Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • নভেম্বর ১৬, ২০২৫

নগুয়েনের দেশের ডুবন্ত কালো পাহাড়

কানাইলাল জানা
নগুয়েনের দেশের ডুবন্ত কালো পাহাড়

 
সচেতন বা অবচেতনে ‘সায়গন’ বাঙালির মনে জেগে থাকে অহরহ কারণ নেতাজি সুভাষকে শেষবার জনসমক্ষে যে দেখা গেছে ১৯৪৫ সালের ১৭ আগস্টে, সেই দৃশ্যটি হচ্ছে সায়গন বিমানবন্দরে নেতাজি সামরিক পোষাকে সন্তপর্ণে নামছেন সিঁড়ি বেয়ে। সায়গন দক্ষিণ ভিয়েতনামের দক্ষিণে। বর্তমানে নাম হো-চি-মিন সিটি। রাজধানী হ্যানয় শহরের থেকেও অনেক বেশি
ঝা-চকচকে। সেখানে প্রকট ইউরোপীয় প্রভাব আর হ্যানয়ে আমেরিকার। এতোটাই যে টিভির চ্যানেল ঘুরিয়ে পেলাম না ভারতীয় কোনও শহরের তাপমাত্রা কত, অথচ দেখাচ্ছে ঢাকা, কলম্বো, ইসলামাবাদ, কাবুলের । হ্যানয় ভিয়েতনামের রাজনৈতিক রাজধানী আর হো-চি-মিন সিটি অর্থনৈতিক। যদিও আমরা হো-চি-মিন সিটি যাবো না। এমনকি মধ্য ভিয়েতনামের দানাং। কিন্তু ‘সায়গন’ শব্দটি হ্যানয়ে থেকে গেছে নানাভাবে। সায়গন রেঁস্তোরা, অফিস, ট্যুরিইজম বুকিং সেন্টার,ব্যাঙ্ক ইত্যাদি নামে। হ্যানয়ে রয়েছে অন্যান্য ব্যাঙ্কও, নাম ভিপি, নামা, পিভিকম। রয়েছে দেশের নামেও ব্যাঙ্ক।  সুন্দর সুন্দর ব্যাঙ্কের নাম দেখেছি ঢাকায়, তারপর লক্ষ্মৌতে। হুক্কাবারের কথা পড়েছি অমরেন্দ্র চক্রবর্তীর ভ্রমণে। নিজের চোখে দেখলাম হ্যানয়ের বিভিন্ন রেঁস্তোরায় এবং বিপনণকেন্দ্রে। ইয়াংরা- ই আয়েস করে হুকো টানছে।
 

মার্কিন আগ্রাসনে ভিয়েতনামের পাঠশালা, স্কুল, কলেজ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো,চার্চ, মন্দির এমনকি প্যাগোডা খালি করে সেগুলোতে বন্দিশালা এবং কনসেনট্রেশান ক্যাম্প করেছিল। খেতখামার, মাঠে ময়দানে, মুড়িমুড়কির মতো বোম ফেলেছিল, বিভিন্ন উদ্যান ও বনভূমিতে বোম ব্লাস্ট করে ধ্বংস করেছিল বন্যপ্রানী, একন সেসবের চিহ্ন নেই

 
একসময় আমেরিকা যে দক্ষিণ ভিয়েতনামের পাঠশালা, স্কুল, কলেজ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো,চার্চ, মন্দির এমনকি প্যাগোডা খালি করে সেগুলোতে বন্দিশালা এবং কনসেনট্রেশান ক্যাম্প করেছিল বা খেতখামার, মাঠে ময়দানে, মুড়িমুড়কির মতো বোম ফেলেছিল, বিভিন্ন উদ্যান ও বনভূমিতে বোম ব্লাস্ট করে ধ্বংস করেছিল বন্যপ্রানী। হ্রদ নদী ও জলাশয়ে বিষাক্ত রাসায়নিক ফেলে মাছসহ সমস্ত জলজ প্রাণী মেরে ফেলেছিল। ফুলোই জেলার একটি কনসেনট্রেশান ক্যাম্পে ৬০০০ বন্দিকে খাবারে বিষ মাখিয়ে খেতে দিলে একদিনেই এক হাজার বন্দি মরণাপন্ন হয়। দিয়েম সরকারের এক অনুগত রাজপুরুষের বাড়ি আক্রমণ করে বিপ্লবীরা একটি বাক্সে পায় ৩৪২ টি কান। ৩৪২ জন কমিউনিস্টকে হত্যা করে সেই অনুগত পায় বড়ো অঙ্কের ভিয়েতনামি টাকা। এখন সে সবের কোনও চিহ্ন নেই। আসলে চাচা হো ( প্রকৃত নাম নগুয়েন টাট্ থান) মৃত্যুর আগে শ্রমিক কৃষক ছাত্র যুবক, সংখ্যালঘুসহ পার্বত্যজাতিকে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রত্যেকে মনে করতেন তাঁরা হো পরিবারের সন্তান। সেখানেই ছিল মুক্তির পথ। তবে এই মূহুর্তে ভিয়েতনামকে পড়তে হয়েছে সাইক্লোনের আওতায়। মাঝে মাঝেই সামুদ্রিক ঝড়-ঝঞ্ঝার কবলে পড়ে ভিয়েতনাম কারণ দক্ষিণ-পশ্চিম, দক্ষিণ এবং গোটা পূর্ব উপকূল সাগর দিয়ে ঘেরা।
 

উপসাগরে ছড়িয়ে আছে ছোটো ছোটো দ্বীপ। সারা যাত্রাপথ সাজানো ডুবন্ত কালো পাহাড় দিয়ে। ভিয়েতনামে ডং-এর প্রভাব ব্যাপক। ডং নোট, ডং সাগর, ডং রাজবংশ, ডং পাহাড় আরো কতোকিছু

 
১৪.১০.২৫, একটি ছোটো গাড়ি এসে দাঁড়াল ‘মুনভিউ’ হোটেলের সামনে। আমরাও প্রস্তুত। যাবো সোজা পূর্বদিকে লং ড্রাইভে হালং ( Halong), দক্ষিণ চিন সাগরে ক্রুজে থাকতে। পথটি দশ লেনের ঝকঝকে রাস্তা। রাস্তার দুপাশে ধানখেত এবং বিভিন্ন ফলের বাগান। এক একটি পাড়ায় আছে সমাধি ক্ষেত্র। মন্দিরের মতো সুন্দর করে সাজানো এবং প্রাচীর টেনে চমৎকার সংরক্ষিত, গেটও আছে । লাল টালি ছাওয়া ঘরবাড়ি। সম্পদ এবং সৌভাগ্যের প্রতীক এদেশে লাল। মাঝে মাঝে খরস্রোতা নদী। সবই দক্ষিণমুখি হয়ে পড়েছে দক্ষিণ চিন সাগরে। এগুলো লাল নদী, নুয়ে বা মেকং নদীর মতো প্রশস্ত নয়। পথিমধ্যে গাড়ি থামল সুসজ্জিত বিপনিতে, বিগ বাজারের মতো নয় বরং প্রয়োজনীয় ও শিল্পসম্মত জিনিসে সারি দেওয়া । হল্ট নিয়ে আবার চলল গাড়ি। বেলা এগারটায় পৌঁছোল দক্ষিণ চিন সাগরের অন্তর্গত ‘হালং’ উপসাগরের পাড়ে। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর ছোটো বোটে করে নেমে পড়ি ‘সাইরিনা ক্রুজে’ (Syrena Cruise)। হাল্কা গর্জন করে চারপাশের অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখাতে দেখাতে পৌঁছে গেল গন্তব্যে। হালং উপসাগরে ছড়িয়ে আছে ছোটো ছোটো দ্বীপ। সারা যাত্রাপথ সাজানো ডুবন্ত কালো পাহাড় দিয়ে। এগুলো ‘ডং ত্রিয়েন রেঞ্জের’ অন্তর্গত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ডুবন্ত পাহাড়। সারা দেশে যেখানে বিস্তৃত আন্নামাইট পর্বতমালা। ভিয়েতনামে ডং-এর প্রভাব ব্যাপক। ডং নোট, ডং সাগর, ডং রাজবংশ, ডং পাহাড় আরো কতোকিছু। দুপুরে তিনতলায় খাওয়া দাওয়া। আমাদের সঙ্গে আছেন কলকাতার দশ জনের একটি মহিলা দল, বাকিরা বিদেশি। আছেন অন্ধ্র এবং কেরলের দুই নবদম্পতি। এখানেও বুফে পদ্ধতিতে খাওয়া। টেবিলে সাজানো নানা ধরনের খাবার, ফল, মিষ্টি,সাদা ভাত, পোলাও, ফ্রায়েড রাইস, সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি, চিকেন,তরিতরকারি, পানীয় । যে যার মতো খেলাম, কোনও অসুবিধে হয়নি। বিভিন্ন তলায় রুম বন্টন হলে বিশ্রাম নিয়ে ছাদে যাই। চারপাশে নীল জল, ক্রুজ আর কালো পর্বত চুড়ো। ছোটো বোটে করে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল অন্য একটি দ্বীপে, একটি জলের সুড়ঙ্গ পেরিয়ে। বৃষ্টি শুরু হল। তবুও ‘টিটপ’ দ্বীপের বালুচরে চলছে হৈ-হল্লা, খেলাধুলো, আনন্দের শেষ নেই। পাহাড়ের টপে অবশ্য কেউ উঠছে না বৃষ্টির দাপটে ! ফেরার পর আলো ক্রমশ কমে এল। অন্ধকার সমুদ্রের আর এক রূপ। ছাদে গিয়ে উপভোগ করি অন্যান্য ক্রুজে মাতোয়ারা করা নাচ গানের আসর সঙ্গে আলোর রোশনাই । আমাদের এখানে স্পেনের মহিলাদল সারাক্ষণ হাসি মস্করায় মাতিয়ে রেখেছেন, বাধা মানেনি ভাষা। ক্রুজে ক্লাস হয় যোগব্যায়াম, রান্না এবং খুশিতে থাকার আর্ট।
 

পরের দিন সকাল সকাল অভিযান সাঙ সট কেভ-এ (Sung Sot cave)। সিঁড়ি বেয়ে সমুদ্রতলের থেকে আরো নিচে নামতে হল। চুনাপাথরের রঙিন পাহাড়। যেমন ভীড় তেমনি রোমাঞ্চকর পথ পরিক্রমা। এই গুহায় নাকি গেরিলাযুদ্ধের সৈন্যরা আশ্রয় নিতেন শত্রুপক্ষের চোখে ধুলো দিয়ে নির্বিঘ্নে থাকতে ।
 

♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦

ড্রাগন পর্বতে, ‘একা এবং কয়েকজন’


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!