্রথমে রাখা হয় হুগলি জেলে। হুগলি জেল থেকে পাঠানো হয় বহরমপুর জেলে। সেখানে তখন চাঁদের হাট। অধ্যাপক রেজাউল করিম, নোয়াখালি অভিযানখ্যাত নির্মলকুমার বসু, বাংলার হরিজন পত্রিকা সম্পাদক রতনমণি চট্টোপাধ্যায়, আচার্য সুধীরচন্দ্র লাহা আরো কতোজন। অতিউৎসাহী বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় জেলে বসেই গড়ে তোলেন চারণদল। চারণদলের উৎস যদিও রাজস্থান। দেশকে ভালবেসে দেশপ্রেমীদের গান রচনা এবং দল বেঁধে গাওয়া। বাংলায় এই কাজ করলেন মুকুন্দ দাসের পর বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়। রচনা করলেন বহু চারণ গান। কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে কৃষ্ণনগরের বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের অনেক মিল। দুজনেরই বই বাজেয়াপ্ত করেছে ইংরেজ সরকার। বিজয়লালের লেখা নিষিদ্ধ বই: ‘বিদ্রোহী রবীন্দ্রনাথ’। এবং দুটি কাব্যগ্রন্থ: ‘ডমরু’ ও ‘কালের ভেরি’। আসলে রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে বিজয়লাল কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন শান্তিনিকেতনে। তখন তাঁর ছাত্র ছিলেন সাগরময় ঘোষ। কবিগুরুর খুবই কাছের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও দেশের ডাকে বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় ফিরে এলেন নিজের শহরে গান্ধীজির আহ্বানে। গান্ধীজির সঙ্গে থেকেও বিপ্লবীদের প্রতি সমর্থন ছিল বরাবর। কৃষ্ণনগর ছিল বাঘাযতীনেরও। তাই বুড়িবালামের যুদ্ধকে স্মরণে রাখতে কাজী নজরুল ইসলাম যেমন লিখেছেন কবিতা: ‘নব ভারতের হলদিঘাট’ তেমনি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ও লিখেছেন দীর্ঘ কবিতা: ‘বুড়ীবালামের তীরে’: বুড়ীবালাম-এর তীরে / বুকের শোনিতে যেদিন তোমরা রাঙালে ধরিত্রীরে…,কে বলে এ দেশে মানুষ কেবল কল্প-কুঞ্জ-বাসী? / মোহললালের অসির সঙ্গে চণ্ডীদাসের বাঁশী…, পিতা শুনাইবে পুত্রেরে তার, ভ্রাতা ছোট ভগিনীরে / কেমন করিয়া মরিলে তোমরা বুড়ীবালাম-এর তীরে।’
বিজয়লালের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সব হারাদের গান’ এর জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে তার সংস্করণ হয়েছে বারবার। দানশীলতায় এবং পড়শিদের জন্য তিনি ছিলেন মমতায় উদ্বেল। ১৯৫৩ সালে ‘সব হারাদের গান’-এর পঞ্চম সংস্করণের ভূমিকায় লিখেছিলেন: প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি বা অর্থ রাখাকে ঋষিরা ঘোষণা করেছিলেন পাপ, কারণ বিশ্বের সব কিছুই ভগবানের। তাহলে লোভে পড়ে ভগবানের বিষয়কে আত্মসাৎ করার ফলে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ আজ সহায়সম্বলহীন
শ্রীঅরবিন্দের লেখা ছিল তাঁর খুবই পছন্দের। বিজয়লালের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সব হারাদের গান’ এর জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে তার সংস্করণ হয়েছে বারবার। দানশীলতায় এবং পড়শিদের জন্য তিনি ছিলেন মমতায় উদ্বেল। ১৯৫৩ সালে ‘সব হারাদের গান’-এর পঞ্চম সংস্করণের ভূমিকায় লিখেছিলেন: প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি বা অর্থ রাখাকে ঋষিরা ঘোষণা করেছিলেন পাপ, কারণ বিশ্বের সব কিছুই ভগবানের। তাহলে লোভে পড়ে ভগবানের বিষয়কে আত্মসাৎ করার ফলে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ আজ সহায়সম্বলহীন। উপদেশ কেউ শুনবে না, উদাহরণ চাই। তিনি করে দেখালেন স্বাধীনতার আগের বছরেই ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের কথায় তিনি কৃষ্ণনগর ছেড়ে চাপড়ায় জলঙ্গীনদীর তীরে উলুখাগড়ার জঙ্গল পরিষ্কার করে গড়ে তোলেন নতুন গ্রাম। গড়ে তোলেন ফুল ফলের বাগান। ঝুড়ি করে পাকা আমের সঙ্গে পাড়ায় পাড়ায় পাঠাতেন কবিতা: ‘কাজ শেষ হলে বেশ করে মাখি তেল খাঁটি / তার পরে জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে সাঁতার কাটি।’ ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের কংগ্রেসের হয়ে বিধায়ক হয়েছিলেন দুবার।
১৯৩৪ সালে যখন তিনি ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষের হয়ে রবীন্দ্রনাথের অনেক লেখা আনিয়ে দিয়েছিলেন যেমন তেমনি সে সময় ‘দেশ’ পত্রিকায় বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন অনেক কবিতা এবং তার থেকে বেশি প্রবন্ধ। বঙ্কিমচন্দ্র এবং হুইটম্যানের অনুরাগী বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের অসাধারণত্ব বলে শেষ করা সহজ নয়। তাঁর লড়াইও তেমনি। তাঁর বাবা ছিলেন সরকারি চাকুরে। ইংরেজ প্রভুকে চটাবেন না। মা বিজয়লালসহ ছেলেমেয়েদের নিয়ে কৃষ্ণনগরের পাট চুকিয়ে বাসা নিলেন কলকাতার বাগবাজারের উদ্বোধনী লেনে। সেই সূত্রে বাবা বাদে তাঁদের পরিবারের সকলের রামকৃষ্ণে ভক্তি। একসময় কৃষ্ণনগর শহরে রামকৃষ্ণ পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেই ক্ষান্ত হলেন না, বড় আন্দুলিয়ায় পাঠাগার, হরিজনদের নৈশ বিদ্যালয়, বালিকা বিদ্যালয়, বেসিক ট্রেনিং স্কুল, গদাধর মন্দির, খেলার মাঠ এবং কী নয় যেন মরুভূমিতে মরুদ্যান ! প্রতিবছর করতেন গদাধর মেলা। পাড়ায় পাড়ায় গরুর গাড়ি চেপে প্রচার করতেন রামকৃষ্ণ- বিবেকানন্দের বাণী। সেই ব্যক্তি-ই আবার সমাজে একঘরে হয়েছেন অন্তত দুবার। প্রথমবার কবি জীবনানন্দ দাশের পরিবারের ইলা দাশগুপ্তকে বিয়ে করে কারণ ব্রাহ্মণ ছেলে বিয়ে করেছেন ব্রাহ্ম বালিকাকে। আর একবার ১৯৪৬ সালে দাঙ্গায় লঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে গ্রামের বাড়িতে আশ্রয় দেওয়ায়। বহু জেল খাটার পর শেষবার যান কৃষ্ণনগর জেলে বিয়াল্লিশের আগস্ট আন্দোলনে যোগ দিয়ে…।
১৯৭৪ সালে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ছিলেন প্রেরণাদায়ী। এই মূহুর্তে কৃষ্ণনগরবাসী কতটা তাঁকে মনে রেখেছেন আমার জানা নেই। তবে তাঁর শতবার্ষিকী এবং সওয়া শতবার্ষিকী পালন করেছেন যথাযথভাবে নেতাজি সুভাষের আগের বছর জন্ম নেওয়া সর্বদা কর্মচঞ্চল এবং লড়াকু এই মনীষীর…
♦–♦♦–♦♦–♦
❤ Support Us








