Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • জানুয়ারি ১১, ২০২৬

জলবায়ুর সংকটে নারীশক্তির সবুজ বিপ্লব

ইমরাজ হাসান
জলবায়ুর সংকটে নারীশক্তির সবুজ বিপ্লব

 
জলবায়ু সংকট আর সুদূর ভবিষ্যতের ‘অবিশ্বাস্য’ আশঙ্কা নয়, আজ তা চরম রুক্ষ বাস্তব। হিমবাহ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, খরা ও বন্যা একই সঙ্গে গ্রাস করছে একের পর এক দেশ, ধ্বস নামছে পাহাড়ে, শুকিয়ে যাচ্ছে নদী, তীব্র দহনে কিংবা তুমুল শীতে প্রাণ ওষ্ঠাগত, বাতাসে ছেয়ে গেছে দূষণের মারণ বিষ। প্রকৃতি জানান দিচ্ছে, সুনামি-ঘূর্ণিঝড়-ভূমিকল্পে সাবধান করছে দুপেয়ে জীবকে। অথচ এখনো চেতেনি মানুষ। রাক্ষুসে খিদেয় সে কেটে চলেছে বন, ভেঙে ফেলছে পাহাড়, মাটির বুক চিড়ে তুলে আনছে হৃদপিণ্ড। সবুজ ধ্বংস করে তুলছে উঁচু উঁচু গগনচুম্বী লোহালক্কড়ের জঙ্গল, রাবনের চিতার মতো দাউদাউ জ্বলছে বিশাল বিশাল কারখানার ফার্নেস। রাষ্ট্রনায়কদের সম্মেলন, জাতিসংঘের প্রতিশ্রুতি আর পরিসংখ্যানের ভিড়ে পরিবেশ বাঁচাতে কাজ কতখানি হচ্ছে, তা বুঝতে পণ্ডিত হতে হয় না। তবু আশায় বুক বাঁধতেই হয়। জানার আগ্রহ জন্মায়, চরম এই সংকটের বিরুদ্ধে প্রকৃত লড়াইটা কে লড়ছে ? উত্তরটা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে, বিশ্বজুড়ে এ লড়াইয়ে সামনের সারিতে রয়েছেন নারীরা।
 
ভারতে পরিবেশ আন্দোলনের গোড়াপত্তন করেছিলেন নারীরাই। গৃহস্থালি ব্যবস্থাপনা, জীবিকা নির্বাহ ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক থাকার ফলে নারীরা সহজাত মর্মিতায় পরিবেশগত সংকটকে প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করেন। ফলে পরিবেশ রক্ষার সংগ্রামে তাদের অংশগ্রহণ কেবল প্রতীকী থাকে না। হয়ে ওঠে বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর প্রতিষ্ঠিত দুর্দম অঙ্গীকার। ভারতীয় দর্শন ও সংস্কৃতিতে পৃথিবীকে মাতৃরূপে কল্পনা করা হয়েছে, যেখানে প্রকৃতিকে মানজাতীর লালনকর্ত্রী হিসেবে। অথচ আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এ দেশেই প্রকৃতির উপর সবচেয়ে বেশি আঘাত নেমেছে। বন উজাড় হয়েছে, প্রকৃতির আদি সন্তানরা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, জল-জঙ্গল-জমিন দখল করেছে পুঁজিবাদী শক্তি, আকাশ দখল করেছে কারখানা-যানবাহনের ধোঁয়া। উন্নয়নের নামে এই অযাচিত হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে পরিবেশ সচেতন মানুষদের প্রতিবাদ থেকেই পরিবেশ আন্দোলনের সূচনা ঘটে। ভারতে পরিবেশ আন্দোলনের ইতিহাস তুলনামূলকভাবে নবীন, রাজনৈতিকও। কিন্তু এর সামাজিক ভিত্তি ও প্রভাব অত্যন্ত গভীর। বিশেষত নারীরা যে আন্দোলনগুলিতে সক্রিয় ও নেতৃত্বমূলক ভূমিকা পালন করেছেন, তা পরিবেশবাদী চিন্তাকে ভরসা জুগিয়েছে।
 

প্রকৃতি জানান দিচ্ছে, সুনামি-ঘূর্ণিঝড়-ভূমিকল্পে সাবধান করছে দুপেয়ে জীবকে । অথচ এখনো চেতেনি মানুষ । রাক্ষুসে খিদেয় সে কেটে চলেছে বন, ভেঙে ফেলছে পাহাড়, মাটির বুক চিড়ে তুলে আনছে হৃদপিণ্ড । সবুজ ধ্বংস করে তুলছে উঁচু উঁচু গগনচুম্বী লোহালক্কড়ের জঙ্গল, রাবনের চিতার মতো দাউদাউ জ্বলছে বিশাল বিশাল কারখানার ফার্নেস । রাষ্ট্রনায়কদের সম্মেলন, জাতিসংঘের প্রতিশ্রুতি আর পরিসংখ্যানের ভিড়ের বাইরে পরিবেশ বাঁচাতে সামনের সারিতে দাড়িয়ে লড়ছেন বীরাঙ্গনরা

 
ভারতে পরিবেশ আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণের সূচনা অষ্টাদশ শতাব্দীতে ‘বিষ্ণোই আন্দোলন’-এর মধ্য দিয়ে ঘটে। ১৭৩১ সালে রাজস্থানের খেজরালি গ্রামে অমৃতা দেবী খেজরি গাছ রক্ষার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। তাঁর আত্মবলিদান রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে নৈতিক প্রতিরোধের এক অনন্য নিদর্শন। পরবর্তীকালে ঔপনিবেশিক শাসনামলে চম্পারণ আন্দোলন ও লবণ সত্যাগ্রহে নারীদের অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়, যদিও সে সময়ে তাদের ভূমিকা প্রধানত সহায়ক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বিশেষত ১৯৭০-এর দশক থেকে গ্রামীণ নারীরা পরিবেশ আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হন। ‘চিপকো আন্দোলন’ ভারতে নারীনেতৃত্বাধীন পরিবেশ আন্দোলনের এক মাইলফলক। উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলায় বন উজাড়ের বিরুদ্ধে গৌরা দেবী ও অন্যান্য গ্রামীণ নারীরা গাছকে আলিঙ্গন করে প্রতিবাদ জানান। এই আন্দোলন নারীদের আত্মপরিচয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতাকে দৃঢ় করে এবং তৃণমূল স্তরে নারীদের সংগঠিত শক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করে। একইভাবে কেরালার ‘সাইলেন্ট ভ্যালি’ আন্দোলনে সুগাথা কুমারীর নেতৃত্বে পরিবেশ রক্ষার দাবি কেবল রাজনৈতিক পরিসরে নয়, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিসরেও প্রতিফলিত হয়। এর ফলে পরিবেশ আন্দোলন একটি ব্যাপক সামাজিক আন্দোলনে রূপ লাভ করে। নবধান্য আন্দোলনের মাধ্যমে বন্দনা শিবা পরিবেশবাদ ও নারীবাদের মধ্যে একটি তাত্ত্বিক সংযোগ স্থাপন করেছেন। এই আন্দোলন নারীদের বীজ সংরক্ষণ ও কৃষি বৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতে উৎসাহিত করে। অপরদিকে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনে মেধা পাটেকরের নেতৃত্ব বৃহৎ বাঁধ নির্মাণ জনিত সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতির প্রশ্নকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরে। এ আন্দোলনে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ উন্নয়নের বিকল্প ধারণা নির্মাণে সহায়ক হয়েছে।
 
বৈশ্বিক পরিসরে গ্রেটা থুনবার্গের নাম আজ জলবায়ু আন্দোলনের প্রতিশব্দ। কৈশোরেই তিনি রাষ্ট্রনেতাদের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন তুলছেন উন্নয়নের সংজ্ঞা নিয়ে। তাঁর কণ্ঠে কোনো কূটনৈতিক নম্রতা নেই, আছে এক নয়া প্রজন্মের ক্ষোভ ও উদ্বেগ। ইউরোপের রাজপথ থেকে জাতিসংঘের মঞ্চ— গ্রেটা বুঝিয়ে দিয়েছেন, জলবায়ু আন্দোলন আর বিশেষজ্ঞদের একচেটিয়া আলোচনার বিষয় নয়, তা গণআন্দোলনের চেহারা নিয়েছে। ২০১৮ সালে মাত্র পনেরো বছর বয়সে তিনি ‘স্কুল স্ট্রাইক ফর ক্লাইমেট’ নামে একটি প্রতিবাদ শুরু করেন, যা পরবর্তীতে ‘ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার’ নামে বিশ্বব্যাপী আন্দোলনে পরিণত হয়। তাঁর অনুপ্রেরণায় শত শত হাজার তরুণ রাজনৈতিক নেতাদের সামনে ‘climate action’ বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছেন এবং জলবায়ু নীতিতে সময়মত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলছেন। কানাডার শীলা ওয়াট-ক্লাউটিয়ার আর্কটিকের মূলনিবাসী (Inuit) সম্প্রদায়ের একজন অগ্রগামী জলবায়ু কর্মী ও অধিকার রক্ষাকারী। কানাডা ও বিশ্বব্যাপী আর্টিক অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং তার কারওনাই মানবাধিকার ও জীবনযাত্রার প্রশ্নগুলোকে আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠা করেছেন। শীলা বরফ গলন, পরিবেশ দূষণ ও জীবিকাশীল সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় বক্তব্য রেখে চলেছেন এবং বহুবার আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারক সংস্থায় আর্কটিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে ও মানবাধিকার ভিত্তিক জলবায়ু ন্যায়ের দাবিতে বক্তব্য করেছেন।
 
অমোঘ এ আন্দোলনের ব্যাপ্তি, ভৌগলিক কেন্দ্র ইউরোপ বা আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ নয়। আফ্রিকার উগান্ডা থেকে উঠে আসা ভেনেসা নাকাতে দেখিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত কীভাবে বৈশ্বিক দক্ষিণের মানুষকে অসমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি জলবায়ু ন্যায়ের প্রশ্নটিকে সামনে এনে বলছেন, যারা সবচেয়ে কম দূষণ করেছে, তারাই সবচেয়ে বেশি ভুগছে। এই বক্তব্য শুধু পরিবেশগত নয়, গভীরভাবে রাজনৈতিকও। অন্যদিকে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপদেশগুলির নারীরা জলবায়ু সংকটকে তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়, অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে যেসব দ্বীপ ধীরে ধীরে মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার মুখে, সেখানকার মহিলা কর্মীরা তাঁদের ভূমি, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন। তাঁদের আন্দোলনে পরিবেশ আর পরিচয়ের প্রশ্ন মিলেমিশে একাকার।
 

পরিবেশ আন্দোলনের পথ সহজ নয় । এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের সমীকরণ । বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক হিসাব । ক্ষমতার জটিল ইমারত । তাই, বিশ্বজুড়ে পরিবেশ ও জলবায়ু কর্মীরা ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে পড়ছেন । বিশেষ করে যাঁরা ভূমি অধিকার, বন সংরক্ষণ বা খনিজ উত্তোলনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন, তাঁদের উপর হামলা ও সহিংসতার ঘটনা বেড়েই চলেছে

 
লাতিন আমেরিকায় মূলনিবাসী মহিলা জলবায়ু কর্মীরা আমেরিকা সহ সাম্রাজ্যবাদী, তৈললোলুপ শক্তির হাতে বন ধ্বংস ও খনিজ উত্তোলনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাচ্ছেন জীবন বাজি রেখে। ব্রাজিল, কলম্বিয়া কিংবা পেরুর অরণ্যভূমিতে সংগ্রামী নারীরা কেবল পরিবেশ রক্ষা করছেন না, তাঁরা রক্ষা করছেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা জীবনব্যবস্থা। উন্নয়নের নামে কর্পোরেট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাঁদের প্রতিবাদ সরাসরি রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। জিওমারা আজেভেদো (কলম্বিয়া) স্থানীয় স্তরে জলবায়ু অভিযোজন ও যুব নেতৃত্ব গড়ে তুলতে কাজ করছেন। তাঁর সংগঠন ‘বারাঙ্কুইয়া +২০’ পরিবেশ নীতিতে নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় তরুণ জলবায়ু কর্মী রাইসা নূর-মহম্মদ তার ‘এক্সটিঙ্কশন রিবেলিয়ন’ ও ‘ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার’-এর মাধ্যমে তুলে ধরছেন, কীভাবে ঐতিহাসিকভাবে কম দূষণকারী দেশগুলিই আজ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাবের মুখে। মিশরের তরুণ নেতৃত্বের উদাহরণ মরিয়ম এলবান্না। তিনি ‘কপ-২৭’ জলবায়ু সম্মেলনে যুব প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জনের পর বর্তমানে কিশোরী ও তরুণীদের জন্য পরিবেশ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এসব কর্মসূচিতে জলবায়ু বিজ্ঞান, টেকসই জীবনধারা এবং কমিউনিটি পর্যায়ে অভিযোজন কৌশল শেখানো হচ্ছে।
 
ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়াতেও চিত্র আলাদা নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষি, জলসম্পদ ও জীবিকার উপর যে আঘাত আসছে, তার প্রথম অভিঘাত পড়ছে নারীদের উপরেই। হাসদেও, আরাবল্লী, দিল্লির বায়ু দূষণ— শহরের জলবায়ু কর্মী থেকে গ্রামীণ জলসংরক্ষণ আন্দোলনের নেতৃত্ব, সব ক্ষেত্রেই নারীশক্তি নতুন দিশা দেখাচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, জলবায়ু আন্দোলন আজ আর শুধু প্রকৃতি ধবংসের প্রশ্ন নয়, তা মানুষের অস্তিত্ব, ন্যায়, সমতা ও মানবাধিকারের প্রশ্ন। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, BELA (Bangladesh Environmental Lawyers Association)-এর প্রধান নির্বাহী সম্পাদক, পরিবেশকর্মী সায়েদা রিজওয়ানা হাসান পরিবেশ রক্ষার আইনি লড়াইয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছেন। বাংলাদেশের সুন্দরবনসহ প্রকৃতি এবং মানুষের জীবিকাকে ধ্বংস করতে পারে এমন কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রকল্পের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন তিনি। তাঁর এই আইনি সংগ্রাম ২০০৯-এ ‘গোল্ডম্যান এনভায়রনমেন্টাল প্রাইজ’ দিয়ে বিশ্বব্যাপী সম্মানিত হয়েছে, যা পরিবেশ ও জলবায়ু সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। পদ্মাপাড়ে আরো একজন মহিলা জলবায়ু কর্মী জাভেদা করিম। উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের জন্য তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শিক্ষা ও সমন্বিত উদ্যোগে যুক্ত করছেন। বাংলাদেশের বন্যা, লবণাক্ততা, খাদ্য নিরাপত্তা সংকটের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কোচিং, সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কমিউনিটি ভিত্তিক অভিযোজন (Community-based Adaptation) কার্যক্রমে জাভেদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
 
পাকিস্তানের তরুণ জলবায়ু অধিকারকর্মী আয়িশা সিদ্দিকা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশেষভাবে পরিচিত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় সৃষ্ট বন্যা, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি নিয়ে তার গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি কাজ বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়েছে। ‘টাইম’ ম্যাগাজিনসহ একাধিক আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম তাকে উদীয়মান জলবায়ু কণ্ঠস্বর হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি জলবায়ু ন্যায়বিচারকে সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে তুলে ধরেন, যেখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। ইন্দোনেশিয়ায় পরিবেশ সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন সুরাবায়াভিত্তিক মুরাল শিল্পী ইনায়াহ ওয়াহিউদি। তিনি শহরের বিভিন্ন স্থাপনায় পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সবুজ নগর পরিকল্পনা বিষয়ক চিত্রকর্ম আঁকছেন। তার কাজ স্থানীয় জনগণের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন ও নগর দূষণ নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। ইন্দোনেশিয়ার ‘গ্রিন সুকুক’ প্রকল্প বন সংরক্ষণ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অর্থায়ন করছে। মালয়েশিয়ায় সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক কমিউনিটি প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ ও অবহেলিত অঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘ইকো-ইউথ’, ‘গ্রিন ক্যাম্পাস’ ও ‘জিরো-ওয়েস্ট স্কুল’ উদ্যোগগুলো প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই অভ্যাস গড়ে তুলতে সহায়তা করছে। এসব প্রকল্পে আন্তর্জাতিক পরিবেশ নীতিমালার পাশাপাশি স্থানীয় বাস্তবতা ও সামাজিক কাঠামোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বাস, সংস্কৃতি বা ভৌগোলিক পার্থক্য যাই থাকুক, এই তরুণ জলবায়ু কর্মীরা দেখিয়ে দিচ্ছেন— উদ্ভাবন, প্রযুক্তি এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্যোগের সমন্বয়ের মাধ্যমে বিশ্ব জলবায়ু আন্দোলনে এশিয়ার দেশগুলিও নেতৃত্বের জায়গায় আসতে পারে।
 
তবে, পরিবেশ আন্দোলনের পথ সহজ নয়। কারণ এর সাথে জড়িয়ে আছে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের সমীকরণ। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক হিসাব। ক্ষমতার জটিল ইমারত। তাই, বিশ্বজুড়ে পরিবেশ ও জলবায়ু কর্মীরা ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে পড়ছেন। বিশেষ করে যাঁরা ভূমি অধিকার, বন সংরক্ষণ বা খনিজ উত্তোলনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন, তাঁদের উপর হামলা ও সহিংসতার ঘটনা বেড়েই চলেছে। ভারত, বাংলাদেশ, চিন, পাকিস্তান, রাশিয়া, লাতিন আমেরিকার কলম্বিয়া, ব্রাজিল, হন্ডুরাস ও মেক্সিকো পরিবেশরক্ষকদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক অঞ্চলগুলির মধ্যে পড়ে। মূলনিবাসী জনগোষ্ঠী এই সহিংসতার প্রধান শিকার। শারীরিক হামলার পাশাপাশি আইনগত ও প্রশাসনিক দমন-পীড়নও বেড়েছে। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদন বলছে, বহু উন্নত দেশেও জলবায়ু আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তাঁদের আন্দোলনকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। এর ফলে গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে। ভারতেও পরিবেশ ও জলবায়ু কর্মীদের উপর নজরদারি ও তদন্তের ঘটনা সামনে এসেছে। অনেক কর্মী মনে করছেন, এটি নাগরিক সমাজকে দুর্বল করার একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী নারীর অধিকার নিয়ে যে ধরণের প্রতিক্রিয়াশীলতা বাড়ছে, তাতে নারী জলবায়ু কর্মীদের জন্য পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলছে।
 
এই অসম লড়াইয়ের বাস্তবতার মধ্যেই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি জলবায়ু সংকট মোকাবিলার জন্য নানান উদ্যোগ নিচ্ছে বলে দাবি করছে। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (UNFCCC) এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১৩ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতার কথা বলছে। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের মতো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলিকে সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে বাস্তবে এই প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড়ের গতি অত্যন্ত ধীর। ‘কপ’ সম্মেলনগুলি (COP) আন্তর্জাতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হলেও, সেখানে নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। মূলনিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মীরা বহুবার এ সম্মেলনগুলিতে প্রতিবাদ জানিয়েছেন, কারণ তাঁদের মতে, পরিবেশের মামলায় রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব প্রকট। জাতিসংঘের নারী শাখা বারবার বলছে, জলবায়ু নীতিতে নারীর নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ অপরিহার্য। কিন্তু এই স্বীকৃতি এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রে নীতিগত ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কার্যকর আইন ও বাধ্যতামূলক কাঠামো তৈরি না হলে লাভের লাভ কিছুই হবে না। অথচ এই মুহূর্তে, নারী জলবায়ু কর্মীদের ভূমিকা, তাঁদের আন্দোলন কেবল প্রতিবাদের কণ্ঠ নয়; তা বিজ্ঞান, আইন, সমাজনীতি ও শিক্ষার সমন্বয়ে গঠিত এক বিকল্প উন্নয়ন দর্শন। তাঁরা হাতেকলমে বারবার দেখিয়ে দিচ্ছেন, জলবায়ু ন্যায় ছাড়া পরিবেশ রক্ষা অসম্ভব, আর সামাজিক ন্যায় ছাড়া টেকসই উন্নয়ন কল্পনাই করা যায় না। ভবিষ্যতের জন্য এই সংগ্রাম কয়েকটি মৌলিক দাবি সামনে রাখছে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব ও বাধ্যতামূলক নীতিতে রূপান্তরিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য জলবায়ু অর্থায়ন বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, পরিবেশ আন্দোলনের অধিকার রক্ষা করতে হবে, দমন নয়। চতুর্থত, পুঁজিবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে ভূমিকা নিতে হবে। আর শেষ দাবি, নারী, মূলনিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে আনতে হবে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!