Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • অক্টোবর ১২, ২০২৫

তমলুকে হিউয়েন সাঙ

কানাইলাল জানা
তমলুকে হিউয়েন সাঙ


শহর থেকে দূরে । পর্ব ৫

 

 প্রতিবছর পুজো এলেই আগ্রহ প্রবল হয়ে ওঠে, কখন গ্রামে যাব। অষ্টমীতে এসপ্ল্যানেডে গেলাম অগ্রিম টিকিট কাটতে, কিন্তু কোনো বাস দাঁড়িয়ে নেই। ভাবলাম, তাহলে কি দুর্যোগের জন্য বাস আসতে পারেনি ? নাকি পুজোর আবহে যাত্রী পাওয়া যাবে না বলে আসেনি ? ভিজতে ভিজতে ভাবছি, আর কত বৃষ্টি হবে ? বৃষ্টি তো চলছে জুন মাস থেকে। ঘাটালে বন্যা। আমাদের জেলাও খানিকটা বিপন্ন।

 

নবমীর দুপুরে দীঘাগামী সরকারি বাসে চাপি তিনজনের পরিবার। রাস্তাঘাট দুর্দান্ত ভালো, দীঘা পর্যন্ত সবটাই এখন জাতীয় সড়ক। মেচেদার পর হাই রোড ধরে যাচ্ছি, দু’ধারে ধান গাছে থোড় আসি আসি করছে। নদীরা সে রূপনারায়ণ হোক, বা হলদী জোয়ারের জলে ফুটে উঠেছে। আকাশে মেঘের ঘনঘটা। পশ্চিমের আকাশে রণসজ্জা, পাহাড়ের কোলে পাহাড়! সূর্যের সংরাগেও অপরূপ দৃশ্য।

 

তমলুকের রাজা ও রাজবাড়ির লোকজন বরাবরই ছিলেন বিপ্লবীদের পক্ষে। তমলুক থানা থেকে খানিকটা উত্তরে আবাসবাড়িতে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন বিয়াল্লিশের আগস্ট আন্দোলনের নেত্রী মাতঙ্গিনী হাজরা।

 

হেঁড়িয়া বাসস্ট্যান্ডে নামি। এখান থেকে একটি বাসরাস্তা, পূর্ব দিকে খেজুরি, দক্ষিণে দীঘা, পশ্চিমে এগরা, ইটাবেড়িয়া ও মাধাখালির দিকে ছুটছে। হেঁড়িয়া থেকে অটো ধরে মাধাখালি পৌঁছোই। নিমতৌড়িতে যোগ দেয় ভায়রা অপূর্ব। সে এসেছে তমলুক থেকে। চারজন টোটো ধরে শ্বশুর বাড়ি শিমুলদাঁড়ির দিকে এগিয়ে চলি। মাধাখালিতে দেদার ফলের পসরা। মিষ্টির দোকানও। মধুমিতা মিষ্টি, ফল কিনল। মুগবেড়িয়া গঙ্গাধর  হাইস্কুলের মোড় থেকে ডানদিকে বাঁক নিয়ে টোটো ঢুকে পড়ল গ্রামের নিবিড়ে। কোথাও কোথাও রাস্তায় উপচে পড়ছে বর্ষা। সারি সারি ধানগাছ রাস্তা থেকেও উঁচু। জলে আর ডুবে যাওয়ার ভয় নেই, আশঙ্কা যদি কেলেঘাই, কপালেশ্বরী বা পানেশ্বরী ভেঙে যায়! তাহলে সর্বনাশ। পদ্মতামলী গ্রামের কাছে রাস্তার অবস্থা বেহাল, দীর্ঘদিন মেরামত হয়নি। ভগবানপুর বিধানসভাটি বিরোধীদের জেতা আসন, ২০২১ সাল থেকে। তবে উন্নয়নের প্রশ্নে সেখানে পালাবদল চাইছে কেউ কেউ।

 

হলদি নদী পেরিয়ে চন্ডীপুর হয়ে বাজকুল থেকে ডানদিকে যে রাজ্যসড়কটি ভগবানপুর হয়ে এগরা যাচ্ছে, সে রাস্তায় বহু দূর পাল্লার বাস চলে, তার হাল ভালো নয়, এখানে-ওখানে খানাখন্দের নিঃশব্দ যন্ত্রণা।

 

কাঁথির প্রভাতকুমার কলেজ থেকে ইতিহাসে স্নাতক হয়ে মেজদা সবে শিক্ষকতায় ঢুকেছিল নরঘাটের একটি স্কুলে। দিনটি ছিল শ্রাবণের বুধবার। তমলুকের নারায়ণপুর পুলের ওপর বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বাসকে পাশ দিতে গিয়ে পড়ে যায় গভীর খালে, আর বাড়ি ফেরেনি মেজদা

 

তমলুক প্রাচীন শহর। সপ্তম শতাব্দীতে এখানে এসেছিলেন পর্যটক হিউয়েন সাঙ। সে ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে শহরের পূর্বদিকে খেয়াঘাটের কিছু আগে, হিউয়েন সাঙের জমজমাট মূর্তি। তমলুকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এসেছেন দুবার। ওই স্মৃতিচিহ্ন জাগ্রত শ্রীগৌরাঙ্গ মন্দির প্রাঙ্গণে। এখানকার হ্যামিল্টন স্কুলে পড়েছেন বিপ্লবী ক্ষুদিরাম, যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায়, সতীশচন্দ্র সামন্ত, অজয় মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। বিভিন্ন সময়ে শহরে এসেছেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, নেতাজি সুভাষ, কাজী নজরুল ইসলাম সহ বহু গুণী। তমলুকের রাজা ও রাজবাড়ির লোকজন বরাবরই ছিলেন বিপ্লবীদের পক্ষে। তমলুক থানা থেকে খানিকটা উত্তরে আবাসবাড়িতে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন বিয়াল্লিশের আগস্ট আন্দোলনের নেত্রী মাতঙ্গিনী হাজরা। জায়গাটি সংরক্ষিত।

 

তমলুকের বিখ্যাত বর্গভীমা মন্দিরের কাছেই রক্ষিতবাড়িটি তখন বিপ্লবীদের আখড়া। এখন তার ভগ্নদশা। তমলুকের দক্ষিণ-পূর্বে, রূপনারায়ণ জুড়ে আছে আঠার গেট। একটি গভীর খাল চলে গেছে শহর পেরিয় পশ্চিম দিকে। নারায়ণপুর পুল থেকে ডুবে যায় আমাদের পারিবারিক ভবিষ্যৎ। সেটা ১৯৬৬ সাল, বাংলা সন ১৩৭৩। সেবছরও প্রবল বৃষ্টি হয়েছিল। সেজদাকে কলকাতার কলেজে ভর্তি করে বাড়ি ফিরছিল মেজদা। কাঁথির প্রভাতকুমার কলেজ থেকে ইতিহাসে স্নাতক হয়ে মেজদা সবে শিক্ষকতায় ঢুকেছিল নরঘাটের একটি স্কুলে। দিনটি ছিল শ্রাবণের বুধবার। তমলুকের নারায়ণপুর পুলের ওপর বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বাসকে পাশ দিতে গিয়ে পড়ে যায় গভীর খালে, আর বাড়ি ফেরেনি মেজদা। মেজদাকে ১৯৬২ সালে, চিন-ভারত যুদ্ধে যাওয়ার উপক্রম হলে মা-র সে কী উদ্বেগ ! কিন্তু যেতে হয়নি। যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গেল। সেই প্রাণচঞ্চল মেজদাকেও গিলে নেয় জল। নিখোঁজ হয়ে গেল বরাবরের জন্য।

 

১৯৭৮ সালে আমি কলকাতায়, কলেজ ছাত্র। সেবারও প্রায় সারা বাংলা বন্যার কবলে, কাঁথি মহকুমা বেঁচে যায়। কলেজের বন্ধুরা তাগাদা দিচ্ছে গ্রামে যেতে, যাইনি সেখানে বন্যা হয়নি বলে। মোদ্দা কথা, আমাদের গ্রাম শেষ হয়ে গেছে ১৯৬৬ আর ১৯৬৭-র পরপর দুবারের বন্যায়। প্রথমবার বন্যার জল ঢোকে পানেশ্বরী এবং দুবদা  বেসিনের বাঁধ ভেঙে। আলগা জল পেয়ে পুকুরের মাছ আনন্দে আত্মহারা। লাফ দিতে দিতে পালাল ডুবন্ত ধানমাঠ দিয়ে। আমাদের পুকুর থেকে পালাল নাকে নথ পরা রুই কাতলা রামু এবং পানু। ১৯৬৬ সালে কেলেঘাই ভেঙে বন্যার জল ধেয়ে এল। ভেঙে পড়ল গ্রামীণ অর্থনীতি। তখনো বিকল্প ধান চাষ শুরু হয়নি। পাড়ার প্রতিভাধর ছাত্ররা সামান্য গ্রাজুয়েট হতেও পারল না। যখন স্কুলে পড়ি, বর্ষাকাল এলেই দলবেঁধে আমরা টোটানালা হয়ে চলে যেতাম আমগেছিয়া বাঁধে। এখানেই কেলেঘাই নদীতে জল মাপার যন্ত্র পোঁতা ছিল।

 

আমরা বায়েন্দা হয়ে যাচ্ছি। মাঠময় সবুজ আর সবুজ। চারপাশ সবুজ। কোনো কোনো বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে জলে। রাস্তায় উঠে আসছে নানাধরণের মাছ। কাঁথি বাসস্ট্যান্ডেও মাছের দৌড়াদৌড়ি, উল্টে গেছে এক ট্রলি সিঙি মাগুর কই। নানা ধরনের জ্যান্ত মাছ। বর্ষাকালের সবথেকে সুস্বাদু মাছ বাঁকি ঝাড়া মৌরলা, দেশি চিংড়ি, পাঁকাল, খলসে ইত্যাদি। চালতা গাছের কাছে নয়ানজুলি আর বিলপুকুরের সংযোগস্থলে স্রোতের কিনারে মা বসিয়ে রাখতেন বাঁকি। বাঁকি ঝাড়া মাছের কথা এখন ইতিহাস!

♦–♦♦–♦♦–♦

দেশপ্রেমী বিজয়লাল


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!